কলকাতার উত্তর প্রান্তে, গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো বাড়ি ছিল। বাড়িটার নাম কেউ জানত না। আশপাশের লোকেরা শুধু বলত—‘তেরো নম্বর বাড়ি’।
বাড়িটা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, দেওয়ালে বট-অশ্বত্থের শিকড়, ছাদের কার্নিশে বাদুড়ের বাসা। দিনের আলোতেও বাড়িটার সামনে দাঁড়ালে বুকের ভিতর কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতি বছর ১৭ নভেম্বর রাতে বাড়িটার দোতলার একটি জানালায় আলো জ্বলত।
তারপর শোনা যেত কারও কান্না।
কেউ বলত, ওটা বাতাসের শব্দ। কেউ বলত, পুরোনো বাড়ির কাঠের দরজা নড়ে আওয়াজ হয়। কিন্তু যাঁরা সেই কান্না একবার শুনেছিলেন, তাঁরা কেউই আর রাতের বেলা ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন না।
তবে এসব গল্পে অরিত্র বিশ্বাস করত না।
অরিত্র সেন, বয়স আটাশ। পেশায় সাংবাদিক। রহস্যজনক ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করাই তার কাজ। ভূত, আত্মা কিংবা অলৌকিক শক্তি—এসবকে সে মানুষের ভয় আর কল্পনার ফল বলেই মনে করত।
কিন্তু একদিন তার নিজের বাড়িতে এমন একটি চিঠি এল, যা তার সমস্ত বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিল।
চিঠিটা এসেছিল ডাকযোগে। খামের উপরে তার নাম ও ঠিকানা লেখা। কিন্তু প্রেরকের নাম নেই।
খাম খুলতেই বেরিয়ে এল একটি পুরোনো সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে একটি বাড়ি। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পাঁচজন মানুষ—একজন বৃদ্ধ, এক মহিলা, দুজন যুবক এবং একটি ছোট্ট মেয়ে।
ছবির পিছনে লাল কালিতে লেখা—
‘এই পাঁচজনের মধ্যে চারজন মারা গেছে। পঞ্চম জন এখনও তোমার বাড়িতে থাকে।’
অরিত্র ছবিটা ভালো করে দেখল।
বৃদ্ধ মানুষটিকে সে চিনতে পারল। তিনি তার দাদু, নীলমাধব সেন। বারো বছর আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
মহিলাটি অরিত্রর ঠাকুমা। তিনিও মারা গেছেন।
দুজন যুবকের মধ্যে একজন তার বাবা, আর অন্যজন তার কাকা। বাবা মারা গিয়েছিলেন একটি গাড়ি দুর্ঘটনায়। কাকার মৃত্যু হয়েছিল তারও তিন বছর আগে, রহস্যজনকভাবে।
আর ছোট্ট মেয়েটি?
অরিত্র ছবিটা চোখের কাছে তুলে ধরল।
মেয়েটির মুখ তার পরিচিত। খুব পরিচিত।
কারণ ছবির মেয়েটি আর কেউ নয়—তার মা, মৃণালিনী সেন।
কিন্তু চিঠিতে লেখা ছিল, পাঁচজনের মধ্যে চারজন মারা গেছে। পঞ্চম জন এখনও তার বাড়িতে থাকে।
তার মা তো এখনও বেঁচে আছেন!
তাহলে চিঠিটা কি নিছক মজা?
অরিত্র চিঠি ও ছবিটা নিয়ে মায়ের ঘরে গেল।
মৃণালিনী তখন জানালার পাশে বসে পুরোনো একটি বই পড়ছিলেন। ছেলের হাতে ছবিটা দেখেই তাঁর মুখের রং বদলে গেল। বইটি হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেতে।
“এই ছবিটা তুমি কোথায় পেলে?” তাঁর গলা কেঁপে উঠল।
“ডাকযোগে এসেছে। মা, ছবির পিছনে কী লেখা আছে, তুমি পড়েছ?”
মৃণালিনী উত্তর দিলেন না। তিনি ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ ছবিটা ছেলের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন।
অরিত্র তাঁর হাত চেপে ধরল।
“মা! কী করছ? তুমি এই ছবিটা চেনো?”
মৃণালিনী কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এই ছবিটা তোমার কাছে আসার কথা ছিল না।”
“কেন?”
“কারণ এই ছবির সঙ্গে তোমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটা জড়িয়ে আছে।”
অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কী সত্য?”
মৃণালিনী ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে জল।
“তেরো নম্বর বাড়িতে তুমি কখনও যাবে না। যেভাবেই হোক, ওই বাড়ি থেকে দূরে থাকবে।”
“কিন্তু কেন?”
মা উত্তর দিলেন না। শুধু ছেলের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, “আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
সেই রাতেই অরিত্র সিদ্ধান্ত নিল—সে তেরো নম্বর বাড়িতে যাবে।
কারণ একজন সাংবাদিক হিসেবে সে জানত, মানুষ যখন কোনও সত্য লুকোতে চায়, তখন সেই সত্যের পিছনেই সবচেয়ে বড় খবর থাকে।
পরদিন বিকেল পাঁচটায় অরিত্র পৌঁছে গেল গঙ্গার ধারের সেই বাড়ির সামনে।
আকাশ মেঘলা। নদীর জল অস্বাভাবিক রকম শান্ত। বাড়িটির লোহার গেটের গায়ে মরচে ধরা তালা ঝুলছে। অথচ গেটের ঠিক পাশে মাটিতে পড়ে আছে একজোড়া তাজা জুতোর ছাপ।
কেউ সম্প্রতি বাড়িতে ঢুকেছে।
অরিত্র মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে গেটের পাশের ভাঙা দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকল।
বাড়ির উঠোনে শুকনো পাতা জমে রয়েছে। মাঝখানে একটা ভাঙা পাথরের মূর্তি। মূর্তির মুখ ক্ষয়ে গেলেও মনে হচ্ছিল, সেটি কোনও নারীর মূর্তি।
দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই একটা তীব্র স্যাঁতসেঁতে গন্ধ নাকে এল।
ঘরের দেওয়ালে সারি সারি ছবি। পরিবারের ছবি, বিয়ের ছবি, জন্মদিনের ছবি।
কিন্তু অরিত্রর চোখ আটকে গেল একটি ছবিতে।
ছবিতে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে তার কাকা। মাঝখানে সেই একই ছোট্ট মেয়ে—মৃণালিনী।
ছবির নিচে তারিখ লেখা—১৭ নভেম্বর, ১৯৯৮।
অরিত্রর মনে পড়ল, তার বাবা মারা গিয়েছিলেন ২০১৪ সালে। কাকা মারা গিয়েছিলেন ২০১১ সালে।
কিন্তু ছবির পিছনে পেন্সিলে লেখা ছিল—
‘আজ রাতেই একজনকে মরতে হবে।’
হঠাৎ দোতলা থেকে একটা শব্দ এল।
টক।
টক।
টক।
কেউ যেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
অরিত্র টর্চের আলো সিঁড়ির দিকে ফেলল।
কেউ নেই।
কিন্তু শব্দটা থামল না।
টক।
টক।
টক।
তারপর এক মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।
“অরিত্র, তুমি অবশেষে এসেছ।”
অরিত্রর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কণ্ঠটা তার মায়ের।
“মা?”
কোনও উত্তর নেই।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। দোতলার করিডর একেবারে অন্ধকার। করিডরের শেষ প্রান্তে একটা দরজা। দরজার গায়ে সাদা রঙে লেখা—১৩।
অরিত্র দরজার হাতলে হাত রাখতেই ভিতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর দরজার ওপার থেকে একটা পুরুষকণ্ঠ বলল—
“দরজাটা খুলো না, অরিত্র। আমি তোমার বাবা।”
অরিত্রর বুকের ভিতর যেন সবকিছু থেমে গেল।
তার বাবা তো বারো বছর আগে মারা গেছেন!
সে পিছিয়ে আসতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ দরজার নীচের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল লাল রঙের তরল।
রক্ত!
অরিত্র কাঁপা হাতে দরজাটা ঠেলে দিল।
দরজার ওপারে কোনও ঘর ছিল না।
ছিল একটি অন্ধকার সিঁড়ি, যা নীচের দিকে নেমে গেছে। অথচ সে তো দোতলায় দাঁড়িয়ে!
সিঁড়ির শেষ প্রান্তে ক্ষীণ আলো জ্বলছিল। সেই আলোয় একজন মানুষ বসে আছেন। মাথা নিচু, পরনে সাদা পাঞ্জাবি।
অরিত্রর মনে হল, এই দৃশ্য সে আগে কোথাও দেখেছে।
হ্যাঁ! তার বাবার শেষ ছবিতে ঠিক এই পোশাকটাই ছিল।
“বাবা?” অরিত্র ফিসফিস করে ডাকল।
লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
অরিত্রর হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল।
সেই মুখ।
সেই চোখ।
সেই কপালের ডান দিকে পুরোনো ক্ষতচিহ্ন।
এ যে তার বাবা, অরিন্দম সেন!
কিন্তু লোকটির মুখে হাসি ফুটতেই অরিত্র বুঝতে পারল, কিছু একটা ভয়ংকরভাবে ভুল হচ্ছে।
লোকটি বললেন, “তুমি দেরি করে ফেলেছ, অরিত্র। তোমার মা তোমাকে সব সত্য বলেনি।”
“আপনি… আপনি বেঁচে আছেন?”
লোকটি কোনও উত্তর দিলেন না। বরং নিজের পিছনের দেওয়ালের দিকে আঙুল তুললেন।
সেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
‘অরিত্র সেনের মৃত্যু: ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।’
অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকাল।
আজ ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।
ঠিক তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের নাম।
সে ফোন ধরতেই ওপার থেকে মৃণালিনীর কান্নাভেজা কণ্ঠ ভেসে এল—
“অরিত্র, তুমি যদি তেরো নম্বর দরজা খুলে থাকো, তাহলে এখনই পালাও! ওটা তোমার বাবা নয়!”
অরিত্র স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তাহলে কে?”
ফোনের ওপারে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মা এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে অরিত্রর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।
“কারণ তোমার বাবা বারো বছর আগে মারা যাননি। তিনি মারা গিয়েছিলেন আজ থেকে আটাশ বছর আগে—তোমার জন্মেরও আগে!”
ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকার ঘরের ভিতর বসে থাকা লোকটি উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি অরিত্রর দিকে এগিয়ে এলেন।
আর ফিসফিস করে বললেন—
“এবার নিজের মুখটা আয়নায় দেখো, অরিত্র।”
ঘরের দেওয়ালে একটি বিশাল আয়না ছিল।
অরিত্র ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্ব দেখা গেল না।
দেখা গেল একটি মৃত মানুষের মুখ।
আর সেই মুখটি ছিল ঠিক তার নিজের।
প্রথম পর্ব সমাপ্ত।