Categories
কবিতা

একটি কথোপকথন : রাণু সরকার।

এই মেয়ে, একই সময় রোজ পুকুর পাড়ে বসে কী ভাবিস?

কী আর ভাববো, বর্তমানের কথা ছাড়া কী আর আছে আমার।

তোর নাম কিরে মেয়ে?

আমার নাম ? হা হা হা হা —

হাসছিস যে–
হ্যাঁ, তোর নাম কী বল?

কী বলি- সবাই বরাঙ্গনা বলে ডাকে , এটা আবার নাম হয়? হ্যাঁ গো বাবু হয় আমাদের মতো মেয়েদের ভালো নামে কেউ ডাকে না।
ভালো করে কথা বল? তোর নাম কী?

শরীর- সবাই তো এই নামে ডাকে ও চেনে।

এইসব কাজ করিস কেনো?

সে অনেক কথা, বাবু।
বলতে বলতে ভোর হয়ে যাবে।

আসুক ভোর, তবু তুই বল-
তুই লেখাপড়া জানিস?

কিছু জানি।

তবে কোথাও না কোথাও কাজ করতে পারতিস, এই কাজে কেনো এলি?

মায়ের ক্যানসার বাবার প্যারালিসিস, ভাইটা বিয়ে করে চলে গেছে বাড়ি থেকে, আমি আর যেতে পারিনি এদের ছেড়ে।
তবে এই কাজ কেনো?
এতো টাকা কোথায় পাবো- তাই বেছে নিলাম এই কাজ।
অনেক টাকা একবার বিছানায় গা ঠেকালেই।

আমি কিছু টাকা দেবো নিবি?

নেবো তবে কখন কোথায় গা এলাতে হবে বলুন।

থাম মেয়ে, আমি এ ধরনের মানুষ নই।

তবে কাজ ছাড়া টাকা দেবেন কেনো?

আমার ইচ্ছে হলো তাই।

আপনার ইচ্ছে আমি নাও তো মানতে পারি।

তুই এই কাজ করবি না কখনো।

তাহলে আমার চলবে কি করে?

আমি একটা ব্যবসা করি, তুই আমার এই ব্যবসায় সাহায্য কর।বল করবি?

করবো বাবু, আমাকে বাঁচালেন বাবু, আমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে পারিনি টাকার অভাবে।

ঠিক আছে, এই আমার নম্বর দিলাম। যোগাযোগ করিস, ঠিকানা বলে দেবো।
আমি চলে যাচ্ছি, মনে যেন থাকে, কাল চলে যাস আর এই কাজ কখনো করবি না।
এবার তোর নামটা বল?
আমার নাম শিউলি,
বাহ্ খুব সুন্দর নাম,
ঠিক আছে বাড়ি চলে যা এখনই,ওই দিকে আর যেতে না দেখি।
ঠিক আছে বাবু এখই চলে যাবো, আমার কথা গুলো যেন মনে থাকে, হ্যাঁ বাবু মনে থাকবে।
কাল চলে যাবো আপনার অফিসে, কিন্তু? কী কিন্তু?বল?থামলি কেনো? আমাকে যে সবাই চেনে বাবু, আপনার সম্মান হানি হবে না তো?
আপনি আর একবার ভেবে দেখুন বাবু?
আপনি সম্মানিত ব্যাক্তি আমি চাই না আমার জন্য আপনার কোন ক্ষতি হোক।
বেশি কথা বলার স্বাভব পাল্টাতে হবে-
আমার ব্যাপার আমি বুঝে নেবো তোর মাথা ব্যথা করতে হবে না ।
আমি যা বলেছি তাই করবি মনে যেন থাকে আজ চললাম কাল দেখা হবে।

Share This
Categories
কবিতা

আহুতি : রাণু সরকার।

দুঃখ, সে তো যজ্ঞের উজ্জ্বল শিখা-
জ্বলছে অবিরাম,
প্রনয়, এক সময় দীপ্যমান তবে
নিত্য সংশয়ের সম্মুখীন হতে হয়!
প্রেম, সে তো খুবই দুর্লভ বিষয়-
বিরহ, এখন তীর্থে বাস করতে চায়-
যজ্ঞের উজ্জ্বল শিখায় আতুর নিকষিত প্রাণ!

মুক্তি পায় না তৃষ্ণাতুরা, পরিতাপের তীব্র দহন চলে অবিরাম,
গৌরব ক্ষয় হয়,
অশ্রুজলের উৎসবে স্নান সারা হয়!

মৃগতৃষ্ণার পূর্ণতা পাওয়া দুর্লভদর্শন
যজ্ঞের উজ্জ্বল দীপশিখায় দিতে হয় আহুতি,
ঘরণী প্রাণ কী ভঙ্গুর?

Share This
Categories
কবিতা

ইশারা : রাণু সরকার।

তুমি ইশারা করে কি
যে বলো-ধুত্ ছাই-
তোমার ইশারার কথা
আমি বুঝি না-
তবে বোঝার চেষ্টা করি,

ইশারায় কি জানি কি বলো
বুঝতেই পারি না,
কেনো ইশারায় ডাকো?
আমি তো একদিন বলেছি
তোমার হয়তো মনে নেই
বেশি দূরে যাই না-
যেতেও পারিনা-
ভয় পাই তুমি তো জানো!

যদি ফিরে আসতে না পারি,
হাত ধরে খাদের কিনারায়
যদি নিয়ে যায়!
মনটা যদি পিছলে খাদে
পড়ে যায়-

আমি বলেছি তো বেশি
দূরে যাই না,
কাছে পিঠেই থাকি,
হাত দু’টি প্রসারিত করে
উচ্চস্বরে ডাক দিয়েই দেখো না-

এক ছুটে চলে আসবো
তোমার বুকে!
মনে কষ্ট পেওনা বুঝিনা বলে-
বলেছি তো–
তবে বোঝার চেষ্টা করি,
কিন্তু বেশি দূরে আমি যাই না!

Share This
Categories
প্রবন্ধ

অবনী মুখোপাধ্যায় : ভারতীয় উপমহাদেশের একজন সাম্যবাদী, বিপ্লবী।

সূচনা—-

ভারতীয় উপমহাদেশের একজন সাম্যবাদী, বিপ্লবী অবনী মুখোপাধ্যায় এক উল্লেখযোগ্য নাম। ১৯২০ সালে ১৭ অক্টোবর তাসখন্ডে ৮ জন সদস্যকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা হলো কমিউনিস্ট পার্টি যার অন্যতম সদস্য অবনীনাথ ও তার পত্নী রোজা ফিটিংগফ। অবনীনাথ মুখোপাধ্যায় অল্প বয়েসেই প্রবীন কমিউনিস্ট ব্যক্তিত্ব সখারাম গনেশ দেউস্করের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। অবনীর পিতা রাজনীতি থেকে তাকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। দূরে পাঠাতে তাকে আমেদাবাদের টেক্সটাইল ট্রেনিং ইন্সটিটিউট এ পড়তে পাঠান। ১৯১৪ সালে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মহান বিপ্লবী বাঘা যতীনের। অবনীনাথ তারই পরামর্শে চাকরি নিয়ে জাপান যাত্রা করেন জাপানে ও অন্যান্য এশীয় দেশের সশস্ত্র বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে।

 

জন্ম—

অবনীনাথ মুখোপাধ্যায় মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর শহরে ৩ জুন ১৮৯১ জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি নিবাস বাংলাদেশের খুলনায়র বাবুলিয়া গ্রামে। পিতার নাম ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। স্কুলের পাঠ শেষে তিনি কলকাতায় উইভিং টেকনোলজি শেখেন।

 

ব্যক্তিগত জীবন —-

 

তিনি বিয়ে করেন ১৯২০ সালে।  বলশেভিক তরুণী রোজা ফিটিংগফের সাথে তার বিবাহ হয় ১৯২০ সালে। কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও গবেষক চিন্মোহন সেহানবীশের সাথে মস্কোয় রোজার সাক্ষাত হয়। জানা যায় অবনীর পুত্র গোরা ঐতিহাসিক স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে শহীদ হন ১৯৪০ সালে। মেয়ে মায়া ছিলেন যক্ষারোগ বিশেষজ্ঞা।

 

কর্ম জীবন—

 

ছাত্রাবস্থায় কলকাতাতেই তিনি গণেশ দেউস্কর ও বিপিন পালের দ্বারা প্রভাবিত হন। উইভিং শেখার পর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের অ্যাসিস্ট্যান্ট উইভিং মাস্টার হয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষার জন্য জাপান ও জার্মানি যান। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে উচ্চতর শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে দেশে ফিরে অ্যান্ডু ইউল কোম্পানিতে চাকরি নেন ও কিছুকাল পরে বৃন্দাবনের প্রেম মহাবিদ্যালয়ে উপাধ্যক্ষ হিসাবে যোগদান করেন।

 

বৈপ্লবিক জীবন—

কুখ্যাত কার্লাইল ফতোয়া জারি করে ব্রিটিশ সরকার ছাত্র আন্দোলন নিষিদ্ধ করলে ১৯০৫ সালে তার বিরুদ্ধে কিশোর অবনী একটি জনসভায় যোগ দেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে শাস্তি প্রদান করলে তিনি স্কুল থেকে পালিয়ে জামালপুরের রেল শ্রমিক ধর্মঘটে সামিল হন। অল্প বয়েসেই সান্নিধ্য পেয়েছিলেন প্রবীণ জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব সখারাম গনেশ দেউস্করের। অবনীনাথ মুখোপাধ্যায়, গদর বিপ্লবী ভগবান সিং ও রাসবিহারী অস্থায়ী বিপ্লব কমিটি গঠন করেন। জার্মান দূতের সাথে দেখা করে ফেরার পথে বিপ্লবীদের নাম ঠিকানাসহ নোটবই নিয়ে ধরা পড়েন পেনাং পুলিশের হাতে অবনীনাথ। ১৯১৭ সালে সিঙ্গাপুরে তাকে বন্দি করে রাখা হয়। কয়েকজন জার্মান যুদ্ধবন্দীর সাথে অবনীনাথ দু:সাহসীক ভাবে পলায়ন করেন। সেখান থেকে সুমাত্রায় এক রবার বাগিচায় কাজ নেন ও গোপনে যোগাযোগ করেন ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মতে সেখানেই তিনি রুশ বিপ্লবের কথা জানতে পারেন ও কমিউনিজমে আকৃষ্ট হন। পরে জাল ছাড়পত্রের সাহায্যে শাহির ছদ্মনামে অবনীনাথ এরপর চলে যান হল্যান্ড ও জার্মানি।

 

হিন্দুস্থান শ্রমিক ও কৃষক পার্টির প্রতিষ্ঠা—

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্বেও ১৯২২ এর শেষে তিনি ভারতে ফেরেন।  ভারত ত্যাগের পূর্বে মাদ্রাজে হিন্দুস্থান শ্রমিক ও কৃষক পার্টির প্রতিষ্ঠা করে যান ১৯২৪ এর ২রা মার্চ।

 

 গবেষনা ও রচনা—

মস্কোতে এম এন রায়ের সাথে মিলিতভাবে ‘ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন’ বইটি রচনা করেন। মোপলা বিদ্রোহ সম্বন্ধে অবনী একটি পুস্তিকা লেখেন যা লেনিনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে পাওয়া গেছে। এছাড়া ১৯২৩ সালে তিনি ‘গরীবের কথা’ একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

 

সম্মাননা—-

১৯৮৬ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব অবনী মুখোপাধ্যায়কে মরণোত্তর সন্মানে পুনর্বাসিত করেন

 

 

মৃত্যু—-

তাঁর মৃত্যু রহস্যাবৃত। সন্দেহ করা হয় বুখারিনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল এই অভিযোগে রাশিয়ান গোয়েন্দা দপ্তরের নির্দেশে তার মৃত্যুদণ্ড হয়।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
রিভিউ

আজ ৩ জুন, ইতিহাসের আজকের এই দিনে যা ঘটেছিল।

আজ ৩ জুন। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় বছরের প্রতিটি দিনে ঘটেছে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আসুন আজকের দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় একনজরে দেখে নিই।  ইতিহাসের আজকের এই দিনে কী কী ঘটেছিল, কে কে জন্ম নিয়েছিলেন ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন——-

 

দিবস—–

 

(ক)  বিশ্ব সাইকেল দিবস।

 

আজ যাদের জন্মদিন—-

১৯৬০ – কার্ল রেকেম্যান, সাবেক অস্ট্রেলীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার।

১৯৬৬ – ওয়াসিম আকরাম, সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেট খেলোয়াড়।

১৯৬৮ – সাফ্রন, ইংরেজ গায়িকা।

১৯৮২ – ইয়েলেনা ইসিনবায়েভা, ভলগোগ্রাদে জন্মগ্রহণকারী রাশিয়ার বিখ্যাত প্রমিলা পোল ভল্টার।

১৯৮৫ – উকাশ পিশ্চেক, পোল্যান্ডের একজন পেশাদার ফুটবলার।

১৯৮৬ – রাফায়েল নাদাল, স্পেনের একজন পেশাদার টেনিস খেলোয়াড়।

১৯৯১ – উকাশ তেওদোর্চেক, পেশাদার ফুটবলার।

১৯৯২ – মারিও গোটজে, জার্মান ফুটবলার।

১৮৯১ – ভারতীয় বাঙালি বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট নেতা অবনীনাথ মুখোপাধ্যায়।

১৯০৬ – জোসেফিন বেকার, আমেরিকান বংশদ্ভুত ফ্রেন্স নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী ও অভিনেত্রী।

১৯০৬ – ওয়াল্টার রবিন্স, ইংরেজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার ও ফুটবলার।

১৯১০ – পলেট গডার্ড, আমেরিকান অভিনেত্রী এবং মডেল।

১৯১১ – এলেন কর্বি, মার্কিন অভিনেত্রী।

১৯১৯ – ছায়া দেবী(চট্টোপাধ্যায়), প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্রাভিনেত্রী।

১৯২০ – অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার, বিশিষ্ট অধ্যাপক, গবেষক ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি’র ভূতপূর্ব সভাপতি।

১৯২৪ – করুণানিধি মুথুবেল, ভারতীয় রাজনীতিক এবং তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী।

১৯২৫ – টনি কার্টিস, মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেতা।

১৯২৬ – অ্যালেন গিন্সবার্গ, মার্কিন কবি এবং লেখক।

১৯২৮ – জন রিচার্ড রিড, সাবেক নিউজিল্যান্ডীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার।

১৯৩১ – রাউল কাস্ত্রো, কিউবার রাষ্ট্রপতি এবং ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই।

১৭২৩ – জিওভান্নি আন্তোনিও স্কোপোলি, তাইরলীয় চিকিৎসক ও প্রকৃতিবিদ।

 

ইতিহাসের পাতায় আজকের দিনের ঘটনাবলী—-

 

২০০০ – মন্টেনিগ্রো কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা।

২০১০ – রাজধানী ঢাকার নিমতলি মহল্লায় অগ্নিকাণ্ডে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়।

১৯১৫ – ব্রিটিশ সরকার রবীন্দ্রনাথকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৩৬ – অবিভক্ত ভারতের সিভিলিয়ান রেডিওর নাম পরিবর্তন করে অল ইন্ডিয়া রেডিও নামকরণ।

১৯৪০ –  (ক) ব্যাটল্‌ অব ডানকার্ক।

(খ)  – জার্মান বিমানবাহিনী ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উপর বোমা বর্ষণ শুরু করে।

(গ) – সিঙ্গাপুর বৃটিশ শাসনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৪৬ – ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতারা ব্রিটিশ সরকার প্রস্তাবিত ভারত বিভাজন প্রস্তাব মেনে নেন।

১৯৪৭ – বৃটিশ সরকার ভারত বিভাগের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।

১৯৪৯ – আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৬৯ – ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হন।

১৯৭১ – জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশে হানাদার বাহিনীর অত্যাচার মানব ইতিহাসের সর্বাধিক বিষাদময় ঘটনা।

১৯৭৮ – বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান বিজয় লাভ করে।

১৯৮৪ – ভারত সরকার শিখদের পবিত্র হরমন্দির সাহিব দখলের জন্য অপারেশন ব্লু স্টার শুরু করে; এটি ৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত হয়।

১৯৮৯ – চীন সরকার তিয়েনআনমেন স্কয়ার থেকে অবরোধকারীদের বিতারণের জন্য সেনা প্রেরণ করে।

১৯৯৯ – যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোভেদান মিলোশোভিচ কোসভো থেকে সৈন্য সরিয়ে নিতে সম্মত হয়।

১৭৮৯ – ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় লবণ উৎপাদন নিষিদ্ধ করে।

১৬৬৫ – ডিউক অব ইয়র্ক জেমস স্টুয়ার্ট ওলন্দাজ নৌ-রণতরীকে পরাজিত করেন।

১৬৬৫ – লোয়েস্টফটের যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে ওলন্দাজদের পরাজয়।

১৫০২ – পর্তুগীজ নৌ অভিযাত্রী ভাস্কো-দা-গামা ভারতের কালিকট বন্দরে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলো।

১০৯৮ – খ্রিস্টানদের এন্টিয়ক দখল। ১৩ হাজার মুসলমানকে হত্যা।

 

এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন যারা—-

২০০১ – অ্যান্থনি কুইন, মার্কিন অভিনেতা।

২০১৪ – প্রবীণ সাংবাদিক বেনজীর আহমেদ।

২০১৫ – সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়।

২০১৬ – মোহাম্মদ আলী, মার্কিন বক্সার।

২০২০ – বলিউডের বিশিষ্ট গীতিকার আনোয়ার সাগর।

১৯০৮ – গোপাল সেনগুপ্ত, বাঙালি, ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদ বিপ্লবী।

১৯২৪ – ফ্রান্‌ৎস কাফকা, জার্মান ও চেক উপন্যাস ও ছোটগল্প লেখক।

১৯৬১ – কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কৃষিবিজ্ঞানী,শিক্ষাবিদ ও লেখক।

১৯৬৩ – (ক)  নাজিম হিকমত, তুর্কি কবি এবং লেখক।

(খ) – ধর্মগুরু ত্রয়োদশ পোপ জনের মৃত্যু।

১৯৬৯ – মুহম্মদ আবদুল হাই, বাংলা ভাষার ধ্বনিবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক।

১৯৭৭ – আর্চিবাল্ড ভি. হিল, ইংরেজ শারীরতত্ত্ববিদ।

১৯৭৫ – এইসাকু সাতো, জাপানী রাজনীতিবিদ।

১৯৮৪ – ঐতিহাসিক আবু মহামেদ।

১৯৮৭ – রুহুল্লাহ্‌ খামেনেই, ইরানি ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিবিদ।

১৯৯০ – রবার্ট নয়েস, আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইন্টেল কর্পোরেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা।

১৬৫৭ – উইলিয়াম হার্ভে, ইংরেজ চিকিৎসক।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
রিভিউ

আজ ২৯ মে, ইতিহাসের আজকের এই দিনে যা ঘটেছিল।

আজ ২৯ মে। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় বছরের প্রতিটি দিনে ঘটেছে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আসুন আজকের দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় একনজরে দেখে নিই।  ইতিহাসের আজকের এই দিনে কী কী ঘটেছিল, কে কে জন্ম নিয়েছিলেন ও মৃত্যুবরণ করেছিলেন——-

 

দিবস—–

 

(ক) আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস।

(খ) সেনাবাহিনী দিবস (আর্জেন্টিনা)।

 

আজ যাদের জন্মদিন—-

১৬৩০ – দ্বিতীয় চার্লস ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডের রাজা।

১৮৬০ – স্যার মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দী, কাশিমবাজারের মহারাজা ও মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব।

১৮৬৫ – রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ঊনবিংশ শতকের বাঙালি সাহিত্যিক ও ‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’ এর সম্পাদক।

১৮৬৮ – দ্বিতীয় আবদুল মজিদ, সর্বশেষ উসমানীয় খলিফা।

১৮৯৪ – ইয়োজেফ ফন স্টার্নবের্গ, অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক।

১৮৯৬ – স্টেলা ক্রামরিশ, অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও কিউরেটর যিনি মূলত ভারতীয় শিল্পের ইতিহাস নিয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

১৯০৩ – বব হোপ, মার্কিন কৌতুকাভিনেতা, অভিনেতা, গায়ক, নৃত্যশিল্পী, মল্লক্রীড়াবিদ ও লেখক।

১৯০৫ – হীরাবাঈ বরোদাকর, হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী।

১৯১৪ – তেনজিং নোরগে, নেপালী শেরপা, এডমন্ড হিলারির সাথে যৌথভাবে এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেন।

১৯১৭ – জন এফ. কেনেডি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম রাষ্ট্রপতি।

১৯২১ – বিশিষ্ট বাঙালি শিল্প ব্যক্তিত্ব সাধন দত্ত।

১৯২৫ – অমলেন্দু বিশ্বাস, বাংলাদেশী যাত্রা অভিনেতা ও পরিচালক।

১৯২৯ – দ্বিজেন শর্মা, বাংলাদেশী প্রকৃতিবিদ।

১৯২৯ – পিটার হিগস, ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামিরেটাস অধ্যাপক।

১৯৪০ – ফারুক আহমদ খান লেগারি, পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং অষ্টম প্রেসিডেন্ট।

১৯৪১ – অরুণাভ সরকার, বাংলাদেশী কবি, কলাম লেখক, সাহিত্য সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৫২ – হুমায়ুন ফরিদী, বাংলাদেশী অভিনেতা।

১৯৮৪ – নিয়া জ্যাক্স, মার্কিন পেশাদার কুস্তিগীর, মডেল এবং বডিবিল্ডার।

১৯৯৩ – মাইকা মনরো, মার্কিন অভিনেত্রী এবং পেশাদার কাইটবোর্ডার।

 

ইতিহাসের পাতায় আজকের দিনের ঘটনাবলী—-

১৩২৮ – ফিলিপ-৫ ফ্রান্সের রাজমুকুট গ্রহণ করেন।

১৪৫৩ – কনস্টান্টিনোপল বিজয়: সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের নেতৃত্বে উসমানীয় সেনারা ৫৩ দিন অবরোধের পর বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করে এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে।

১৭২৭ – দ্বিতীয় পিটার রাশিয়ার জার হন।

১৮০৭ – মোস্তফা চতুর্থ কর্তৃক তুরস্কের সুলতান সেলিম তৃতীয় ক্ষমতাচ্যুত।

১৮৭৪ – সুইজারল্যান্ডে সংবিধান কার্যকর হয়।

১৯০৩ – সার্বিয়ার রাজা আলেকজান্ডার আর্বেনোভিচ সস্ত্রীক নিরাপত্তা রক্ষীদের হাতে নিহত।

১৯৩৪ – তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোসফের স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি অনুযায়ী, কিউবারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বাতিল করা হয়।

১৯৩৫ – হেগ জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়।

১৯৩৭ – স্পেনে গৃহযুদ্ধ চলার সময় রিপাবলিকানদের জঙ্গী বিমান জার্মানীর একটি জাহাজে আঘাত হানে।

১৯৪৮ – আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ বিরতির জন্য জাতিসংঘের পরিচালিত প্রথম শান্তিরক্ষা মিশন।

১৯৫৩ – তেনজিং নরগেএবং এডমন্ড হিলারী যৌথভাবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন। দু জনের মধ্যে তেনজিং নরগে প্রথমে শৃঙ্গে উঠেছিলেন।

১৯৫৪ – পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক এ.কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা বাতিল ঘোষণা করা হয়।

১৯৫৯ – শার্ল দ্য গোল ফ্রান্সে জাতীয় নিরাপত্তামূলক সরকার গঠন করেন।

১৯৬৩ – ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে ২২ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।

১৯৬৮- ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব ইউরোপিয়ান কাপ জয় করে।

১৯৭২ – তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিকসেন সৌভিয়েত ইউনিয়নে তার এক সপ্তাহব্যাপী সফর করেন।

১৯৯০ – বরিস ইয়েলৎসিন রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৯০ – কর্ণফুলি সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

১৯৯১ – ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা।

১৯৯৩ – চতুর্থ এশিয়া-প্যাসিফিক রেড ক্রস সম্মেলন পেইচিংএ সমাপ্ত হয়।

১৯৯৬ – কায়রোতে ৭টি আরব দেশের পরিবেশ সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬ – বেনজামিন নেতানিয়াহু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত।

 

এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন যারা—-

১২৫৯ – ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ক্রিস্টোফার।

১৪৫৩ – উলুবাতলি হাসান, অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের অধীনস্থ একজন তিমারলি সিপাহি।

১৮২৯ – হামফ্রে ডেভি, ব্রিটিশ আবিষ্কারক এবং প্রখ্যাত রসায়নবিদ।

১৮৯২ – বাহাউল্লাহ, বাহাই ধর্ম-এর প্রতিষ্ঠাতা।

১৯৪২ – জন ব্যারিমোর, আমেরিকান অভিনেতা।

১৯৭১ – পৃথ্বীরাজ কাপুর, ভারতের থিয়েটার ও চলচ্চিত্র অভিনেতা ও ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ।

১৯৭৭ – সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাঙালি, একজন ভাষাতাত্ত্বিক পণ্ডিত, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।

১৯৭৯ – ম্যারি পিকফোর্ড, কানাডীয়-মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও প্রযোজক।

১৯৮১ – চীনের মহান বিপ্লবী পথিকৃৎ ড: সান ইয়াত সেনের বিধবা সন ছিং লিন।

১৯৮৭ – চৌধুরী চরণ সিং, ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং ভারতের ৬ষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী।

২০০৪ – আঞ্জুমান আরা বেগম, একুশে পদক বিজয়ী বাংলাদেশী সঙ্গীতশিল্পী।

২০১০ – ডেনিস হপার, মার্কিন অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, আলোকচিত্রী ও চিত্রশিল্পী।

২০১৭ – মানুয়েল নরিয়েগা, পানামার সাবেক রাজনীতিবিদ ও সৈনিক।

২০২১ – (ক) ‘টারজান’ খ্যাত হলিউড তারকা জো লারা।

(খ ) বিষ্ণুপুর ঘরানার কিংবদন্তি ধ্রুপদী সঙ্গীত শিল্পী ড.দেবব্রত সিংহ ঠাকুর।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

গুরুতত্ত্বে-র গূঢ় রহস্য : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

শ্রীমন্ মহাপ্রভু রায় রামানন্দের কাছে জানতে চেয়েছিলেন — “বিদ্যার মধ্যে কোন্ বিদ্যা জীবের হয় সার ?” বিদ্যা শব্দটি “বিদ্‌’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘জানা’। আর সার অর্থে শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ তিনি জানতে চাইলেন কী বা কাকে জানা শ্রেষ্ঠ? তখন ‘রায় কহে, ভক্তি বিনা বিদ্যা নাহি আর। ভক্তি বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ।” ভক্তিকে জানাই সর্বোত্তম বিদ্যা। ভক্তি কি? ভক্তি অর্থাৎ ভজনা। অতএব, ভগবানকে ভজনা করতে জানাই হল শ্রেষ্ঠ বিদ্যা। এ পৃথিবীতে যে কোন ধরণের শিক্ষার জন্য একজন শিক্ষকের প্রয়োজন। এমনকি যা আমরা প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে বা অনুভবের দ্বারা শিখি তাও এ সংসারে কারো না কারো প্রেরণা বা অবদান। তাহলে জাগতিক বিদ্যা শিক্ষা করতে যখন শিক্ষকের প্রয়োজন তখন ভক্তিবিদ্যা বা পরাবিদ্যার মতো গম্ভীর বিষয়কে জানার জন্য, শেখার জন্যও একজন শিক্ষকের প্রয়োজন। এই শিক্ষকই হলেন ‘গুরু’। গুরু শব্দটি ‘গুড়’ ধাতু থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘রক্ষা করা’। যিনি সংসার মহাদাবাগ্নি থেকে রক্ষা করেন তিনিই গুরু। ‘গু’অর্থ ‘অন্ধকার’, ‘রু’ অর্থ ‘দূর করা’। যিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে দেন তিনিই গুরু। গুরু অর্থে ‘হিতকারী’। গুরু অর্থে ‘উপদেষ্টা’। কথিত আছে— “এক অক্ষর শিখায় যে, জন্মে জন্মে গুরু সে।” আবার গুরু অর্থ ভারীও হয়। অতএব এই যে, ‘গুরুতত্ত্ব’ তা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, গূঢ়, ও রহস্যময় বিষয়ও।

আমাদের জীবনে গুরুর প্রয়োজন কতটা? গুরু বিনা কি গতি নেই? ভগবানকে মন থেকে ডাকলে, ভক্তি করলেই তো চলে, তার জন্য আবার গুরুর কি দরকার—এ প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই। তাহলে সেই উত্তর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকেই আমরা শুনি। তিনি বলেছেন – ভবসমুদ্র পাড় করতে মানব- শরীর হল এক সুদৃঢ় নৌকা। যা প্রাপ্ত হওয়া দুর্লভ। সেই দুর্লভ বস্তু সুলভ হয়ে যখন কেউ মনুষ্য যোনিতে জন্মগ্রহণ করে; গুরু-কে তার জীবন সমুদ্র পথের কাণ্ডারী নিযুক্ত করে; তখন শুধুমাত্র স্মরণ করা মাত্রই আমি অনুকুল বায়ু হয়ে তাকে লক্ষ্যপথে নিয়ে যাই। আর যে তা করে না, সে নিজের আত্মহননের পথ প্রশস্ত করে। তার অধঃপতনের জন্য সে নিজেই দায়ী হয়।’ (শ্রীমদ্ ভা.-১১/১০/১৭)।

অতএব ভগবানের কথা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে ভবসমুদ্র পার করতে গুরুর চরণাশ্রয় করলেই ভগবান ভক্তের উদ্ধারের জন্য নিজের হাতখানা বাড়িয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে, শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলেন বালক ‘ধ্রুব’ মহারাজ। তপঃকর্মের শেষ সীমায় পৌঁছালেও বালক ধ্রুব-কে দর্শন দিতে পারছিলেন না শ্রীনারায়ণ। তখন শ্রীভগবানের আদেশে নারদ মুনি ধ্রুবকে দ্বাদশ অক্ষর মন্ত্রে দীক্ষা দান করলেন। দীক্ষিত হাবর পর ধ্রুব শ্রীনারায়ণের সাক্ষাৎ দর্শনের কৃপালাভ করলেন। তাই গুরুর যে কী গুরুত্ব তা সহজেই অনুমেয়। কলিযুগ পাবনাবতার শ্রীমন্ মহাপ্রভু নিজে পরতত্ত্বের শেষ সীমা হয়েও শ্রীঈশ্বরপুরীপাদের কাছে দীক্ষা নিয়ে গুরুকরণ করে দেখিয়েছেন গুরুর প্রয়োজনীয়তা। দীক্ষা কি? জীব গোস্বামীপাদ তাঁর ‘ভক্তিসন্দর্ভ’ গ্রন্থে বলেছেন—‘যা থেকে দিব্যজ্ঞান লাভ হয় ও পাপসমূহ সম্যকরূপে নষ্ট হয় তাই দীক্ষা।’ (২৮৩ অনুঃ)। এখন এই দিব্যজ্ঞান হাটে-বাজারে বিকোবার বস্তু নয় যে গিয়ে ক্রয় করবো । বা, গ্রন্থ পড়ে জ্ঞানার্জনের দ্বারাও শুধু লাভ হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে একমাত্র উপায়—‘শ্রীগুরুদেব’। শ্রীগুরুদেব ভিন্ন অন্য কেউ দীক্ষাদান করতে পারেন না। বা ঘুরিয়ে বললে, যিনি দীক্ষা দান করেন তিনিই শ্রীগুরুদেব। “অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকায়। চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।” অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে দীক্ষা নামক দিব্যজ্ঞানের অঞ্জনশলাকা দ্বারা যিনি জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন করেন, তিনিই শ্রীগুরুদেব, তাঁকে প্রণাম করি।

শ্রীল রূপ গোস্বামীপাদ তাঁর ‘শ্রীভক্তিরসামৃত সিন্ধু’ গ্রন্থে যে চৌষট্টি প্রকার ভজন অঙ্গের নির্দেশ করেছেন তার প্রারম্ভেই ভক্তি মন্দিরে প্রবেশের দ্বারস্বরূপ তিনটি বিশেষ অঙ্গের কথা লিখেছেন—১) গুরুপদাশ্রয়, ২) শ্রীকৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করে ভাগবত ধর্ম শিক্ষা, ও ৩) বিশ্বাসের সঙ্গে শ্রীগুরুসেবা। শ্রীগুরুপদাশ্রয় বলতে দীক্ষাগ্রহণের পূর্বে কিছুকাল শ্রীগুরুদেবের কাছে বাস করে তাঁর আনুগত্যে থেকে নিষ্কপট সেবা পরিচর্যা দ্বারা গুরুদেবকে প্রসন্ন করা-কে বোঝানো হয়েছে। এর ফলে গুরু ও শিষ্য একে অপরকে অনুধাবন করতে পারেন। শিষ্য দীক্ষাগ্রহণের যোগ্যতা ও ভজনযোগ্যতা লাভ করে। আবার শিষ্যের সেবার আন্তরিকতা দেখে গুরুদেবের চিত্ত করুণার্দ্র হয়ে ওঠে। আর তার ফলে করুণা বিগলিত ও সন্তুষ্ট শ্রীগুরুদেবের কাছ থেকে পাওয়া দীক্ষামন্ত্র পরম পুরুষার্থ ও সৌভাগ্যজনক হয় শিষ্যের কাছে। এ প্রসঙ্গে ঠাকুর নরোত্তমের দৃষ্টান্ত প্রাতঃস্মরণীয় আমাদের কাছে। শ্রীল লোকনাথ গোস্বামী সংকল্প করেছিলেন যে তিনি জীবনে কোন শিষ্য গ্রহণ করবেন না। আর ঠাকুর নরোত্তম তাঁকেই মনে মনে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছিলেন। তাই তাঁর থেকে দীক্ষাগ্রহণ করাটাই ছিল নরোত্তম ঠাকুরের অভীষ্ট। তিনি প্রতিদিন লোকনাথ প্রভুর প্রাতঃকৃত্য করার স্থানটি সূর্যোদয়ের আগেই মার্জন করে পরিস্কার করে রাখতেন। আর তারপর “বৈষ্ণবের দেহ প্রাকৃত কভু নয়। অপ্রাকৃত দেহ ভক্তের চিদানন্দময় ।।” এই জ্ঞানে লোকনাথ প্রভুর বিষ্ঠাকেও অপ্রাকৃত বস্তু হিসেবে মেনে সেই বিষ্ঠালাগানো সম্মার্জনীটি (ঝাঁটাটি) নিজের বুকে চেপে ধরে ‘হা গুরুদেব’ বলে ক্রন্দন করতেন। এদিকে লোকনাথ গোস্বামী মনে মনে সংকুচিত হন, এই ভেবে যে— কোন ব্রজবাসী এমন সেবা করে প্রতিদিন তার জন্য ! এতে যে তার পাপ হচ্ছে !

