Categories
অনুগল্প বিবিধ

অচেনা ভাষার আদালত।।

পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি মহকুমা শহরে জেলা আইনি সহায়তা কেন্দ্রের হয়ে কাজ করতেন রূপসা মিত্র। তাঁর কাজ ছিল এমন মানুষদের সাহায্য করা, যাঁরা অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না অথবা আইনি প্রক্রিয়া বুঝতে সমস্যায় পড়েন।

রূপসা মনে করতেন, আদালতের দরজা সবার জন্য খোলা থাকলেও সেখানে নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলতে না পারলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

একদিন কেন্দ্রে এলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক মহিলা, নাম ফুলমণি হাঁসদা। তিনি পাশের একটি আদিবাসী গ্রাম থেকে এসেছেন। তাঁর জমির সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ হয়েছে। কয়েক মাস আগে জমির একটি অংশে বেড়া দেওয়া নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগ হয় এবং তাঁকে একটি নোটিশ পাঠানো হয়।

ফুলমণি বাংলা অল্প বুঝতেন, কিন্তু আইনি ভাষা তাঁর কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অচেনা ছিল। নোটিশে কী লেখা রয়েছে, তা তিনি বুঝতে পারেননি। গ্রামের একজনের কাছ থেকে শুনেছিলেন, নির্দিষ্ট দিনে হাজির না হলে তাঁর জমি নাকি হাতছাড়া হয়ে যাবে। সেই ভয়েই তিনি আইনি সহায়তা কেন্দ্রে এসেছিলেন।

রূপসা তাঁকে বসতে দিয়ে নোটিশটি পড়লেন। বিষয়টি যতটা গুরুতর বলে ফুলমণি ভেবেছিলেন, কাগজে ততটা বলা ছিল না। তাঁকে একটি নির্দিষ্ট শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। জমির মালিকানা সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও নেওয়া হয়নি।

রূপসা সহজ বাংলায় বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু ফুলমণির মুখের উদ্বেগ কমল না। তিনি বারবার একই প্রশ্ন করছিলেন, “আমার জমি কি আর থাকবে না?”

রূপসা বুঝলেন, শুধু কাগজের ভাষা সহজ করলেই হবে না। ফুলমণি যে ভাষায় স্বচ্ছন্দে নিজের কথা বলতে পারেন, সেই ভাষায় যোগাযোগের ব্যবস্থা দরকার।

তিনি কেন্দ্রের সমন্বয়কারীর সঙ্গে কথা বললেন। তাঁদের পরিচিত একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে সাঁওতালি ভাষায় দক্ষ একজন প্রশিক্ষিত দোভাষীর ব্যবস্থা করা হলো। পরবর্তী সাক্ষাতে দোভাষীর উপস্থিতিতে ফুলমণি নিজের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে জানাতে পারলেন।

তিনি বললেন, জমির সীমানা নিয়ে বিরোধের অনেক আগে থেকেই দুই পরিবারের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। তাঁর কাছে জমির পুরোনো কাগজপত্রও ছিল। কিন্তু সেগুলোর অর্থ কী, তা তিনি জানতেন না। বিরোধের দিন ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়েও তিনি নিজের ভাষায় ধারাবাহিকভাবে বিবরণ দিলেন।

রূপসা নথিগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনও যাচাই করা বাকি। তাই তিনি কোনও পক্ষকে দোষী না ধরে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের পরামর্শ দিলেন। ফুলমণিকে জানানো হলো, শুনানিতে কী হতে পারে, কোন কাগজ সঙ্গে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে কীভাবে আইনি সহায়তা চাওয়া যায়।

শুনানির দিন দোভাষী উপস্থিত ছিলেন। ফুলমণি ধীরে ধীরে নিজের বক্তব্য জানালেন। অপর পক্ষও তাদের নথি জমা দিল। কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে জমির রেকর্ড পরীক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। বিরোধের নিষ্পত্তি তখনই হলো না, কিন্তু ফুলমণি অন্তত নিজের কথা বলতে পারলেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেলেন।

শুনানি শেষে তিনি রূপসাকে বললেন, “আগে মনে হচ্ছিল, সবাই কাগজের কথা বুঝবে, শুধু আমি বুঝব না। আজ মনে হলো, আমার কথারও মূল্য আছে।”

কথাটি রূপসার মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।

পরের মাসে আইনি সহায়তা কেন্দ্রের উদ্যোগে একটি সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করা হলো। সেখানে স্থানীয় ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করা হলো। আইনি নথির সহজ ব্যাখ্যা, শুনানির নিয়ম এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো হলো।

সভায় রূপসা বললেন, “কোনও মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে অজ্ঞ বলে তাঁর অধিকার কমে যায় না। ভাষা, শিক্ষা বা আর্থিক অবস্থার কারণে কেউ যেন নিজের কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটাই আমাদের লক্ষ্য।”

সেই সভার পরে আরও কয়েকজন মানুষ আইনি পরামর্শ নিতে এলেন। কেউ জমির নথি নিয়ে, কেউ পারিবারিক বিরোধ নিয়ে, কেউ আবার সরকারি সুবিধার আবেদন সম্পর্কে জানতে।

রূপসা বুঝতে পারলেন, ন্যায়বিচারের পথে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় বাধা আইন নয়, বরং আইনকে বোঝার সুযোগের অভাব।

ফুলমণির জমির বিরোধের নিষ্পত্তি হতে আরও সময় লেগেছিল। কিন্তু তিনি আর ভয়ে নোটিশ লুকিয়ে রাখতেন না। প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতেন, নথি বুঝে নিতেন এবং নিজের বক্তব্য জানাতেন।

একদিন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তিনি রূপসাকে বললেন, “এখন আর কাগজ দেখলেই ভয় লাগে না। বুঝতে না পারলে জিজ্ঞাসা করতে হয়, সেটাও শিখেছি।”

রূপসা হাসলেন। তাঁর কাছে এটাই ছিল কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

শিক্ষা: ভাষা বা শিক্ষার সীমাবদ্ধতা যেন কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে। অন্যের কথা বোঝার চেষ্টা করা, প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং প্রত্যেককে নিজের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়াই প্রকৃত ন্যায় ও মানবিকতার পরিচয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *