রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে অর্কর ফোনে একটা মেসেজ এল।
প্রেরকের নাম দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মেঘলা।
তার স্ত্রী মেঘলা মারা গেছে ঠিক এক বছর আগে।
মেসেজে লেখা ছিল মাত্র তিনটি শব্দ—
“আমি বাড়ি ফিরেছি।”
অর্ক অনেকক্ষণ ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁপা আঙুলে মেসেজটার উত্তর দিল।
“কে আপনি?”
উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গেই।
“তুমি কি সত্যিই আমাকে ভুলে গেছ, অর্ক?”
অর্কর হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
মেঘলা তাকে শেষবার এই কথাটাই বলেছিল।
মৃত্যুর আগের রাতে।
সেদিন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। অর্ক অফিস থেকে ফিরে দেখেছিল, মেঘলা জানলার পাশে বসে আছে। তার সামনে একটা পুরোনো চিঠি। অর্ক জিজ্ঞেস করেছিল, “কী হয়েছে?”
মেঘলা কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বলেছিল, “আমি যদি একদিন হঠাৎ হারিয়ে যাই, তুমি কি আমাকে খুঁজবে?”
অর্ক হেসে বলেছিল, “এমন কথা বলছ কেন? তুমি কোথায় যাবে?”
মেঘলা তখন তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “যদি আমি ফিরে আসি, তুমি কি আমাকে চিনতে পারবে?”
অর্ক সেদিন কথাটাকে গুরুত্ব দেয়নি।
পরদিন সকালে মেঘলাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পুলিশ বলেছিল, রাতের বেলা সিঁড়ি থেকে পড়ে মাথায় আঘাত লেগেছিল তার। দুর্ঘটনা।
কিন্তু অর্ক আজও বিশ্বাস করতে পারেনি।
কারণ মেঘলার দেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল একটা চিঠি। চিঠির কাগজে শুধু একটি বাক্য লেখা ছিল—
“এই বাড়িতে আমি একা নই।”
তারপর থেকে অর্ক আর ওই বাড়িতে থাকেনি। কলকাতার ফ্ল্যাটটা তালাবন্ধ করে সে চলে গিয়েছিল শিলিগুড়িতে। কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল। তবু প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার মনে পড়ত মেঘলার শেষ প্রশ্নটা।
আজ ঠিক এক বছর পরে সেই বন্ধ ফ্ল্যাট থেকেই এসেছে মেসেজ।
অর্ক সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল মেঘলার নম্বরে।
ফোন বন্ধ।
সে আবার মেসেজ লিখল—
“তুমি কোথায়?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
“যেখানে তুমি আমাকে রেখে এসেছিলে।”
অর্কর মাথার মধ্যে যেন বজ্রপাত হল।
সে তো মেঘলাকে কোথাও রেখে আসেনি। পুলিশ তার দেহ নিয়ে গিয়েছিল। শেষকৃত্যও হয়েছে তার সামনে।
তাহলে এই মেসেজ কে পাঠাচ্ছে?
হঠাৎ আরও একটা মেসেজ এল।
“আজ রাতেই বাড়ি ফিরে এসো। তোমার জন্য একটা চিঠি রেখে গেছি।”
অর্ক আর দেরি করল না।
সেই রাতেই কলকাতার ট্রেন ধরল সে।
ভোর ৫টা ২০ মিনিটে অর্ক তার পুরোনো ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল।
বাড়িটার নাম ‘শান্তিনিকেতন অ্যাপার্টমেন্ট’। পাঁচতলার ফ্ল্যাট। একসময় এই বাড়িটাই ছিল তার পৃথিবী। মেঘলার সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি লুকিয়ে আছে প্রতিটি ঘরে।
কিন্তু আজ বাড়িটাকে দেখে তার মনে হল, যেন সে কোনো অচেনা জায়গায় ফিরে এসেছে।
প্রধান দরজার তালাটা খোলা।
অর্ক নিশ্চিত ছিল, যাওয়ার সময় সে নিজেই তালা লাগিয়েছিল।
সে ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ।
পুরোনো কাগজ, স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল আর যেন কোথাও পুড়ে যাওয়া ফুলের গন্ধ।
ড্রয়িংরুমের টেবিলের ওপর রাখা একটা সাদা খাম।
খামের ওপর মেঘলার হাতের লেখা।
“অর্কর জন্য।”
অর্ক চিঠিটা খুলল।
“অর্ক,
তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তার মানে তুমি ফিরে এসেছ। আমি জানতাম, তুমি ফিরবে।
আমার মৃত্যুর জন্য তুমি নিজেকে দোষ দিও না। কিন্তু এটাও ভেবো না যে আমার মৃত্যু একটা দুর্ঘটনা ছিল।
আমাকে কেউ হত্যা করেনি।
আমি নিজেই মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলাম, কারণ আমি এমন একটা সত্য জেনে গিয়েছিলাম, যেটা জানার কথা কোনো মানুষের নয়।
এই বাড়িতে মোট ছয়টি ঘর আছে। কিন্তু তুমি সব সময় পাঁচটি ঘরই দেখেছ।
ষষ্ঠ ঘরটা কোথায়, সেটা মনে করার চেষ্টা করো।
আর একটা কথা মনে রেখো—রাত ১২টার পরে যদি কেউ তোমার নাম ধরে ডাকে, উত্তর দেবে না।
সে আমি হলেও না।
—মেঘলা”
চিঠিটা পড়ে অর্কর মাথা ঘুরতে লাগল।
ছয়টি ঘর?
