শহরের পুরোনো বাজারের শেষ মাথায়, একটি ওষুধের দোকানের পাশে বসতেন হরিপদ কাকু। তাঁর দোকান বলতে ছিল কাঠের একটি ছোট বাক্স, কয়েকটি সরু লোহার শিক, রঙিন সুতো, প্লাস, হাতুড়ি আর একটি পুরোনো টিনের ছাউনি। সেই সামান্য জায়গাতেই তিনি ছাতা সারানোর কাজ করতেন।
শীত হোক কিংবা গ্রীষ্ম, প্রতিদিন সকাল আটটার মধ্যে তিনি নিজের জায়গায় এসে বসতেন। কারও ছাতার শিক ভেঙেছে, কারও কাপড় ছিঁড়েছে, আবার কারও ছাতার হাতল খুলে গিয়েছে—সবই যত্ন করে সারিয়ে দিতেন।
তাঁর কাজের মজুরি ছিল সামান্য। তবু তিনি কখনো গ্রাহকের মুখের দিকে তাকিয়ে অতিরিক্ত টাকা চাইতেন না।
বাজারের লোকেরা তাঁকে চিনতেন। কিন্তু তাঁর একটি অদ্ভুত অভ্যাস অনেকের কাছেই রহস্য ছিল।
বৃষ্টি শুরু হলেই তিনি নিজের কাজ থামিয়ে চারপাশে তাকাতেন। কোনো বৃদ্ধ, অসহায় মানুষ কিংবা স্কুলের কোনো শিশু ভিজতে ভিজতে রাস্তা পার হতে গেলে তিনি নিজের বাক্স থেকে একটি ছাতা বের করে দিতেন।
“নাও, এটা নিয়ে যাও। বৃষ্টি থামলে ফেরত দিয়ে যেয়ো।”
অনেকেই ছাতা ফেরত দিতেন, কেউ কেউ ভুলে যেতেন। তবু হরিপদ কাকু কাউকে তিরস্কার করতেন না।
একদিন পাশের দোকানের মালিক নিতাইবাবু তাঁকে বললেন, “হরিপদ, এভাবে ছাতা বিলিয়ে দিলে তোমার ব্যবসা চলবে কী করে? তোমার নিজেরই তো সংসার চলে কষ্টে।”
হরিপদ কাকু মুচকি হেসে বললেন, “ছাতা সারিয়ে টাকা নিই। কিন্তু বৃষ্টিতে কাউকে ভিজতে দেখলে টাকা মনে থাকে না।”
নিতাইবাবু মাথা নেড়ে নিজের কাজে ফিরে গেলেন। তিনি কথাটাকে বৃদ্ধের আবেগ বলে উড়িয়ে দিলেন।
কিন্তু হরিপদ কাকুর এই অভ্যাসের পেছনে লুকিয়ে ছিল বহু বছরের পুরোনো একটি ঘটনা।
প্রায় তিরিশ বছর আগে হরিপদ ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারের যুবক। তাঁর বাবা দিনমজুরের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বাবা সব সময় বলতেন, “মানুষের কাছে টাকা না থাকলেও তার সম্মান যেন কেড়ে নিস না।”
এক বর্ষার দিনে হরিপদের মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে পাশের শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তখন প্রবল বৃষ্টি। তাঁদের বাড়িতে একটি মাত্র ছাতা ছিল, সেটিও ভাঙা।
হরিপদ ছাতা সারানোর জন্য বাজারে বেরিয়েছিলেন। পকেটে ছিল মাত্র কয়েকটি টাকা। দোকানে দোকানে ঘুরেও এমন কাউকে পেলেন না, যিনি সঙ্গে সঙ্গে ছাতাটি সারিয়ে দিতে পারবেন।
অবশেষে বাজারের এক কোণে বসে থাকা এক অচেনা বৃদ্ধ তাঁকে ডাকলেন।
“কী হয়েছে বাবা?”
হরিপদ সব কথা খুলে বললেন। বৃদ্ধ তাঁর ভাঙা ছাতাটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি সারিয়ে দিলেন।
হরিপদ টাকা দিতে গেলে বৃদ্ধ হাত তুলে থামিয়ে দিলেন।
“আজ টাকা লাগবে না। আগে মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাও।”
“কিন্তু আপনার মজুরি?”
বৃদ্ধ হেসে বলেছিলেন, “আজ আমার কাজের দাম টাকা নয়। আজ আমার কাজের দাম তোমার মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠা।”
সেই ছাতার সাহায্যে হরিপদ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। চিকিৎসার পরে তাঁর মা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।
কিন্তু হরিপদ বৃদ্ধটির নাম জানতে পারেননি। কয়েক দিন পরে বাজারে গিয়ে তাঁকে আর খুঁজে পাননি।
সেই দিন থেকেই হরিপদ মনে মনে ঠিক করেছিলেন, জীবনে যতটুকু পারবেন, মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। তিনি বড়লোক হতে পারেননি, বড় দোকানের মালিকও হননি। কিন্তু তাঁর হাতের কাজ দিয়ে অন্তত কিছু মানুষের কষ্ট কমাতে পারবেন—এই বিশ্বাস তিনি কখনো হারাননি।
বছর কেটে গিয়েছিল। হরিপদের নিজের সংসারও হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী মালতী বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। একমাত্র মেয়ে পিউ পড়াশোনা করত। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না, তবে অভাবের মধ্যেও তাঁরা একে অপরকে আগলে রেখেছিলেন।
পিউ ছোটবেলা থেকেই বাবার ছাতা দেওয়ার অভ্যাস দেখত। কখনো কখনো সে বিরক্ত হয়ে বলত, “বাবা, তোমার এতগুলো ছাতা কোথায় পেলে? মানুষ ফেরত না দিলে তোমার ক্ষতি হয় না?”
হরিপদ উত্তর দিতেন, “হয় তো মা। কিন্তু সব ক্ষতি শুধু টাকায় মাপা যায় না।”
পিউ তখন কথাটার গভীর অর্থ বুঝত না।
সময়ের সঙ্গে পিউ বড় হলো। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে তার ইচ্ছা হলো শহরের বাইরে গিয়ে পড়বে। কিন্তু বাবার আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে সে নিজের ইচ্ছের কথা বলতে পারছিল না।
এক সন্ধ্যায় হরিপদ কাজ থেকে ফিরে দেখলেন, মেয়ে চুপ করে বসে আছে।
“কী হয়েছে পিউ?”
“কিছু না বাবা।”
“আমার কাছে কিছু লুকোতে হয় না। বল।”
পিউ ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছের কথা জানাল। সে অন্য শহরে একটি প্রশিক্ষণমূলক কোর্সে ভর্তি হতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে ভালো কাজের সুযোগ পায়। কিন্তু ভর্তি ফি, যাতায়াত আর থাকার খরচ অনেক।
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর হাতে তখন খুব বেশি সঞ্চয় ছিল না। তবু তিনি মেয়েকে বললেন, “তুই আগে ভর্তি হওয়ার ব্যবস্থা কর। টাকার ব্যবস্থা আমরা করব।”
মালতী চিন্তিত হয়ে বললেন, “সংসারের খরচও তো আছে। সব টাকা দিলে চলবে কী করে?”
হরিপদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ বারবার আসে না। আমরা একটু কষ্ট করব, তবু ওর পড়াশোনা থামাব না।”
পিউ শেষ পর্যন্ত কোর্সে ভর্তি হলো। নিজের পরিশ্রমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগল। বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাটিও সে মনে রাখল—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় অনেক টাকা দরকার হয় না; দরকার আন্তরিকতা এবং দায়িত্ববোধ।
কয়েক বছর পরে পিউ একটি সংস্থায় কাজ পেল। তার কাজ ছিল বিভিন্ন এলাকায় শিশুদের শিক্ষা এবং পরিবারের সামাজিক সহায়তা নিয়ে কাজ করা। প্রথম বেতন হাতে পেয়ে সে বাবার জন্য একটি নতুন কাজের বাক্স কিনে আনল।
হরিপদ বাক্সটি দেখে বললেন, “এত দামি জিনিস কেনার কী দরকার ছিল মা?”
পিউ হেসে বলল, “তোমার পুরোনো বাক্সটার অবস্থা তো দেখো। এবার একটু ভালো করে কাজ করবে।”
হরিপদ নতুন বাক্সটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল।
তারপর এল সেই বর্ষার দিন।
সকাল থেকেই আকাশ কালো। দুপুরের দিকে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো। বাজারের রাস্তা জলে ভরে গেল। দোকানিরা তাড়াতাড়ি মালপত্র সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
হরিপদ কাকু নিজের টিনের ছাউনির নিচে বসেছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন, রাস্তার ওপারে একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার স্কুলের পোশাক ভিজে গিয়েছে। হাতে একটি কাগজের ফাইল। বারবার সে ফাইলটিকে জামার ভেতর ঢুকিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
হরিপদ তাকে ডাকলেন।
“কী হয়েছে বাবা?”
ছেলেটি বলল, “আমার বাড়ি অনেক দূরে। বাস ধরতে হবে। কিন্তু বৃষ্টি থামছে না। আমার কাছে ছাতা নেই।”
হরিপদ নিজের বাক্স থেকে একটি ছাতা বের করে দিলেন।
“এটা নিয়ে যা। বাসে উঠে ভালো করে বসিস। আর ফাইলটা সাবধানে রাখিস।”
ছেলেটি ছাতাটি নিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল।
“কাকু, ছাতাটা ফেরত দেব কী করে?”
“তোর যখন সুবিধা হবে, তখন দিয়ে যাবি। না পারলেও চিন্তা নেই।”
ছেলেটি কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে চলে গেল।
এই দৃশ্যটি দূর থেকে দেখছিলেন এক মহিলা। তিনি বৃষ্টির মধ্যেই হরিপদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি।
“আপনি কি হরিপদবাবু?”
হরিপদ অবাক হলেন।
“হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে মা?”
মহিলা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এক বৃদ্ধ ছাতা সারাচ্ছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক কিশোর।
“আপনি হয়তো আমাকে চিনবেন না। আমার নাম অনুরাধা। তিরিশ বছর আগে আমার বাবা এই বাজারেই ছাতা সারানোর কাজ করতেন।”
হরিপদের বুকের মধ্যে যেন কিছু একটা কেঁপে উঠল।
“আপনার বাবা?”
অনুরাধা মাথা নাড়লেন।
“বাবা বহু বছর আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন। এক বর্ষার দিনে তিনি এক অসহায় যুবকের ছাতা বিনা পয়সায় সারিয়ে দিয়েছিলেন। সেই যুবকের মা অসুস্থ ছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ছাতাটা সারিয়ে দেওয়ার পর ছেলেটির চোখে যে কৃতজ্ঞতা দেখেছিলেন, সেটা তিনি কোনো দিন ভুলতে পারেননি।”
হরিপদের হাত কাঁপতে লাগল।
“আপনার বাবার নাম কি নরেন?”
অনুরাধা বিস্মিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ! আপনি তাঁকে চিনতেন?”
হরিপদ ধীরে ধীরে বসে পড়লেন। এত বছর পরে তিনি সেই মানুষটির নাম জানতে পারলেন, যিনি একদিন তাঁর মায়ের জীবন বাঁচানোর পথে সাহায্য করেছিলেন।
অনুরাধা জানালেন, তাঁর বাবার পুরোনো খাতায় হরিপদের কথা লেখা ছিল। খাতাটি গোছাতে গিয়ে তিনি ঘটনাটি পড়েছিলেন। বাবার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত সেই মানুষটিকে খুঁজে বের করার ইচ্ছা থেকেই তিনি বাজারে এসেছেন।
“আমি আপনাকে অনেক দিন ধরে খুঁজছিলাম,” অনুরাধা বললেন। “বাবা বলতেন, ভালো কাজের প্রতিদান সব সময় একই মানুষের কাছ থেকে ফিরে আসে না। কখনো অন্য কারও জীবনে তার ফল দেখা যায়।”
হরিপদ কিছু বলতে পারলেন না।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। টিনের ছাউনিতে জলের শব্দ হচ্ছে। দোকানের সামনে দিয়ে মানুষ ছুটে যাচ্ছে। আর হরিপদ ভাবছেন, তিরিশ বছর আগে একজন অপরিচিত মানুষের ছোট্ট সাহায্য কীভাবে তাঁর নিজের জীবনের পথ বদলে দিয়েছিল।
অনুরাধা চলে যাওয়ার আগে তাঁর হাতে একটি নতুন ছাতা দিলেন।
“এটা আমার বাবার স্মৃতিতে আপনাকে দিতে চাই।”
হরিপদ ছাতাটি নিতে চাইছিলেন না। শেষ পর্যন্ত অনুরাধা বললেন, “আপনি এত মানুষকে সাহায্য করেছেন। আজ অন্য কাউকে আপনাকে সাহায্য করার সুযোগ দিন।”
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হরিপদ সব কথা পিউকে বললেন।
পিউ বাবার হাত ধরে বলল, “তুমি যে কাজটা এত বছর ধরে করে গেছ, তার একটা গল্প আজ তোমার কাছে ফিরে এল।”
হরিপদ মৃদু হেসে বললেন, “গল্পটা আমার একার নয় মা। নরেনবাবু যদি সেদিন আমাকে সাহায্য না করতেন, হয়তো আমিও কোনো দিন বুঝতাম না, সামান্য একটা কাজ মানুষের জীবনে কত বড় হয়ে উঠতে পারে।”
তারপর থেকে হরিপদের দোকানের সামনে একটি ছোট বোর্ড দেখা যেতে লাগল।
সেখানে লেখা ছিল—
‘ছাতা সারানোর মজুরি নির্দিষ্ট। তবে প্রবল বৃষ্টিতে বিপদে পড়লে সাহায্যের জন্য কোনো মূল্য দিতে হবে না।’
কেউ কেউ বোর্ডটি দেখে হাসতেন। কেউ বলতেন, এই সময়ে এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। আবার কেউ নিঃশব্দে এগিয়ে এসে নিজের ভাঙা ছাতাটি সারিয়ে নিতেন।
হরিপদ জানতেন, তিনি পৃথিবীর সব মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। প্রতিটি অভাব দূর করার সামর্থ্যও তাঁর নেই। কিন্তু তাঁর সামনে দাঁড়ানো একজন মানুষের কষ্ট একটু কমানোর সুযোগ থাকলে তিনি চেষ্টা করবেন।
কারণ তিনি শিখেছিলেন, ভালোবাসা সব সময় বড় বড় কথায় প্রকাশ পায় না। কখনো তা প্রকাশ পায় বৃষ্টির মধ্যে বাড়িয়ে দেওয়া একটি ছাতায়, বিপদে পড়া মানুষের জন্য থেমে যাওয়া কয়েকটি মুহূর্তে, কিংবা এমন একটি কাজে যার প্রতিদান পাওয়ার কোনো প্রত্যাশা থাকে না।
আর সেই ছোট্ট কাজই হয়তো একদিন অন্য কারও জীবনে সাহস হয়ে ফিরে আসে।
গল্পের শিক্ষা
মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সহায়তা কখনোই অর্থহীন হয় না। তার প্রতিদান সব সময় সঙ্গে সঙ্গে বা একই মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যায় না, কিন্তু একটি ভালো কাজ অন্য কাউকে ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাই সামর্থ্য যতটুকুই হোক, বিপদে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।