শালবনের ছোট্ট গ্রামটিতে ডাকঘর ছিল না। চিঠি পাঠাতে হলে মানুষকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের বাজারে যেতে হতো। অথচ গ্রামের অধিকাংশ মানুষই ছিলেন বয়স্ক, আর অনেকেরই দূরে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না।
এই সমস্যার কথা প্রথম বুঝেছিলেন গ্রামের তরুণী মেঘলা। তিনি শহরে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। গ্রামের পুরোনো পঞ্চায়েত ভবনের একটি ঘরকে ছোট পাঠকেন্দ্রে পরিণত করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। কিন্তু বইয়ের অভাব, অর্থের অভাব এবং মানুষের অনাগ্রহ—সব মিলিয়ে কাজ এগোচ্ছিল না।
একদিন পাঠকেন্দ্রের ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি কাঠের একটি বাক্স পেলেন। বাক্সের মধ্যে ছিল কয়েকটি পুরোনো পোস্টকার্ড, কিছু খাম এবং নীল রঙের একটি মোটা খাম। খামটির গায়ে লেখা—‘যাঁদের কথা দূরে পৌঁছয় না, তাঁদের জন্য।’
ভেতরে ছিল একটি হাতে লেখা আবেদনপত্র।
লেখক ছিলেন গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক হরিপদবাবু। তিনি বহু বছর আগে গ্রামের মানুষের হয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি লিখতেন। কারও জমির কাগজের সমস্যা, কারও ভাতার আবেদন, কারও সন্তানকে অন্য স্কুলে ভর্তি করার অনুরোধ—সবই তাঁর হাত ধরে ঠিক জায়গায় পৌঁছত।
চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল, ‘একটি গ্রামে শুধু রাস্তা থাকলেই হয় না। সেই গ্রামের মানুষের কথা বাইরে পৌঁছনোর পথও থাকতে হয়। একদিন যদি কেউ এই বাক্স খুঁজে পায়, তবে সে যেন মানুষের কথাগুলো হারিয়ে যেতে না দেয়।’
মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
পরদিন তিনি গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। জানতে পারলেন, হরিপদবাবু শুধু চিঠি লিখতেন না, তিনি প্রত্যেক আবেদনকারীর সমস্যার বিবরণও একটি খাতায় লিখে রাখতেন। সেই খাতা আর পাওয়া গেল না, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তাঁর কাজের গল্প রয়ে গিয়েছিল।
মেঘলা সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি গ্রামের মানুষের জন্য একটি ‘জনকথা কেন্দ্র’ তৈরি করবেন। সেখানে মানুষ নিজের সমস্যা লিখিয়ে রাখতে পারবেন, প্রয়োজনীয় আবেদনপত্রের খসড়া তৈরি করতে পারবেন এবং কোন সরকারি দপ্তরে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয়, তার তথ্য পাবেন।
শুরুতে মাত্র চারজন এলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিধবা সরস্বতী দেবী, কৃষক নিতাই এবং দুই তরুণ শ্রমিক।
সরস্বতী দেবী নিজের বার্ধক্যভাতার আবেদনের অবস্থা জানতে চেয়েছিলেন। নিতাই জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর জমির মাটির পরীক্ষা কোথায় করানো যায়। দুই শ্রমিক জানতে চেয়েছিলেন, শহরে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি কীভাবে তৈরি করতে হবে।
মেঘলা তাঁদের কথা শুনলেন। প্রত্যেকের সমস্যা আলাদা কাগজে লিখলেন। কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, কোন নথি লাগবে এবং কীভাবে আবেদন জমা দিতে হবে, তা বুঝিয়ে দিলেন। যেসব বিষয়ে তাঁর নিশ্চিত জ্ঞান ছিল না, সেগুলোর উত্তর অনুমান করে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করলেন।
ধীরে ধীরে খবর ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ জমির নথি নিয়ে এলেন, কেউ স্কুলের বৃত্তির ফর্ম নিয়ে, কেউ আবার শুধু জানতে চাইলেন, তাঁদের অধিকার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথায় পাওয়া যাবে।
মেঘলা বুঝলেন, মানুষের শুধু সাহায্য দরকার নয়; দরকার এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রশ্ন করতে লজ্জা পেতে হয় না।
তাই পাঠকেন্দ্রের এক পাশে তিনি একটি বড় বোর্ড লাগালেন। তার শিরোনাম দিলেন—‘আপনার প্রশ্ন লিখুন’। নাম না লিখেও প্রশ্ন জমা দেওয়া যেত। প্রতি সপ্তাহে তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে উত্তর সংগ্রহ করে বোর্ডে টাঙিয়ে দিতেন।
একদিন সেখানে একটি প্রশ্ন এল—‘আমার মেয়ে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু বাড়ির সবাই বলছে মেয়েদের এত দূর পড়তে যাওয়ার দরকার নেই। আমি কী করব?’
প্রশ্নটির পাশে কোনও নাম ছিল না।
মেঘলা সেদিন কোনও বক্তৃতা দিলেন না। তিনি মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ, কাছাকাছি বিদ্যালয়ের তথ্য, যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং শিক্ষাবৃত্তির নিয়ম নিয়ে একটি ছোট তথ্যপত্র তৈরি করলেন। পরের সপ্তাহে সেই তথ্যপত্র পড়তে এসে গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন।
কয়েক মাসের মধ্যে জনকথা কেন্দ্রটি গ্রামের পরিচিত জায়গা হয়ে উঠল। সেখানে এখন শুধু আবেদনপত্র লেখা হতো না, মানুষ অন্যের সমস্যার কথাও শুনতেন। কেউ পড়তে না জানলে অন্য কেউ তাঁকে কাগজের লেখা বুঝিয়ে দিতেন। কেউ সরকারি দপ্তরে যাওয়ার পথ না জানলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি পথ দেখিয়ে দিতেন।
একদিন জেলা প্রশাসনের একটি দল গ্রামে এসে কেন্দ্রটির কাজ দেখল। তারা মেঘলাকে জানাল, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও সুসংগঠিত করা যেতে পারে। মেঘলা সেই সুযোগ গ্রহণ করলেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দিলেন, তথ্যের উৎস যাচাই করার নিয়ম তৈরি করলেন এবং ব্যক্তিগত নথি নিরাপদে রাখার ব্যবস্থাও করলেন।
এক বছর পরে গ্রামের পাঠকেন্দ্রে একটি ছোট অনুষ্ঠান হলো। হরিপদবাবুর স্মরণে নীল খামটি কাচের বাক্সে রাখা হলো। তার পাশে লেখা হলো—
‘একটি চিঠি কখনও কখনও শুধু খবর বহন করে না, মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় তার নিজের কণ্ঠস্বর।’
অনুষ্ঠান শেষে সরস্বতী দেবী মেঘলার কাছে এসে বললেন, “আগে ভাবতাম, এসব কাজ বড় বড় অফিসের লোকেরাই শুধু করতে পারেন। এখন বুঝি, ঠিক পথটা চিনিয়ে দেওয়ার জন্য একজন মন দিয়ে শুনতে জানেন—এমন মানুষও দরকার।”
মেঘলা হাসলেন। তাঁর মনে হলো, হরিপদবাবুর নীল খামটি কোনও রহস্যের বাক্স ছিল না। সেটি ছিল একটি অসমাপ্ত কাজের স্মারক।
আর সেই কাজের অর্থ ছিল—কেউ যেন শুধু না জানার কারণে নিজের অধিকার, সুযোগ কিংবা স্বপ্ন থেকে দূরে সরে না থাকেন।
সেদিন সন্ধ্যায় জনকথা কেন্দ্র বন্ধ করার আগে মেঘলা বাক্সে একটি নতুন নীল খাম রাখলেন। তার ওপর লিখলেন—
‘আগামী দিনের প্রশ্নগুলোর জন্য।’
কারণ তিনি জানতেন, মানুষের প্রশ্ন কোনও দিন শেষ হয় না। আর যত দিন প্রশ্ন থাকবে, তত দিন উত্তর খোঁজার পথও খোলা রাখা দরকার।
শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে সব সমস্যার সমাধান নিজে করে দেওয়া নয়; বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় সুযোগ এবং নিজের কথা বলার সাহস দিয়ে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা।