Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

শীতকালে জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন থেকে কীভাবে বাঁচবেন? তৃষ্ণা কম পেলেও সুস্থ থাকতে মেনে চলুন ১০টি জরুরি নিয়ম।

শীতকাল এলেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। গরম পোশাক, কম্বলের আরাম, গরম চা-কফি এবং নানা ধরনের শীতকালীন খাবার হয়ে ওঠে জীবনের অংশ। কিন্তু এই সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেকেই অবহেলা করেন—পর্যাপ্ত জল পান করা। গরমকালে তৃষ্ণা বেশি পাওয়ায় আমরা বারবার জল পান করি। অথচ শীতকালে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যাওয়ায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করেন।

এর ফলে শরীরে জলের ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন দেখা দিতে পারে। শরীরে পর্যাপ্ত জল না থাকলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং মাথা ঘোরার মতো সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে জলশূন্যতার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

তাই শীতকালেও শরীরকে সুস্থ রাখতে জল পানের অভ্যাসের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। জেনে নেওয়া যাক, শীতকালে জলশূন্যতা এড়াতে কোন ১০টি নিয়ম মেনে চলা উচিত।

১. তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত জল পান করুন

শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও শরীরের জলের প্রয়োজন বন্ধ হয়ে যায় না। শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখা, রক্ত সঞ্চালন, হজম এবং বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়ার মতো নানা কাজে জল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাই তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষা না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে জল পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর, খাবারের মাঝের সময়ে এবং শরীরচর্চার আগে-পরে জল পান করতে পারেন।

তবে সবার জলের চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর জলের প্রয়োজন নির্ভর করে। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ জল সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য—এমন ধারণা ঠিক নয়।

২. দিনের শুরু করুন জল পান দিয়ে

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেই সরাসরি চা বা কফি পান করেন। তার আগে এক গ্লাস জল পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। রাতভর ঘুমের সময় শরীর প্রস্রাব ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে কিছুটা জল হারায়। সকালে জল পান করলে শরীরের তরলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য হয়।

সকালে জল খুব ঠান্ডা না গরম—তা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই। সাধারণ তাপমাত্রার জল অথবা আরামদায়ক হালকা গরম জল পান করতে পারেন।

তবে মনে রাখতে হবে, সকালে একবারে অনেকটা জল পান করলেই সারাদিনের জলের চাহিদা পূরণ হয় না। দিনের বাকি সময়েও নিয়মিত জল পান করতে হবে।

৩. খাবারের তালিকায় জলসমৃদ্ধ ফল ও সবজি রাখুন

শরীরে জলের জোগান শুধু পানীয় থেকে আসে না। বিভিন্ন ফল, সবজি, স্যুপ এবং অন্যান্য তরল খাবার থেকেও জল পাওয়া যায়।

শীতকালে খাদ্যতালিকায় কমলালেবু, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি, শসা, টমেটো, গাজর এবং অন্যান্য মরশুমি ফল ও সবজি রাখতে পারেন। ফল ও সবজিতে থাকা জল ছাড়াও এগুলি শরীরকে ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং খাদ্যআঁশ সরবরাহ করে।

সবজি দিয়ে তৈরি হালকা স্যুপও শীতকালের ভালো খাবার হতে পারে। তবে অতিরিক্ত নুন দেওয়া স্যুপ বা প্রক্রিয়াজাত পানীয় নিয়মিত খাওয়ার পরিবর্তে বাড়িতে তৈরি পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।

ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে ফলের পরিমাণ ও ধরন নিজের খাদ্যপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারণ করুন।

৪. চা-কফির ওপর নির্ভর করে থাকবেন না

শীতকালে গরম চা-কফি পান করতে অনেকেরই ভালো লাগে। এগুলি তরল গ্রহণের অংশ হলেও সারাদিনের পানীয় হিসেবে শুধু চা-কফির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

চা ও কফিতে ক্যাফেইন থাকে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা বা বুক ধড়ফড়ের মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

তাই চা-কফির পাশাপাশি সাধারণ জল, দুধ, হালকা স্যুপ এবং উপযুক্ত অন্যান্য পানীয় গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত চিনি মেশানো পানীয়ের বদলে স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন।

৫. শরীরচর্চার আগে ও পরে জল পান করুন

শীতকালে হাঁটা, দৌড়ানো, যোগব্যায়াম কিংবা অন্যান্য শরীরচর্চা করার সময় ঘাম কম হচ্ছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু শারীরিক পরিশ্রমের সময় শরীর থেকে জল বেরিয়ে যায়। ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেও কিছুটা জল হারাতে পারে।

তাই শরীরচর্চার আগে, প্রয়োজন অনুযায়ী চলাকালীন এবং ব্যায়ামের পরে জল পান করুন। দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা কঠোর পরিশ্রম করলে শরীরের জলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

তবে একবারে অতিরিক্ত জল পান করার পরিবর্তে নিয়মিত অল্প অল্প করে পান করা ভালো। সাধারণ দৈনন্দিন শরীরচর্চায় অধিকাংশ মানুষের জন্য সাধারণ জলই যথেষ্ট। দীর্ঘ সময়ের কঠোর পরিশ্রম বা প্রচুর ঘাম হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইটের প্রয়োজন হতে পারে।

৬. প্রস্রাবের রং ও পরিমাণের দিকে নজর দিন

শরীরে জলের ঘাটতি হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য প্রস্রাবের রং ও পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন থাকা উপকারী হতে পারে। সাধারণত হালকা খড়ের রঙের প্রস্রাব পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের একটি ভালো ইঙ্গিত। গাঢ় হলুদ প্রস্রাব অনেক সময় শরীরে জলের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে।

তবে শুধু প্রস্রাবের রং দেখে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিছু ওষুধ, ভিটামিন, খাবার এবং শারীরিক অবস্থার কারণেও প্রস্রাবের রং পরিবর্তিত হতে পারে।

প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে, বারবার মাথা ঘুরলে কিংবা অতিরিক্ত দুর্বলতা অনুভব করলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৭. শিশু ও বয়স্কদের জল পানের দিকে বিশেষ নজর দিন

শিশুরা খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকলে অনেক সময় জল পান করতে ভুলে যায়। আবার বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণা অনুভব করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে এই দুই বয়সের মানুষের শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিশুদের নিয়মিত জল পান করতে উৎসাহিত করুন এবং স্কুলে যাওয়ার সময় পরিষ্কার জলের বোতল সঙ্গে দিন। খেলাধুলার বিরতিতে জল পান করার অভ্যাস তৈরি করুন।

বয়স্ক পরিবারের সদস্যদেরও দিনের বিভিন্ন সময়ে জল বা উপযুক্ত তরল পান করার কথা মনে করিয়ে দিন। তবে যাঁদের হৃদ্‌যন্ত্র বা কিডনির সমস্যার কারণে চিকিৎসক তরল গ্রহণের পরিমাণ সীমিত করে দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশই অনুসরণ করতে হবে।

৮. জ্বর, বমি বা ডায়রিয়া হলে সতর্ক থাকুন

শীতকালে বিভিন্ন সংক্রমণের কারণে জ্বর, বমি বা ডায়রিয়া হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শরীর থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি জল ও লবণ বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে দ্রুত জলশূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বমি বা ডায়রিয়া হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস ব্যবহার করা যেতে পারে। প্যাকেটের নির্দেশ অনুযায়ী নিরাপদ জলে সঠিক অনুপাতে ওআরএস মিশিয়ে তৈরি করতে হবে। অনুমান করে অতিরিক্ত বা কম জল মেশাবেন না।

গুরুতর দুর্বলতা, প্রস্রাব খুব কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা পানীয় গ্রহণ করতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে জলশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে বিশেষ সতর্ক থাকা জরুরি।

৯. শীতের পোশাকের পাশাপাশি ঘরের পরিবেশেও নজর দিন

শীতকালে অতিরিক্ত গরম পোশাক পরে থাকা, হিটার ব্যবহার করা কিংবা দীর্ঘ সময় বন্ধ ঘরে থাকার কারণে অনেকের মুখ ও গলা শুকিয়ে যেতে পারে। ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে নাক ও গলায় অস্বস্তিও হতে পারে।

তাই ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন এবং নিরাপদভাবে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং অস্বস্তি হলে ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারেন।

শুধু মুখ শুকিয়ে যাওয়াকেই ডিহাইড্রেশনের নিশ্চিত লক্ষণ মনে করবেন না। শুষ্ক বাতাস, কিছু ওষুধ এবং মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণেও এমন হতে পারে। একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করুন।

১০. নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে জল পান করুন

শীতকালে সুস্থ থাকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর নয়। যাঁরা বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেন, বাইরে কাজ করেন অথবা শুষ্ক পরিবেশে থাকেন, তাঁদের বেশি তরল প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে।

তাই নিজের দৈনন্দিন কাজ, খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী জল পানের অভ্যাস তৈরি করুন। তৃষ্ণা, প্রস্রাবের স্বাভাবিকতা এবং শরীরের অন্যান্য লক্ষণের দিকে নজর রাখুন। চিকিৎসক যদি দৈনিক তরল গ্রহণের নির্দিষ্ট সীমা দিয়ে থাকেন, তা মেনে চলুন।

শুধু সুস্থ থাকার আশায় জোর করে অতিরিক্ত জল পান করাও ঠিক নয়। অল্প সময়ে অত্যধিক জল পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। তাই ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

শীতকালে তৃষ্ণা কম পেলেও শরীরের জলের প্রয়োজন কমে যায় না। তাই এই মরশুমে জল পানের অভ্যাসকে অবহেলা না করে প্রতিদিনের স্বাস্থ্যচর্চার অংশ করে তুলুন। নিয়মিত জল পান, জলসমৃদ্ধ ফল ও সবজি খাওয়া, শরীরচর্চার আগে-পরে তরল গ্রহণ এবং শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা—এই সহজ অভ্যাসগুলি শরীরে জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

মনে রাখবেন, সুস্থ থাকার জন্য শুধু ঠান্ডা থেকে বাঁচলেই হবে না; শরীরের ভেতরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখার দিকেও নজর দিতে হবে। তাই শীতের প্রতিটি দিন শুরু হোক স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে। শরীরের সংকেত বুঝুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং জলশূন্যতার লক্ষণকে কখনও অবহেলা করবেন না।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *