Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং পালনের গুরুত্ব।

সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই তারিখে আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস বা বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হয়।২০১০ সালে সেণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র অভিবর্তনে এই দিবসের সূচনা হয়। এই দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে এর সম্পর্কে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করা। প্রতি বছর বিভিন্ন কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। বাঘ ভারতের জাতীয় পশু হওয়ার কারণে এই দিবসের মহত্ব এখানে বেশি ধরা হয়।
২০১০ সালে নভেম্বরে প্রথম বাঘ দিবস উদযাপিত হয়। বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বন্য বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে যায়। এই বিষয়টি উপলব্ধি করার পরেই বাঘ দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। রাশিয়ায় সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগাই সামিটে প্রথম বাঘ দিবস পালিত হয়। বাঘেদের স্বাভাবিক বাসস্থান রক্ষা করাই ছিল এই সামিটের মূল উদ্দেশ্য।
সামিটে যে ১৩টি দেশ অংশগ্রহণ করে, সেগুলি হল – ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, চিন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং রাশিয়া। এই সামিটে ২০২২-এর মধ্যে বন্য বাঘের সংখ্যা ৬০০০-এর বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়।
সপ্তম বিশ্ব বাঘ দিবস গোটা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাবে পালন করা হয়। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল প্রভৃতি বাঘের বেশি ঘনত্ব থাকা দেশের সাথে ইংল্যান্ড ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন স্থানীয় কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। কিছু জনপ্রিয় তারকা তাদের সোসাল মিডিয়ায় নিজেদের প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করে এতে অংশগ্রহণ করেন। বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থা (WWF) এর রেঞ্জারসমূহে বিনিয়োগ করে “দ্বিগুণ বাঘ” অভিযান চালায়। কয়েকটি কোম্পানী বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থার সঙ্গে মিলিতভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।

তথ্য অনুযায়ী বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বন্য বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে যায়। বিষয়টি উপলব্ধি করার পরেই বাঘ দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।প্রতি বছর বিভিন্ন কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। বাঘ ভারতের জাতীয় পশু হওয়ার কারণে এই দিবস আমাদের দেশের একটু বেশিমাত্রায় উপযোগী। গোটা বিশ্বে নগরায়নের কারণে বাঘেরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থানের ৯০ শতাংশই হারিয়ে ফেলেছে। বর্তামানে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ৪০০০-এরও কম।
আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস বা বিশ্ব বাঘ দিবস সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই তারিখে পালন করা হয়। ২০১০ সালে সেণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র অভিবর্তনে এই দিবসের সূচনা হয়। বিশ্ব বাঘ দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এছাড়াও বাঘের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করাও আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যে।
ভারতের জাতীয় পশু বাঘ হওয়ায় ভারতে এই দিনটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাঘেদের স্বাভাবিক বাসস্থান বৃদ্ধি ও বাঘের সংখ্যা বাড়ানো এই বাঘ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।

।। তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং দিনটি পালনের গুরুত্ব।

আজ বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস,প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ৷ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আবিষ্কারক নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ জন্মদিনে চিকিৎসাবিদ্যায় তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর এইদিনে (২৮ জুলাই) হেপাটাইটিস দিবস উদযাপন করা হয়। সরাবিশ্বের মতো ভারতেও গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয় এ দিবস। দিবসটির উদ্দেশ্য হচ্ছে সারাবিশ্বে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা; রোগনির্ণয়, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা ৷বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ হেপাটাইটিসের কোনো না কোনো ধরনে আক্রান্ত। অথচ প্রতি ১০ জনের ৯ জনই জানেন না যে, তাদের হেপাটাইটিস আছে। প্রতিবছর গোটা বিশ্বে হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন লোক মারা যায় ৷ ফলে ভাইরাসটি প্রতিরোধে অসচেতনতা ও সময় মতো শনাক্ত না হওয়ায় অসংখ্য রোগী চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। যা অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর ঘটনা বাড়াচ্ছে।

 

হেপাটাইটিস লিভার টিস্যুর প্রদাহ জনিত একটি জটিল রোগ। এই সংক্রমণে প্রথম দিকে কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্তদের অল্প কিছু লক্ষণ দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে বমি বমি ভাব, চামড়া হলুদ হওয়া, ক্লান্তি, পেট ব্যাথা, প্রস্রাব হলুদ ইত্যাদি।
সাধারণত এই লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং অল্প কিছু লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর দীর্ঘ ভোগান্তি শেষে রোগীর মৃত্যু হয়। ভাইরাসটির সংক্রমণের পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৩০ থেকে ১৮০ দিন সময় লাগতে পারে।
হেপাটাইটিস ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন: হেপাটাইটিস এ, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, ডি এবং হেপাটাইটিস ই। এদের মধ্যে হেপাটাইটিস এ ও ই মূলত দূষিত খাবার এবং পানির মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি প্রধানত যৌনবাহিত রোগ। তবে গর্ভাবস্থা বা প্রসবের সময় মা থেকে শিশুরাও এতে আক্রান্ত হতে পারে।
এছাড়া এটি রক্তের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে । হেপাটাইটিস সি সাধারণত সংক্রামিত রক্তের মাধ্যমে ছড়ায়। যেমন, সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক ব্যবহারকারীদের একত্রে মাদক নেওয়ার সময় এ ভাইরাস ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস ডি শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সংক্রামিত করতে পারে।

 

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপে অন্যতম আটটি অফিসিয়াল পাবলিক হেলথের মধ্যে একটি ৷ অন্যান্য দিবসসমূহ হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস, বিশ্ব ইম্যুনাইজেশন সপ্তাহ, বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস, বিশ্ব তামাক দিবস, বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস এবং বিশ্ব এইডস দিবস।

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস এর এ বারের থিম “ এক জীবন, এক লিভার ” থিমের অধীনে, WHO-এর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রচারাভিযান দীর্ঘ, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য হেপাটাইটিস থেকে লিভারকে রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

 

পটভূমি—-

 

২০০৮ সালের ২৮ জুলাই বিশ্ববাসীকে সচেতন করতে হেপাটাইটিস দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে ‘বিশ্ব হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স’। ২০১১ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়। নোবেলবিজয়ী বিজ্ঞানী বারুচ স্যামুয়েল ব্লুমবার্গ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস আবিষ্কার করেন। তিনি এই রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষাব্যবস্থা উন্নত করেন ও টিকা দেওয়া শুরু করেন। চিকিৎসাবিদ্যায় তার এই অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে তার জন্মদিনে (২৮ জুলাই) বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়।

 

 

 

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস এখন ১০০ টিরও বেশি দেশে বিনামূল্যে স্ক্রীনিং, পোস্টার প্রচারাভিযান, বিক্ষোভ, কনসার্ট, টক শো, ফ্ল্যাশ মব এবং টিকাদান ড্রাইভের মতো ইভেন্টের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়।  প্রতি বছর ডব্লিউএইচও এবং ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্স সারা বিশ্বের সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

 

বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালনের গুরুত্ব: —

 

হেপাটাইটিসের বিভিন্ন রূপ এবং সেগুলি কীভাবে সংক্রমিত হয় সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা;

ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং এর সাথে সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধ, স্ক্রীনিং এবং নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করা;

হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন কভারেজ বৃদ্ধি এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে একীকরণ; এবং

হেপাটাইটিস একটি বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সমন্বয়.

