Categories
অনুগল্প বিবিধ

ছাতার নিচে দুজন।।।

শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিন সকালে দাঁড়িয়ে থাকত সুমন। তার হাতে থাকত একটা বিশাল কালো ছাতা।

সুমন ছাতা বিক্রি করত না। বরং বৃষ্টি হলেই যে কাউকে নিজের ছাতার নিচে দাঁড় করিয়ে দিত।

লোকজন হাসত।

—“নিজের ছাতার নিচে নিজেই ঠিকমতো দাঁড়াতে পারো না, আবার সবাইকে জায়গা দাও!”

সুমন শুধু হাসত।

একদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বাসস্ট্যান্ডে এল এক বৃদ্ধা। হাতে ওষুধের প্যাকেট, কিন্তু মাথায় কোনও ছাতা নেই।

সুমন সঙ্গে সঙ্গে ছাতাটা বাড়িয়ে দিল।

—“মা, এখানে দাঁড়ান।”

বৃদ্ধা বললেন,

—“তুমি ভিজে যাবে।”

—“আমি একটু ভিজলে কিছু হবে না।”

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলেন।

বাস এল।

বৃদ্ধা উঠে যাওয়ার আগে বললেন,

—“তোমার নাম কী?”

—“সুমন।”

—“মনে রাখব।”

সুমন হেসে বলল,

—“আমাকে মনে রাখার দরকার নেই। শুধু আজকের মতো আর কাউকে ভিজতে দেখলে ছাতার নিচে দাঁড় করিয়ে দেবেন।”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

তারপর চলে গেলেন।

কয়েকদিন পর আবার বৃষ্টি।

সুমন দেখল, বাসস্ট্যান্ডে একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা ছোট ছাতা, কিন্তু পাশে এক বৃদ্ধ লোক ভিজছেন।

কিশোর নিজের ছাতাটা বৃদ্ধের মাথার ওপর ধরল।

সুমন দূর থেকে দেখে হাসল।

পরদিন আরেকজন।

তারপর আরেকজন।

বৃষ্টির দিনে বাসস্ট্যান্ডে যেন অদ্ভুত একটা নিয়ম তৈরি হয়ে গেল।

যার ছাতা আছে, সে ছাতা ভাগ করে নেয়।

একদিন সুমন নিজেই প্রচণ্ড জ্বরে পড়ল।

সেদিন বাসস্ট্যান্ডে তার বড় কালো ছাতাটা ছিল না।

বৃষ্টি নামতেই মানুষজন একে একে জড়ো হতে লাগল।

কেউ বলল,

—“সুমন নেই?”

আরেকজন বলল,

—“ওকে তো আজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে।”

এক বৃদ্ধ লোক নিজের ছাতা মেলে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকে আমরা ওর কাজটা করব।”

সেদিন বাসস্ট্যান্ডে একজনেরও মাথায় বৃষ্টি পড়ল না।

কয়েকদিন পর সুমন সুস্থ হয়ে ফিরে এল।

বাসস্ট্যান্ডে এসে সে অবাক হয়ে গেল।

দশ-পনেরোটা মানুষ দাঁড়িয়ে।

কারও হাতে ছোট ছাতা, কারও বড়।

সবাই বৃষ্টিতে অন্য কাউকে জায়গা দিচ্ছে।

একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এসে বললেন,

—“চিনতে পারছ?”

সুমন তাকিয়ে রইল।

তারপর চিনতে পারল।

সেই প্রথম দিনের বৃদ্ধা।

বৃদ্ধা হাসলেন।

—“তুমি বলেছিলে, আমাকে মনে রাখার দরকার নেই। কিন্তু তোমার কথাটা মনে রেখেছি।”

সুমনের চোখ ভিজে গেল।

বৃদ্ধা নিজের ছাতাটা তার হাতে দিয়ে বললেন,

—“এটা রাখো।”

সুমন বলল,

—“আমার তো ছাতা আছে।”

বৃদ্ধা বললেন,

—“এটা তোমার জন্য নয়।”

—“তাহলে?”

—“যার প্রয়োজন হবে, তার জন্য।”

সুমন ছাতাটা নিল।

সেদিন থেকে বাসস্ট্যান্ডে আরও একটা ছাতা ঝুলতে লাগল।

তার ওপর লেখা—

“যার ছাতা নেই, সে নিয়ে নিন। যার আছে, সে অন্য কাউকে জায়গা দিন।”

বছর কেটে গেল।

সুমন বুড়ো হল।

কিন্তু বৃষ্টির দিনে সেই বাসস্ট্যান্ডে এখনও ছাতাগুলো ঝুলে থাকে।

কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না—

“তুমি কে?”

শুধু জিজ্ঞেস করে—

“আপনি ভিজছেন? আসুন, এখানে দাঁড়ান।”

কারণ সুমন একদিন শিখেছিল—

মানুষের পরিচয় জানার আগে তার পাশে দাঁড়ানো যায়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

সেলাই মেশিনের শব্দ।।।

গ্রামের শেষ মাথায় টিনের চালের একটা ছোট ঘর। জানালার পাশে বসে প্রতিদিন সেলাই মেশিন চালাতেন জহুরা খালা।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘর থেকে ভেসে আসত—

খটখট… খটখট… খটখট…

গ্রামের মানুষ জানত, জহুরা খালা কাপড় সেলাই করেন।

কিন্তু কেউ জানত না, তিনি শুধু কাপড় জোড়েন না—মানুষের ভাঙা স্বপ্নও জোড়েন।

একদিন তাঁর কাছে এল রিমি।

বয়স মাত্র চৌদ্দ।

হাতে ছেঁড়া স্কুলের পোশাক।

রিমি মাথা নিচু করে বলল,

—“খালা, এটা একটু ঠিক করে দেবেন? নতুন জামা কেনার টাকা নেই।”

জহুরা খালা জামাটা হাতে নিয়ে বললেন,

—“কাল নিয়ে যাস।”

রিমি অবাক হয়ে বলল,

—“কত টাকা লাগবে?”

—“তুই পড়াশোনা করিস?”

