কলেজের লাইব্রেরির শেষ কোণের টেবিলটায় প্রতিদিন এসে বসত মেয়েটা। সাদা সালোয়ার, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, আর সামনে সবসময় একটা খোলা খাতা।
অর্ণব প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করেছিল তাকে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেয়েটা কারও সঙ্গে কথা বলত না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়ত।
একদিন লাইব্রেরিয়ান কাকু বললেন,
— “ওর নাম তৃষা। ছোটবেলায় অসুস্থতার পর থেকে কথা বলতে পারে না।”
সেদিন থেকে অর্ণবের কেমন যেন আলাদা টান জন্মাল।
প্রতিদিন সে দূর থেকে তৃষাকে দেখত। কখনো বই খুঁজে দিত, কখনো চুপচাপ টেবিলের ওপর একটা চকোলেট রেখে চলে যেত।
তৃষাও ধীরে ধীরে ছোট ছোট কাগজে উত্তর দিতে শুরু করল।
“ধন্যবাদ।”
“আজ বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।”
“তোমার পছন্দের বই কোনটা?”
একদিন প্রবল বৃষ্টি। পুরো কলেজ প্রায় ফাঁকা।
অর্ণব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক তখন তৃষা এসে তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজ দিল।
কাগজ খুলতেই সে থমকে গেল।
তাতে লেখা—
“সব অনুভূতি শব্দে বলতে হয় না। কিছু মানুষ নীরবতাতেই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।”
অর্ণব ধীরে ধীরে তৃষার দিকে তাকাল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভিতরে দুটো নীরব মন প্রথমবার একে অপরের ভাষা বুঝে ফেলেছিল।
Category: অনুগল্প
চাঁদের আলোয় প্রতিশ্রুতি।
গ্রামের শেষ প্রান্তে ছোট্ট নদীর ধারে একটা পুরোনো ঘাট ছিল। পূর্ণিমার রাতে সেখানে বসতে খুব ভালোবাসত নীল আর ঐশী।
দু’জনেই স্বপ্ন দেখত— একদিন শহরে গিয়ে নিজেদের মতো একটা জীবন গড়বে।
সেদিনও আকাশভরা চাঁদ। নদীর জলে রুপালি আলো ঝিলমিল করছে।
ঐশী হঠাৎ বলল,
— “যদি কোনোদিন আমরা আলাদা হয়ে যাই?”
নীল মৃদু হেসে তার হাতটা ধরল।
— “তাহলে পূর্ণিমার রাতে এখানেই ফিরে আসবো। তুমি থাকো বা না থাকো… আমি আসব।”
তারপর সময় বদলালো।
চাকরির জন্য নীল শহরে চলে গেল। প্রথমে ফোন, চিঠি— সবই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে লাগল।
একদিন খবর এলো, ঐশীর বিয়ে ঠিক হয়েছে।
নীল আর ফিরে আসেনি।
কেটে গেল আট বছর।
সেদিন আবার পূর্ণিমা। বহুদিন পর নীল গ্রামের সেই ঘাটে এসে দাঁড়াল। চারপাশ নিঃশব্দ। শুধু নদীর জলে চাঁদের আলো ভাসছে।
নীল মৃদু হেসে বলল,
— “দেখো, আমি কথা রেখেছি।”
ঠিক তখনই পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “আমি জানতাম তুমি আসবে।”
নীল ঘুরে দাঁড়াল।
সাদা শাড়ি পরে ঐশী দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল, ঠোঁটে সেই পুরোনো হাসি।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কারণ কিছু প্রতিশ্রুতি সময় ভাঙতে পারে না…
সেগুলো শুধু চাঁদের আলোয় নীরবে অপেক্ষা করে।
শেষ ট্রেনের যাত্রী।
রাত তখন প্রায় বারোটা। শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ লোকাল ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা।
অভ্র জানালার পাশে বসে ছিল। ক্লান্ত চোখে বাইরে অন্ধকার শহরটা দেখছিল সে। সারাদিনের কাজের পর এই নিঃশব্দ ট্রেনযাত্রাটুকুই যেন তার নিজের সময়।
হঠাৎ পরের স্টেশনে এক মেয়ে উঠে এসে তার সামনের সিটে বসল।
কালো শাল জড়ানো, ভেজা চুল, আর হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। মেয়েটা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
— “এই ট্রেনটা কি কৃষ্ণনগর যাবে?”
অভ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “না, এর আগেই শেষ স্টপেজ।”
মেয়েটার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— “তাহলে আমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছি…”
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। রাতও অনেক।
অভ্র একটু দ্বিধা করে বলল,
— “আপনি চাইলে শেষ স্টপেজ পর্যন্ত যান। তারপর আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব।”
মেয়েটা মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানাল।
ট্রেন চলতে লাগল। দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা হতে লাগল— পছন্দের বই, বৃষ্টি, পুরোনো গান…
অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন তারা বহুদিনের পরিচিত।
শেষ স্টেশনে পৌঁছে অভ্র ঘুরে বলল,
— “চলুন, নেমে—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে থেমে গেল।
সামনের সিটটা খালি।
মেয়েটা নেই।
অভ্র অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল। পুরো কামরা ফাঁকা।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এসে বললেন,
— “কাউকে খুঁজছেন?”
অভ্র বলল,
— “এই তো একটা মেয়ে ছিল…”
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “পাঁচ বছর আগে এই একই ট্রেনে এক মেয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝে শেষ ট্রেনে তাকে দেখা যায়…”
অভ্র কিছু বলল না।
শুধু দেখল, সামনের সিটে এখনও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল পড়ে আছে।
হারিয়ে যাওয়া ডায়েরি।
পুরোনো বইয়ের দোকানটা শহরের এক কোণে আজও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। ধুলো জমা তাক, হলদেটে পাতা আর পুরোনো কাগজের গন্ধে ভরা ছোট্ট দোকানটায় খুব কম লোকই আসে।
সেদিন বিকেলে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দোকানে ঢুকেছিল ঋতম।
বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা পুরোনো নীল ডায়েরি তার হাতে এলো। মলাটের ওপর ছোট করে লেখা—
“যদি কখনো হারিয়ে যাই, কেউ যেন আমাকে পড়ে।”
কৌতূহল সামলাতে না পেরে ডায়েরিটা খুলল সে।
পাতার পর পাতা জুড়ে এক অচেনা মেয়ের লেখা। তার ছোট ছোট সুখ, অভিমান, ভালোবাসা আর এক মানুষের অপেক্ষার গল্প।
শেষের দিকের এক পাতায় লেখা ছিল—
“আজ আমি শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু যদি কোনোদিন কেউ এই ডায়েরিটা পড়ে, তাকে একটা কথা বলতে চাই— অপেক্ষা কখনো বৃথা যায় না।”
ঋতম অদ্ভুত এক টান অনুভব করল। যেন অচেনা মানুষটার কষ্টগুলোও তার নিজের হয়ে গেছে।
ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ঠিকানা লেখা ছিল।
পরের দিন অনেক খুঁজে সেই ঠিকানায় পৌঁছাল সে। কিন্তু সেখানে এখন ভাঙা এক পুরোনো বাড়ি ছাড়া কিছু নেই।
ফিরে আসার সময় পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধা হঠাৎ বললেন,
— “তুমি কি নীলার খোঁজে এসেছো?”
ঋতম থমকে দাঁড়াল।
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
— “ও প্রায়ই বলত, একদিন কেউ ঠিক ওর ডায়েরি পড়ে ওকে খুঁজতে আসবে।”
ঋতম কিছু বলল না। শুধু বুকের কাছে ডায়েরিটা আরও শক্ত করে ধরে রাখল।
মনে হলো, কিছু গল্প হারিয়ে গেলেও… তাদের অপেক্ষা কখনো হারায় না।
এক কাপ চায়ের গল্প।
কলকাতার পুরোনো এক গলির মোড়ে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। দোকানটার নাম কেউ জানত না, সবাই শুধু বলত— “কাকুর দোকান।”
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় সেখানে এসে বসত অর্ণব। এক কাপ লাল চা আর খবরের কাগজ— এটাই ছিল তার অভ্যাস।
আর ঠিক সেই সময়েই আসত একটি মেয়ে। সাদা কুর্তি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি।
মেয়েটা প্রতিদিন একই কথা বলত—
— “কাকু, এক কাপ চা… একটু কম চিনি।”
প্রথম প্রথম অর্ণব শুধু চুপচাপ দেখত। তারপর ধীরে ধীরে সেই কণ্ঠস্বর, সেই হাসি তার বিকেলের অংশ হয়ে গেল।
কিন্তু দু’জনের মধ্যে কোনোদিন কথা হয়নি।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। অর্ণব ভেবেছিল, আজ হয়তো মেয়েটা আসবে না।
ঠিক তখনই ভিজে চুলে দৌড়ে দোকানে ঢুকল সে।
কাকু হেসে বললেন,
— “আজও এলে?”
মেয়েটা হেসে উত্তর দিল,
— “কিছু অভ্যাস ছাড়া যায় না।”
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। দোকানটা অন্ধকার হয়ে গেল মুহূর্তে।
অর্ণব নিজের অজান্তেই বলে ফেলল,
— “আপনার জন্য একটা চা আমি দিতে পারি?”
মেয়েটা একটু অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— “তাহলে এক শর্তে… আপনাকেও আমার সঙ্গে বসে খেতে হবে।”
বাইরে তখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আর ছোট্ট সেই চায়ের দোকানে দুটো অচেনা মানুষ ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছিল এক কাপ চায়ের উষ্ণতায়।
নীল শাড়ির মেয়ে।
প্রতিদিন সকাল আটটার লোকাল ট্রেনে একই মেয়েটাকে দেখত সৌরভ।
নীল শাড়ি, খোলা চুল, আর হাতে একটা সাদা ডায়েরি। জানালার পাশে বসে সে কখনো বাইরে তাকিয়ে থাকত, কখনো ডায়েরিতে কিছু লিখত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পুরো ট্রেনে এত ভিড়ের মাঝেও মেয়েটার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা ছিল। যেন সে অন্য এক জগতে থাকে।
সৌরভ প্রতিদিন ঠিক তার উল্টো দিকের সিটে বসার চেষ্টা করত। কিন্তু কোনোদিন কথা বলতে পারেনি।
একদিন সাহস করে একটা ছোট্ট কাগজে লিখল—
“আপনাকে প্রতিদিন দেখি। আপনার নীরবতাটা খুব সুন্দর।”
কাগজটা মেয়েটার ডায়েরির ভেতর আলতো করে রেখে নেমে গেল সে।
পরের দিন ট্রেনে উঠে সৌরভ অবাক।
মেয়েটা আজও সেই একই জায়গায় বসে আছে। তবে আজ তার হাতে একটা নীল খাম।
ট্রেন ছাড়তেই মেয়েটা খামটা বাড়িয়ে দিল।
কাঁপা হাতে খুলে দেখল সৌরভ।
ভেতরে লেখা—
“আমি কথা বলতে পারি না। তাই লিখেই উত্তর দিলাম… আমিও আপনাকে প্রতিদিন দেখি।”
সৌরভ জানালার বাইরে তাকাল। সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
আর ভিড়ের সেই লোকাল ট্রেনে দুটো নীরব হৃদয় প্রথমবার একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলল।
ফেলে আসা বিকেল।
বহু বছর পর আজ আবার সেই মাঠটার পাশ দিয়ে হাঁটছিল অনির্বাণ। শহর বদলেছে, রাস্তা বদলেছে, শুধু পুরোনো বটগাছটা এখনও আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এই মাঠেই প্রতি বিকেলে দেখা হতো তাদের।
মেঘলা সবসময় আগে এসে বসে থাকত। হাতে একটা গল্পের বই, চুলে হালকা বাতাস। আর অনির্বাণ দৌড়ে এসে বলত,
— “আবার এত তাড়াতাড়ি চলে এলে?”
মেঘলা হেসে বলত,
— “কিছু অপেক্ষা ভালো লাগে।”
তারপর একদিন হঠাৎ সব বদলে গেল। মেঘলার বাবার বদলি হলো অন্য শহরে। যাওয়ার আগের বিকেলে মেঘলা বলেছিল,
— “যদি কোনোদিন ফিরে আসি, এই মাঠেই তোমাকে খুঁজবো।”
তারপর কেটে গেছে বারো বছর।
আজ অফিসের কাজে হঠাৎ এই শহরে এসে অনির্বাণের মনে হলো, একবার মাঠটার কাছে যাক।
বিকেলের শেষ আলো তখন ঘাসের ওপর পড়েছে। দূরে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে।
হঠাৎ বটগাছটার নিচে একটা পরিচিত মুখ দেখতে পেল সে।
সাদা শাড়ি, হাতে সেই একই ধরনের বই।
মেঘলা।
দু’জনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল।
তারপর মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— “দেখলে? কিছু অপেক্ষা সত্যিই ফুরোয় না।”
ডুবন্ত সূর্যের আলোয় তখন পুরোনো সেই বিকেলটা আবার ফিরে এসেছিল।
অচেনা স্টেশনের মানুষ।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। ছোট্ট নির্জন স্টেশনটায় ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য। চারপাশে হালকা কুয়াশা, চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছে।
ঈশিতা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়ানো একজন মানুষের দিকে।
কালো শাল গায়ে, হাতে পুরোনো একটা ব্যাগ। লোকটা বারবার ট্রেনের প্রতিটা জানালার দিকে তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে।
ট্রেন ছাড়ার বাঁশি বাজতেই হঠাৎ লোকটা ঈশিতার জানালার সামনে এসে দাঁড়াল।
মৃদু হেসে বলল,
— “মাফ করবেন… আপনি কি নীলাঞ্জনাকে চেনেন?”
ঈশিতা অবাক হয়ে মাথা নাড়ল,
— “না তো।”
লোকটার চোখে এক মুহূর্তের জন্য হতাশা নেমে এলো। তারপর ধীরে বলল,
— “আজ পঁচিশ বছর হলো… এই একই ট্রেনে ও চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে বলেছিল, একদিন ঠিক ফিরে আসবে।”
ট্রেন চলতে শুরু করল।
ঈশিতা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল মানুষটাকে। কুয়াশার ভেতর সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক একই জায়গায়।
হয়তো কোনো মানুষ নয়, একটা অপেক্ষাই দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে।
জানালার ওপারে তুমি।।
প্রতিদিন রাত ঠিক ন’টায় মীরা জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। সামনের বাড়িটার দ্বিতীয় তলার জানালায় তখন আলো জ্বলে ওঠে।
সেখানে একটা ছেলে বসে থাকে। কখনো বই পড়ে, কখনো গিটার বাজায়, কখনো শুধু চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে থাকে।
দু’জনের কখনো কথা হয়নি। পরিচয়ও নেই। তবু অদ্ভুত এক অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মীরা অপেক্ষা করত আলো জ্বলার জন্য।
আর ছেলেটা হয়তো অপেক্ষা করত জানালার পাশে মীরাকে দেখার জন্য।
একদিন হঠাৎ সামনের বাড়িটা অন্ধকার।
একদিন… দু’দিন… পুরো এক সপ্তাহ।
মীরার কেমন যেন অস্থির লাগতে শুরু করল। সে বুঝতেই পারেনি, অচেনা মানুষটার জন্য তার এতটা ভাবনা জমে গেছে।
অষ্টম দিনের রাতে আবার আলো জ্বলে উঠল।
মীরা ছুটে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
ছেলেটা আজও সেখানে। তবে আজ তার হাতে একটা ছোট্ট কাগজ।
সে কাগজটা জানালার কাঁচে তুলে ধরল।
তাতে বড় বড় অক্ষরে লেখা—
“তুমি না এলে জানালাটাও ফাঁকা লাগে।”
মীরার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি, আর দুটো জানালার মাঝখানে নীরব একটা ভালোবাসা জন্ম নিচ্ছে।
বৃষ্টিভেজা বারান্দা।
পুরোনো বাড়িটার ছোট্ট বারান্দায় আজও বৃষ্টি পড়লে মেঘলা এসে দাঁড়ায়। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, চোখ দূরের রাস্তায়।
এই বারান্দাতেই একদিন অর্ণব বলেছিল,
— “যেদিন খুব একা লাগবে, বৃষ্টির দিনে এখানে দাঁড়িয়ে আমাকে মনে করো।”
তারপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। সম্পর্ক ভেঙেছে, শহর বদলেছে, মানুষ বদলেছে। শুধু বদলায়নি এই বারান্দা আর বৃষ্টির শব্দ।
সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। চারপাশ অন্ধকার। বৃষ্টির ফোঁটা এসে মেঘলার হাত ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই নিচে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
— “এক কাপ চা হবে?”
চমকে নিচে তাকাল সে।
ভিজে ছাতাটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অর্ণব। আগের মতোই হাসছে।
মেঘলা কিছু বলল না। শুধু দরজাটা খুলে দিল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু বহুদিন পর বারান্দাটা আর একা লাগছিল না।