 

দিবসটির উদ্দেশ্য হচ্ছে সারাবিশ্বে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করা। রোগনির্ণয়, প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা ৷

 

 

 

প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট থিম উপর ফোকাস.  থিমের তালিকা নিম্নরূপ:

২০১১: হেপাটাইটিস প্রত্যেককে, সর্বত্র প্রভাবিত করে।  এটা জানেন.  এটা মোকাবিলা.  তার মুখোমুখি.

২০১২: এটি আপনার ধারণার চেয়ে কাছাকাছি।

২০১৩: এই নীরব হত্যাকারীকে থামাতে আরও কিছু করতে হবে।

২০১৪: হেপাটাইটিস: আবার চিন্তা করুন

২০১৫: ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ।  এখনই কাজ করুন।

২০১৬: হেপাটাইটিস-এক্ট এখনই জানুন।

২০১৭: হেপাটাইটিস নির্মূল করুন।

২০১৮: পরীক্ষা।  চিকিৎসা।  হেপাটাইটিস।

২০১৯: হেপাটাইটিস নির্মূলে বিনিয়োগ করুন।

২০২০: হেপাটাইটিস মুক্ত ভবিষ্যত।

২০২১: হেপাটাইটিস অপেক্ষা করতে পারে না।

২০২২: হেপাটাইটিস যত্নকে আপনার কাছাকাছি নিয়ে আসা।

২০২৩ : এক জীবন, এক লিভার।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
অনুগল্প প্রবন্ধ

আদি শঙ্করাচার্য সম্পর্কে কিছু কথা : রাণু সরকার।

যেকোনো ভ্রান্ত মতবাদকে তথা দোষযুক্ত মতবাদকে খণ্ডন করতে অদ্বৈতবাদ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আদি শঙ্করাচার্য হলেন সেই অদ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু তিনি যে শুধুমাত্র অদ্বৈতবাদী তেমনটাও না, বরং তিনি অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতবাদের মিলন। ভারতে বৌদ্ধদর্শনের শূন্যবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় সনাতন সংস্কৃতি যখন লোপ পেতে থাকল, তখন তাঁর আবির্ভাবে এবং তাঁর কঠোর পরিশ্রমে পুনরায় দৃঢ়মূলে সনাতন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেল। ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রের বেদান্তের সর্বোচ্চ তত্ত্ব অদ্বৈতবাদ প্রচারের জন্য তিনি ভারতের সমস্ত সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে দশনামধারী দশটি সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে যথা : তীর্থ, আশ্রম, বন, অরণ্য, গিরি, পর্বত, সাগর, সরস্বতী, ভারতী এবং পুরীকে বাছাই করে তারপর ভারতের চারপ্রান্তে চারটি মঠ যথা : পূর্বে ওড়িশার পুরীতে গোবর্ধনমঠ, পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকায় সারদামঠ, উত্তরে উত্তরখন্ডের বদ্রিকাশ্রমে জ্যোতির্মঠ এবং দক্ষিণে কর্ণাটকের শৃঙ্গেরীতে শৃঙ্গেরীমঠ স্থাপন করে উক্ত দশনামধারী সম্প্রদায়কে একত্রিত করে কার্যভার প্রদান করেন এবং উক্ত মঠে মহন্তরূপে চারজন শঙ্করাচার্যের পরম্পরা শুরু করেন। ভারতের ৪২ সাধকদের মধ্যে অন্যতম হলেন আদি শঙ্করাচার্য, তিনি জাগ্রত চৈতন্য। হিন্দু সম্প্রদায় এবং সনাতন ধর্ম অর্থাৎ আত্মধর্ম অর্থাৎ স্বধর্ম এখনও পর্যন্ত ভারতে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার নেপথ্যে আদি শঙ্করাচার্যের যে বহু অবদান আছে তা অনস্বীকার্য। অদ্বৈত উপলব্ধি সাধনার সর্বোচ্চ উপলব্ধি, কিন্তু তা উপলব্ধি করতে বহু প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়, আদি শঙ্করাচার্যও তা অতিক্রম করেন। তাঁর শুদ্ধ ভক্তি ও সাধনা সমস্ত সনাতনীদের জন্য প্রবল উৎসাহ বহন করে। আদি শঙ্করাচার্য হলেন ব্রহ্মবিদ্বরিষ্ঠ, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা (ভ্রম), জগত-ব্রহ্ম এক। তাঁর মতবাদ গুরুসহায়ে শুদ্ধচিত্তে মনন করলে ব্রহ্ম উপলব্ধির পথ অর্থাৎ পরম সত্য উপলব্ধির পথ অর্থাৎ জীবদ্দশায় জীবন্মুক্তির পথ সরল হয়।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ভারতের মিসাইল ম্যান, এপিজে আবদুল কালাম : প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 

আব্দুল কালাম ছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি একজন বিজ্ঞানীও ছিলেন। তিনি স্বাধীন ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি যিনি ধর্মনিপেক্ষভাবে নির্বাচিত হন। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের রামেশ্বরমে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। ভারতীয় বিজ্ঞান সংস্থা ইসরো তে তিনি একজন বিজ্ঞানী হিসাবে কাজ করেন। মহাকাশযানবাহী রকেট এবং বালিস্টিক মিসাইলের উপর অবদানের জন্য তাঁকে ভারতের Missile Man বলা হয়।

 

আব্দুল পাকির জয়নুলাবদিন আব্দুল কালাম ছিলেন একজন ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রনায়ক যিনি ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের সাধারণ এক পরিবারে ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর  জন্ম হয় এপিজে আব্দুল কালামের। তখন রামেশ্বরম বৃটিশ ভারতের  মাদ্রাস প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ছিল। তাঁর বাবার নাম জয়নুল আবেদীন এবং মায়ের নাম আশিয়াম্মা। তাঁর জীবনে তাঁর বড় বোন জোহরা এবং ভগ্নিপতি আহামাদ জালালুদ্দীনেরও অনেক প্রভাব ছিল। রামেশ্বরম এবং তাম্রেশ্বরম এবং রমেশ্বরম এবং স্টান্ট ইঞ্জিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠেন।

 

তিনি পরবর্তী চার দশক একজন বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান প্রশাসক হিসেবে কাটিয়েছেন, প্রধানত ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO) এবং ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ISRO) এ এবং ভারতের বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি এবং সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন প্রচেষ্টার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন।  এইভাবে তিনি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উৎক্ষেপণ যান প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করার জন্য ভারতের মিসাইল ম্যান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।  এছাড়াও তিনি ১৯৯৮ সালে ভারতের পোখরান-II পারমাণবিক পরীক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক, প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা ১৯৭৪ সালে ভারতের মূল পারমাণবিক পরীক্ষার পর প্রথম।

ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তৎকালীন বিরোধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস উভয়ের সমর্থনে কালাম ২০০২ সালে ভারতের ১১ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।  ব্যাপকভাবে “জনগণের রাষ্ট্রপতি” হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তিনি একটি একক মেয়াদের পরে তার শিক্ষা, লেখালেখি এবং জনসেবার নাগরিক জীবনে ফিরে আসেন।  তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান, ভারতরত্ন সহ বেশ কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের প্রাপক ছিলেন।

 

তিনি মানুষের মাঝে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করতেন। ভালবাসতেন নিজের জীবনের শিক্ষা তরুণ পজন্মের মাঝে পৌঁছে দিতে । তেমনই  ২০১৫ সালে ২৭শে জুলাই মেঘালয়ের শিলং শহরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানে বসবাসযোগ্য পৃথিবী বিষয়ে বক্তব্য রাখছিলেন । ভারতীয় সময় ৬টা ৩০ মিনিটে বক্তব্য রাখা অবস্থায় তাঁর হার্ট এ্যটাক হয় এবং তাকে বেথানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ তাঁর মৃত্যু ঘটে ।

৮৪ বছর বয়সে দেশের জন্য নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করে যাওয়া এ মহাপুরুষ পরলোক গমন করেন। ২৯শে জুলাই তাঁর জন্মস্থান রামেশ্বরমেই তাকে দাফন করা হয়।

 

কালামের লেখা—

 

এ পি জে আব্দুল কালাম এবং রোদ্দাম নরসিমহা দ্বারা তরল মেকানিক্স এবং স্পেস টেকনোলজির উন্নয়ন;  ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেস, ১৯৮৮।

ভারত ২০২০: এ পি জে আবদুল কালাম, ওয়াই এস রাজন-এর নতুন সহস্রাব্দের জন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি;  নিউ ইয়র্ক, ১৯৯৮।

উইংস অফ ফায়ার: এ পি জে আবদুল কালাম, অরুণ তিওয়ারির একটি আত্মজীবনী;  বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ১৯৯৯।

ইগনিটেড মাইন্ডস: এ পি জে আবদুল কালামের দ্বারা ভারতের মধ্যে শক্তি উন্মোচন করা;  ভাইকিং, ২০০২।

দ্য লাউমিনাস স্পার্কস এ পি জে আবদুল কালাম, দ্বারা;  পুণ্য পাবলিশিং প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০৪।

এ পি জে আবদুল কালামের মিশন ইন্ডিয়া, মানব গুপ্তের আঁকা ছবি;  পেঙ্গুইন বই, ২০০৫।

এ পি জে আবদুল কালামের অনুপ্রেরণামূলক চিন্তা;  রাজপাল অ্যান্ড সন্স, ২০০৭।

এ পি জে আবদুল কালামের অদম্য আত্মা;  রাজপাল অ্যান্ড সন্স প্রকাশনা

শিবথানু পিল্লাইয়ের সাথে এ পি জে আব্দুল কালামের দ্বারা একটি ক্ষমতাপ্রাপ্ত জাতির কল্পনা করা;  টাটা ম্যাকগ্রা-হিল, নয়াদিল্লি

ইউ আর বর্ন টু ব্লসম: টেক মাই জার্নি বিয়ন্ড এ পি জে আবদুল কালাম এবং অরুণ তিওয়ারি;  ওশান বুকস, ২০১১।

টার্নিং পয়েন্টস: এ পি জে আব্দুল কালামের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে একটি যাত্রা;  হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া, ২০১২।

এ পি জে আবদুল কালাম এবং সৃজন পাল সিং-এর লক্ষ্য ৩ বিলিয়ন;  ডিসেম্বর ২০১১ (প্রকাশক: পেঙ্গুইন বই)।

মাই জার্নি: এ পি জে আবদুল কালাম দ্বারা স্বপ্নকে কর্মে রূপান্তর করা;  রূপা পাবলিকেশন দ্বারা ২০১৪।

পরিবর্তনের জন্য একটি ইশতেহার: এ পি জে আব্দুল কালাম এবং ভি পোনরাজের ভারত ২০২০ এর সিক্যুয়েল;  হার্পারকলিন্স দ্বারা জুলাই ২০১৪।

আপনার ভবিষ্যত তৈরি করুন: এ পি জে আবদুল কালামের দ্বারা স্পষ্ট, স্পষ্ট, অনুপ্রেরণামূলক;  রাজপাল অ্যান্ড সন্স দ্বারা, ২৯ অক্টোবর ২০১৪।

পুনরুজ্জীবিত: এ পি জে আব্দুল কালাম এবং সৃজন পাল সিং দ্বারা একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক পথ;  পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া দ্বারা, ১৪ মে ২০১৫।

অরুণ তিওয়ারির সঙ্গে এ পি জে আবদুল কালামের প্রমুখ স্বামীজির সঙ্গে আমার আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা;  হার্পারকলিন্স পাবলিশার্স, জুন ২০১৫।

অ্যাডভান্টেজ ইন্ডিয়া: ফ্রম চ্যালেঞ্জ টু অপারচুনিটি এ পি জে আবদুল কালাম এবং সৃজন পাল সিং দ্বারা;  হার্পারকলিন্স পাবলিশার্স, ১৫ অক্টোবর ২০১৫।

 

তার জীবদ্দশায় ৮৪ বছরের দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দর্শন থেকে আমাদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য মহামূল্যবান বাণী। তার মধ্যে কিছু সংকলন করা হলো-

 

(ক) স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে যাও। স্বপ্ন সেটা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখো, স্বপ্ন হলো সেটাই যা তোমাকে ঘুমোতে দেয় না।

(খ) মানুষ তার ভবিষ্যত পরিবর্তন করতে পারে না, কিন্তু অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে। অভ্যাসই মানুষের ভবিষ্যত পরিবর্তন করে দেয়।

(গ) তুমি যদি সূর্যের মতো আলো ছড়াতে চাও, তাহলে আগে সূর্যের মতো পুড়তে শেখো।

(ঘ) একটি ভালো বই একশ ভালো বন্ধুর সমান, কিন্তু একজন ভালো বন্ধু একটি লাইব্রেরির সমান।

(ঙ) সফলতার গল্প পড়ো না, কারণ তা থেকে তুমি শুধু গল্পটাই পাবে। ব্যর্থতার গল্প পড়ো, তাহলে সফল হওয়ার কিছু উপায় পাবে।

(চ) উদার ব্যক্তিরা ধর্মকে ব্যবহার করে বন্ধুত্বের হাত বাড়ান। কিন্তু সংকীর্ণমনস্করা ধর্মকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

(ছ) ছাত্রজীবনে আমি বিমানের পাইলট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়েছি, হয়ে গেছি রকেট বিজ্ঞানী।

(জ) জীবন ও সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। জীবন শেখায় সময়কে ভালোভাবে ব্যবহার করতে আর সময় শেখায় জীবনের মূল্য দিতে।

(ঝ) যারা মন থেকে কাজ করে না, তারা আসলে কিছুই পায় না। আর পেলেও সেটা হয় অর্ধেক হৃদয়ের সফলতা। তাতে সব সময়ই একরকম তিক্ততা থেকে যায়।

(ঞ) কঠিন কাজে আনন্দ বেশি পাওয়া যায়। তাই সফলতার আনন্দ পাওয়ার জন্য মানুষের কাজ কঠিন হওয়া উচিত।

(ট) প্রথম সাফল্যের পর বসে থেকো না। কারণ দ্বিতীয়বার যখন তুমি ব্যর্থ হবে তখন অনেকেই বলবে প্রথমটিতে শুধু ভাগ্যের জোরে সফল হয়েছিলে।

(ঠ) বৃষ্টি শুরু হলে সব পাখিই কোথাও না কোথাও আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু ঈগল মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে বৃষ্টিকে এড়িয়ে যায়।

(ড) নেতা সমস্যায় ভয় পান না। বরং সমস্যার মোকাবিলা করতে জানবেন। তাকে কাজ করতে হবে সততার সঙ্গে।

(ঢ) জাতির সবচেয়ে ভালো মেধা ক্লাসরুমের শেষ বেঞ্চ থেকে পাওয়া যেতে পারে।(ণ) আমি সুপুরুষ নই। কিন্তু যখন কেউ বিপদে পড়েন আমি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। সৌন্দর্য থাকে মানুষের মনে, চেহারায় নয়।

(ত) তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার বার্তা হলো- তাদের ভিন্নভাবে চিন্তা করবার সাহস থাকতে হবে। মনের ভেতর আবিষ্কারের তাড়না থাকতে হবে। নিজের সমস্যা নিজে মেটাবার মানসিকতা থাকতে হবে।

(থ) কাউকে হারিয়ে দেয়াটা খুব সহজ, কিন্তু কঠিন হলো কারো মন জয় করা।

(দ) জীবনে সমস্যার প্রয়োজন আছে। সমস্যা আছে বলেই সাফল্যে এতো আনন্দ।

(ধ) যে হৃদয় দিয়ে কাজ করে না, শূন্যতা ছাড়া সে কিছুই অর্জন করতে পারে না।

(ন) সেই ভালো শিক্ষার্থী যে প্রশ্ন করে। প্রশ্ন না করলে কেউ শিখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে।

(প) সমাপ্তি মানেই শেষ নয়। ‘END’ শব্দটির মানে হচ্ছে ‘Effort Never Dies’ অর্থাৎ ‘প্রচেষ্টার মৃত্যু নেই’।

(ফ) উপরে তাকিয়ে আকাশটাকে দেখো। তুমি একা নও, এই মহাবিশ্ব তোমার বন্ধুর মতোই।

(ব) স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না।

(ভ) ফেল করে হতাশ হয়ো না। ইংরেজি শব্দ ফেল ‘Fail’ মানে ‘First Attempt in Learning’ অর্থাৎ ‘শেখার প্রথম ধাপ’। বিফলতাই তোমাকে সফল হবার রাস্তা দেখিয়ে দেবে।

(ম) কোনো একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছো না! চিন্তিত করো না- ‘NO’ শব্দের মানে হচ্ছে ‘Next Opportunity’ অর্থাৎ ‘পরবর্তী সুযোগ’।

(য) আমরা শুধু সাফল্যের উপরেই গড়ি না, ব্যর্থতার উপরেও গড়ি।

(র) একজন খারাপ ছাত্র একজন দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে যা শিখতে পারে তার চেয়ে একজন ভালো ছাত্র একজন খারাপ শিক্ষকের কাছ থেকে অনেক বেশি শিখতে পারে।

(ল) তুমি যদি তোমার কাজকে স্যালুট করো, দেখো তোমাকে আর কাউকে স্যালুট করতে হবে না। কিন্তু তুমি যদি তোমার কাজকে অসম্মান করো, অমর্যাদা কর, ফাঁকি দাও, তাহলে তোমার সবাইকে স্যালুট করতে হবে।

(ব)  প্রতিদিন সকালে এই পাঁচটা লাইন বলো:

১) আমি সেরা

২) আমি করতে পারি

৩) সৃষ্টিকর্তা সব সময় আমার সঙ্গে আছে

৪) আমি জয়ী

৫) আজ দিনটা আমার

(শ)  তিনজনই পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তাঁরা হলেন, বাবা, মা ও শিক্ষক।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

আজাদ আজাদ হিন্দ ফৌজের রানী ঝাঁসি রেজিমেন্টের সৈনিক ও প্রথম গুপ্তচর : নীরা আর্য।

ভূমিকা:-

 

তিনি ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম মহিলা গুপ্তচর, আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষী সেহেগল। দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভুত মহিলা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ১৯৪৩ সালে গড়ে উঠেছিল এই রেজিমেন্ট। ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল ব্যাংকক, রেঙ্গুন ও সিঙ্গাপুর।

 

 নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকে হত্যা —

 

নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের স্বামীকে হত্যা করেন। নেতাজী তাঁকে নীরা নাগিনী বলে অভিহিত করলে তিনি নীরা নাগিনী নামে পরিচিতি লাভ করেন। বৃটিশ সরকার তাঁকে একজন গুপ্তচর হিসাবে গণ্য করেছিল। তার ভাই বসন্ত কুমারও আজাদ হিন্দ ফৌজে ছিলেন।

 

প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সাহসী ও আত্মসম্মান বোধ–

 

অনেক লোকশিল্পী নীরা নাগিন ও তার ভাই বসন্ত কুমারের জীবন নিয়ে কবিতা ও ভজন রচনা করেছেন। নীরা নাগিনী নামে তার জীবনের একটি মহাকাব্যও রয়েছে। তার জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তিনি ছিলেন এক দুর্দান্ত দেশপ্রেমিক, সাহসী ও আত্মসম্মান বোধে গর্বিত মহিলা। তার শেষ জীবন কাটে হায়দ্রাবাদে। সেখানকার মহিলারা তাকে গর্বের সাথে ‘পদ্মমা’ বলে সম্বোধন করতেন।

 

জন্ম ও শিক্ষাজীবন—-

 

নীরা আর্য ১৯০২ সালের ৫ মার্চ ভারতের তৎকালীন যুক্তপ্রদেশের অধুনা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাগপত জেলার খেকড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা শেঠ ছজুমল ছিলেন সে সময়ের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা-বাণিজ্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পিতার ব্যবসায়ের মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই কলকাতাতে তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। নীরা আর্য হিন্দি, ইংরেজি, বাংলার পাশাপাশি আরও অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে বিবাহ করেন। শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ইংরেজপ্রভু ভক্ত অফিসার। মূলতঃ শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে গুপ্তচরবৃত্তি করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ—–

 

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসার শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে হত্যা করেছিলেন। একসময় সুযোগ পেয়ে শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নেতাজিকে হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গুলি নেতাজির গাড়ীর চালককে বিদ্ধ করে । কিন্তু এরই মধ্যে নীরা আর্য শ্রীকান্ত জয়রঞ্জনের পেটে বেয়নেট চালিয়ে হত্যা করে। শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নীরা আর্যের স্বামী ছিলেন, তাই স্বামী হত্যার কারণে নেতাজি তাঁকে নাগিনী বলে অভিহিত করেছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণের পরে, সমস্ত বন্দী সৈন্যকে দিল্লির লাল কেল্লায় বিচারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নীরাকে স্বামী হত্যার কারণে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। জেলে বন্দীদশায় সেখানে তাঁকে কঠোর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।

 

আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর—–

নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। পবিত্র মোহন রায় আজাদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহিলা এবং পুরুষ উভয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন।   নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজেই নীরাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গী মনবতী আর্য, সরস্বতী রাজামণি এবং দুর্গা মল্লা গোর্খা এবং যুবক ড্যানিয়েল কালে তার সামরিক গোয়েন্দা শাখার সাথে যুক্ত ছিল। তারা নেতাজির জন্য গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করত। তারা বিভিন্ন কাজের অছিলায় ব্রিটিশ অফিসারদের বাড়ি ও সেনাশিবিরে প্রবেশ করতেন তথ্য সংগ্রহের জন্য, তারপর তা নেতাজীর কাছে পাঠাতেন। এই কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লে প্রথমে নথিগুলি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া ও পরে পিস্তল চালিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে, এই নিয়ম তারা কঠোর ভাবে মেনে চলতেন।

 

 রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে নীরাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড–

 

দক্ষিণ এশিয়ার অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ। ধরা পড়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের হাজার হাজার সেনানী। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে লালকেল্লায় তাদের বিচার শুরু হয়, বেশির ভাগ সেনানী ছাড়া পেলেও নীরাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, জাহাজে করে পাঠানো হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে। সেখানে তার ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
আন্দামানে নীরাকে রাখা হয়েছিল একটি ছোট কুঠরিতে, সেখানে বাকি বন্দিরা ছিল মুক্ত, কিন্তু নীরাকে বন্য জন্তুর মত প্রথমদিন বেঁধে রাখা হয়েছিল। গলায় বাঁধা ছিল চেন ও হাতে-পায়ে ছিল শেকল লাগানো বেড়ি। নীরাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি প্রথম দিন। শোয়ার জন্য মাদুর কিংবা কম্বল কিছুই দেওয়া হয়নি প্রথমে। কুঠরির কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন পরিশ্রান্ত নীরা। মাঝরাতে এক প্রহরী কুঠরিতে ঢুকে গায়ের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিল দুটো কম্বল। সকাল বেলায় প্রথম জুটেছিল খাবার, খেতে দেওয়া হয়েছিল ফুটন্ত খিচুড়ি।

এরপরেও আরও অনেক পাশবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে নীরাকে। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন ভারতে সূর্যোদয় দেখবেন। এই মহান ত্যাগের সম্মান দেয়নি দেশ। নীরা আন্দামানে আসার একবছর পর স্বাধীন হয়েছিল দেশ। মুক্তি পেয়েছিলেন নীরা। এই আত্মত্যাগের সম্মান দেয়নি দেশ। অভিমানে সাধারণের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন অসাধারণ নীরা।

 

স্বাধীনতা পরবর্তী জীবন–

 

স্বাধীনতার পরে, তিনি ফুল বিক্রি করে জীবনযাপন করেছিলেন, তবে কোনও সরকারী সহায়তা বা পেনশন গ্রহণ করেননি। তার ভাই বসন্ত কুমারও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পর সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। নীরা স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা নিয়ে আত্মজীবনীও লিখেছেন। উর্দু লেখক ফারহানা তাজ’কে তিনি তার জীবনের অনেক ঘটনা শুনিয়েছিলেন। তিনি তার জীবন নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে একটি উপন্যাসও রচনা করেন।

 

সম্মাননা—

 

নীরা আর্য নামে একটি জাতীয় পুরষ্কারও চালু করা হয়েছে। ছত্তিশগড়ের অভিনেতা অখিলেশ পান্ডে প্রথম নীরা আর্য পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবং তাঁকে নীরা আর্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

 

জীবনাবসান—

 

শেষ জীবনে তিনি  তিনি দরিদ্র, অসহায়, নিঃস্ব হয়ে পরেছিলেন।  হায়দরাবাদের ফালকনুমার একটি কুঁড়ে ঘরে বাস করতেন। নীরা আর্য জীবনের শেষ দিনগুলিতে ফুল বিক্রি করে কাটিয়েছেন এবং সরকারি জমিতে থাকার কারণে তার কুঁড়েঘরটিও শেষ মুহুর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সকলের অলক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ২৬শে জুলাই উসমানিয়া হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছিলেন ৯৬ বছরের বীরাঙ্গনা এক অগ্নিকন্যা নীরা আর্য্য।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ ২৬ জুলাই, কার্গিল বিজয় দিবস, জানুন দিনটির ইতিহাস ও গুরুত্ব।

কার্গিল বিজয় দিবস ভারতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী ভারতীয় বীরদের স্মরণে সারা দেশে কার্গিল বিজয় দিবস উদযাপিত হয়।প্রতি বছর ২৬ জুলাই কার্গিল যুদ্ধের বীরদের সম্মানে দিনটি পালিত হয়। এই দিনটি সারা ভারতে এবং জাতীয় রাজধানী নয়াদিল্লিতে পালিত হয়, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রতি বছর ইন্ডিয়া গেটে অমর জওয়ান জ্যোতিতে সৈন্যদের শ্রদ্ধা জানান।  ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অবদানকে স্মরণ করার জন্য সারা দেশে অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।

১৯৯৯ সালে লাদাখের উত্তর কারগিল জেলার পাহাড়ের চূড়ায় পাকিস্তানি বাহিনীকে তাদের দখলকৃত অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের বিজয়কে পালন করতে প্রতি ২৬ জুলাই ভারতে পালিত হয় কার্গিল বিজয় দিবস  ।

 

প্রাথমিকভাবে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধে তাদের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে, দাবি করে যে এটি কাশ্মীরি সামরিক বাহিনী দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। তবে হতাহতদের রেখে যাওয়া নথি, যুদ্ধবন্দিদের সাক্ষ্য এবং পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফের বিবৃতিতে জেনারেল আশরাফ রশিদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি আধা-সামরিক বাহিনী জড়িত ছিল।

 

 

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে, সিয়াচেন হিমবাহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষ রয়েছে। ১৯৯৯ সালের মে মাসে, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী কাশ্মীর এবং লাদাখের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে নিয়ন্ত্রণ রেখায় (LOC) প্রবেশ করে। এইভাবে, তারা ভারতীয় সৈন্যদের লক্ষ্য করার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে এবং পর্বতশ্রেণী দখল করে। ভারত সরকার শীঘ্রই কাজ শুরু করে এবং ‘অপারেশন বিজয়’ দিয়ে জবাব দেয়।

১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে, দুই প্রতিবেশীর সামরিক বাহিনীকে জড়িত তুলনামূলকভাবে কয়েকটি প্রত্যক্ষ সশস্ত্র সংঘাতের দীর্ঘ সময়কাল ছিল – পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে সামরিক ফাঁড়ি স্থাপন করে সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উভয় দেশের প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করেনি।  শৈলশিরা এবং ১৯৮০ এর দশকে এর ফলে সামরিক সংঘর্ষ।  1990-এর দশকে, তবে, কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের কারণে উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি পায়, সেইসাথে 1998 সালে উভয় দেশের পারমাণবিক পরীক্ষা পরিচালনার ফলে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি প্রশমিত করার প্রয়াসে, উভয় দেশই ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোর ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে, কাশ্মীর সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক সমাধান প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে।  ১৯৯৮-১৯৯৯ সালের শীতকালে, পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর কিছু উপাদান গোপনে পাকিস্তানি সৈন্য এবং আধাসামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ রেখার (LOC) ভারতের দিকে ভূখণ্ডে পাঠাচ্ছিল।  অনুপ্রবেশের কোড-নাম ছিল ‘অপারেশন বদ্রি’।  পাকিস্তানি অনুপ্রবেশের লক্ষ্য ছিল কাশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং ভারতীয় বাহিনীকে সিয়াচেন হিমবাহ থেকে প্রত্যাহার করা, এইভাবে ভারতকে বৃহত্তর কাশ্মীর বিরোধের নিষ্পত্তিতে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।  পাকিস্তানও বিশ্বাস করেছিল যে এই অঞ্চলে যে কোনও উত্তেজনা কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করবে, এটি একটি দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।  তবুও আরেকটি লক্ষ্য হতে পারে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের মাধ্যমে ভারতের কাশ্মীর রাজ্যে দশকব্যাপী বিদ্রোহের মনোবল বাড়ানো।