—“হ্যাঁ।”

—“তাহলে টাকা লাগবে না।”

পরদিন জামাটা সুন্দর করে সেলাই করে দিলেন তিনি।

রিমি যাওয়ার সময় জহুরা খালা তাকে একটা খাতা দিলেন।

—“এতে কী?”

—“তোর পড়ার খাতা। শেষ হলে আবার আসবি।”

এভাবেই রিমি প্রায়ই তাঁর কাছে আসতে লাগল।

কখনও জামা সেলাই, কখনও বই, কখনও শুধু গল্প।

একদিন রিমি জিজ্ঞেস করল,

—“খালা, আপনি এত কাজ করেন কেন?”

জহুরা খালা মেশিন চালাতে চালাতে বললেন,

—“আমার মেয়েটা ছিল।”

রিমি চুপ করে গেল।

—“ছিল?”

—“হ্যাঁ। খুব পড়তে চাইত। কিন্তু আমাদের তখন টাকা ছিল না। একদিন অসুখে চলে গেল।”

সেলাই মেশিনের শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল।

জহুরা খালা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—“তখন ঠিক করেছিলাম, আমার কাছে যদি কেউ পড়তে চায়, তাকে যতটা পারি সাহায্য করব।”

রিমি কিছু বলল না।

শুধু জহুরা খালার হাতটা ধরে রইল।

বছর কেটে গেল।

রিমি কলেজে পড়তে গেল। তারপর নার্সিং প্রশিক্ষণ নিল।

একদিন সে খবর পেল, জহুরা খালা খুব অসুস্থ।

সে ছুটে এল।

ঘরের কোণে সেলাই মেশিনটা পড়ে আছে।

রিমি মেশিনটার ওপর হাত রাখল।

—“খালা, এটা আর চালান না?”

জহুরা খালা দুর্বল হাসলেন।

—“চোখ আর আগের মতো নেই।”

রিমি বলল,

—“তাহলে এবার আমি চালাব।”

জহুরা খালা অবাক।

—“তুই?”

রিমি মেশিনে বসে প্যাডেল চাপল।

খটখট… খটখট…

বৃদ্ধার চোখে জল এসে গেল।

—“আমার মেয়ের মতোই শব্দ হচ্ছে।”

রিমি হেসে বলল,

—“আপনার মেয়ের স্বপ্নটা তো এখনও বেঁচে আছে।”

কয়েক বছর পর গ্রামের সেই ছোট ঘরটা বদলে গেল।

সেখানে তৈরি হল একটি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

নাম—

“আলো সেলাই কেন্দ্র”

দরিদ্র মেয়েরা সেখানে বিনা খরচে সেলাই শেখে।

নিজেদের পোশাক বানায়।

তারপর কাজও পায়।

দরজার পাশে পুরনো সেলাই মেশিনটা এখনও রাখা আছে।

প্রথম দিন রিমি নিজে মেশিনটা পরিষ্কার করে তার ওপর একটা ছোট কাগজ লাগিয়ে দিল—

“যে হাত একদিন সাহায্য পেয়েছিল, সেই হাতই আজ অন্যকে সাহায্য করবে।”

জহুরা খালা তখন আর হাঁটতে পারেন না।

তবু প্রতিদিন বিকেলে চেয়ারে বসে মেয়েদের কাজ দেখেন।

ঘরজুড়ে আবার সেই পুরনো শব্দ—

খটখট… খটখট… খটখট…

একদিন এক কিশোরী জহুরা খালাকে জিজ্ঞেস করল,

—“খালা, এই মেশিনটা এত পুরনো হয়েও ফেলে দেননি কেন?”

জহুরা খালা মৃদু হেসে বললেন,

—“এই মেশিন শুধু কাপড় সেলাই করেনি মা।”

তিনি চারপাশে তাকালেন।

—“এটা অনেকগুলো জীবনকে জোড়া দিয়েছে।”

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

ভেতরে সেলাই মেশিনের শব্দ চলছে।

আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অনেক মেয়ের স্বপ্নের শব্দ।

কখনও একটি ছোট সাহায্যও বৃথা যায় না—সঠিক হাতে পৌঁছালে তা একদিন অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ সেলাই করে দেয়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

বৃষ্টির ছাউনির নিচে।।।

শহরের ব্যস্ত মোড়ে একটা পুরনো বাসস্ট্যান্ড ছিল। টিনের ছাউনি, ভাঙা বেঞ্চ আর পাশে একটা ছোট্ট পান-সিগারেটের দোকান।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেখানে বসত এক বৃদ্ধ—নন্দলাল।

তিনি কারও অপেক্ষায় বসে থাকতেন না।

তবু প্রতিদিন একই সময়ে এসে একই বেঞ্চে বসতেন।

একদিন প্রবল বৃষ্টি নামল।

বাসস্ট্যান্ডে মানুষ ছুটে এসে ভিড় করল। ছাউনির নিচে জায়গা নেই।

একটি ছোট ছেলে ভিজতে ভিজতে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা স্কুলব্যাগ।

নন্দলাল নিজের জায়গা ছেড়ে তাকে বসতে দিলেন।

—“এখানে বস।”

ছেলেটা বলল,

—“আপনি?”

—“আমি তো বৃষ্টিতে বসতেই ভালোবাসি।”

ছেলেটা হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পর নন্দলাল জিজ্ঞেস করলেন,

—“বাড়ি কোথায়?”

ছেলেটা একটা পাড়ার নাম বলল।

—“বাবা আসবে?”

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

—“বাবা নেই।”

নন্দলাল আর কিছু বললেন না।

বাস এলো।

ছেলেটা উঠে যাওয়ার সময় নন্দলাল বললেন,

—“কাল আবার দেখা হবে?”

ছেলেটা হেসে বলল,

—“হবে।”

পরদিন সত্যিই সে এল।

তারপর প্রায় প্রতিদিন।

ছেলেটার নাম ছিল শুভ।

শুভ স্কুলের গল্প করত। নন্দলাল তাঁর পুরনো দিনের গল্প বলতেন।

একদিন শুভ জিজ্ঞেস করল,

—“আপনি এখানে একা বসে থাকেন কেন?”

নন্দলাল অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

—“আমার একটা ছেলে ছিল।”

—“কোথায়?”

—“দূরে।”

—“আসেন না?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“কখনও কখনও মানুষ দূরে চলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা দূরে যায় না।”

শুভ কথাটা বুঝতে পারেনি।

এক শীতের সকালে নন্দলাল আর এলেন না।

পরপর তিনদিন।

শুভ চিন্তায় পড়ে গেল।

সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল।

দোকানদার বলল,

—“শুনেছি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।”

শুভ হাসপাতালে ছুটে গেল।

নন্দলাল তাকে দেখে অবাক।

—“তুই এখানে?”

শুভ বলল,

—“আপনি তো বলেছিলেন, কাল দেখা হবে।”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।

কয়েকদিন পর নন্দলাল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন।

কিন্তু সেদিন বাসস্ট্যান্ডে এসে তিনি দেখলেন, বেঞ্চের পাশে একটা নতুন ছোট্ট কাঠের ছাউনি তৈরি হয়েছে।

শুভ আর এলাকার কয়েকজন ছেলে সেটি বানিয়েছে।

তার ওপর লেখা—

“যে কেউ অপেক্ষা করলে, এখানে বসতে পারবেন।”

নন্দলাল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

শুভ বলল,

—“আপনি তো আমাকে একদিন আপনার জায়গা দিয়েছিলেন। এবার আমরা সবাই মিলে আপনার জন্য একটা জায়গা বানালাম।”

নন্দলাল বেঞ্চে বসে পড়লেন।

তারপর পকেট থেকে একটা পুরনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে এক তরুণ ছেলে।

তিনি ছবিটা শুভকে দেখিয়ে বললেন,

—“এটাই আমার ছেলে।”

শুভ জিজ্ঞেস করল,

—“সে কোথায়?”

নন্দলাল ধীরে বললেন,

—“অনেক বছর আগে বিদেশে চলে গেছে। তারপর আর যোগাযোগ নেই।”

শুভ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“একদিন হয়তো ফিরে আসবে।”

নন্দলাল হাসলেন।

—“তুই এখনও এত বিশ্বাস করিস?”

শুভ বলল,

—“আপনি তো আমাকে শিখিয়েছেন—অপেক্ষা মানে আশা ছেড়ে দেওয়া নয়।”

বৃদ্ধ কিছু বললেন না।

শুধু শুভর মাথায় হাত রাখলেন।

কয়েক মাস পরে এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় বাসস্ট্যান্ডে একজন অচেনা মানুষ এসে দাঁড়াল।

চোখে ক্লান্তি, হাতে পুরনো ব্যাগ।

সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল,

—“নন্দলালবাবু কি এখনও এখানে বসেন?”

দোকানদার দূরের বেঞ্চটার দিকে দেখিয়ে বলল,

—“ওই যে।”

লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

নন্দলাল তাকালেন।

কয়েক সেকেন্ড যেন সময় থেমে রইল।

তারপর বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বললেন,

—“তুই?”

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,

—“বাবা।”

বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে গেল।

শুভ দূরে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

নন্দলাল ছেলেকে জড়িয়ে ধরে শুধু বললেন,

—“অনেক দেরি করলি।”

ছেলে কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দিল,

—“কিন্তু ফিরেছি তো।”

নন্দলাল চোখ বন্ধ করলেন।

বছরের পর বছর যে বেঞ্চে তিনি অপেক্ষা করেছিলেন, সেদিন সেই বেঞ্চেই তাঁর অপেক্ষার শেষ হল।

আর শুভ বুঝল—

কখনও কখনও কাউকে আশ্রয় দেওয়া মানে শুধু তাকে বৃষ্টি থেকে বাঁচানো নয়; তার ভেতরের আশাটাকেও বাঁচিয়ে রাখা।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

পুরনো সিনেমা হলের আলো।।

শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল ‘রূপম’ সিনেমা হল।

একসময় সেখানে প্রতিদিন ভিড় হতো। এখন বহু বছর ধরে বন্ধ। দরজায় তালা, পোস্টারগুলো ছিঁড়ে গেছে, জানালার কাচে ধুলো জমেছে।

তবু প্রতি শনিবার রাতে হলটির প্রজেকশন ঘরের জানালায় একটি ক্ষীণ আলো দেখা যেত।

এলাকার সবাই জানত।

কেউ জানত না আলোটা জ্বালায় কে।

চায়ের দোকানের মালিক শম্ভু বলত,

—“ভূত-টুত হবে।”

কেউ বিশ্বাস করত, কেউ হাসত।

কিন্তু ষোলো বছরের রুদ্র বিশ্বাস করত না।

এক শনিবার রাতে সে লুকিয়ে সিনেমা হলের পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল।

ভেতরে অন্ধকার।

পুরনো চেয়ার, ছেঁড়া পর্দা, মেঝেতে ধুলো।

হঠাৎ ওপর থেকে প্রজেক্টরের শব্দ এল।

রুদ্র সিঁড়ি বেয়ে উঠল।

প্রজেকশন ঘরের দরজা আধখোলা।

ভেতরে এক বৃদ্ধ বসে পুরনো ফিল্ম চালাচ্ছেন।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—“আপনি কে?”

বৃদ্ধ ঘুরে তাকালেন।

—“আমার নাম হরেন। এই হলের প্রজেক্টর চালাতাম।”

—“কিন্তু হল তো বন্ধ!”

—“হল বন্ধ হয়েছে। সিনেমা নয়।”

রুদ্র পর্দার দিকে তাকাল।

সেখানে কোনও সিনেমা চলছে না।

দেখা যাচ্ছে পুরনো কিছু ছবি—একটি পরিবার, কিছু শিশু, গ্রামের রাস্তা, স্কুলের মাঠ।

রুদ্র জিজ্ঞেস করল,

—“এগুলো কী?”

হরেনবাবু বললেন,

—“এই শহরের স্মৃতি।”

তিনি একটা পুরনো অ্যালবাম খুললেন।

—“এই হল যখন চলত, মানুষ সিনেমা দেখতে আসত। কিন্তু আমি ক্যামেরা দিয়ে তাদেরও ছবি তুলতাম। যারা আর নেই, তাদের ছবি অন্তত বেঁচে থাকুক।”

রুদ্র চুপ করে গেল।

হরেনবাবু একটা ছবিতে আঙুল রাখলেন।

—“ওকে চিনিস?”

ছবিতে এক তরুণী হাসছিল।

রুদ্র বলল,

—“আমার ঠাকুমা!”

হরেনবাবু মৃদু হাসলেন।

—“তোর ঠাকুমা একবার এখানে সিনেমা দেখতে এসে আমাকে বলেছিল, ‘আমার একটা ছবি তুলে রাখবেন? একদিন যদি আমি না থাকি, কেউ যেন মনে রাখে।’”

রুদ্রের চোখ ভিজে গেল।

সেদিন রাতেই সে ঠিক করল, এই আলো আর নিভতে দেওয়া যাবে না।

পরদিন বন্ধুদের নিয়ে পুরনো হল পরিষ্কার করতে শুরু করল।

তারপর এলাকার মানুষও এগিয়ে এল।

কেউ পুরনো ছবি দিল, কেউ পুরনো পোস্টার, কেউ স্মৃতির গল্প।

কয়েক মাস পর ‘রূপম’ সিনেমা হল আবার খুলল।

সিনেমা দেখানোর জন্য নয়।

স্মৃতি দেখানোর জন্য।

প্রতি শনিবার রাতে সেখানে এলাকার পুরনো ছবি প্রদর্শিত হতে লাগল।

বৃদ্ধরা এসে নিজেদের তরুণ বয়স দেখতেন।

ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের পুরনো ছবি চিনত।

কেউ হাসত, কেউ কাঁদত।

উদ্বোধনের দিন হরেনবাবু প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রুদ্র এসে বলল,

—“কাকু, আজ আলোটা আপনি জ্বালাবেন।”

হরেনবাবু মাথা নাড়লেন।

—“না। আজ তুই জ্বালাবি।”

রুদ্র সুইচ টিপল।

পুরনো প্রজেক্টর গুঞ্জন করে উঠল।

পর্দায় প্রথম ছবি ভেসে উঠল—

এক তরুণী।

রুদ্রের ঠাকুমা।

হরেনবাবু ধীরে ধীরে বললেন,

—“দেখলি? মানুষ চলে যায়। কিন্তু ভালোবাসা যদি কেউ ধরে রাখে, তাহলে তাদের আলো থেকে যায়।”

রুদ্র মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে এই হল আর কখনও বন্ধ হবে না।”

হরেনবাবু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—“যতদিন মানুষ স্মৃতি মনে রাখতে চায়, ততদিন কোনও আলো সত্যিই নিভে যায় না।”

সেই রাত থেকে ‘রূপম’-এর প্রজেকশন ঘরের আলো আর শুধু একটা বাতি ছিল না।

তা হয়ে উঠেছিল হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরে পাওয়ার আলো।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

মাটির ব্যাংক।

রেললাইনের পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান চালাত বিমল।

দোকানের এক কোণে সবসময় একটা মাটির ব্যাংক রাখা থাকত। ব্যাংকটার গায়ে লাল রঙে লেখা—

“কারও স্বপ্নের জন্য।”

কেউ জানত না, এই ব্যাংকে টাকা জমে কেন।

একদিন দোকানে চা খেতে এসে স্কুলশিক্ষক অরুণবাবু জিজ্ঞেস করলেন,

—“বিমল, এটা কী?”

বিমল হেসে বলল,

—“জানি না।”

—“মানে?”

—“যে টাকা থাকে, সেটা আমার নয়। কারও দরকার হলে নিয়ে যাবে।”

অরুণবাবু অবাক হলেন।

—“কিন্তু কে নেবে?”

বিমল চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“যার সত্যিই দরকার।”

দিনের পর দিন ব্যাংকটায় কয়েন জমতে লাগল।

কেউ এক টাকা, কেউ পাঁচ টাকা, কেউ দশ টাকা ঢুকিয়ে যেত।

কেউ নাম লিখত না।

একদিন গ্রামের দরিদ্র রিকশাচালক গণেশের মেয়ে পিয়ালী স্কুলে পরীক্ষার ফি দিতে পারল না।

সে চুপচাপ স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

বিমল জানতে পেরে তাকে দোকানে ডাকল।

মাটির ব্যাংকটা হাতে নিয়ে বলল,

—“কত টাকা লাগবে?”

পিয়ালী বলল।

বিমল ব্যাংকটা ভেঙে টাকা বের করল।

পরীক্ষার ফি দেওয়া হল।

পিয়ালী কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আমি টাকা ফেরত দেব।”

বিমল বলল,

—“আমাকে নয়। যখন পারবে, অন্য কারও স্বপ্নে দিও।”

পিয়ালী মাথা নাড়ল।

বছর কেটে গেল।

পিয়ালী পড়াশোনা করে নার্স হল।

চাকরি পাওয়ার প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে সে সোজা বিমলের দোকানে এল।

বিমল তখন বৃদ্ধ।

পিয়ালী একটা বড় মাটির ব্যাংক এনে দোকানের কোণে রাখল।

তার গায়ে লিখল—

“কারও স্বপ্নের জন্য।”

বিমল অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,

—“এটা কী?”

পিয়ালী হেসে বলল,

—“আপনার পুরনো ব্যাংকের নতুন রূপ।”

বিমল চুপ করে রইল।

পিয়ালী প্রথম টাকা ব্যাংকে ফেলল।

তারপর বলল,

—“আপনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, স্বপ্নের টাকা ফেরত দিতে হয় না। অন্য কাউকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করতে হয়।”

বিমলের চোখ ভিজে গেল।

কয়েক মাস পর সেই ব্যাংক আবার পূর্ণ হল।

একদিন এক দরিদ্র ছাত্র এল কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাড় করতে।

ব্যাংক খুলে তার ভর্তি ফি দেওয়া হল।

তারপর আরেকজনের বই।

তারপর কারও পরীক্ষার ফি।

কারও চিকিৎসা।

কারও ট্রেনের টিকিট।

কেউ জানল না টাকা কার।

শুধু সবাই জানল—রেললাইনের ধারের ছোট্ট চায়ের দোকানে একটা মাটির ব্যাংক আছে।

সেখানে টাকা জমে না।

জমে মানুষের বিশ্বাস।

একদিন বিমল দোকানের বাইরে বসে দেখছিল, পিয়ালী এক ছোট ছেলের হাতে বই তুলে দিচ্ছে।

ছেলেটা বলল,

—“দিদি, টাকা কীভাবে শোধ করব?”

পিয়ালী হেসে বলল,

—“একদিন তুমিও কাউকে সাহায্য করবে।”

বিমল চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হল, মাটির ব্যাংকটা আসলে কখনও ভাঙেনি।

শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে তার স্বপ্নটা চলে গেছে।

কারও জীবনে আলো জ্বালানোর সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো—সেই আলোটা নিঃশব্দে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

বটগাছের নিচে চিঠির বাক্স।।।

গ্রামের মাঝখানে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। তার নিচে কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট বাক্স ঝুলত।

বাক্সটির গায়ে লেখা ছিল—

“যা মুখে বলতে পারছেন না, এখানে লিখে রাখুন।”

কে প্রথম বাক্সটা ঝুলিয়েছিল, কেউ জানত না।

তবে গ্রামের মানুষ জানত, সপ্তাহে একদিন বিকেলে স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হেমন্তবাবু এসে বাক্সটা খুলে চিঠিগুলো নিয়ে যান।

চিঠিগুলোর কোনও ঠিকানা থাকত না।

কখনও লেখা থাকত—

“বাবা, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই, কিন্তু অভিমানটা কাটাতে পারছি না।”

কখনও—

“আমি পড়াশোনা করতে চাই। কেউ কি আমাকে সাহায্য করবেন?”

আবার কখনও শুধু একটা লাইন—

“আজ আমার খুব একা লাগছে।”

হেমন্তবাবু প্রতিটি চিঠি পড়তেন।

যার উত্তর দেওয়া দরকার, নিজের হাতে উত্তর লিখতেন।

কখনও কাউকে বই দিতেন, কখনও কারও বাড়িতে গিয়ে কথা বলতেন।

একদিন বাক্সে এল একটা চিঠি।

মাত্র তিনটি শব্দ—

“আমি হারিয়ে গেছি।”

নাম নেই।

ঠিকানা নেই।

হেমন্তবাবু অনেকক্ষণ চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

পরদিন আবার বাক্স খুললেন।

আরেকটা চিঠি।

“কেউ আমাকে খুঁজবে?”

তৃতীয় সপ্তাহে—

“আমি বাড়ি ফিরতে চাই।”

হেমন্তবাবুর মনে হল, এই চিঠিগুলো একই মানুষের।

কিন্তু কে?

তিনি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খোঁজ নিলেন।

কেউ কিছু জানে না।

একদিন স্কুলের মাঠে তিনি দেখলেন, এক কিশোর একা বসে আছে।

নাম সায়ন।

সায়নের বাবা-মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নয়। পড়াশোনায় ভালো হলেও সে খুব চুপচাপ হয়ে গেছে।

হেমন্তবাবু কাছে বসে বললেন,

—“কী হয়েছে?”

সায়ন মাথা নিচু করে বলল,

—“কিছু না।”

হেমন্তবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“কিছু না থাকলে মানুষ এত চুপ করে থাকে না।”

ছেলেটা কিছু বলল না।

সেদিন রাতে হেমন্তবাবু আবার বটগাছের কাছে গেলেন।

বাক্স খুলতেই দেখলেন নতুন একটা চিঠি।

“স্যার, আপনি কি বুঝতে পেরেছেন?”

হেমন্তবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।

পরদিন সায়নকে স্কুলে ডেকে বললেন,

—“চিঠিগুলো তুই লিখেছিস?”

ছেলেটার চোখে জল এসে গেল।

সে মাথা নাড়ল।

—“বাড়িতে কেউ আমার কথা শোনে না। কাউকে বলতে পারি না। তাই লিখি।”

হেমন্তবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।

—“কথা বলার জন্য সবসময় বড় মানুষ লাগে না। শুধু একজন মন দিয়ে শুনবে—এমন মানুষ লাগে।”

সায়ন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“আপনি কি আমার কথা শুনবেন?”

—“যতদিন তুই বলতে চাইবি।”

সেদিন প্রথমবার সায়ন অনেক কথা বলল।

বাবার সঙ্গে তার অভিমান, মায়ের সঙ্গে দূরত্ব, নিজের স্বপ্ন—সব।

হেমন্তবাবু পরদিন সায়নের বাবা-মাকে স্কুলে ডাকলেন।

তাদের সামনে ছেলের কোনও অভিযোগ করলেন না।

শুধু বললেন,

—“আপনারা ওকে পড়াশোনার ফলাফল দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন।”

কথাগুলো ধীরে ধীরে কাজ করল।

কয়েক মাস পর সায়নের বাড়িতে আবার হাসি ফিরল।

এক সন্ধ্যায় হেমন্তবাবু বটগাছের বাক্স খুললেন।

ভেতরে একটা শেষ চিঠি।

“এবার আমি আর হারিয়ে যাইনি।”

নিচে সায়নের নাম।

হেমন্তবাবু চিঠিটা ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখলেন।

তারপর বাক্সটার পাশে আরেকটা ছোট কাগজ লাগিয়ে দিলেন—

“চিঠি লিখুন। কেউ না কেউ পড়বে।”

বছর কেটে গেল।

হেমন্তবাবু আর নেই।

কিন্তু বটগাছের নিচে সেই বাক্স এখনও ঝুলছে।

এখন গ্রামের স্কুলের কয়েকজন ছাত্র পালা করে চিঠি সংগ্রহ করে।

কেউ উত্তর দেয়।

কেউ বই দেয়।

কেউ শুধু পাশে বসে থাকে।

একদিন এক ছোট মেয়ে বাক্সে চিঠি ফেলল।

চিঠিতে লেখা—

“আমার খুব ভয় করছে। আমি কি একা?”

কিছুক্ষণ পর বাক্সের ভেতর থেকে একটা উত্তর বেরিয়ে এল।

“না। তুমি একা নও।”

বটগাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছিল।

হয়তো কোথাও হেমন্তবাবুর হাসিও মিশে ছিল সেই শব্দে।

কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও,

তারা মানুষের পাশে থাকার যে অভ্যাস তৈরি করে যায়, সেটি কখনও মরে না।

Share This
Categories
অনুগল্প

লিফটের চার নম্বর তলা।

বড় শহরের একটা বহুতল আবাসনে থাকত নীলয়।

সকাল থেকে রাত—অফিস, মিটিং, ফোন, ই-মেইল। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, সেটাও সে জানত না।

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় লিফটে উঠতেই চার নম্বর তলায় লিফট থেমে গেল।

দরজা খুলতেই এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হাতে ভারী বাজারের ব্যাগ।

নীলয় বলল,

—“দিদা, দিন, আমি নিয়ে দিচ্ছি।”

বৃদ্ধা একটু অবাক হয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিলেন।

—“আপনি চার নম্বরেই থাকেন?”

—“হ্যাঁ।”

—“আমিও।”

দুজন একই তলায় থাকেন—এটাই নীলয় প্রথম জানল।

পরদিন আবার দেখা।

তারপর প্রায় প্রতিদিনই।

বৃদ্ধার নাম কমলা দেবী।

স্বামী নেই। ছেলে বিদেশে থাকে।

কমলা দেবী একা থাকেন।

একদিন নীলয় জিজ্ঞেস করল,

—“আপনার ছেলে কি আসেন না?”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

—“সময় পায় না।”

নীলয় আর কিছু বলল না।

কিন্তু সেদিন থেকে সে মাঝে মাঝে দরজায় কড়া নেড়ে জিজ্ঞেস করত,

—“কিছু লাগবে?”

কমলা দেবীও যেন অপেক্ষা করতেন।

কখনও এক কাপ চা, কখনও বাজার থেকে ওষুধ, কখনও শুধু পাঁচ মিনিট গল্প।

একদিন নীলয় অফিস থেকে ফিরতে দেখল, চার নম্বর তলায় অনেক লোক।

কমলা দেবী পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

নীলয় ছুটে হাসপাতালে গেল।

ডাক্তার বললেন,

—“পরিবারের কাউকে খবর দিন।”

নীলয় ফোন করল তাঁর ছেলেকে।

ছেলে বলল,

—“আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আসছি।”

কিন্তু বিদেশ থেকে আসতে সময় লাগবে।

পরের কয়েকদিন নীলয়ই হাসপাতাল, ওষুধ, খাবার—সব সামলাল।

এক সপ্তাহ পরে কমলা দেবী বাড়ি ফিরলেন।

দরজার সামনে এসে তিনি নীলয়ের হাত ধরে বললেন,

—“তুই না থাকলে আমি কী করতাম?”

নীলয় হেসে বলল,

—“আপনি তো আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন।”

কমলা দেবী মাথা নাড়লেন।

—“পাশের ফ্ল্যাটে থাকা আর পাশে থাকা এক কথা নয়।”

কথাটা নীলয়ের মনে গেঁথে গেল।

কয়েক মাস পর এক রাতে লিফটে এক নতুন পরিবার উঠল।

তাদের সঙ্গে ছিল এক বৃদ্ধ মানুষ। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল।

লিফট চার নম্বর তলায় থামল।

নীলয় দরজা খুলে বৃদ্ধের ব্যাগটা হাতে নিল।

ঠিক তখন পিছন থেকে কমলা দেবীর কণ্ঠ শোনা গেল,

—“নীলয়, ব্যাগটা একটু আমি নিই।”

নীলয় অবাক হয়ে তাকাল।

—“আপনি পারবেন?”

কমলা দেবী হেসে বললেন,

—“তুই তো আমাকে শিখিয়েছিস।”

বৃদ্ধ লোকটা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালেন।

কমলা দেবী বললেন,

—“এই বাড়িতে আমরা সবাই একই তলায় থাকি। কিন্তু চেষ্টা করলে একে অপরের পাশেও থাকা যায়।”

লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ডিজিটাল স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

৪

নীলয়ের মনে হল, চার নম্বর তলা আসলে শুধু একটা ঠিকানা নয়।

এটা একটা শিক্ষা।

মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী সে নয়, যে সবচেয়ে কাছে থাকে—সে, যে প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায়।

Share This
Categories
অনুগল্প

শেষ চিঠির কালি।

গ্রামের পোস্ট অফিসটা ছিল রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। ছোট্ট একটা ঘর, সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছ আর পাশে ভাঙা বেঞ্চ।

সেই পোস্ট অফিসে কাজ করতেন হরিদাসবাবু।

চিঠি বিলি করতে করতে তাঁর জীবনের তিরিশ বছর কেটে গিয়েছিল।

কিন্তু অবসর নেওয়ার আগের দিনও একটা চিঠি তাঁর কাছে এসে আটকে গেল।

খামের ওপর লেখা—

“যার হাতে পৌঁছবে, সে যেন পড়ে।”

প্রেরকের নাম নেই।

প্রাপকের নাম নেই।

শুধু ঠিকানা—

“নদীর ধারের পুরনো বাড়ি, যে বাড়ির জানালায় সন্ধ্যায় আলো জ্বলে।”

হরিদাসবাবু অবাক হলেন।

গ্রামে এমন বাড়ি অনেক।

তবু চিঠিটা আলাদা করে তাঁর মনে দাগ কাটল।

পরদিন অবসর।

তবু চিঠিটা তিনি নিজের ব্যাগে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে নদীর ধারে হাঁটতে লাগলেন।

অবশেষে দেখতে পেলেন একটা পুরনো বাড়ি। জানালায় সত্যিই আলো জ্বলছে।

দরজায় কড়া নাড়তেই এক বৃদ্ধা দরজা খুললেন।

হরিদাসবাবু খামটা এগিয়ে দিয়ে বললেন,

—“আপনার জন্য কিনা জানি না।”

বৃদ্ধা খামটা হাতে নিয়েই কেঁপে উঠলেন।

—“এটা… কোথায় পেলেন?”

—“পোস্ট অফিসে এসেছিল।”

বৃদ্ধা চিঠিটা খুললেন।

মাত্র কয়েকটি লাইন।

“মা,

আমি জানি, ফিরে আসতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুমি যদি এখনও জানালায় আলো জ্বেলে রাখো, তবে বুঝব তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ।

—তোমার অরুণ।”

বৃদ্ধার হাত কাঁপছিল।

তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

হরিদাসবাবু জিজ্ঞেস করলেন,

—“আপনার ছেলে?”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

—“ত্রিশ বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। তারপর আর আসেনি।”

—“কোনও খবর পাননি?”

—“না।”

বৃদ্ধা জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তবু আমি প্রতিদিন সন্ধ্যায় আলো জ্বেলে রাখতাম।”

হরিদাসবাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

হঠাৎ বৃদ্ধা বললেন,

—“চিঠিটা কি আজ এসেছে?”

—“জি।”

তিনি মৃদু হাসলেন।

—“তাহলে ও হয়তো কাছেই আছে।”

সেই রাতেই নদীর ঘাটের দিকে একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল।

একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে পুরনো বাড়িটার দিকে এগিয়ে আসছিল।

বৃদ্ধা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন।

দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর বৃদ্ধা শুধু বললেন,

—“এত দেরি করলি কেন?”

লোকটা মাথা নিচু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“ভয় পেয়েছিলাম মা।”

বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।

ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।

দূরে দাঁড়িয়ে হরিদাসবাবু চোখ মুছলেন।

অরুণ তাঁর কাছে এসে বলল,

—“আপনি না এলে হয়তো আমি সাহস পেতাম না।”

হরিদাসবাবু মাথা নাড়লেন।

—“আমি শুধু চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছি।”

অরুণ বলল,

—“না। আপনি একটা ঠিকানা খুঁজে দিয়েছেন।”

পরদিন হরিদাসবাবু তাঁর শেষ কর্মদিবসে পোস্ট অফিসে গেলেন।

টেবিলটা খালি।

চিঠির বস্তা নেই।

স্ট্যাম্প নেই।

শুধু তাঁর পুরনো কলমটা পড়ে আছে।

তিনি কলমটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর সেটি পোস্টমাস্টারের হাতে দিয়ে বললেন,

—“এটা রেখে দিন।”

পোস্টমাস্টার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেন?”

হরিদাসবাবু হাসলেন।

—“এই কলমে অনেক চিঠি লেখা হয়েছে। কিন্তু শেষ চিঠিটা আমাকে শিখিয়েছে—কখনও কখনও একটা চিঠি শুধু কাগজে লেখা থাকে না, মানুষের অপেক্ষার ওপর লেখা থাকে।”

বাইরে তখন কৃষ্ণচূড়ার পাতা ঝরছিল।

আর নদীর ওপারের সেই পুরনো বাড়ির জানালায় সেদিনও আলো জ্বলছিল।

তবে সেই আলো আর অপেক্ষার ছিল না।

এবার সেটা ছিল ফিরে পাওয়ার আলো।

Share This
Categories
অনুগল্প

স্টেশনের হারানো জুতো।

ভোরের ট্রেন ধরতে প্রতিদিন স্টেশনে আসত মধু।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় ছোট্ট একটা জুতোর দোকান ছিল তার। দোকান বলতে কাঠের বাক্সের ওপর সাজানো কয়েক জোড়া স্যান্ডেল, চটি আর জুতো।

মধু জুতো বিক্রি করত ঠিকই, কিন্তু তার দোকানের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল।

কেউ টাকা না দিতে পারলে সে কাউকে খালি পায়ে ফিরিয়ে দিত না।

এক শীতের সকালে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল বছর দশেকের একটি ছেলে। নাম রনি।

তার এক পায়ে জুতো আছে, অন্য পা খালি।

মধু জিজ্ঞেস করল,

—“আরেকটা জুতো কোথায়?”

রনি মাথা নিচু করে বলল,

—“ট্রেনে উঠে খুলে গিয়েছিল। নামার সময় আর পাইনি।”

—“বাড়িতে টাকা নেই?”

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

—“মা বলেছে, মাসের শেষে কিনে দেবে।”

মধু তাক থেকে একটা জোড়া জুতো নামিয়ে দিল।

—“নাও।”

রনি চমকে উঠল।

—“কিন্তু টাকা?”

—“যেদিন পারবে, সেদিন দিও।”

রনি জুতো পরে কয়েক পা হাঁটল। তারপর ফিরে এসে বলল,

—“কাকু, আমি বড় হয়ে টাকা দিয়ে দেব।”

মধু হেসে বলল,

—“টাকা না দিলেও চলবে। কাউকে একদিন জুতো কিনে দিও।”

রনি চলে গেল।

মধু ঘটনাটা ভুলেই গেল।

প্রায় পনেরো বছর কেটে গেল।

মধুর চুলে তখন পাক ধরেছে। দোকানটাও আগের মতো ভালো চলছে না।

একদিন দুপুরে একজন যুবক এসে তার সামনে দাঁড়াল।

পরনে পরিচ্ছন্ন পোশাক, হাতে একটা বড় ব্যাগ।

—“আপনি কি মধু কাকু?”

মধু তাকিয়ে বলল,

—“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কে?”

যুবকটা হেসে বলল,

—“এক পায়ে জুতো ছিল, আর এক পা খালি।”

মধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বুঝতে পারল।

—“রনি?”

যুবকটা মাথা নাড়ল।

তারপর ব্যাগ খুলে অনেকগুলো নতুন জুতো বের করল।

—“আমি এখন একটা জুতোর কোম্পানিতে কাজ করি। আজ আপনার জন্য কিছু নিয়ে এসেছি।”

মধু অবাক হয়ে বলল,

—“আমার জন্য?”

রনি একটা জোড়া জুতো তার হাতে তুলে দিল।

—“আপনি বলেছিলেন, টাকা না দিলেও চলবে। কাউকে একদিন জুতো কিনে দিতে।”

মধুর চোখ ভিজে উঠল।

রনি বলল,

—“আমি সেই কথা ভুলিনি।”

তারপর স্টেশনের বাইরে একটা টেবিল পেতে সে জুতোগুলো সাজিয়ে দিল।

যে শিশুদের জুতো নেই, তাদের বিনা পয়সায় জুতো দিতে শুরু করল।

মধু পাশে বসে রইল।

একটা ছোট মেয়ে নতুন জুতো পরে আনন্দে লাফাচ্ছিল।

রনি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“কেমন লাগছে?”

মেয়েটা বলল,

—“খুব ভালো!”

রনি মৃদু হেসে উত্তর দিল,

—“তাহলে দৌড়ে বাড়ি যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—কখনও কাউকে খালি পায়ে দেখলে, পারলে তার পাশে দাঁড়াবে।”

মধু চুপ করে শুনছিল।

তার মনে হল, পনেরো বছর আগে সে আসলে একটা জোড়া জুতো দেয়নি।

সে দিয়েছিল একটা বিশ্বাস।

আর সেই বিশ্বাসই আজ ফিরে এসেছে বহু জোড়া জুতো হয়ে।

স্টেশনের ভিড়ে ট্রেনের হুইসেল বাজল।

মধু নিজের নতুন জুতোর দিকে তাকিয়ে হাসল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

—“কিছু ভালো কাজের কোনও দাম থাকে না। শুধু তার পথটা অনেক দূর যায়।”

আর প্ল্যাটফর্মের ধুলোয় সেদিন অসংখ্য ছোট ছোট পায়ের ছাপ পড়ে রইল।

একটি জোড়া জুতো থেকে শুরু হওয়া গল্প, একদিন হয়ে উঠল অনেক শিশুর পথচলার সাহস।

Share This
Categories
অনুগল্প

বৃষ্টির দিনের লাল খাতা।

সকাল থেকেই বৃষ্টি।

শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট একটা বইয়ের দোকান চালাত অমল। দোকান বলতে টিনের চালের নিচে চারটে কাঠের তাক আর সামনে একটা পুরনো টেবিল। নতুন বইয়ের চেয়ে পুরনো বইই বেশি ছিল সেখানে।

অমলের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

প্রতিদিন দোকান খোলার আগে সে একটা লাল খাতা খুলে কিছু একটা লিখত।

কেউ জানত না কী লিখে।

একদিন বৃষ্টির মধ্যে এক স্কুলছাত্রী দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। নাম তার ঐশী। হাতে ছেঁড়া ছাতা, কাঁধে ভেজা স্কুলব্যাগ।

সে একটা বই হাতে নিয়ে বলল,

—“কাকু, বইটা কত?”

অমল দাম বলতেই মেয়েটা চুপ করে গেল।

তারপর ব্যাগ খুলে কয়েকটা কয়েন বের করল।

—“এত টাকা আছে। বাকিটা কাল দেব?”

অমল বইটা তার হাতে দিয়ে বলল,

—“কাল নয়, যখন পারিস তখন দিবি।”

ঐশী অবাক হয়ে তাকাল।

—“সত্যি?”

—“বইয়ের দাম সবসময় টাকা দিয়ে দিতে হয় না।”

মেয়েটা বই নিয়ে চলে গেল।

অমল লাল খাতাটা খুলে লিখল—

“ঐশী—একটা বই। টাকা পরে।”

এভাবেই চলতে লাগল।

কেউ পরীক্ষার আগে বই নিত, কেউ চাকরির প্রস্তুতির বই, কেউ গল্পের বই।

যাদের টাকা থাকত না, অমল তাদের বই দিত।

আর লাল খাতায় শুধু নাম আর বইয়ের নাম লিখে রাখত।

কেউ কেউ টাকা ফিরিয়ে দিত।

কেউ দিত না।

অমল কাউকে মনে করিয়ে দিত না।

একদিন দোকানে এলেন এক ভদ্রলোক।

চেহারায় বয়সের ছাপ। হাতে একটা পুরনো ফাইল।

তিনি অমলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আপনি কি অমলবাবু?”

—“জি।”

ভদ্রলোক ফাইল খুলে একটা পুরনো বই বের করলেন।

বইটার প্রথম পাতায় অমলের হাতের লেখা।

অমল অবাক হয়ে গেল।

—“এটা তো আমার দোকানের বই!”

ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন।

—“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমি এই বইটা আপনার কাছ থেকে নিয়েছিলাম।”

অমল কিছু মনে করতে পারল না।

ভদ্রলোক বললেন,

—“তখন আমার কাছে বই কেনার টাকা ছিল না। আপনি বলেছিলেন, ‘চাকরি পেলে টাকা দিও।’”

অমল হেসে বলল,

—“তারপর?”

—“চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনাকে আর খুঁজে পাইনি।”

ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলেন।

—“আজ টাকা দিতে আসিনি।”

অমল অবাক হয়ে তাকাল।

—“তাহলে?”

ভদ্রলোক বললেন,

—“আজ আপনার দোকানের সামনে একটা নতুন সাইনবোর্ড লাগাতে এসেছি।”

অমল কিছু বুঝতে পারল না।

বাইরে গিয়ে দেখল, নতুন বোর্ডে লেখা—

“অমলের পাঠঘর — যার বই কেনার সামর্থ্য নেই, তার জন্যও দরজা খোলা।”

অমলের চোখ ভিজে উঠল।

ভদ্রলোক বললেন,

—“আমি একা আপনার কাছে ঋণী নই। আমার মতো আরও অনেকেই আছে। আপনার লাল খাতায় যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত।”

অমল ধীরে ধীরে দোকানে ফিরে এল।

লাল খাতাটা খুলল।

শেষ পাতায় আজকের তারিখ লিখে থামল।

তারপর লিখল—

“আজ বুঝলাম, কিছু ধার টাকা দিয়ে শোধ হয় না। মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়ে শোধ করতে হয়।”

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।

ঐশী, যে এখন কলেজের ছাত্রী, ছাতা হাতে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।

হেসে বলল,

—“কাকু, নতুন বই এসেছে?”

অমল তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—“এসেছে। তোর জন্য একটা আলাদা করে রেখেছি।”

বৃষ্টির শব্দের মধ্যে পুরনো বইয়ের দোকানটায় যেন আরও একটু আলো বেড়ে গেল।

আর টেবিলের ওপর পড়ে রইল সেই লাল খাতা—

যেখানে হিসেব ছিল না টাকার,

হিসেব ছিল মানুষের।

Share This