এই ফ্ল্যাটে তো পাঁচটি ঘরই—একটা শোবার ঘর, একটা বসার ঘর, রান্নাঘর, পড়ার ঘর আর ছোট্ট একটা স্টোররুম।
তাহলে ষষ্ঠ ঘর কোথায়?
অর্ক একে একে সমস্ত ঘর খুঁজল। কোথাও কিছু পেল না। স্টোররুমের পুরোনো বাক্সগুলো সরাল। রান্নাঘরের তাক পরীক্ষা করল। শোবার ঘরের আলমারি খুলল।
শেষে মেঘলার পুরোনো ডায়েরিটা পেল বিছানার নিচে।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“মানুষ বাড়ি তৈরি করে থাকার জন্য। কিন্তু কিছু বাড়ি তৈরি হয় মানুষকে আটকে রাখার জন্য।”
অর্ক পাতা উল্টাতে লাগল।
তারিখ অনুযায়ী শেষ লেখাটা ছিল মেঘলার মৃত্যুর তিন দিন আগে।
“আজ আবার দরজাটা দেখলাম।
এবার দরজার ওপাশ থেকে কেউ আমার নাম ধরে ডাকছিল।
আমি জানি, ওই ঘরে আমার শৈশবের একটা স্মৃতি লুকিয়ে আছে। কিন্তু অর্ককে কিছু বলতে পারছি না। কারণ ওকে বললেই ওর বিপদ হবে।
আজ আয়নায় নিজেকে দেখার সময় বুঝলাম, আমার প্রতিবিম্ব আমার সঙ্গে নেই।
আমি যখন হাসলাম, ও হাসল না।
আমি যখন চোখ বন্ধ করলাম, ও চোখ খুলে রাখল।
আর তারপর ও ঠোঁট নেড়ে বলল—
‘তুমি এতদিন আমার জীবন নিয়ে বেঁচে আছ।’”
অর্কর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
ডায়েরির পরের পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু শেষ পাতার কোণে পেনসিল দিয়ে আঁকা একটা নকশা আছে।
ফ্ল্যাটের পাঁচটি ঘরের নকশা। তার পাশে একটা ছোট আয়তক্ষেত্র।
তার ওপর লেখা—
“ঘর নম্বর ৬।”
অর্ক নকশাটা নিয়ে বাড়ির দেওয়ালগুলোর মাপ মিলিয়ে দেখতে লাগল। স্টোররুমের দেওয়ালের পাশে এসে সে থামল।
দেওয়ালটা বাইরে থেকে যতটা মোটা দেখায়, ভেতর থেকে ততটা নয়।
সে হাত দিয়ে চাপ দিতেই একটা কাঠের প্যানেল সামান্য সরে গেল।
প্যানেলের পেছনে একটা সরু দরজা।
দরজায় কোনো হাতল নেই।
শুধু মাঝখানে খোদাই করা একটা চোখ।
অর্ক দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল।
“অর্ক, তুমি এসেছ?”
কণ্ঠস্বরটা মেঘলার।
অর্ক চোখ বন্ধ করে ফেলল।
মেঘলার চিঠির কথা মনে পড়ল—রাত ১২টার পরে কেউ নাম ধরে ডাকলে উত্তর দেবে না।
কিন্তু এখন তো সকাল।
তাহলে কি উত্তর দেওয়া নিরাপদ?
দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠস্বর এল।
“অর্ক, আমাকে এখানে একা রেখো না।”
অর্ক ধীরে ধীরে বলল, “মেঘলা?”
সঙ্গে সঙ্গে দরজার পেছনে সব শব্দ থেমে গেল।
তারপর ভেতর থেকে একটা হাসি শোনা গেল।
সেই হাসি মেঘলার নয়।
ওটা যেন অনেকগুলো মানুষের হাসি একসঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে।
দরজার মাঝখানে খোদাই করা চোখটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
অর্ক পিছিয়ে এল।
চোখটার ভেতরে কোনো মণি নেই। শুধু গভীর কালো অন্ধকার।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যে সে দেখতে পেল একটা ঘর।
ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ার।
চেয়ারে বসে আছে মেঘলা।
সাদা শাড়ি পরা। মাথা নিচু।
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “মেঘলা, তুমি কি সত্যিই ওখানে আছ?”
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
সে শুধু আঙুল তুলে ঘরের পেছনের দেওয়ালটা দেখাল।
সেখানে ঝুলছে একটা বড় আয়না।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অর্ক।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আয়নার ভেতরের অর্কর মুখে হাসি।
বাস্তবের অর্ক হাসছে না।
আয়নার ভেতরের অর্ক ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল।
“ওকে বিশ্বাস করো না।”
তারপর সে আয়নার কাচে হাত রাখল।
কাচের ওপাশ থেকে একটা কালো হাত বেরিয়ে এল।
সেই হাত মেঘলার গলা চেপে ধরল।
মেঘলা চিৎকার করে উঠল।
অর্ক আর থাকতে পারল না। সে দরজায় ধাক্কা দিল।
“মেঘলা!”
দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল।
কিন্তু ওপাশে কোনো ঘর নেই।
আছে একটা লম্বা করিডর।
দেওয়ালে সারি সারি ছবি।
প্রতিটি ছবিতে একই বাড়ি, একই দরজা, একই আয়না।
আর প্রতিটি ছবিতে দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ।
অর্ক।
কিন্তু প্রত্যেক ছবিতে তার বয়স আলাদা।
একটিতে সে শিশু।
একটিতে কিশোর।
একটিতে বৃদ্ধ।
শেষ ছবিটিতে সে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলার পাশে।
ছবির নিচে লেখা—
“অর্ক সেন, মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর ২০২৫।”
অর্কর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
কারণ তার মৃত্যু হয়েছিল গত বছর, মেঘলার মৃত্যুর ঠিক সাত দিন আগে।
সে ছবির তারিখের দিকে তাকাল।
আজকের তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে দেখল।
তারপর নিজের হাতের দিকে তাকাল।
আঙুলগুলো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে।
সে চিৎকার করে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে মেঘলা দৌড়ে এল।
সে অর্কর হাত ধরে টেনে বলল—
“এবার সব মনে পড়েছে?”
অর্কর চোখের সামনে একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল।
সেই রাত।
গাড়ির ব্রেক ফেল করা।
প্রবল বৃষ্টি।
মেঘলার ফোন।
আর দুর্ঘটনার ঠিক আগে সে যে কথাটা বলেছিল—
“মেঘলা, আমি বাড়ি ফিরছি।”
অর্ক হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
“আমি… আমি তো মারা গিয়েছিলাম!”
মেঘলা কাঁদতে লাগল।
“হ্যাঁ, অর্ক। তুমি মারা গিয়েছিলে। কিন্তু তুমি সেটা মনে রাখতে চাওনি।”
“তাহলে আমি এতদিন কোথায় ছিলাম?”
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
“ঘর নম্বর ছয়ে।”
অর্ক পিছনে তাকাল।
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু এবার দরজার ওপাশ থেকে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মেঘলা, দরজা খোলো। আমি বাড়ি ফিরেছি।”
মেঘলা অর্কর হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
তার চোখে আতঙ্ক।
“না! ও ফিরে এসেছে!”
“কে?”
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল—
“যে তোমার মুখ পরে আমার সঙ্গে থাকে।”
দরজায় আবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
তারপর ওপাশ থেকে অর্করই কণ্ঠস্বর শোনা গেল—
“মেঘলা, দরজা খোলো। এবার আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।”
মেঘলা অর্কর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
“তুমি যদি সত্যিই অর্ক হও, তাহলে বলো—আমাদের বিয়ের রাতে আমি তোমাকে কোন কথাটা বলেছিলাম, যেটা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না?”
অর্ক উত্তর দিতে মুখ খুলল।
কিন্তু তার মনে পড়ল না।
আর ঠিক তখনই করিডরের সব ছবি একসঙ্গে মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
প্রতিটি ছবির পেছনে লেখা ছিল একই বাক্য—
“এই বাড়িতে একজনই জীবিত। বাকিরা সবাই তার স্মৃতি।”
চলবে…