পুরুলিয়ার এক ছোট্ট শহরে বাস করত ষোলো বছরের মেয়ে তিতলি। তার বাবা সুব্রত দত্ত একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন, আর মা বাড়িতে সেলাই করে সংসারে সাহায্য করতেন। সংসারে অভাব ছিল না বললে ভুল হবে, তবে খুব হিসাব করে চললে মাসের খরচ কোনোমতে মিটে যেত।
তিতলি পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুলের পরীক্ষায় প্রায়ই ভালো ফল করত। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল ছবি আঁকা। জানালার ধারে বসে সে কখনও গ্রামের পুকুর আঁকত, কখনও রেললাইনের পাশে দাঁড়ানো একাকী গাছ, কখনও আবার মানুষের মুখের অভিব্যক্তি।
তার ছবিতে এমন কিছু থাকত, যা দেখে শিক্ষকরা অবাক হয়ে যেতেন।
একদিন স্কুলের অঙ্কনশিক্ষক বলেছিলেন, “তিতলি, তোর চোখে দেখার একটা আলাদা ক্ষমতা আছে। তুই যদি নিয়মিত অনুশীলন করিস, অনেক দূর যেতে পারবি।”
কিন্তু তিতলির বাড়িতে ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে দেখার মতো মানসিকতা ছিল না। বাবা বলতেন, “ছবি আঁকবি, ভালো কথা। কিন্তু আগে এমন একটা পড়াশোনা কর, যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস।”
তিতলি প্রতিবাদ করত না। সে জানত, বাবার কথার মধ্যে অবহেলা নেই; আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।
তবু তার মনে প্রশ্ন জাগত—মানুষ কি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকেও বাঁচিয়ে রাখতে পারে না?
একদিন স্কুল থেকে ফিরে তিতলি মায়ের পুরোনো কাঠের আলমারি পরিষ্কার করছিল। আলমারির নিচের তাকে কাপড়ের একটি পুঁটলি পাওয়া গেল। পুঁটলিটি খুলতেই বেরিয়ে এল একটি ছোট কাঠের বাক্স।
বাক্সটির ওপর ধুলোর আস্তরণ। ঢাকনায় খোদাই করা ফুলের নকশা। তালা ছিল না, শুধু একটি পুরোনো হুক দিয়ে বন্ধ করা।
তিতলি সাবধানে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি শুকিয়ে যাওয়া রঙের কৌটো, পুরোনো তুলি, কিছু আঁকার কাগজ এবং একটি সাদা-কালো ছবি। ছবিতে এক তরুণী নদীর ধারে বসে ছবি আঁকছেন।
ছবির পেছনে লেখা—‘মালবিকা, ১৯৮৭’।
তিতলি ছবিটি নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে গেল।
“মা, এই মালবিকা কে?”
ছবিটি দেখেই মায়ের মুখের রং বদলে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “ও তোমার পিসি। আমার বড় ননদ।”
তিতলি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে তুমি কখনও বলোনি কেন?”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সব গল্প বলা যায় না মা। কিছু গল্প সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যায়।”
কিন্তু তিতলি বুঝতে পারল, এই বাক্সের মধ্যে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা তার পরিবারের কেউ আর উচ্চারণ করতে চায় না।
১. যে স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল
রাতে খাওয়ার পর তিতলি আবার মায়ের পাশে বসে পড়ল।
“মা, পিসি কি ছবি আঁকতেন?”
মা মাথা নাড়লেন।
“খুব ভালো আঁকতেন। তোমার বয়সে আমিও ওঁর কাছ থেকে ছবি আঁকা শিখেছিলাম। পিসি বলতেন, রং দিয়ে শুধু দৃশ্য আঁকা যায় না, মানুষের মনের কথাও বলা যায়।”
“তাহলে উনি ছবি আঁকা ছেড়ে দিলেন কেন?”
মা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “পিসি আর্ট কলেজে পড়তে চেয়েছিলেন। কলকাতায় যাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন ঠাকুরদার শরীর খারাপ হয়ে গেল। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর ওপর। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, পড়াশোনার চেয়ে বাড়িতে থাকাই বেশি জরুরি।”
“তারপর?”
“পিসি সংসার সামলালেন। নিজের ইচ্ছেগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখলেন। পরে বিয়ে হয়ে অন্য জেলায় চলে যান। অনেক দিন যোগাযোগ ছিল। তারপর একসময় খবর পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।”
তিতলি বিস্মিত হয়ে শুনছিল।
“কেউ কি ওঁর খোঁজ করেনি?”
মা চোখ নামিয়ে বললেন, “করেছিল। কিন্তু জীবন অনেক সময় মানুষকে এমন দূরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিতলি বাক্সটির দিকে তাকাল।
তার মনে হলো, কাঠের এই ছোট্ট বাক্সটি শুধু পুরোনো রঙের সংগ্রহ নয়। এর মধ্যে আটকে আছে এমন একজন মানুষের স্বপ্ন, যিনি নিজের ইচ্ছের কথা বলতে বলতে একসময় চুপ করে গিয়েছিলেন।
সে মাকে জিজ্ঞেস করল, “পিসি এখন কোথায় থাকেন, জানো?”
মা মাথা নাড়লেন।
“ঠিকানা জানি না। বহু বছর আগে এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, তিনি বাঁকুড়ার দিকে কোথাও থাকেন। কিন্তু নিশ্চিত নই।”
তিতলি আর প্রশ্ন করল না। সে বাক্সটি নিজের ঘরে নিয়ে গেল।
সেই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে একটি সিদ্ধান্ত নিল—মালবিকা পিসির খোঁজ সে করবে।
২. পুরোনো ছবির সূত্র
পরের দিন স্কুলে গিয়ে তিতলি তার অঙ্কনশিক্ষক অরিন্দমবাবুকে সব কথা জানাল। তিনি মন দিয়ে শুনলেন।
“তোর পিসির পুরোনো ছবিগুলো কি আছে?”
তিতলি বলল, “কয়েকটা কাগজ আছে। বেশিরভাগই বিবর্ণ হয়ে গেছে।”
অরিন্দমবাবু বললেন, “ছবিগুলোর পেছনে কোনো নাম, তারিখ বা প্রদর্শনীর পরিচয় আছে কি না, দেখিস। কখনও কখনও ছোট্ট একটি তথ্যও বড় সূত্র হয়ে উঠতে পারে।”
বাড়ি ফিরে তিতলি বাক্সের সব জিনিস একে একে বের করল। রঙের কৌটোর নিচে একটি ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গেল। কাগজে হাতে লেখা কয়েকটি নাম এবং একটি ঠিকানার অংশ ছিল। ঠিকানাটি অস্পষ্ট হলেও একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার নাম বোঝা যাচ্ছিল।
তিতলি বাবাকে দেখাল।
সুব্রতবাবু কাগজটি দেখে বললেন, “এটা সম্ভবত বহু পুরোনো কোনো চিত্রপ্রদর্শনীর পরিচয়। তবে এত দিন পর ঠিকানা খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
ঋজু নামের এক সহপাঠীর বড় দাদা স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে কাজ করতেন। তিতলি তাঁর সাহায্য চাইল। তিনি পুরোনো পত্রিকার কিছু সংখ্যা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তালিকা ঘেঁটে দেখার পর জানালেন, প্রায় চল্লিশ বছর আগে ওই সংস্থার উদ্যোগে একটি তরুণ শিল্পীদের প্রদর্শনী হয়েছিল।
প্রদর্শনীর তালিকায় ‘মালবিকা দত্ত’ নামে একজনের ছবি ছিল।
এটি ছিল প্রথম নিশ্চিত সূত্র।
তিতলি আনন্দে মাকে খবর দিল। কিন্তু ঠিকানাটি তখনকার, বর্তমান ঠিকানা নয়। তাই শুধু ওই তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলো না।
কয়েক দিন পর অরিন্দমবাবু তিতলিকে বললেন, “স্থানীয় শিল্পীদের পুরোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারিস। তবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজতে গেলে সম্মান ও গোপনীয়তার কথা মাথায় রাখবি। কাউকে অস্বস্তিতে ফেলা চলবে না।”
তিতলি সেই পরামর্শ মেনে এগোল। সংগঠনের একজন প্রবীণ সদস্য পুরোনো প্রদর্শনীর কথা মনে করতে পারলেন। তিনি জানালেন, মালবিকা বিয়ের পর শিল্পচর্চা অনেকটাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন বলে পরিবারটি একসময় বাঁকুড়ার কাছে থাকত।
কিন্তু এরপর আর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেল না।
তিতলির মন খারাপ হলো। তবু সে খোঁজ করা বন্ধ করল না।
৩. রং ফিরে পাওয়ার দিন
মালবিকার সন্ধান চলতে থাকলেও তিতলি নিজের আঁকা বন্ধ করল না। বরং সে প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা ছবি আঁকার জন্য সময় রাখতে শুরু করল।
একদিন সে পুরোনো বাক্সের শুকনো রঙগুলো পরীক্ষা করছিল। বেশিরভাগ রং নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবু বাক্সের এক কোণে কয়েকটি ছোট রঙের টুকরো পাওয়া গেল। সেগুলো ব্যবহার করার মতো অবস্থায় ছিল না, কিন্তু রঙের নাম লেখা কাগজগুলো পড়া যাচ্ছিল।
তিতলি সেই নামগুলো লিখে রাখল।
তারপর সে একটি নতুন ছবি আঁকল—একটি কাঠের বাক্স খোলা, তার ভেতর থেকে নানা রঙের আলো বেরিয়ে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ছবির এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি কিশোরী, আর অন্য পাশে দূরে বসে আছেন এক বৃদ্ধা শিল্পী।
ছবিটির নাম দিল—‘অসমাপ্ত রঙ’।
স্কুলের বার্ষিক প্রদর্শনীতে ছবিটি রাখা হলো। দর্শকদের অনেকেই ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ বললেন, ছবিটি যেন হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা বলে। কেউ আবার জানতে চাইলেন, ছবিটির পেছনের গল্প কী।
তিতলি তার পিসির কথা বলল। তবে কাউকে দোষারোপ করল না। সে শুধু জানাল, কীভাবে একটি পুরোনো বাক্স তাকে পরিবারের এক হারিয়ে যাওয়া গল্পের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকার সম্পাদক। তিনি তিতলিকে বললেন, “তোমার ছবিতে আবেগ আছে, আবার গল্প বলার ক্ষমতাও আছে। তুমি চাইলে এই বিষয় নিয়ে একটি ছোট লেখা লিখতে পারো।”
তিতলি বাড়ি ফিরে লেখাটি তৈরি করল। সেখানে সে নিজের পিসির নাম, পুরোনো ছবির কথা এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের অনুভূতি তুলে ধরল। তবে পিসির বর্তমান ঠিকানা না জানায় ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কোনো অনুমান করল না।
লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো।
তিতলি জানত না, এই লেখাই তার খোঁজের পথ খুলে দেবে।
৪. একটি ফোনকল
প্রায় তিন সপ্তাহ পর এক বিকেলে তিতলির মায়ের ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর।
ওপাশ থেকে এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি মালবিকা দত্তের পরিবারের কেউ?”
মা বিস্মিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?”
মহিলা জানালেন, তিনি বাঁকুড়ার একটি ছোট পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে স্থানীয় শিল্পীদের পুরোনো কাজ নিয়ে একটি আলোচনা সভা হয়েছিল। সেই সভায় কেউ তিতলির লেখা পড়ে মালবিকার কথা তুলেছিলেন। তাঁর এক পরিচিত প্রতিবেশী মালবিকাকে চিনতেন।
মালবিকা এখন বাঁকুড়ার কাছেই একটি ছোট শহরে থাকেন। বয়স হয়েছে, শরীরও খুব ভালো নয়। কিন্তু তিনি এখনও মাঝে মাঝে ছবি আঁকেন।
খবর শুনে তিতলির মা কেঁদে ফেললেন।
“এত বছর পর ওর খবর পেলাম!”
মহিলা জানালেন, তিনি মালবিকার অনুমতি নিয়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে পারবেন। তিতলির মা সম্মতি দিলেন। কয়েক দিন পর তাঁদের মধ্যে ফোনে কথা হলো।
প্রথমে মা কিছু বলতে পারছিলেন না। তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “দিদি, আমি মালতী বলছি।”
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর শোনা গেল, “মালতী? তুই?”
দুজনের কণ্ঠেই কান্না মিশে গেল। কত বছর জমে থাকা স্মৃতি, অভিমান, না-বলা কথা যেন একসঙ্গে ফিরে এল।
মালবিকা জানালেন, তিনি পরিবারের কারও ওপর রাগ করে দূরে সরে যাননি। সংসারের দায়িত্ব, স্থান পরিবর্তন, অসুস্থতা এবং নানা পরিস্থিতির মধ্যে যোগাযোগ হারিয়ে গিয়েছিল। পরে যোগাযোগ করার কথা ভাবলেও কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারেননি।
মালতী বললেন, “দিদি, তোমার রঙের বাক্সটা এখনও আমাদের কাছে আছে।”
ওপাশ থেকে মালবিকা মৃদু হেসে বললেন, “ওটা যে এখনও আছে, ভাবতেই পারিনি।”
তিতলি পাশে বসে সব শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে যে গল্পটি অসমাপ্ত ছিল, তার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
৫. অসমাপ্ত ছবির শেষ রেখা
কয়েক সপ্তাহ পর তিতলি ও তার মা মালবিকার বাড়িতে গেলেন। ছোট শহরের শান্ত পাড়ায় একতলা বাড়ি। উঠোনে তুলসী গাছ, জানালার পাশে কয়েকটি টব। ঘরের ভেতরে দেওয়ালে টাঙানো কিছু পুরোনো ছবি।
দরজা খুলে দাঁড়ালেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধা। চোখে চশমা, মুখে মৃদু হাসি।
মালতী এগিয়ে গিয়ে দিদিকে জড়িয়ে ধরলেন।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারলেন না।
তারপর মালবিকা তিতলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই সেই মেয়ে, যে আমার বাক্সটা খুঁজে পেয়েছিস?”
তিতলি মাথা নাড়ল।
“তুমি কি এখনও ছবি আঁকো, পিসি?”
মালবিকা একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, “খুব বেশি নয়। হাত কাঁপে। চোখেও সমস্যা হয়েছে। তবে কখনও কখনও আঁকি।”
তিনি ঘরের ভেতর থেকে একটি কাগজ এনে দেখালেন। সেখানে একটি নদী, তার পাশে কয়েকটি গাছ, দূরে মেঘলা আকাশ। ছবিটি অসমাপ্ত।
“এটা বহু বছর আগে শুরু করেছিলাম,” তিনি বললেন। “শেষ করতে পারিনি।”
তিতলি ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। ছবির রং বিবর্ণ, তবু তার মধ্যে গভীর সৌন্দর্য ছিল।
সে বলল, “পিসি, তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে এটা শেষ করতে পারি।”
মালবিকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।
“এখন আর আমার হাত আগের মতো চলে না মা।”
“তোমাকে একাই তো সব করতে হবে না। তুমি আমাকে বলবে কোথায় কোন রং লাগবে। আমি রং করব। ছবিটা তোমারই থাকবে।”
মালবিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তাঁর চোখে জল এসে গেল।
“জানিস, আমি একসময় ভাবতাম, ছবি আঁকার স্বপ্নটা আমার জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজ বুঝছি, স্বপ্ন হারিয়ে গেলেও তার দরজা সব সময় বন্ধ হয়ে যায় না।”
পরের দিন সকালে তাঁরা ছবিটি নিয়ে বসে পড়লেন। মালবিকা তিতলিকে বুঝিয়ে দিলেন, নদীর জলে কীভাবে আলো ফুটিয়ে তুলতে হয়, দূরের গাছের রং কীভাবে হালকা রাখতে হয়, আর আকাশের মেঘে কীভাবে গভীরতা তৈরি করতে হয়।
তিতলি রং লাগাল। মালবিকা নির্দেশ দিলেন। কোথাও ভুল হলে তিতলি আবার ঠিক করল।
কাজ শেষ হতে কয়েক দিন লেগে গেল।
শেষ দিনে মালবিকা নিজের কাঁপা হাতে ছবির নিচে লিখলেন—‘মালবিকা ও তিতলি—দুই প্রজন্মের অসমাপ্ত রঙ’।
ছবিটি শেষ হওয়ার পর মালবিকা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তিনি বললেন, “আমার স্বপ্ন হয়তো সেই সময়ে পূর্ণ হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বপ্নের কোনো মূল্য ছিল না। সেই স্বপ্নই আজ তোকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে।”
তিতলি তাঁর হাত ধরে বলল, “তোমার গল্প না জানলে আমি হয়তো নিজের স্বপ্নের মূল্যও বুঝতাম না।”
৬. বাক্সের নতুন ঠিকানা
বাড়ি ফেরার সময় মালবিকা রঙের পুরোনো বাক্সটি তিতলির হাতে তুলে দিলেন।
তিতলি অবাক হয়ে বলল, “এটা তো তোমার স্মৃতি!”
মালবিকা হেসে বললেন, “স্মৃতি শুধু নিজের কাছে আটকে রাখলে চলে না। তবে বাক্সটা নিয়ে যাওয়ার আগে একটা কথা মনে রাখিস—এটাকে শুধু পুরোনো জিনিস হিসেবে দেখবি না। এটা যেন তোকে শেখায়, নিজের স্বপ্নের জন্য সময় বের করা জরুরি।”
তিতলি বাক্সটি গ্রহণ করল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি দিল, বাক্সটি পরিবারের স্মৃতি হিসেবেই থাকবে, আর পিসির সঙ্গে তার সম্পর্কও নিয়মিত বজায় থাকবে।
পরের বছর তিতলির স্কুলে একটি বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হলো। প্রদর্শনীর নাম—‘অসমাপ্ত স্বপ্নের নতুন রং’। সেখানে মালবিকার পুরোনো ছবি, তিতলির আঁকা ছবি এবং তাঁদের একসঙ্গে শেষ করা ছবিটির প্রতিলিপি প্রদর্শিত হলো।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনে মালবিকা নিজে উপস্থিত হতে পারেননি, কিন্তু একটি ভিডিওবার্তায় তিনি শিশুদের বললেন, “জীবনে কখনও কখনও পরিস্থিতির জন্য নিজের ইচ্ছেকে পিছিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু নিজের ভালোবাসার কাজটিকে একেবারে ভুলে যেও না। সুযোগ পেলে আবার শুরু করো। আর মনে রেখো, জীবনের কোনো অধ্যায় অসমাপ্ত থাকলে পরের অধ্যায়ে তার নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”
অনুষ্ঠানের শেষে তিতলি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি আগে ভাবতাম, সফল হতে হলে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে। এখন বুঝেছি, নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি অন্য মানুষের স্বপ্নের গল্প শোনাও জরুরি। কারণ, অনেক সময় অন্যের অসমাপ্ত গল্পই আমাদের নিজের পথ দেখায়।”
সেদিন বাড়ি ফিরে তিতলি কাঠের বাক্সটি নিজের পড়ার টেবিলের পাশে রাখল। তার পাশে রাখল মালবিকার সঙ্গে তোলা একটি ছবি।
বাক্সটি এখন আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক নয়। সেটি হয়ে উঠেছে দুই প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হওয়া এক নতুন সম্পর্কের স্মারক।
তিতলি জানত, সামনে তার পড়াশোনা আছে, পরীক্ষা আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত আছে। সে হয়তো একদিন অন্য শহরে যাবে, হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়বে। কিন্তু সে আর নিজের আঁকার খাতাটি লুকিয়ে রাখবে না।
কারণ সে বুঝেছে, স্বপ্নের জন্য সব সময় পৃথিবীকে বদলে দিতে হয় না। কখনও কখনও নিজের জীবনের ভেতরেই তার জন্য একটু জায়গা তৈরি করতে হয়।
আর কখনও কখনও একটি পুরোনো রঙের বাক্স খুললেই দেখা যায়—যে স্বপ্নকে আমরা মৃত বলে ভেবেছিলাম, সে আসলে নতুন হাতের অপেক্ষায় ছিল।
শিক্ষা: জীবনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে পিছিয়ে রাখতে হতে পারে, কিন্তু তাকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অভিজ্ঞতা ও অসমাপ্ত ইচ্ছা নতুন মানুষের পথ দেখাতে পারে। নিজের স্বপ্নকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্যের স্বপ্নের প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়া আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলে।