Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

শীতকালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখবেন কীভাবে? সুস্থ থাকতে মেনে চলুন ১০টি জরুরি নিয়ম।

শীতের মরশুমে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরেও নানা পরিবর্তন দেখা যায়। ঠান্ডা হাওয়া, কুয়াশা, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন দৈনন্দিন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের শীতকালে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাই ব্লাড প্রেশার এমন একটি শারীরিক সমস্যা, যার অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ থাকে না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁদের রক্তচাপ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি রয়েছে। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র, মস্তিষ্ক, কিডনি এবং রক্তনালির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীরের রক্তনালিগুলি সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে কিছু মানুষের রক্তচাপ বেড়ে যায়। শীতকালে শরীরচর্চা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত নোনতা খাবার খাওয়া এবং ওষুধ অনিয়মিতভাবে গ্রহণ করাও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তাই শীতের দিনগুলিতে সুস্থ থাকতে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলা জরুরি। জেনে নেওয়া যাক, শীতকালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

১. নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রথম শর্ত হলো নিজের রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতন থাকা। শুধু মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি হলেই রক্তচাপ পরীক্ষা করবেন—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক সময় রক্তচাপ বেড়ে গেলেও কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।

শীতকালে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। বাড়িতে রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকলে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন। মাপার আগে অন্তত পাঁচ মিনিট শান্তভাবে বসে থাকুন। পিঠে ভর দিয়ে বসুন, পা মেঝেতে সমান রাখুন এবং হাত হৃদ্‌যন্ত্রের সমতলে রাখুন। মাপার আগের ৩০ মিনিটে চা-কফি, ধূমপান ও শরীরচর্চা এড়িয়ে চলা ভালো।

একবারের রিডিং দেখে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন হলে কিছুক্ষণ পর আবার মাপুন এবং রিডিং লিখে রাখুন। বারবার রক্তচাপ বেশি এলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

২. ঠান্ডা থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখুন

ঠান্ডা আবহাওয়ায় রক্তনালি সংকুচিত হওয়ার কারণে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাঁদের সতর্ক থাকা উচিত।

বাইরে বেরোনোর সময় আবহাওয়া অনুযায়ী গরম পোশাক পরুন। মাথা, কান, হাত ও পা যথাসম্ভব ঠান্ডা থেকে সুরক্ষিত রাখুন। খুব ভোরে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে হঠাৎ করে জোরে হাঁটা বা কঠোর পরিশ্রম শুরু করবেন না।

ঘুম থেকে ওঠার পর ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়ুন এবং শরীরকে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হতে সময় দিন। তবে ঠান্ডা এড়ানোর নামে সারাদিন ঘরে বসে থাকাও ঠিক নয়। নিরাপদ পরিবেশে নিয়মিত শরীরচর্চা চালিয়ে যান।

৩. খাবারে নুনের পরিমাণ কমান

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। খাবারে অতিরিক্ত নুন থাকলে অনেকের রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। শীতকালে আচার, চানাচুর, নোনতা বিস্কুট, চিপস, প্যাকেটজাত খাবার এবং বিভিন্ন ভাজাভুজি বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এগুলিতে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।

রান্নায় পরিমিত নুন ব্যবহার করুন এবং খাবারের সঙ্গে আলাদা করে কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় লেবেলে সোডিয়ামের পরিমাণ দেখে নিন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক নুনের পরিমাণ পাঁচ গ্রামের কম রাখা উচিত। তবে চিকিৎসকের দেওয়া ব্যক্তিগত খাদ্যপরামর্শ থাকলে সেটি অনুসরণ করুন। নুন কমানোর পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলুন।

৪. শীতকালেও নিয়মিত হাঁটুন ও শরীরচর্চা করুন

শীতকালে ঠান্ডার কারণে অনেকেই সকালের হাঁটা বন্ধ করে দেন। এর ফলে শারীরিক সক্রিয়তা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

আবহাওয়া অনুকূল থাকলে দিনের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ সময়ে হাঁটতে বেরোন। শুরুতে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটুন এবং শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। চিকিৎসাগত বাধা না থাকলে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের লক্ষ্য রাখা যেতে পারে।

হাঁটার পাশাপাশি সাইকেল চালানো, হালকা যোগব্যায়াম বা ঘরের মধ্যে ব্যায়ামও করতে পারেন। তবে দীর্ঘদিন শরীরচর্চা না করলে হঠাৎ কঠোর ব্যায়াম শুরু করবেন না। ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরা দেখা দিলে থামুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন।

৫. শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খান

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য থাকা জরুরি। শীতকালে সহজেই পাওয়া যায় এমন পালং শাক, লাল শাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বিট, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য মরশুমি সবজি নিয়মিত খেতে পারেন।

পেয়ারা, কমলালেবু, আপেল ও অন্যান্য উপযুক্ত ফলও খাদ্যতালিকায় রাখুন। ডাল, মাছ, ডিম, বাদাম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস থেকে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়।

পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার অনেকের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে কিডনির রোগ থাকলে বা রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার বা বিকল্প নুন ব্যবহার করবেন না।

৬. অতিরিক্ত তেল, চিনি ও ভাজাভুজি এড়িয়ে চলুন

শীতকালে গরম গরম সিঙাড়া, কচুরি, পরোটা, পকোড়া এবং মিষ্টি খেতে ভালো লাগলেও এগুলি অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। নিয়মিত বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।

খাবারে তেলের পরিমাণ কম রাখুন। গভীর তেলে ভাজা খাবারের বদলে সেদ্ধ, ঝোল, ভাপানো বা অল্প তেলে রান্না করা খাবার বেছে নিন। মিষ্টি পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা-কফি কমিয়ে দিন।

ওজন বেশি থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। অল্প সময়ে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য কঠোর উপবাস বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়েট অনুসরণ করবেন না।

৭. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না

উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীতকালে রক্তচাপ কখনও স্বাভাবিক দেখালেও নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা ডোজ কমানো উচিত নয়।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। ওষুধ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ওষুধ সংগ্রহ করুন, যাতে কোনো দিন বাদ না যায়। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

সর্দি-কাশির কিছু ওষুধ, বিশেষ করে নাক বন্ধ কমানোর কিছু উপাদান, রক্তচাপ বাড়াতে পারে। কিছু ব্যথানাশক ওষুধও রক্তচাপ বা কিডনির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নতুন ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে নিজের সমস্যার কথা জানান।

৮. পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক শান্তি বজায় রাখুন

ঘুমের অনিয়ম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করতে পারে। শীতকালে রাতে দেরি করে ঘুমানো এবং সকালে দীর্ঘ সময় বিছানায় থাকার অভ্যাস অনেকের দৈনন্দিন রুটিন নষ্ট করে দেয়।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং সকালে কাছাকাছি সময়ে ওঠার চেষ্টা করুন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

মানসিক চাপ কমাতে হালকা হাঁটা, ধ্যান, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, বই পড়া বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস করুন। ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৯. ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন

ধূমপান রক্তনালি ও হৃদ্‌যন্ত্রের ক্ষতি করে এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তামাকের নিকোটিন সাময়িকভাবে রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্পন্দন বাড়াতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ধূমপান ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত মদ্যপানও রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই মদ্যপান এড়িয়ে চলা বা কমানোর বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শুধু ধূমপান বন্ধ করলেই সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে না। তার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ চালিয়ে যেতে হবে।

১০. বিপদের লক্ষণ চিনুন এবং দ্রুত চিকিৎসা নিন

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। রক্তচাপ খুব বেশি হলে এবং সঙ্গে বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ দৃষ্টির পরিবর্তন, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।

রক্তচাপ ১৮০/১২০ মিলিমিটার পারদ বা তার বেশি হলে অন্তত এক মিনিট অপেক্ষা করে আবার মাপুন। রক্তচাপ একই রকম বেশি থাকলে এবং উপরের বিপদের লক্ষণগুলির কোনোটি থাকলে জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা নিন। এমন লক্ষণ না থাকলেও দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী পদক্ষেপ জেনে নিন।

শুধু রক্তচাপের সংখ্যা দেখে নিজের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ওষুধ খাবেন না। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলাই নিরাপদ।

উপসংহার

শীতকালে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেতনতা এবং নিয়মিত জীবনযাত্রার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঠান্ডা থেকে শরীরকে সুরক্ষিত রাখা, খাবারে নুন কমানো, নিয়মিত হাঁটা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

মনে রাখবেন, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলেই শীতকালে সব ধরনের কাজকর্ম বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সক্রিয় থাকুন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। কোনো উপসর্গ না থাকলেও রক্তচাপ পরীক্ষা করতে ভুলবেন না।

সুস্থ থাকার মূলমন্ত্র হলো—সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সময়মতো চিকিৎসা। এই অভ্যাসগুলি মেনে চললে শীতের মরশুমেও হৃদ্‌যন্ত্রের যত্ন নেওয়া এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *