Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ বাঁশির পরেও খেলা বাকি।

বর্ধমানের একটি ছোট শহরে ফুটবল রেফারি হিসেবে পরিচিত ছিলেন অরূপ চক্রবর্তী। বয়স চল্লিশ পেরোলেও তাঁর দৌড়ানোর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। স্থানীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় তিনি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তের জন্য সম্মান পেতেন। তাঁর কাছে রেফারির কাজ শুধু বাঁশি বাজানো নয়, খেলার নিয়মের প্রতি খেলোয়াড়দের আস্থা বজায় রাখা।

এক বছর শহরের সবচেয়ে বড় আন্তঃক্লাব ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ‘অগ্রদূত’ ও ‘সংহতি’ ক্লাব। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে ম্যাচের উত্তেজনা শুরু থেকেই তুঙ্গে।

অরূপ ছিলেন সেই ম্যাচের প্রধান রেফারি।

খেলার প্রথমার্ধে দুই দলই একটি করে গোল করল। দ্বিতীয়ার্ধে অগ্রদূত একটি গোল করায় তাদের সমর্থকেরা উল্লাসে ফেটে পড়লেন। কিন্তু সংহতির খেলোয়াড়েরা দাবি করলেন, গোলের আগে তাদের একজন খেলোয়াড়কে ফাউল করা হয়েছিল।

অরূপের দৃষ্টিতে ঘটনাটি পরিষ্কার ছিল না। তিনি সহকারী রেফারির সঙ্গে কথা বললেন। সহকারী জানালেন, তিনি কোনও স্পষ্ট ফাউল দেখেননি। তাই গোলটি বৈধ বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল।

সংহতির অধিনায়ক দেবাশিস ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, “আপনারা আমাদের কথা শুনছেন না। এইভাবে খেলা হলে প্রতিযোগিতার মানে কী?”

অরূপ শান্ত গলায় বললেন, “তোমার আপত্তি নথিভুক্ত করা হবে। কিন্তু মাঠে খেলা চালিয়ে যেতে হবে।”

দেবাশিস কিছুটা শান্ত হলেও দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যে অসন্তোষ রয়ে গেল।

খেলার শেষ পাঁচ মিনিটে সংহতি সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। তাদের এক তরুণ খেলোয়াড়, সৌরভ, প্রতিপক্ষের গোলমুখে বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। অগ্রদূতের একজন রক্ষণের খেলোয়াড় বল আটকাতে গিয়ে পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে অগ্রদূতের সমর্থকেরা ফাউলের দাবি জানালেন।

অরূপ বাঁশি বাজালেন। কিন্তু এবার তিনি ফাউল দিলেন অগ্রদূতের বিরুদ্ধে।

মাঠে হইচই শুরু হয়ে গেল। অগ্রদূতের অধিনায়ক প্রতিবাদ করে বললেন, “আপনি কি আগের সিদ্ধান্তের ক্ষতিপূরণ করছেন?”

অরূপ কঠোরভাবে উত্তর দিলেন, “প্রতিটি ঘটনা আলাদা করে বিচার করা হয়। আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই।”

ফ্রি-কিক থেকে সংহতি গোল করল। ম্যাচ শেষ হলো দুই-দুই গোলে। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হলো।

অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে সৌরভ বল নিয়ে বক্সের দিকে এগোচ্ছিল। প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে সে মাটিতে পড়ে গেল। সংহতির খেলোয়াড়েরা পেনাল্টির দাবি তুললেন। অগ্রদূতের খেলোয়াড়েরা বললেন, সৌরভ নিজেই ভারসাম্য হারিয়েছিল।

অরূপ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছলেন। তিনি দেখলেন, সৌরভ ব্যথায় কাতরাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাকর্মীদের ডাকলেন। সৌরভকে মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।

এবার অরূপকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো। তিনি ঘটনাটি কাছ থেকে দেখেছিলেন, কিন্তু সংঘর্ষের মুহূর্তে দুই খেলোয়াড়ের পায়ের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ছিল না। সহকারী রেফারিও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারলেন না।

গ্যালারি থেকে হাজারো কণ্ঠে পেনাল্টির দাবি উঠছিল। অরূপ জানতেন, যে সিদ্ধান্তই নিন, এক পক্ষ অসন্তুষ্ট হবে। তবু দর্শকদের চিৎকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

তিনি নিজের দেখা ঘটনা, সহকারীর পর্যবেক্ষণ এবং খেলার নিয়ম বিচার করে সিদ্ধান্ত দিলেন—পেনাল্টি নয়। তবে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের অসতর্ক আচরণের জন্য ফ্রি-কিক দেওয়া হলো।

ম্যাচের ফল তখনও অমীমাংসিত। শেষ পর্যন্ত কোনও দল গোল করতে পারল না। টাইব্রেকারে অগ্রদূত জয়ী হলো।

খেলা শেষ হওয়ার পর সংহতির কয়েকজন সমর্থক অরূপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে লাগলেন। দেবাশিসও হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়ছিলেন। কিন্তু অরূপ তাঁকে ডেকে বললেন, “তোমাদের অভিযোগ থাকলে নিয়মমাফিক জমা দাও। ম্যাচের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে আমি প্রস্তুত। তবে ফল পছন্দ না হলেই সিদ্ধান্ত অন্যায় হয়ে যায় না।”

পরদিন প্রতিযোগিতা কমিটি ম্যাচের ঘটনাগুলি পর্যালোচনা করল। কোনও ভিডিওপ্রমাণ বা অন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে অরূপের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেল না। তাঁর প্রতিবেদনও বিস্তারিত ও যুক্তিসংগত ছিল।

কয়েক দিন পরে দেবাশিস নিজেই অরূপের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।

“ম্যাচ হেরে খুব রাগ হয়েছিল,” তিনি বললেন। “কিন্তু পরে বুঝেছি, আমরা ফল নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে নিয়মের কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম।”

অরূপ বললেন, “খেলার নিয়ম শুধু রেফারির জন্য নয়। খেলোয়াড়দেরও তা মেনে নিতে হয়। তবে রেফারির সিদ্ধান্তও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ জানাতে হবে।”

পরের মরশুমে সংহতি আবার ফাইনালে উঠল। এবার তাদের অধিনায়ক খেলোয়াড়দের বললেন, “রেফারির সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত হতে পারে, কিন্তু নিজের নিয়ন্ত্রণ হারালে আমরা নিজেদেরই ক্ষতি করি।”

সেই ম্যাচে সংহতি জিতেছিল। কিন্তু দেবাশিসের কাছে আগের বছরের পরাজয়ই ছিল বড় শিক্ষা। তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিযোগিতার প্রকৃত মান শুধু ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না; কঠিন মুহূর্তে নিয়ম, সংযম ও ন্যায্যতার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার মধ্যেও তার পরিচয় থাকে।

শিক্ষা: জয়-পরাজয় খেলাধুলার স্বাভাবিক অংশ। নিজের পছন্দের ফল না পেলেও সংযম বজায় রাখা, নিয়মকে সম্মান করা এবং মতভেদ হলে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিবাদ করাই প্রকৃত খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *