Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের পরিচয়)।

ট্রেনের ভিতরে লাল আলো জ্বলছে। জানালার বাইরে কোনো দৃশ্য নেই, শুধু ঘন কালো অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য মানুষের কান্না, চিৎকার আর ফিসফিসানি।

অরিত্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তার সামনে বসে থাকা মানুষটি দেখতে অবিকল তার বাবা অরুণাভ সেনের মতো। সেই একই মুখ, একই চোখ, একই কণ্ঠস্বর। অথচ জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা তার মৃত মা স্পষ্ট বলে গেলেন, এই মানুষটি তার বাবা নন।

তাহলে সত্যিটা কী?

“আপনি কে?” অরিত্র কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

লোকটি মাথা নিচু করে বসে রইলেন।

“আমি যা-ই বলি, তুই বিশ্বাস করবি না।”

“আপনার নাম কী?”

“অরুণাভ সেন।”

“আমার মায়ের নাম?”

“মধুমিতা সেন।”

“আমাকে ছোটবেলায় কী নামে ডাকতেন?”

লোকটি মুখ তুলে তাকালেন।

“অরি।”

অরিত্রর বুকের মধ্যে যেন কেউ ছুরি চালাল। এই উত্তরগুলো তো তার বাবা ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়।

সে আরও এগিয়ে গেল।

“আমার পাঁচ বছর বয়সে আমি একবার ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার কপালে সেলাই হয়েছিল। তখন আপনি আমাকে কী বলেছিলেন?”

লোকটির চোখে জল এসে গেল।

“বলেছিলাম, দাগটা তোর সাহসের চিহ্ন। একদিন তুই এই দাগ নিয়ে গর্ব করবি।”

অরিত্র নিজের কপালে হাত রাখল। ছোটবেলার সেই দাগ এখনও আছে।

“আপনি যদি আমার বাবা না হন, তাহলে এসব জানেন কীভাবে?”

লোকটি এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“কারণ আমি তোর বাবার স্মৃতি বহন করি।”

“মানে?”

“আমি সেই মানুষ, যে অরুণাভ সেনের শেষ স্মৃতিগুলো নিয়ে বেঁচে আছে। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর অভ্যাস, তাঁর ভালোবাসা—সব আমার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আমি তাঁর শরীর নই।”

অরিত্রর মুখ শুকিয়ে গেল।

“আপনি কি কোনো যন্ত্র? কোনো প্রতিলিপি?”

“আমাকে কী নামে ডাকবি, সেটা তোর ইচ্ছা। কিন্তু আমি তোকে কখনও আঘাত করতে চাইনি।”

“আমাকে সত্যিটা বলুন!”

লোকটি চোখ বন্ধ করলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনের মেঝে কেঁপে উঠল। দূরে একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

তারপর ঘোষণা ভেসে এল—

“পরবর্তী স্টেশন—স্মৃতিপুর। যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজেদের হারানো স্মৃতি সঙ্গে রাখুন। যে যাত্রী নিজের স্মৃতি চিনতে পারবেন না, তাঁকে এই স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হবে।”

কামরার সমস্ত যাত্রী একসঙ্গে মাথা তুলল।

অরিত্র দেখল, জানালার পাশে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি তার পুতুলটিকে বুকে চেপে ধরে কাঁদছে। একজন বৃদ্ধ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বারবার বলছেন, “আমি কে? আমি কে?”

আর একটি যুবক জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করছে, “আমি বাড়ি ফিরতে চাই। আমার ছেলে অপেক্ষা করছে।”

ট্রেনের গতি কমে এল।

জানালার ওপারে দেখা গেল একটি অদ্ভুত স্টেশন। প্ল্যাটফর্মের নামফলকে লেখা—স্মৃতিপুর। সেখানে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ বৃদ্ধ, কেউ শিশু, কেউ আবার এমন পোশাকে সজ্জিত, যা বহু দশক আগেই অচল হয়ে গেছে।

তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ছবি।

ট্রেন থামতেই দরজা খুলে গেল।

কালো পোশাকের টিকিট পরীক্ষক কামরায় প্রবেশ করল। তার হাতে একটি লম্বা রেজিস্টার।

“যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করা হবে।”

সে প্রথমে বৃদ্ধ লোকটির সামনে দাঁড়াল।

“নাম?”

“হরিপদ দত্ত।”

“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “বাড়ি।”

“আপনার বাড়ি কোথায়?”

বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।

টিকিট পরীক্ষক রেজিস্টারে কিছু লিখল।

“আপনার স্মৃতি অসম্পূর্ণ। আপনাকে নামতে হবে।”

“না! না! আমার মেয়ে অপেক্ষা করছে!”

বৃদ্ধ আসন আঁকড়ে ধরলেন।

“আমার মেয়েকে আমি কথা দিয়েছিলাম, ফিরে আসব। আমাকে নামাবেন না!”

কিন্তু টিকিট পরীক্ষক তাঁর হাত ধরে প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিল।

বৃদ্ধের চিৎকার ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।

তারপর টিকিট পরীক্ষক অরিত্রর সামনে এসে দাঁড়াল।

“নাম?”

“অরিত্র সেন।”

“আপনি কাকে খুঁজছেন?”

“আমার বাবাকে।”

“আপনার বাবা কে?”

অরিত্র বিপরীত আসনে বসা লোকটির দিকে তাকাল।

লোকটি কিছু বললেন না।

অরিত্র উত্তর দিল, “অরুণাভ সেন।”

“তিনি কি জীবিত?”

প্রশ্নটি শুনে অরিত্রর বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

সে জানে না।

“আমি জানি না,” সে বলল।

টিকিট পরীক্ষক রেজিস্টারে কিছু লিখল।

“উত্তর অসম্পূর্ণ।”

“কিন্তু আমি সত্যিই জানি না!”

“তাহলে আপনাকে একটি স্মৃতি বেছে নিতে হবে। সেই স্মৃতি আপনাকে দেখাবে, আপনি কাকে খুঁজছেন।”

টিকিট পরীক্ষক হাত বাড়াল।

তার তালুর ওপর একটি ছোট্ট রুপোলি চাবি।

“এই চাবি দিয়ে স্মৃতির দরজা খোলা যায়। কিন্তু মনে রাখবেন, দরজার ওপারে যা দেখবেন, তা পরিবর্তন করা যাবে না।”

অরিত্র চাবিটি হাতে নিল।

“আমি কীভাবে বুঝব কোন দরজা আমার?”

টিকিট পরীক্ষক উত্তর দিল, “যে দরজার সামনে দাঁড়ালে আপনি সবচেয়ে বেশি ভয় পাবেন, সেটিই আপনার দরজা।”

তারপর সে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।


কামরার শেষ প্রান্তে হঠাৎ একটি দরজা দেখা গেল।

অরিত্র নিশ্চিত, কয়েক মুহূর্ত আগেও সেখানে কোনো দরজা ছিল না।

দরজাটির গায়ে লেখা—

১৯ অক্টোবর, ২০১১।

অরিত্রর হাতের চাবিটি গরম হয়ে উঠল।

সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

বিপরীত আসনে বসে থাকা লোকটি চিৎকার করে উঠলেন, “ওই দরজা খুলিস না!”

অরিত্র থামল।

“কেন?”

“কারণ ওই রাতের সত্যিটা জানলে তুই আর আমাকে আগের মতো দেখতে পারবি না।”

“আমি আপনাকে চিনি না। আপনি আমার বাবা কি না, সেটাও জানি না। আমার কাছে হারানোর মতো আর কী আছে?”

লোকটি মাথা নিচু করলেন।

“তোর মায়ের বিশ্বাস।”

কথাটা শুনে অরিত্র থমকে গেল।

তার মা মৃত্যুর আগে যে সতর্কবাণী দিয়েছিলেন, তা আবার মনে পড়ল।

‘ওর কথা বিশ্বাস করিস না।’

অরিত্র চাবিটি তালায় ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।

দরজা খুলে গেল।

ওপারে একটি পাহাড়ি রাস্তা।

আকাশে ঘন মেঘ। বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাদা গাড়ি। গাড়ির সামনে অরুণাভ সেন। তাঁর পাশে এক মহিলা—সেই ছবির মহিলা। তাঁর কোলে ছোট্ট একটি শিশু।

অরিত্র নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

এ দৃশ্যটি সে আগে কখনও দেখেনি।

অরুণাভ মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলছেন, “এবার আমাদের যেতে হবে। ওরা জেনে গেছে।”

মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “কিন্তু শিশুটাকে নিয়ে কোথায় যাব?”

“যেখানে ওরা আমাদের খুঁজে পাবে না।”

“তুমি কি নিশ্চিত, ওকে বাঁচানো যাবে?”

অরুণাভ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “আমি কথা দিচ্ছি।”

ঠিক তখনই রাস্তার অন্য প্রান্তে দুটি গাড়ির আলো দেখা গেল।

অরুণাভ তাড়াতাড়ি শিশুটিকে মহিলার কাছ থেকে নিয়ে নিজের গাড়িতে রাখলেন। মহিলাটি তাঁর হাত ধরে বললেন, “অরুণাভ, তুমি যদি ফিরে না আসো?”

“আমি ফিরে আসব।”

“আর যদি না আসো?”

অরুণাভ তাঁর কপালে চুমু খেলেন।

“তাহলে অরিকে বলবে, তার বাবা তাকে কোনোদিন ছেড়ে যায়নি।”

এই কথা শুনে অরিত্রর চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু পরের দৃশ্যটি তাকে স্তব্ধ করে দিল।

অরুণাভ গাড়িতে উঠে পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর যেতেই পিছন থেকে একটি কালো গাড়ি তাঁকে ধাক্কা মারল।

সাদা গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে গেল।

একটি ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

তারপর আগুন।

অরিত্র চিৎকার করে উঠল।

“বাবা!”

দৃশ্যটি বদলে গেল।

এবার সে দেখল, খাদ থেকে কয়েকশো মিটার দূরে একটি ছোট্ট ঘর। ঘরের ভিতরে অরুণাভ মেঝেতে পড়ে আছেন। তাঁর মাথায় রক্ত। পাশে সেই কালো পোশাকের টিকিট পরীক্ষক।

কিন্তু এবার টিকিট পরীক্ষকের মুখ দেখা যাচ্ছে।

সে অরুণাভেরই মুখ!

অরিত্র পিছিয়ে গেল।

ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় অরুণাভ বললেন, “তুমি ব্যর্থ হয়েছ। শিশুটি কোথায়?”

মেঝেতে পড়ে থাকা অরুণাভ কষ্ট করে বললেন, “ও নিরাপদে আছে।”

“তুমি জানো, তোমাকে এর মূল্য দিতে হবে।”

“আমি প্রস্তুত।”

দ্বিতীয় অরুণাভ পকেট থেকে একটি ছোট্ট যন্ত্র বের করলেন। যন্ত্রটির মাঝখানে নীল আলো জ্বলছে।

“তোমার স্মৃতি মুছে ফেলা হবে। তোমার পরিচয় আমার মধ্যে থাকবে। পৃথিবী জানবে, অরুণাভ সেন দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আর তুমি চিরকাল এই ট্রেনে বন্দি থাকবে।”

মেঝেতে পড়ে থাকা অরুণাভ দুর্বলভাবে হাসলেন।

“তাহলে অন্তত আমার ছেলে বেঁচে থাকবে।”

দ্বিতীয় অরুণাভ যন্ত্রটি তাঁর কপালে ছোঁয়ালেন।

এক মুহূর্তে ঘর আলোয় ভরে গেল।

অরিত্র আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে মেঝেতে বসে পড়ল।

দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল।

সে আবার ট্রেনের কামরায় ফিরে এসেছে।

তার সামনে বসে থাকা লোকটি এবার আর আগের মতো স্থির নন। তাঁর মুখে গভীর ক্লান্তি।

অরিত্র ধীরে ধীরে বলল, “আপনি আমার বাবার স্মৃতি নিয়ে তৈরি হয়েছেন?”

লোকটি মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ।”

“আর আমার আসল বাবা?”

“সেই রাতেই তাঁর শরীরের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শেষ স্মৃতিগুলো এই ট্রেনের মধ্যে রয়ে গিয়েছিল।”

“আপনি তাহলে আমার বাবার স্মৃতি। আপনি কি জানেন, তিনি আমাকে ভালোবাসতেন?”

লোকটির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুই যখন জন্মেছিলি, তোর বাবা তোকে কোলে নিয়ে সারারাত বসে ছিল। তুই কাঁদলেই সে গান গাইত। তোর প্রথম জন্মদিনে সে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিল। তোর স্কুলের প্রথম দিনে তুই তার হাত ছাড়তে চাইছিলি না।”

অরিত্র মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগল।

এগুলো তার স্মৃতি নয়। এগুলো সেই মানুষটির স্মৃতি, যাকে সে এতদিন খুঁজেছে।

“কিন্তু আমার মা বলেছিলেন, আপনি আমার বাবা নন।”

“তোর মা সত্যি বলেছিলেন। আমি তোর বাবা নই। কিন্তু আমি তাঁর ভালোবাসার স্মৃতি।”

অরিত্র চোখ মুছে বলল, “তাহলে আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন কেন?”

লোকটি উত্তর দিলেন না।

কামরার শেষ প্রান্তে আবার সেই বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন।

“কারণ তার কাছে আর সময় নেই।”

অরিত্র তাঁর দিকে তাকাল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধা নিজের পুতুলটি আসনের ওপর রাখলেন।

“আমি মায়া। যে মহিলাকে তুমি ছবিতে দেখেছিলে, তিনি আমার মেয়ে। আর তাঁর কোলে যে শিশুটি ছিল, সেই শিশুটিই তুমি।”

অরিত্রর মনে হলো, তার বুকের ভিতর সবকিছু থেমে গেল।

“কিন্তু আমার মা তো মধুমিতা সেন!”

“মধুমিতা তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করেছে। কিন্তু তোমার জন্মের আগে তার একটি সন্তান মারা গিয়েছিল। সেই শোকের মধ্যেই সে তোমাকে পেয়েছিল। তোমার জন্মের নথি বদলানো হয়েছিল, কারণ তোমাকে বাঁচাতে হলে তোমার পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হতো।”

অরিত্র মাথা নাড়ল।

“না। আমার বাবা-মা আমাকে কোনোদিন বলেননি যে আমি দত্তক নেওয়া।”

মায়া শান্ত গলায় বললেন, “কারণ তুমি দত্তক নেওয়া ছিলে না। তুমি তাদের কাছেই জন্মেছিলে। কিন্তু তোমার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এমন এক গোপন পরীক্ষা, যা তোমার জীবনকে বিপন্ন করেছিল। তোমার বাবা সেই পরীক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।”

“কোন পরীক্ষা?”

মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার আলো নিভে গেল।

এবার অন্ধকারের মধ্যে একাধিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। ট্রেনটি শেষ স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে। যে যাত্রী নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ করতে পারবেন না, তাঁর স্মৃতি চিরতরে মুছে যাবে।”

অরিত্র হাতের টিকিটের দিকে তাকাল।

টিকিটে নতুন লেখা ফুটে উঠেছে—

“দ্বিতীয় প্রশ্ন: তুমি কি সত্যিই তোমার বাবাকে ফিরে পেতে চাও, নাকি শুধু নিজের শৈশবের নিরাপত্তা ফিরে পেতে চাও?”

অরিত্রর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

সে বাবাকে ফিরে পেতে চায়। কিন্তু যে মানুষটিকে সে সামনে দেখছে, তিনি তার বাবা নন। তিনি বাবার স্মৃতি। তাঁর সঙ্গে কথা বলা মানে অতীতের প্রতিধ্বনির সঙ্গে কথা বলা।

তাহলে কি সে শুধু সেই সময়টাকে ফিরে পেতে চাইছে, যখন তার বাবা বেঁচে ছিলেন?

ঠিক তখনই জানালার ওপারে একটি নতুন দৃশ্য ফুটে উঠল।

ছোট্ট অরিত্র বিছানায় শুয়ে আছে। তার বয়স দশ বছর। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। ঘরের দরজা খুলে বাবা ভিতরে ঢুকছেন।

ছোট্ট অরিত্র ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

“বাবা, তুমি আজ কোথাও যাবে না তো?”

অরুণাভ হাসলেন।

“না রে, আজ আমি তোর কাছেই থাকব।”

দৃশ্যটি দেখে অরিত্রর চোখ ভিজে উঠল।

কিন্তু পরমুহূর্তে দৃশ্যের ভিতরে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল।

ছোট্ট অরিত্রর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকটি শিশু।

তার মুখও অবিকল অরিত্রর মতো।

শিশুটি ধীরে ধীরে বড় অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল—

“তুমি কি জানো, তোমার বাবা সেদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে তোমার ঘরে এসেছিলেন?”

অরিত্র অবাক হয়ে বলল, “কী?”

শিশুটি বলল, “তিনি তোমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলেন। তারপর তোমার বালিশের নিচে একটা চিঠি রেখে গিয়েছিলেন।”

“কোন চিঠি?”

শিশুটি হাত বাড়াল।

তার হাতে একটি খাম।

অরিত্র খামটি খুলল।

ভিতরে মাত্র একটি বাক্য—

“অরি, যদি কোনোদিন জানতে পারিস আমি ফিরে আসিনি, তবে বুঝবি, আমি তোকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।”

অরিত্রর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।

তার বাবা তাকে ছেড়ে যাননি।

তিনি তাকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কিসের থেকে?

এবার অরিত্র সিদ্ধান্ত নিল, সে আর কোনো প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাবে না।

সে বাবার স্মৃতির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি শেষ স্টেশনে যাব। আমি সব সত্যি জানতে চাই।”

লোকটি মাথা নাড়লেন।

“তাহলে তোকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শেষ স্টেশনে পৌঁছলে তুই আমাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে পারবি না। আমাকে এই ট্রেনেই থাকতে হবে।”

“আমি জানি।”

“তাহলে আমাকে ভুলে যাবি?”

অরিত্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আপনি আমার বাবা নন। কিন্তু আপনি আমার বাবার স্মৃতি। আপনাকে ভুলে গেলে আমি আমার বাবার একটি অংশ হারাব।”

লোকটি মৃদু হাসলেন।

“তাহলে আমাকে ভুলিস না। শুধু মনে রাখিস, স্মৃতি আর মানুষ এক নয়।”

ট্রেনের গতি হঠাৎ বেড়ে গেল।

জানালার বাইরে স্টেশনগুলো একে একে পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি স্টেশনের নাম আলাদা—শৈশব, বিচ্ছেদ, অপরাধবোধ, অনুশোচনা, বিস্মৃতি।

সবশেষে একটি কালো নামফলক দেখা গেল।

তাতে কোনো নাম নেই।

শুধু একটি সাদা দরজা।

ট্রেন থামল।

দরজার ওপরে লেখা ফুটে উঠল—

শেষ স্টেশন: প্রত্যাবর্তন।

টিকিট পরীক্ষক এসে দাঁড়াল।

“অরিত্র সেন, আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণ। আপনি কি আপনার বাবাকে ফিরে পেতে চান, নাকি নিজের শৈশবকে?”

অরিত্র চোখ বন্ধ করল।

তার মনে পড়ল, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া, রাতের খাবারের সময় গল্প শোনা, অসুস্থ হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া। সে বুঝল, সে শুধু বাবাকে নয়, বাবার সঙ্গে কাটানো সময়টাকেও ফিরে পেতে চেয়েছে।

কিন্তু অতীতকে ফিরিয়ে আনা যায় না।

“আমি আমার বাবাকে ফিরে পেতে চাই,” সে বলল। “কিন্তু তাঁকে জীবিত বলে মিথ্যে বিশ্বাস করতে চাই না। আমি তাঁর সত্যিটা জানতে চাই। তাঁর ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে চাই।”

টিকিট পরীক্ষক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর মাথা নাড়ল।

“দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর গ্রহণ করা হলো।”

দরজা খুলে গেল।

ওপারে একটি বিশাল ঘর। দেওয়ালে শত শত ছবি। প্রতিটি ছবিতে একজন নিখোঁজ মানুষ। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে ভয়, কারও হাতে শিশুর আঙুল।

ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল।

টেবিলের ওপর একটি পুরোনো টেপ রেকর্ডার।

অরিত্র সেটি চালু করল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর তার মায়ের কণ্ঠস্বর—

“অরি, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনতে পাস, তবে বুঝবি, তুই শেষ পর্যন্ত ট্রেনে পৌঁছেছিস। আমি তোকে একটা কথা বলিনি। তোর বাবা মারা যাওয়ার আগে যে পরীক্ষাটি বন্ধ করতে চেয়েছিল, তার সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম।”

অরিত্রর হাত থেকে রেকর্ডারটি প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

মায়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল—

“তোর বাবা শুধু তোকে বাঁচাতে যাননি। তিনি এমন একজন মানুষকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর কেউ জানত না। সেই মানুষটি ছিল—”

হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।

ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

দূরে, অন্ধকারের মধ্যে একটি দরজা খুলল।

সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একজন মহিলা।

তার মুখ অরিত্রর মায়ের মতো, কিন্তু চোখে এমন এক দৃষ্টি, যা অরিত্র কখনও দেখেনি।

মহিলাটি ধীরে ধীরে বললেন—

“অবশেষে তুমি এলে, অরি। এবার তোমাকে জানতে হবে, তোমার জন্মের আগের দিন তোমার বাবা কাকে হত্যা করেছিলেন।”

অরিত্রর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারণ মহিলার পিছনে দেওয়ালে ঝুলছিল একটি ছবি।

ছবির নীচে লেখা—

মৃত: অরুণাভ সেন।

আর ছবির ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ ছিল অবিকল অরিত্রর নিজের মুখ।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *