মহিষাদলের ছোট্ট বাজারের এক কোণে ছিল একটি পুরোনো চশমার দোকান। দোকানের নাম—‘দৃষ্টিপথ’। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, এই ছোট্ট দোকানের ভেতরে কত মানুষের পৃথিবী নতুন করে স্পষ্ট হয়ে উঠত।
দোকানটির মালিক ছিলেন অরুণবাবু। বয়স প্রায় ষাট। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কপালে কয়েকটি গভীর ভাঁজ, আর কথাবার্তায় অদ্ভুত এক মমতা। তিনি শুধু চশমা বিক্রি করতেন না, মানুষের চোখের সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনের কথাও শুনতেন।
তাঁর একমাত্র মেয়ে নন্দিতা কলকাতায় পড়াশোনা করত। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল একজন আলোকচিত্রী হওয়ার। পৃথিবীর নানা রং, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি, বৃষ্টিভেজা রাস্তা কিংবা জানালার পাশে বসে থাকা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ—সবকিছুর মধ্যেই সে খুঁজে পেত গল্প।
কিন্তু অরুণবাবুর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম।
তিনি চাইতেন, নন্দিতা পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরে দোকানের দায়িত্ব নিক। তাঁর যুক্তি ছিল, এত বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসাটি একদিন বন্ধ হয়ে গেলে সবকিছু হারিয়ে যাবে।
নন্দিতা বাবাকে ভালোবাসত। কিন্তু নিজের স্বপ্নটাকেও সে অস্বীকার করতে পারত না।
একদিন রাতে বাবার সঙ্গে তার তুমুল তর্ক হয়ে গেল।
“বাবা, আমি সারাজীবন চশমার দোকানে বসে থাকতে পারব না। আমি ছবি তুলতে চাই। নিজের কাজ দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে চাই।”
অরুণবাবু চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
“ছবি তুলে জীবন চলে?” তিনি ধীরে ধীরে বললেন। “শখ আর জীবিকার মধ্যে পার্থক্য আছে, নন্দিতা।”
“তুমি কখনো আমার কাজটা বুঝতেই চাওনি!”
কথাটা বলে নন্দিতা নিজের ঘরে চলে গেল।
পরদিন সকালে সে কলকাতায় ফিরে গেল। যাওয়ার সময় বাবাকে কিছু বলল না। অরুণবাবুও তাকে আটকাননি।
শুধু দোকানের কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের চলে যাওয়া দেখেছিলেন।
তারপর থেকে বাবা-মেয়ের কথাবার্তা কমতে লাগল। ফোনে প্রয়োজনীয় কথা হতো, কিন্তু সেই কথার মধ্যে আর আগের মতো হাসি থাকত না।
নন্দিতা কলকাতায় একটি ছোট সংবাদমাধ্যমে ছবি তোলার কাজ পেল। বেতন বেশি ছিল না। তবু প্রতিদিন নতুন কিছু দেখার সুযোগ পেয়ে সে খুশি ছিল।
একদিন তাকে শহরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে ছবি তুলতে পাঠানো হলো। সেখানে গিয়ে তার পরিচয় হলো সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার সঙ্গে। নাম কমলা দেবী।
কমলা দেবী জানালার পাশে বসে প্রতিদিন আকাশ দেখতেন। তাঁর চোখে ছানি পড়েছিল। দূরের গাছ, পাখি, এমনকি নিজের সামনে রাখা ফুলের পাপড়িগুলোও তিনি স্পষ্ট দেখতে পেতেন না।
নন্দিতা ছবি তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল, “আপনি সব সময় জানালার পাশে বসে থাকেন কেন?”
বৃদ্ধা হেসে বললেন, “এখান থেকে আকাশটা দেখা যায়। যদিও এখন আর আগের মতো স্পষ্ট দেখতে পাই না।”
“আপনার বাড়ির লোকেরা আপনাকে দেখতে আসেন?”
কমলা দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
“ছেলে বিদেশে থাকে। ব্যস্ত মানুষ। বউমা সংসার সামলায়। আমি এখানে ভালোই আছি। কাউকে দোষ দিয়ে কী হবে বলো?”
নন্দিতা বুঝতে পারল, বৃদ্ধা কথার আড়ালে নিজের একাকিত্ব লুকিয়ে রাখছেন।
ছবি তোলার কাজ শেষ করে সে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু কমলা দেবীর কথাগুলো তার মনে থেকে গেল।
কয়েক দিন পর নন্দিতা আবার সেখানে গেল। এবার তার হাতে ছিল একটি ছোট ক্যামেরা এবং কিছু সময়।
সে বৃদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলল, তাঁদের পুরোনো দিনের গল্প শুনল, তাঁদের প্রিয় গান, হারিয়ে যাওয়া অভ্যাস আর অপূর্ণ ইচ্ছের কথা জানল। বুঝতে পারল, অনেক মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়—কেউ মন দিয়ে তাঁদের কথা শুনুক, সেই অভাবের।
তার তোলা ছবিগুলোর একটি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হলো। প্রদর্শনীর নাম দিল—‘জানালার ওপারে’।
সেখানে ছিল বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের ছবি। প্রতিটি ছবির সঙ্গে তাঁদের নিজের ভাষায় লেখা কয়েকটি বাক্য।
কমলা দেবীর ছবির নিচে লেখা ছিল—
‘আকাশ প্রতিদিন একই থাকে না। কখনো রোদ, কখনো মেঘ। তবু জানালার সামনে বসে থাকি, কারণ মনে হয়, পৃথিবী এখনও আমার সঙ্গে কথা বলছে।’
প্রদর্শনীতে প্রচুর মানুষ এলেন। কেউ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন, কেউ বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের জন্য বই ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
একজন প্রবীণ চক্ষু চিকিৎসকও প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন। তিনি নন্দিতার কাজ দেখে মুগ্ধ হলেন।
“তুমি শুধু ছবি তোলোনি,” তিনি বললেন, “তুমি মানুষের না-বলা কথাগুলোকে দৃশ্যমান করেছ।”
কথাটা নন্দিতার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।
এর কয়েক সপ্তাহ পরে তার কাছে একটি ফোন এল। ফোনের ওপারে ছিলেন অরুণবাবু।
“তোর ছবির প্রদর্শনীর কথা শুনলাম,” তিনি বললেন।
নন্দিতা অবাক হয়ে গেল। “তুমি জানলে কী করে?”
“তোর এক স্কুলের বন্ধু খবরের কাগজে ছবিটা দেখেছে। আমাকে পাঠিয়েছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর অরুণবাবু বললেন, “ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে।”
নন্দিতার বুকের মধ্যে জমে থাকা অভিমান যেন একটু নরম হলো।
“ধন্যবাদ, বাবা।”
“একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“তুই কি এই রবিবার বাড়ি আসতে পারবি? দোকানে একটু কাজ আছে।”
নন্দিতা জানত, বাবা সহজে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন না। তাই সে বুঝল, এই ফোনের আড়ালে অন্য কোনো কথা রয়েছে।
রবিবার সকালে সে বাড়ি ফিরল।
দোকানে ঢুকেই দেখল, অরুণবাবু একটি পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে বসে আছেন। বাক্সের মধ্যে বহু বছরের চশমার ফ্রেম, স্ক্রু, ছোট যন্ত্রপাতি আর কিছু ছবি রাখা।
“এগুলো কী?” নন্দিতা জিজ্ঞেস করল।
অরুণবাবু একটি বিবর্ণ ছবি তুলে দিলেন তার হাতে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক তরুণ অরুণবাবু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে একটি পুরোনো ক্যামেরা।
নন্দিতা অবাক হয়ে তাকাল।
“তোমার ক্যামেরা ছিল?”
“ছিল। তোর দাদুর কাছ থেকে লুকিয়ে ছবি তুলতাম। একবার একটা স্থানীয় পত্রিকায় আমার তোলা ছবি ছাপাও হয়েছিল।”
“তাহলে তুমি আমাকে কখনো বলোনি কেন?”
অরুণবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছিল। তারপর ছবি তোলাটা বন্ধ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম, আমার যে স্বপ্ন পূরণ হয়নি, অন্তত তুই নিরাপদ একটা জীবন পাবি। তাই তোকে নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়ার সাহস পাইনি।”
নন্দিতা বাবার পাশে বসে পড়ল।
“নিরাপদ জীবন চাই, বাবা। কিন্তু নিজের পছন্দের কাজটাও করতে চাই। দুটো কি একসঙ্গে সম্ভব নয়?”
অরুণবাবু মেয়ের দিকে তাকালেন।
“হয়তো সম্ভব। আমি শুধু নিজের ভয়টাকে তোর ভবিষ্যৎ ভেবে বসেছিলাম।”
সেদিন তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ কথা হলো। কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব পরিকল্পনা তৈরি হলো। নন্দিতা নিজের কাজ চালিয়ে যাবে। পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন দোকানে এসে বাবাকে সাহায্য করবে। অরুণবাবুও দোকানের পুরোনো হিসাব ও কাজকর্ম তাকে শেখাবেন।
কয়েক মাস পর ‘দৃষ্টিপথ’ দোকানে একটি নতুন ব্যবস্থা চালু হলো। দোকানের এক পাশে ছোট্ট একটি কোণ তৈরি করা হলো, যেখানে মানুষ তাঁদের পুরোনো চশমা মেরামত করাতে পারবেন এবং প্রয়োজনে কম খরচে চোখ পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থার খোঁজ পাবেন। নন্দিতা দোকানের কাজের ছবি তুলে স্থানীয় মানুষদের কাছে সেই পরিষেবার খবর পৌঁছে দিতে লাগল।
একদিন এক দরিদ্র বৃদ্ধ এলেন। তাঁর চশমার একটি ডাঁটি ভেঙে গিয়েছিল। নতুন চশমা কেনার সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
অরুণবাবু চশমাটি হাতে নিয়ে বললেন, “দেখি, মেরামত করা যায় কি না।”
বৃদ্ধটি উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কত টাকা লাগবে?”
অরুণবাবু হেসে বললেন, “আগে দেখি আপনার পৃথিবীটাকে আবার পরিষ্কার করা যায় কি না। টাকার কথা পরে হবে।”
নন্দিতা পাশ থেকে বাবার ছবি তুলল।
ছবিটি তোলার পর সে কাচের জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বিকেলের আকাশ। সূর্যের আলো দোকানের কাচে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
তার মনে হলো, এত দিন সে ভেবেছিল, বাবার দোকান তার স্বপ্নের পথে একটি বাধা। অথচ সেই দোকানের জানালা দিয়েই সে জীবনের নতুন অর্থ দেখতে শিখেছে।
চশমার কাচ মানুষের দৃষ্টিকে স্পষ্ট করে। কিন্তু মনের জানালায় জমে থাকা ভয়, অভিমান আর ভুল ধারণাগুলো সরাতে হলে দরকার বোঝাপড়া।
সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে অরুণবাবু মেয়েকে বললেন, “তোর ক্যামেরায় আমার একটা ছবি তুলবি?”
নন্দিতা হেসে ক্যামেরা তুলল।
“কেমন ছবি চাই, বাবা?”
অরুণবাবু কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “এমন ছবি, যেখানে আমাকে শুধু একজন চশমার দোকানদার বলে মনে হবে না।”
“তাহলে কেমন?”
“একজন মানুষ, যে অনেক দেরিতে হলেও নিজের মেয়ের স্বপ্ন দেখতে শিখেছে।”
ক্যামেরার পর্দায় অরুণবাবুর মুখ ফুটে উঠল। চোখে চশমা, ঠোঁটে মৃদু হাসি, আর জানালার ওপারে বিস্তৃত আকাশ।
নন্দিতা ছবিটির নাম দিল—‘দৃষ্টির বাইরে’।
কারণ সে জানত, পৃথিবীকে স্পষ্ট করে দেখতে শুধু চোখের কাচ পরিষ্কার করলেই হয় না। কখনো কখনো নিজের মনের কাচটাও পরিষ্কার করতে হয়।
গল্পের শিক্ষা
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু নিজের ভয়কে সন্তানের স্বপ্নের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রজন্মের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকতেই পারে; আন্তরিক কথোপকথন ও পারস্পরিক সম্মান সেই দূরত্ব কমাতে পারে। আর জীবনের কোনো স্বপ্ন দেরিতে পূরণ হলেও তার সৌন্দর্য একেবারে হারিয়ে যায় না।