দীর্ঘ এক বৎসর পর বহু চেষ্টা করে লোকনাথ গোস্বামী একদিন হাতে-নাতে ধরলেন নরোত্তম ঠাকুরকে, অমন হীনসেবা দানের সময়। বিস্মিত ও মুগ্ধ হলেন নরোত্তম ঠাকুরের গুরুভক্তি দেখে। সেই দিনই নিজের সংকল্প ত্যাগ করে দীক্ষা দিলেন নরোত্তম ঠাকুরকে।

“গুরুকৃপা হি কেবলম্”—গুরুকৃপাই শিষ্যকে নিতাই-গৌর-গোবিন্দের প্রতি একনিষ্ঠ প্রেমসেবায় ব্রতী করেন। শ্রীললিতা সখী মাতা ঠাকুরাণী বলেছেন— “শ্রীগুরুকৃপাই সাধনভক্তি, ভাবভক্তি ও প্রেমভক্তির মূল।” তাই গুরুসেবা দ্বারা গুরুপ্রসন্নতা অর্জন করা একান্তরূপে বাঞ্ছনীয় এবং চরম ও পরম কর্তব্য শিষ্যের কাছে। গুরুসেবা দুই প্রকার—১) পরিচর্যারূপ সেবা ও ২) প্রসঙ্গরূপ সেবা। শ্রীগুরুদেবকে জলপ্রসাদ বা ভোজ্যপ্রসাদ নিবেদন, স্নানাদির জন্য জল আহরণ, তাঁর শ্রীঅঙ্গমার্জন, বস্ত্রধৌতাদি, অথবা অসুস্থ থাকাকালীন পথ্যাদি দান, শ্রীঅঙ্গের সেবা ইত্যাদি হল পরিচর্যারূপ সেবা তাঁর। আর, ভাগবতী কথা পাঠ করে , কৃষ্ণনামগান কীৰ্ত্তন করে শ্রবণ করানো—- ইত্যাদি হল প্রসঙ্গরূপ সেবা। শ্রীপাদ মাধবেন্দ্রপুরী যখন অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন তখন শ্রীঈশ্বরপুরী তাঁর কতই না সেবা করেছেন। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে পাই—“ঈশ্বরপুরী গোসাঞি করে শ্রীপাদ সেবন। স্বহস্তে করেন মল-মূত্ৰাদি মার্জন।।’ অতএব নিষ্ঠসহ পরিচর্যারূপ সেবা করেছেন। আবার “কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণলীলা শুনায় অনুক্ষণ।” কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণকথা শ্রবণ করিয়ে প্রসঙ্গরূপ সেবাও করেছেন। সেবায় সন্তুষ্ট গুরু শ্রীপাদ মাধবেন্দ্রপুরী আশীর্বাদ করলেন শিষ্য ঈশ্বরপুরীকে “তোমার হোক কৃষ্ণের প্রসাদ।” সেই আশীর্বাদের গুণেই প্রেমের সাগর হলেন তিনি আর পরিণামে স্বয়ং ভগবান শ্রীমন্ মহাপ্রভুকে শিষ্যরূপে পেলেন। অতএব, দীক্ষাগ্রহণান্তে শ্রীগুরুসেবার বিশেষ প্রয়োজন। সেবা দ্বারা সাধকের সকল অনর্থ নষ্ট হয়ে যায়। সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্তশুদ্ধির উপায় ‘শ্রীগুরুদেব’। সকল অভাব পূরণের উপায় ‘শ্রীগুরুদেব’। সিদ্ধ জগন্নাথ দাস বাবার শিষ্য তথা শ্রীঅঙ্গসেবক বিহারীজী গুরুচরণ-ছাড়া-না হবার আদর্শ। জগন্নাথ দাস বাবা বলেছিলেন— “হ্যাঁ রে বিহারী ! তুই আমায় চাস, নাকি টাকা চাস? ভেবে বল। ভাবছি তোকে একগাড়ী টাকা পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করে যাব আমার মৃত্যুর পরে।” বিহারী হাসতে হাসতে বললেন- “বাবা। তোমার আবার টাকা কই গো ! থাকো তো লোকের দয়া করে তৈরী করে দেওয়া কুটীরে, আর ভিক্ষা করে আনা চালে ঠাকুরের প্রসাদান্ন পাও। তুমি কোথায় টাকা পাবে, বল?” সিদ্ধ বাবা বললেন, “আমায় কয়েকদিন পরই গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু নিতে আসবেন। তখন আমি বলবো তাঁকে— বিহারী তো আমার অনেক সেবা করেছে, ওকে এক গাড়ী টাকা পাইয়ে দাও। গৌরাঙ্গ প্রভু তোর টাকার ব্যবস্থা করে দেবেন।” এইবার বিহারী সঙ্গে সঙ্গে বললেন- “না, না বাবা ! টাকা আমার চাই না, আমার শুধু তোমার শ্রীচরণ চাই।” তৃপ্ত হয়ে বাবা তখন আশীর্বাদ করে বললেন, “বেশ। তোর কোনদিন কোন অভাব হবে না। তুই শুধু শ্রীনাম করে যাস, বাকী সব শ্রীনামের প্রভাবে ঠিক হয়ে যাবে।” এই ঘটনার চারদিন পরই সিদ্ধ বাবা দেহ রাখলেন। তিনি ১৪০ বৎসর ধরাধামে ছিলেন। তাঁর নিত্যলীলায় গমনের পর বিহারীই তাঁর যাবতীয় ক্রিয়া-কর্ম করলেন। সুতরাং, শ্রীগুরুচরণ প্রাপ্তিই একমাত্র লক্ষ্য হয় যথার্থ সাধকের।

“দাস বংশী কহে, ভজিলে ভজন নহে, গুরকৃপা ভজনের মূল।” শ্রীগুরুস্বরূপের চিন্তনই হল ধ্যানের মূল, পূজার মূল শ্রীগুরুচরণ পূজা, মন্ত্রের মূল শ্রীগুরুবাক্য আর ভক্তির মূল হল শ্রীগুরুভক্তি। যার প্রতি গুরুদেব তুষ্ট হন, স্বয়ং শ্রীহরিও তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। কৃষ্ণ অপ্রসন্ন হলে গুরুদেব তাঁর ভজন দ্বারা কৃষ্ণের মন ফেরাতে পারেন সেই শিষ্যের প্রতি। কিন্তু গুরু অসন্তুষ্ট হলে, কৃষ্ণ গুরুকে প্রসন্ন করতে কোন চেষ্টা করেন না। তাই তো বলা হয়েছে, “কৃষ্ণ রুষ্ট হলে গুরু রাখিবারে পারে। গুরু রুষ্ট হলে কৃষ্ণ রাখিবারে নারে।।’
তাহলে এমন মহিমাময় গুরুদেবকে কী ভগবৎস্বরূপ জ্ঞান করে গঙ্গাজল-তুলসী দিয়ে পূজা করা উচিৎ? কারণ বলা হয়েছে— “গুরু কৃষ্ণরূপ হন শাস্ত্রের প্রমাণে । গুরুরূপে কৃপা করেন শিষ্যগণে।।” তবে তার উত্তর হল, গুরু কেবল শিষ্যের কাছে আরাধ্যস্বরূপ, সমগ্র জগৎ-এর কাছে নন। তিনি শিষ্যের কাছে প্রিয়তমাংশে ও পূজাতমাংশে কৃষ্ণের সাথে অভিন্ন কিন্তু স্বরূপাংশে ভিন্ন। অর্থাৎ শিষ্যের কাছে গুরুদেব কৃষ্ণের মতই প্রিয় ও পূজনীয়, কিন্তু ভগবানের ষড়শ্বৈর্যশালী যে স্বরূপ তা গুরুতে নেই। গুরুর ভিতর সাধক-ভক্ত ভবন প্রকাশিত হয়। তিনি নিজেকে একজন সাধক ভিন্ন অন্য কিছু ভাবেন না। তাই তাঁর শ্রীচরণে তুলসী-গঙ্গাজল নিবেদন করে কৃষ্ণজ্ঞানে পূজা করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন। এ প্রসঙ্গে, উৎকলে ‘বড়বাবাজী’ নামে খ্যাত শ্রীরাধারমণচরণদাস বাবা অপূর্ব সিদ্ধান্ত করে গেছেন।
একবার শ্রীগুরুপূর্ণিমায় পুরীর ঝাঁজপিটা মঠে উপস্থিত ভক্তদের মধ্যে সংশয় দেখা দেয় যে, শ্রীগুরুদেব কে কী পৃথক দ্রব্য দিয়ে পূজা করা উচিৎ নাকি প্রসাদী দ্রব্যে পূজা করা সঙ্গত? কারণ শাস্ত্রে গুরু-কৃষ্ণের অভিন্নতার প্রমাণ আছে বিস্তর। তাই সর্বাগ্রে গুরুপূজা করা উচিৎ। এমনকি কোথাও বলাও নেই যে কৃষ্ণের প্রসাদী দ্রব্যে তাঁকে ভোগ লাগানো বা পূজা করা বিধেয়। তাহলে উপায়? তখন বড়বাবাজী মহাশয় বললেন— “শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রদর্শিত উপাসনা প্রণালীর নাম রাগানুগা পন্থা। এই উপাসনার মূল ভিত্তিই ‘আনুগত্য’ অর্থাৎ গুরুর অনুগত হয়ে ভজন। এমন গুরুকে সাক্ষাৎ ভগবদ্‌-বুদ্ধিতে পূজা করলে উনি যতটা সুখী হন তার থেকে বেশী সুখ পান অনুগত ভাবের আরাধনায়। অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রাসদী থালায় তাঁকে বরণ করলে। কারণ তিনি তো নিজেও সাধক। আর তাই শিষ্যের কাছে ‘সকল ছাড়িয়া আজ্ঞা বলবান’ অর্থাৎ গুরুর আজ্ঞানুসারে কর্ম করাই শিষ্যের কর্ত্তব্য । সেবার অর্থ তো সুখ দেওয়া। আমি হয়তো সাক্ষাৎ কৃষ্ণ ভেবে গুরুকে সেবা-পূজা করলাম অনেক কিন্তু তাতে তিনি সুখী হলেন না। তাহলে সেই সেবা করে আমি নিজেও সুখলাভ করতে পারবো কী? শাস্ত্রে প্রমাণ ও যুক্তি যাই থাক শিষ্যের কাছে গুরু আজ্ঞাই সর্বথা পালনীয়। তাই গুরুসেবা করে গুরুকে সুখ দিতে কৃষ্ণের মালা, প্রসাদে গুরুপূজা করাটাই বিধেয়, সমুচিত।”

শ্রীপাদ রামদাস বাবাজী মহাশয় বলেছেন যে— “শ্রীগুরু পাদপদ্মই হলেন শেষ প্রাপ্তি। নিতাই-গৌর বা অন্য যা কিছুর সেবা সকলই তাঁর (গুরুদেবের) সুখের জন্য। শ্রীগুরদেবকে সুখ দিতে হলে তিনি যা পেলে সুখ পাবেন তাই দিতে হবে। সেবা মানে নিজে সুখ পাওয়া নয়। সেব্যকে সুখ দিয়ে, তাঁরই সুখে নিজে সুখ পাওয়া। এ সুখ পাওয়া নিজের সুখ পাওয়ার চেয়ে কোটিগুণ বেশি …. সেবকের তো ওই ভজন-সাধন, সর্বদা শ্রীগুরুদেবের সুখের পানে ও মুখের পানে চেয়ে থাকা।”

শ্রীরাধারমণদেবের অশেষ কৃপাস্নাত সবিশেষ গুরুগতপ্রাণ শিষ্য শ্রীশীতলচরণ দাস বাবাজী মহাশয় সিদ্ধ মহাত্মা ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে সাক্ষাৎকালে একবার প্রশ্ন করেছিলেন—‘ঈশ্বর দর্শন করতে শ্রীগুরুর কৃপালাভ কতটা অপরিহার্য?’ ত্রৈলঙ্গ স্বামীজী হিন্দীতে যে উত্তর দিয়েছিলেন তার বাংলা অনুবাদ করলে হয়— “জগতে শ্রীগুরু হতে আর কোন বস্তুই বড় অর্থাৎ গুরু নয়। শ্রীগুরু ব্যতীত আর সকলই লঘু। জপ-তপ-আরাধনা, পুত্র-পরিবার- সংসার—-এ সবই শ্রীগুরুচরণলাভের চেয়ে বড় নয়। সাধারণভাবে শ্রীগুরুদেব দুইভাবে পাওয়া যায়—দীক্ষাগুরু ও শিক্ষাগুরু। আবার বিশেষভাবে গুরুকে তিনভাবে দর্শনলাভ হয়—জগৎগুরু, দীক্ষাগুরু ও শিক্ষাগুরু। চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্রাদি যে শক্তির ইঙ্গিতে নিরন্তর আপন কার্য সমাধা করে চলেছে নিয়মের গণ্ডীতে থেকে—– সে শক্তিকে জগদগুরু বলা যায়।
যখন কোন শক্তি জীবের হৃদয়ে জগদ্‌গুরুকে জানবার বা বোঝার জন্য প্রেরণা জাগিয়ে জগৎগুরুর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, তখন সেই শক্তিকে দীক্ষাগুরুর শক্তি বলা হয়। এই বিশ্বচরাচর হচ্ছে জগদ্গুরুর মায়াজাল। ব্রহ্মাণ্ডের পরমানু থেকে ব্রহ্মা পর্যন্ত পশুপাথী, কীটপতঙ্গ, বৃক্ষলতা, গ্রহনক্ষত্র প্রভৃতি মনুষ্য ও মনুষ্যেতর জীবজগত থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন পরে। যার কাছ হতে সেই শিক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে পাওয়া যায়, তখন তাঁকে বা সেই শক্তিকে শিক্ষাগুরুর শক্তির প্রভাব বলা যায়। জগদ্গুরুকে জানতে শিক্ষাগুরুর প্রয়োজন অপরিহার্য।”

অতএব, ‘গুরুকৃপা হি মূলম্’ গুরুকৃপাই মূল, গুরুকৃপাই একমাত্র সহায়, একমাত্র অবলম্বন । শ্রীগুরুদেব নির্দেশিত পথে নববিধা ভক্তি (শ্রবণ, কীৰ্ত্তন, স্মরণাদি …) যাজন করে আমরা নিতাই-গৌর-গোবিন্দের প্রেমসেবা করার যোগ্যতা অর্জন করবো। ভজনরাজ্যে প্রবেশ করিয়ে দেন ভক্ত-কে তাঁর গুরুদেব আপন ভজনানুভূতির শিক্ষা ও সকরুণ কৃপা দ্বারা। গুরুকৃপাতেই ভজনপথ হয় সুসংহত, শাস্ত্রানুযায়ী সঠিক ও প্রেমপূর্ণ।

কলিযুগে আমাদের জগদ্গুরু হলেন পতিত উদ্ধারণ শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু। তাইতো শ্রীরামদাস বাবাজী মহাশয় বলেছেন , “যত দেখ শ্রীগুরুরূপ, নিত্যানন্দ প্রকাশ-স্বরূপ।… দেখে গুরু স্বরূপ নানা, যেন ভিনু ভিনু মনে করো – না ! অনুকূলে বা প্রতিকূলে নিতাই অনন্ত গুরুরূপে।…নিতাই যেখানে যেমন সেখানে তেমন, যে যেমন তার কাছে তেমন।…যেদিন শ্রীগুরুরূপে হাত ধরেছে, সেদিন সাধন শেষ হয়েছে। গুরুরূপে দেছে পদছায়া, শেষ হয়েছে সব চাওয়া পাওয়া । …. কাজ কি অন্য উপাসনা, আমার কাজ তাঁর পদে বিকানা।”

তাই একান্ত নিবেদন, শ্রীগুরুতত্ত্বের’র মতো গূঢ় গম্ভীর গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিয়ে লেখার চেষ্টা আমার মত ভজনহীনা, অধমার ধৃষ্টতা—বই আর কিছু নয়। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো! “বিধি কী এ সাধ পূরাবে আমার।” সাধ্যের বাইরে গিয়ে সাধপূরণ করার আস্ফালন শুধু। সকল গুরুজন তথা গুণীজন, সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থিনী, এ হেন ধৃষ্টতার জন্য। আর সেই সাথে সকলের শ্রীচরণে অনন্তকোটি প্রণাম নিবেদন করে আশীর্বাদ ভিক্ষা করি যেন গুরু-গোবিন্দের চরণারবিন্দে সেবা করাই জন্মজন্মান্তরের একমাত্র অভীষ্ট হয় আমার।

জয় শ্রীগুরুদেব। জয় শ্রীশ্রীনিতাই। জয় শ্রীশ্রীগৌরসুন্দর ।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৪-তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি : দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ । তিনি বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার (বর্তমানে পশ্চিম বর্ধ্মান জেলা) আসানসোলের কাছে চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর ডাক নাম “দুখু মিয়া” । তাঁর জীবনকে আমরা চারটি ভাগে ভাগ করতে পারিঃ- প্রাথমিক জীবন ১৮৯৯ — ১৯১৭, সৈনিক জীবন ১৯১৭ – ১৯২০, সাহিত্য জীবন ১৯২০ – ১৯৪২ ও অসুস্থতা জীবন ১৯৪২ – ১৯৭৬ ।
নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয় । স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াজ্জিন (নমাজের সময় হলে অংশ নেওয়ার জন্য আজান দেন) হিসেবেও কাজ করেছিলেন । কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে গিয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন । ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নেন । সেই সময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন । তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন । জেলে বন্দী অবস্থায় লেখেন “রাজবন্দীর জবানবন্দী” । নজরুল প্রায় ৩০০০গান রচনা করেন । অধিকাংশ গানে সুরারোপ করেছেন তিনি নিজে, সেগুলি নজরুল গীতি নামে পরিচিত ।
কবি নজরুল ইসলাম ছিলেন বাঙালি কবি এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি । তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রেখে গেছেন । তিনি বাংলা সাহিত্যে, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব । ভারত ও বাংলাদেশ — দুই দেশে তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত । তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি বলা হতো । তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের ও দাসত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ । বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব ছিল অপরিসীম । কাজী নজরুল ইসলাম প্রেম, সাম্য, আর বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করেছেন আজীবন । যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনি জীবনে ও কাজে বিদ্রোহী কবি । তিনি প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং শেকল ভাঙ্গার গানের মতো কবিতা । “অগ্নিবীণা” হাতে তাঁর প্রবেশ, “ধূমকেতুর” মতো তাঁর প্রকাশ । বাংলা কবিতায় নজরুলের আবির্ভাব একেবারেই উল্কার মতো । কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা জীবন সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা জুটিয়েছে । বাংলা কাব্যে একটি নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন । সেটা হচ্ছে গজল । শ্যামাসঙ্গীত ও ভক্তিগীতিও রচনা করেন । সংগীত বিশিষ্টজনদের মতে রবীন্দ্রনাথ – পরবর্তি নজরুলের গান অনেকটাই ভিন্ন ধরনের নির্মাণ । অধিকাংশ গান সুর প্রধান । বৈচিত্রপূর্ণ সুরের লহরী কাব্যকথাকে তরঙ্গায়িত করে এগিয়ে নিয়ে যায় । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাজী নজরুল ইসলামকে বর্ণনা করেছিলেন — “ছন্দ ও সরস্বতির বরপুত্র” হিসাবে ।
যদিও উল্লেখিত তবুও বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা । তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিনী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগতকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন । তার কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল । তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃৎ লেখক । রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নজরুল চেয়েছিলেন । কিন্তু তিনি মনে করতেন এর পথে প্রধান বাধা সাম্প্রদায়িক সংঘাত । সেইজন্য তিনি “দুর্গম গিরি কান্তার মরু” গানে বলেছিলেন —
“হিন্দু না ওরা মুসলমান ওই জিজ্ঞাসে কোন্‌ জন ?
কাণ্ডারি বলো ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার ।“
তাঁর লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে । তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে । বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস ।
দাসত্বের শৃঙ্খলে বদ্ধ জাতিকে শোষণ ও উৎপীড়ন থেকে মুক্ত হবার ডাক দিয়েছিলেন । তাই তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বল বীর / বল উন্নত মম শীর” । অনেকেই বলেন “বিদ্রোহী” কবিতা তাঁকে অমর করে রেখেছে ।
১৯৭২ সালের ২৪শে মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন । রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করেন । কবির বাকী জীবন বাংলাদেশেই কাটে ।
পরবর্তীতে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে “জাতীয় কবি”র মর্যাদা দেওয়া হয় । তাঁর রচিত “চল চল চল ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংঙ্গীত হিসাবে গৃহীত ।
১৯৭৬ সালের ২৯শে আগষ্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবির জীবনাবসান ঘটে । কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় । এখানেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ।
পরিশেষে এটাই বলার, ৭৭ বছর তিনি বেঁচেছিলেন এবং এই ৭৭ বছর ছিল তাঁর সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার এক বিশাল ইতিহাস । কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৪তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই শতকোটি প্রণাম । (তথ্যসূত্রঃ সংগৃহীত)
———–০———

Share This
Categories
প্রবন্ধ

জমজমাট জামাই ষষ্ঠী ::: রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।।।

আজ জামাই ষষ্ঠী। জামাই ষষ্ঠী কিন্তু বাঙালিদের কাছে বেশ মিষ্টি মধুর একটি পার্বণ। তাই না ? বিশেষতঃ জামাই আর শাশুড়িদের কাছে এটি যেন সারা বছর ধরে এক অপেক্ষার উৎসব—একথা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে জামাই আর শাশুড়ি উভয়কেই। এই তিথিতেই শ্বশুড় বাড়িতে জামাই আদর পাওয়া বিষয়টি পুরুষদের কাছে বাস্তবায়িত হয় ভীষণভাবে। আবার বিপরীতে জামাইরা তাঁদের দ্বিতীয় মা , অর্থাৎ শাশুড়ি মার হাতে তুলে দেন আপন আপন সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রদ্ধার্ঘ্য। অতএব, উভয় দিক থেকেই বেশ একটা ‘দিবে আর নিবে,মিলাবে মিলিবে,যাবে না ফিরে’ ব্যাপার ঘটে। ফলস্বরূপ, আদরের জামাইয়ের সাথে শ্বশুর বাড়ির সম্পর্ক আরও মাখো মাখো হয়ে মালপোয়া-মিষ্টিদইয়ের মাত্রা পায়।
কিন্তু , শুধুই কী দেওয়া-নেওয়া , তার বেশি কিছু নয় ? না,না,তা কেন। এদিন যে নিজের জামাইয়ের দীর্ঘায়ু আর মঙ্গল কামনায় বাঙালি মায়েরা পালন করেন নানান আচার । বটপাতা,দূর্বা আর আম নতুন হাতপাখার ওপর রেখে, সেই পাখা আড়াআড়ি ভাবে ধরে জামাইকে বাতাস করেন শাশুড়ি। সেই সঙ্গে মুখে বলতে থাকেন ”ষাট,ষাট,ষাট” । অর্থাৎ,ভালো হোক ,ভালো হোক জামাইবাবার ।এই স্নিগ্ধ,শীতল হাওয়া জামাইকে রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করে এই বিশ্বাস ।এ প্রথা তাঁর যাবতীয় অমঙ্গল বিনাশকারী মনে করা হয়। জামাইয়ের মাথায় আশীর্বাদ দেন ধান-দূর্বা দিয়ে। ধান হল সম্পদের বা সমৃদ্ধির প্রতীক । আর ,দূর্বার গুণ হল তা সহজে মরে না। পায়ে মারিয়ে চলে গেলেও বেঁচে ওঠে। অতএব, দীর্ঘায়ুর দ্যোতক দূর্বাঘাস।
পাঁচ রকম ফল,মিষ্টি,দই ,দুধ,চিড়ে এসব থালায় সাজিয়ে জামাইয়ের সামনে ধরে দেন শাশুড়িরা। জামাই ফলাহার করবে তাই এসবের আয়োজন। আবার জৈষ্ঠ্য মাস তো আম, জাম,কাঁঠাল,লিচু,তালশাসের মাস । তাই এই গ্রীষ্মকালীন ফলের স্বাদ জামাইকে পাওয়াতেই বুঝিবা , এমন একটি মধুর পার্বণের সূচনা হয়েছিল।বাংলাদেশের অনেক জায়গায় এও প্রথা আছে বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেলে পাত্র ও কন্যাপক্ষের পরিবার একে অপরকে আম-দুধ ভেট দেয় এসময়।
এবার আসি ষষ্টী পূজা সম্পর্কে।সন্তানের মঙ্গল করেন মা ষষ্টী । বাঙালিদের প্রতি ঘরে ঘরে নবজাত শিশুর জন্য ষষ্টী পূজো করা হয় অবধারিত ভাবে। তারপরই কিন্তু আঁতুর ওঠে মা ও শিশুর। জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথি বা জামাইষষ্ঠী এদেশী বা ঘটী রমণীদের কাছে অরণ্য ষষ্ঠী বা স্কন্দ ষষ্ঠীর ব্রত হিসেবে পালিত হয়।
এদিন সকালে স্থানীয় বট গাছের তলায় এসে পূজারী ব্রাক্ষ্মণের দ্বারা মা ষষ্টীর পূজা সারেন তাঁরা। খেজুরের ছড়া,ডোয়ো ফল,জাম ,বটপাতা ইত্যাদি একসাথে করে ‘ভাগা’ অর্পণ করেন । গুটিছোপায় (মাটির দোয়াতের মত দেখতে) দই দেন ,আর নানারকম ফল নিবেদন করেন দেবীর উদ্দেশ্যে। যেসব রমণীর সন্তান হয় না , তাঁরা এখানে এসে এদিন আঁচল পেতে ব্রাহ্মণের থেকে গ্রহণ করেন মা ষষ্টীর প্রসাদী গোটা ফল। বিশ্বাস সে ফল খেলে অচীরেই সন্তানসম্ভবা হবেন । এদেশী মায়েরা সন্তানের মঙ্গল কামনায় উপবাস করে থাকেন। রাতে ফলাহার সারেন চিড়ে ,মুড়ি দিয়ে। যা কিছু চর্ব্য-চোষ্য সব রেঁধে দেন জামাই ও পরিবারের অন্য সকলের জন্য । তবে বাঙালদের মধ্যে আবার এসব উপবাস টুপবাসের ব্যাপার নেই। মহানন্দে জামাইকে ব্যাপক ভাবে খাওয়া দাওয়া করিয়ে নিজেও শাশুড়ি ভরপেটে থাকেন। তাবলে জামাই ষষ্ঠীর আচার পালনে কোন ত্রুটি বা খামতি থাকে না । নিষ্ঠাসহ জামাইয়ের প্রতি কর্তব্য সারেন তাঁরা।
আবার কোন কোন পরিবারে শ্যালিকাদের জন্যও একটি অদ্ভুত নিয়ম থাকে তাঁদের ভগ্নিপতিদের প্রতি। এদিন বাঁশের কঞ্চি বেঁকিয়ে লাভ সাইন বা হার্ট শেপের করে তাতে লাল সুতোয় ধান বেঁধে উপহার হিসেবে তুলে দেন তাঁরা ভগ্নিপতির হাতে।
মুর্শিদাবাদ জেলার সামসেরগঞ্জ থানার অন্তর্গত দোগাছি গ্রামে এইদিনে গ্রামের এয়োস্ত্রীগণ সাড়ম্বরে গ্রাম্যদেবতার পূজা করেন এবং ডোমকল থানার অন্তর্গত ভগীরথপুর গ্রামের স্ত্রীলোকগণ দইমেলা উৎসব পালন করেন।
এবার একটি প্রশ্ন কিন্তু প্রায় সকলের মনেই একটু উঁকি দিচ্ছে জানি।তা হল
‘যম-জামাই-ভাগ্না/তিন হয়না আপনা ‘ কথায় আছে যখন ,তবে ঘটা করে জামাই ষষ্ঠী কেন করা ! কন্যা ষষ্ঠীও তো হতে পারতো! আসলে জামাইবাবাজীবনকে তুষ্ট রাখার এ এক পন্থা বলা যায়। নিজের মেয়েটির সংসার বন্ধন যাতে অটুট থাকে , জামাইয়ের আদরে ,ভালোবাসায় মেয়ে যাতে রসেবশে, সুখে-শান্তিতে ঘর করে , সধবা থাকে চিরটাকাল সেই আশাতেই এত সব পরিপাটী প্রচেষ্টা ।

অতএব,সব মিলিয়ে জামাই ষষ্ঠীর পার্বণ জমে ক্ষীর হয়ে যায় আনন্দে,আবেগে আর জামাইয়ের প্রতি নির্ভেজাল ভালোবাসায়।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

গুপি গাইনের চরিত্রের মধ্যে অমর হয়ে রবেন তপেন চ্যাটার্জী।

ভূমিকা—

তপেন চ্যাটার্জী ছিলেন ভারতের একজন বাঙালি কিংবদন্তি অভিনেতা যিনি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে বেশ কয়েকটি ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, বিশেষ করে গুপি গাইনে বাঘা বাইন (১৯৬৮) এবং এর সিক্যুয়েল ১৯৬৮-এ গুপি গাইনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।  বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সফল ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। ১৯৬৯-এ মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তপেন চট্টোপাধ্যায় ও রবি ঘোষ। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন সন্তোষ দত্ত, জহর রায় ও হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সেই সময় বাংলায় সবথেকে ব্যয়বহুল ছবি ছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’।

 

জন্ম ও পরিবার—

 

তপেন চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, কালীঘাটের মাইশোর রোডের বাড়িতে। নলিনীরঞ্জন ও শোভনাদেবীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তপেন ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁরা তিন ভাই ও দুই বোন। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক তপেন চট্টোপাধ্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা রাজেন্দ্র বিদ্যাভবনে।

 

 

অভিনয়ের দিকে ঝোঁক—

ছোট থেকেই অভিনয়ের দিকে ঝোঁক ছিল। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তপেন প্রথম মঞ্চে পা দিলেন, নাটকের নাম ‘অচলায়তন’। ছোট্ট চরিত্র হলেও দর্শকের মনে দাগ কেটে গিয়েছিল তাঁর অভিনয়। শীতকালে বা পুজোর সময় সেই নাটকের জন্যই ডাক পড়ত তপেনের। পরে শেখর চট্টোপাধ্যায়ের গ্রুপ থিয়েটারে যোগ দিয়েছিলেন।

 

কর্ম জীবন—-

অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার তপেন চট্টোপাধ্যায় খুব কম বয়সে এক সময়ে রাজস্থানের বিকানেরে চাকরি করতেন। সেখানকার জিপসাম মাইনস-এ রোজ দু’ টাকা দু’ আনা পারিশ্রমিক মিলত। বছর দুই চাকরি করার পর অতঃপর কলকাতায় ফিরলেন তিনি। তখনও কি জানতেন, এই রাজস্থানে এসেই তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ চরিত্রের জন্য শুটিং করবেন, তা-ও সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায়! কলকাতায় ফিরে এসে যোগ দিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাটকের দলে।

 

 

অভিনয় জীবন—-

 

তবে প্রথমে তিনি একজন যোগ্য প্রকৌশলী হিসেবে, চ্যাটার্জির রাজস্থানে চাকরি ছিল, এরপর তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সত্যজিৎ রায়ের পুনরুজ্জীবিত বাংলা পত্রিকা সন্দেশে যোগ দেন।  ছোটদের পত্রিকা সন্দেশের বিজ্ঞাপন বিভাগে কর্মজীবন শুরু করেন।  সত্যজিৎ তাকে মহানগরে একটি ক্যামিও চরিত্রে অভিনয় করেন এবং তারপরে গুপি গাইন বাঘা বাইন-এ গায়ক গুপি গাইন হিসেবে বিখ্যাত হন।  আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাশে গানটি তার উপর গুপি এবং রবি ঘোষের বাঘা বাইন চরিত্রে নির্মিত গানটি এখনও বাঙালি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্মৃতিতে নাড়া দেয়।

 

জানা যায় গুপীর চরিত্রে তপেন’ই পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন না। ষাটের দশকের শুরুতে, সত্যজিৎ যখন এই ছবি নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, তখন বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর অভিনেতা অরুণ মুখোপাধ্যায়কে গুপীর চরিত্রের জন্য ভেবেছিলেন। শুন্ডি ও হাল্লা রাজার চরিত্রে ছবি বিশ্বাস, এবং মন্ত্রীর ভূমিকায় তুলসী চক্রবর্তীর কথা ভেবেছিলেন। এরপর একমসয় গুপীর চরিত্রে গায়ক-অভিনেতা পার্থ মুখোপাধ্যায়ের নামও শোনা যায়।ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যে বাঘার চরিত্রে অভিনয় করবেন রবি ও গুপীর ভূমিকায় দেখা যাবে নবাগত জীবনলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে যিনি সত্যযুগ পত্রিকার সহসম্পাদক ছিলেন।

শেষমেশ তিন-তিনবার অভিনেতা পাল্টে গুপীর জন্য তপেনকে নির্বাচিত করেন সত্যজিৎ। এর আগে তপেন সত্যজিতের ‘মহানগর’-এ একটি ছোট চরিত্রে কাজ করেছিলেন। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হীরক রাজার দেশে ছবিতেও গুপী ও বাঘার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তপেন ও রবি।

 

 

চলচ্চিত্র সমূহ—

 

১৯৬৩-মহানগর, ১৯৬৯-গুপী গাইন বাঘা বাইন, ১৯৭০- রূপসী, ১৯৭১-ধন্যি মেয়ে, ১৯৭৩- শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, ১৯৭৩- ননিগোপালের বিয়ে, ১৯৭৪- সঙ্গিনী, ১৯৭৪- বিকালে ভোরের ফুল, ১৯৭৪- ঠগিনী, ১৯৭৭-ভোলা ময়রা, ১৯৭৭- হাতে রইল তিন, ১৯৭৯গণদেবতা (তারা নাপিত) , ১৯৮০আঁচল (প্রযোজনা), ১৯৮০-হীরক রাজার দেশে(গুপী গাইন), ১৯৯১-গুপী বাঘা ফিরে এলো(গুপী), ১৯৯৬-রবিবার, ১৯৯৭- শ্রীমান ভূতনাথ, ২০০৮- নরক গুলজার(সর্বশেষ চলচ্চিত্র)

 

প্রয়াণ—-

তপেন চ্যাটার্জি ২৪ মে ২০১০ তারিখে  ৭২ বছর বয়সে মারা যান। তিনি ফুসফুসের রোগে ভুগছিলেন।

 

।।তথ্য সূত্র: উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবপেজ ।।

 

Share This