প্রাথমিকভাবে, অনুপ্রবেশের প্রকৃতি এবং ব্যাপ্তি সম্পর্কে সামান্য জ্ঞানের সাথে, এলাকার ভারতীয় সৈন্যরা অনুপ্রবেশকারীরা জিহাদি বলে ধরে নিয়েছিল এবং ঘোষণা করেছিল যে তারা কয়েক দিনের মধ্যে তাদের উচ্ছেদ করবে।  অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারা নিযুক্ত কৌশলের পার্থক্য সহ LOC বরাবর অন্যত্র অনুপ্রবেশের পরবর্তী আবিষ্কার, ভারতীয় সেনাবাহিনী বুঝতে পেরেছিল যে আক্রমণের পরিকল্পনাটি অনেক বড় পরিসরে ছিল।  প্রবেশের দ্বারা জব্দ করা মোট এলাকা সাধারণত  ১৩০ কিমি ২ – ২০০ কিমি ২ এর মধ্যে গ্রহণ করা হয়।  ভারত সরকার ২০০০০০ ভারতীয় সৈন্যদের একত্রিত করা অপারেশন বিজয়ের সাথে প্রতিক্রিয়া জানায়।  ২৬ জুলাই, ১৯৯৯ তারিখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যদের তাদের দখলকৃত অবস্থান থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে, এইভাবে এটিকে কার্গিল বিজয় দিবস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

 

 

ভারতীয় সৈন্যরা ধাপে ধাপে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করেছিল।প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে দুই মাসব্যাপী যুদ্ধটি তিনটি পর্বে হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে, পাকিস্তানি বাহিনী টাইগার হিল এবং অন্যান্য পোস্টে নিজেদের অবস্থান করে ভারতীয় ভূখণ্ডে আক্রমণ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিবহন রুট দখল করে এবং পাকিস্তানি আক্রমণাত্মক লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে প্রতিক্রিয়া জানায়। কার্গিল যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতীয় বিমান বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি সেনাদের সরিয়ে দেওয়ার মিশন সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছিল।

 

২৬ শে জুলাই, ১৯৯৯-এ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈন্যদের তাদের দখলকৃত অবস্থান থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে, এইভাবে এটিকে কার্গিল বিজয় দিবস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। যুদ্ধের সময় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ৫২৭ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাত্রা সেই সাহসী সৈনিকদের একজন যারা দেশের জন্য লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছিলেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার পরম বীর চক্রে ভূষিত হন।

 

এই দিনে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ডিয়া গেটে অমর জওয়ান জ্যোতিতে সৈন্যদের শ্রদ্ধা জানান। বাইরের শক্তির হাত থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান উদযাপনের জন্য দেশজুড়ে উদযাপনেরও আয়োজন করা হয়। স্মৃতিসৌধে শহিদদের পরিবারকেও স্বাগত জানানো হয়।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

অরোভিলের জননী – মীরা আলফাসা ::: সৌরভকুমার ভূঞ্যা।।।।

অরোভিল কিংবা ‘ভোরের শহর’। তামিলনাড়ুর ভিল্লুপুরম জেলায় অবস্থিত ছোট্ট সুন্দর শহর অরোভিল। যার কিছুটা অংশ রয়েছে পণ্ডেচেরিতেও। যে পণ্ডেচেরি শহরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুজন বিখ্যাত মানুষের নাম, ঋষি অরবিন্দ এবং তাঁর শিষ্যা ও সহযোগী মীরা আলফাসা। গুরুদেব অরবিন্দের আদর্শ মাথায় নিয়ে পরীক্ষামূলক এই শহরটি স্থাপন করেছিলেন মীরা আলফাসা। অরোভিল একটি ফরাসী শব্দ। ফরাসীতে ‘auro’ শব্দের অর্থ ভোর আর ‘ville’ শব্দের অর্থ শহর। এককথায় ভোরের শহর। তবে অনেকের মতে মিরা আলফাসা গুরুদেব অরবিন্দের নামে এই শহরের নামকরণ করেছিলেন। নামকরণের নেপথ্য কাহিনি যাই থাক, মীরার এই শহর পত্তনের উদ্দেশ্য ছিল অরবিন্দের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা। তার আদর্শ ও ভাবনাচিন্তাকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
ভারতবর্ষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, আধ্যাত্মিকতা প্রভৃতির টানে যুগের পর যুগ ধরে বহু মানুষ সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এদেশে ছুটে এসেছেন, এখনও আসেন। তাদের অনেকে এই দেশকে ভালোবেসে এখানেই পাকাপাকিভাবে থেকে গেছেন। এখানকার সভ্যতা, সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছেন। এরকম অনেক মানুষ আছেন যাদের কথা আমরা জানতে পারি না। আবার এমন কেউ কেউ আছেন যারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের ইতিহাসের পাতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে এরকম অনেক খ্যাতনামা মানুষের কথা আমরা জানতে পারি। তেমনই একজন মহিলা হলেন মীরা আলফাসা। আধ্যাত্মিকতার টানে সুদূর ফ্রান্স থেকে তিনি ভারতবর্ষে ছুটে এসেছিলেন এবং আমৃত্যু এখানেই কাটিয়েছেন।
* * * * *
মীরা আলফাসার পুরো নাম ব্লাঞ্চে রেচেল মীরা আলফাসা। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি প্যারিসে জন্ম হয় তার। বাবা মরিস আলফাসা ও মা মাথিলদে ইসমালুন। ছোটোবেলা থেকে মীরা ছিলেন আলাদা প্রকৃতির। যখন তাঁর বয়স চার বছর তখন থেকেই তিনি ধ্যান করতেন। নিজের মধ্যে একাত্ম হয়ে যেতেন। ঘরে তার জন্য থাকা একটি ছোট্ট চেয়ারের ওপর বসে তিনি ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। তিনি বুঝতে পারতেন তার মনের মধ্যে আলাদা কিছু ঘটে চলেছে। তাঁর কথায়, ‘চার বছর বয়স থেকে আমি যোগা বা ধ্যান করতে শুরু করেছিলাম। আমার জন্য একটা ছোট্ট চেয়ার ছিল। আমি তার ওপর চুপ করে বসতাম আর ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেতাম। একটা উজ্জ্বল আলো আমার মাথার ওপর নেমে আসত এবং আমার মাথায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্ট করত। আমি কিছু বুঝতে পারতাম না। কেননা বয়সটা বোঝার মতো ছিল না। তবে ধীরে ধীরে আমি অনুভব করতে পারি আমি হয়তো এমন কোনো মহান কাজ করার জন্য এসেছি যার কথা কেউ জানে না।’ সেই ছোট্টবেলা থেকেই তিনি জগতের দূর্দশা, মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা বুঝতে পারতেন। যখন তাঁর বয়স এগারো বারো বছর, তখন থেকে তিনি প্যারিসের কাছাকাছি একটি বনে একাকী ঘুরে বেড়াতেন। বনটি বেশ পুরোনো। এখানে এমনকি দুহাজার বছরের পুরোনো গাছ ছিল। সেখানে কোনো গাছের নীচে বসে তিনি গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। বনের গাছপালা, পশু পাখিদের সঙ্গে তিনি অদ্ভুত একাত্মতা অনুভব করতে পারতেন। সেই বয়স থেকে তার মধ্যে গুপ্তবিদ্যার প্রতি আগ্রহ জন্মতে শুরু করে। নানারকম মানসিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে থাকেন। তিনি স্পষ্টই অনুভব করেন ঈশ্বর আছেন এবং মানুষ চেষ্টা করলে সেই ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হতে পারে। তাঁর ঘুমন্ত সত্ত্বায় কেউ যেন এসে তাঁকে এই শিক্ষা দিয়ে যেত। যে সত্ত্বাকে তিনি ঈশ্বর বলে মানতেন, যাকে পরবর্তীকালে তিনি কৃষ্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন তিনি সেই ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাবেন।
এরকম এক ঐশ্বরিক কিংবা স্বর্গীয় ঘটনার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। রাত্রে শুতে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হত তার। কোনো কোনোদিন শুয়ে পড়ার পর অনুভব করতে পারতেন তার মধ্যেকার সত্ত্বা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। তারপর তা ক্রমশ উপরে উঠত থাকে। দেখতেন তার সেই শরীরে একটা সোনালী পোশাক। নারী পুরুষ, শিশু বৃদ্ধ, অসুস্থ দুর্ভাগ্যপীড়িত মানুষ তার পোশাকের নীচে হাজির হয়েছে। তারা নিজেদের দুঃখ দূর্দশার কথা তার কাছে ব্যক্ত করছে। তার কাছে সাহায্যের আবেদন করছে। যেইমাত্র না তারা তার সোনালী পোশাক স্পর্শ করত সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, দূর্দশা চলে যেত। এই ব্যাপারটা তাঁকে নাড়িয়ে দিত। তার মনে হত সাধারণের মতো জীবন তার নয়। আলাদা কিছু কাজের জন্য তার এই পৃথিবীতে আসা।
সেই ছোটোবেলা থেকে নানান অদ্ভুত, অতিপ্রাকৃত ঘটনা তাঁর জীবনে ঘটত। মীরার মায়ের চোখেও মেয়ের ব্যতিক্রমী স্বভাব ও আচরণ নজর এড়ায় না। তিনি মনে করতেন মেয়ের মানসিক সমস্যা রয়েছে।
নয় বছর বয়সে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়। স্কুলজীবন শেষ করে পনের বছর বয়সে তিনি আর্ট সেন্টারে আকাদেমি জুলিয়ানে ভর্তি হয়েছিলেন চিত্রকলা শেখার জন্য। এখানে তিনি চার বছর পড়াশোনা করেন। তার চিত্রকলার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীও হয়। যাই হোক, এখানে পড়াশোনা করার সময় তার পরিচয় হয় হেনরি মারসেটের সঙ্গে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর তাদের বিয়ে হয়। পরের বছর তাঁদের একমাত্র সন্তান আন্দ্রের জন্ম হয়।
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মীরা একটি ছোটো দল গঠন করেন। নাম দেন আইডিয়া। প্রত্যেক বুধবার সন্ধ্যায় দলের সদস্যেদর নিয়ে নিজের বাড়িতে বসতেন। আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে তাদের আলোচনা হত। পাশাপাশি গুপ্তবিদ্যা নিয়েও তাঁরা আলোচনা করতেন। তিনি মনে করতেন গুপ্তবিদ্যার জ্ঞান থাকার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞান থাকাও দরকার। যার মধ্যে এই দুটি বিদ্যা থাকবে তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবেন। আধ্যাত্মকি জ্ঞান না থাকলে গুপ্তবিদ্যার খারাপ প্রয়োগ হতে পারে। এই বিষয়ে তিনি অতিমাত্রায় সচেতন ছিলেন। তাই নিজেকে নিমগ্ন করেছিলেন আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনে।
এই সময় প্যারিসে তাঁর পরিচয় হয় ম্যাক্স থিওনের সঙ্গে। গুপ্তবিদ্যা বিষয়ে তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান। দক্ষিণ আলজেরিয়ার টেলিমেসন-এ তাঁর বাড়ি। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুলাই মীরা একাকী আলজেরিয়া যান। ম্যাক্স থিওন ও তাঁর স্ত্রী আলমা থিওনের সঙ্গে দেখা করেন। ম্যাক্স থিওনের কাছ থেকে গুপ্তবিদ্যার বিষয়ে শিক্ষা নেন। শুধু সেই বছর নয়, পরের বছরও তিনি আলজেরিয়া যান। দুবছর টেলিমেশনে নিজের শিক্ষা শেষ করেন তিনি।
ম্যাক্স থিওন এই সময় ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। তিনি মীরাকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যান। মীরা এই সময়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন যা ভয়ংকর সুন্দর। সমুদ্রপথে ইউরোপ ভ্রমণে যাওয়ার সময় তাঁদের জাহাজ ভূমধ্যসাগরে ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়ের শিকার হয়। সবাই বুঝতে পারেন বড়ো বিপর্যয় ঘটতে চলেছে। এই সময় ম্যাক্স থিওন মীরাকে আদেশ দেন তাঁর অর্জিত গুপ্তবিদ্যা কাজে লাগিয়ে এই বিপর্যয় মোকাবিলা করার। গুরুর আদেশ পেয়ে মীরা নিজের দেহ থেকে বেরিয়ে মাঝ সমুদ্রে যান। খোলা সমুদ্রে কিছু ছোটো ছোটো সজীব প্রাণসত্ত্বা দেখেন যা এই সমস্যা সৃষ্টির কারণ। তিনি তাদের সঙ্গে আধ ঘন্টা কথা বলেন। তাদের বোঝান এবং এই জায়গা থেকে ছেড়ে যেতে বলেন। তারা তার কথা মেনে সেই জায়গা ছেড়ে চলে যায়। যখন তিনি জাহাজে নিজের শরীরে ফিরে আসেন দেখেন ঝড় থেমে গেছে।
এদিকে স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে হেনরির সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। বিচ্ছেদের পর তিনি রু দ্য লেভিসে একটি ছোট্ট ঘরে একাকী থাকতে শুরু করেন। তিন বছর পর, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিয়ে করেন পল রিচার্ডকে। পল ছিলেন একজন খ্যাতনামা দার্শনিক। পাশাপাশি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিকতা, যোগা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি আগ্রহী ছিলেন।
পল রাজনীতিতেও আগ্রহী ছিলেন। ভারতবর্ষের পণ্ডেচেরি তখন ফ্রান্সের অধিকারে ছিল। পলের উদ্দেশ্য ছিল এখান থেকে ফ্রান্স সিনেটে জয়লাভ করা। সেই কারণে তিনি পণ্ডেচেরি আসেন।
* * * * *
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম হয় অরবিন্দের। তাঁর বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন তৎকালীন বাংলার রংপুর জেলার জেলা সার্জেন। মা স্বর্ণলতাদেবী ছিলেন রাজ নারায়ন বসুর কন্যা।
অরবিন্দের যখন সাত বছর বয়স তখন তার বাবা কৃষ্ণধন বসু তাকে ইউরোপে পাঠান পড়াশোনা করার জন্য। এখানে চোদ্দ বছর ছিলেন তিনি। পড়াশোনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। আইসিএস পরীক্ষায় তিনি সফল হয়েছিলেন। কিশোর বয়স থেকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন ভারতবর্ষকে পরীধনতার অক্টোপাশ থেকে মুক্ত করার। দেশের স্বাধীনতার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার। তিনি স্থির করেন ইংরেজদের অধীনে কাজ করবেন না। তাই আইসিএস-এর ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনি অংশগ্রহন করেন না। ফলে ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে যান।
১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেশে ফিরে আসেন। রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বরোদা কলেজের প্রফেসর হন। পরবর্তীকালে এখানকার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হয়েছিলেন। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি দেশের কাজে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বরোদায় থাকার সময় তার পরিচয় হয় মহারাষ্ট্রের বিপ্লবী নেতা ঠাকুর সাহেবের সঙ্গে। তার কাছ থেকে তিনি বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষা নেন। তরুণ সমাজকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ কাজ করে যাচ্ছিলেন। তার ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষকেও তিনি বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন।
অরবিন্দ ঘোষ তখন বরোদা কলেজের অধ্যক্ষ। এই সময় ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নিবেদিতা তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দালনে নিজিকে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন দেশের স্বাধীনতা আন্দালনে অরবিন্দের মতো মানুষকে দরকার। তিনি তাঁকে কলকাতায় এসে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। কলকাতায় তখন জাতীয় মহাবিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। অরবিন্দকে সেই মহাবিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। বরোদা কলেজের লোভনীয় পদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় আসেন অরবিন্দ। ১৯০৬ ক্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার জাতীয় মহাবিদ্যালয় যা বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে খ্যাত, তাতে যোগ দেন। শুরু হয় তার বিপ্লবী জীবনের আর এক অধ্যায়। তিনি ছিলেন চরমপন্থী আন্দোলনে বিশ্বাসী। দেশের যুব সমাজকে তিনি বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। যুগান্তর নামে গুপ্ত বিপ্লবী সমিতির সঙ্গে তিনি জড়িয়ে ছিলেন।
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিপিন চন্দ্র পালের ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকার সম্পাদক হন। এই পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে তিনি দেশের বিপ্লবী ও তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেন দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। পত্রিকায় ব্রিটিশ বিরোধী লেখার জন্য ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সরকার বিপিনচন্দ্র পাল ও তাকে গ্রেপ্তার করে। বিপিন চন্দ্র পালের ছয় মাস জেল হয়। অরবিন্দ পত্রিকায় সরাসরি নিজের নামে লিখতেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয় ইংরেজরা। ফলে সরকার তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারেন অরবিন্দকে এভাবে ছেড়ে রাখা তাদের পক্ষে বিপজ্জনক। তারা সুযোগ খুঁজছিলেন কোনো অজুহাতে তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। সেই সুযোগও তাঁরা পেয়ে যান। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল অত্যাচারী মেজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মুজফফরপুরে তার গাড়ির ওপর বোমা ছোঁড়েন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান কিন্তু দুজন ইউরোপীয় মহিলা মারা যান। তারপর পর সারা দেশ জুড়ে ইংরেজ সরকার বোমার সন্ধানে তল্লাশি অভিযান শুরু করে। মানিকতলার মুরারী পুকুর বাগানবাড়িতে বোমের কারখানা খুঁজে পায় তারা। মোট সাঁইত্রিশ জন বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। শুরু হয় আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলা। তার হয়ে মামলা লড়েন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণতি হন। ফলে বেকসুর খালাস পান।
জেলে থাকাকালীন সময়ে অরবিন্দের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। এক অন্য জীবনের সন্ধান পান তিনি। জেল থেকে মুক্ত পাওয়ার পর সমস্তরকম রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। বৃটিশ সরকার যাতে তার কাজে কোনো ঝমেলা করতে না পারে তার জন্য প্রথমে যান ফরাসী অধিকৃত চন্দননগের। সেখান থেকে চলে যান পণ্ডেচেরি যেটিও ছিল ফরাসী অধিকৃত। পণ্ডেচেরি আসার পর এক নতুন জীবন শুরু হয় তার। নিজেকে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় ডুবিয়ে দেন। বিপ্লবী অরবিন্দ থেকে ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন ঋষি অরবিন্দ।
* * * * *
নির্বাচনী কাজে পণ্ডেচেরিতে বেশ কিছুদিন ছিলেন পল রিচার্ড। এখানে থাকার সময় তিনি জানতে পারেন অরবিন্দের কথা, তার আধ্যাত্মিক সাধনার কথা। পল নিজেও আধ্যাত্মিক ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন। তাই বেশ কয়েকবার তিনি অরবিন্দের সঙ্গে দেখা করেন। অরবিন্দের জীবন দর্শন, ভাবধারায় মুগ্ধ হন তিনি। প্যারিসে ফিরে মীরাকে তিনি অরবিন্দের কথা বলেন। অরবিন্দের কথা শুনে মীরা উৎসাহী হয়ে পড়েন। তার যেন মনে হয় এই সেই মানুষ যাঁকে তিনি স্বপ্নে দেখেন। তাঁর মধ্যে আগ্রহ বাড়ে ভারতবর্ষে আসার জন্য।
১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ পল রিচার্ড দ্বিতীয়বার ভারতে আসেন। এবার মীরাও তার সঙ্গে আসেন। যেদিন তারা এই দেশের মাটিতে পা দেন, সেদিনই তারা সাক্ষাৎ করেন অরবিন্দের সঙ্গে। অরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ মীরার মনে আলোড়ন তোলে। মুগ্ধ হন তিনি। তার মনে হয় এই সেই মানুষ যাকে তিনি খুঁজে চলেছেন এতদিন। যাকে তিনি স্বপ্নে দেখেছেন বারবার। ইনিই সেই ‘ঈশ্বর পুরুষ’ যাকে তিনি কৃষ্ণ বলে মনে করতেন। প্রথম সাক্ষাতে মীরা অনুভব করেন এই ভারতবর্ষ তার কর্মক্ষেত্র। অরবিন্দের সাক্ষাতে আসার পর তিনি নিজের মধ্যে অদ্ভুত এক পরিবর্তন উপলব্ধি করেন। সেই সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মনে হল, যেন নতুন জন্ম হল আমার। অতীতের সব রীতি, অভ্যাস মনে হল অপ্রয়োজনীয়। আর মনে হল, একসময় যাকে আমি ফল বলে মনে করতাম, এখন মনে হল তা আসলে প্রস্তুতি মাত্র … আমার হৃদয়ের মধ্যে থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা জাগরিত হল। আমার মনে হল এতদিন ধরে আমি যা খুঁজছি অবশেষে তার দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁচেছি।’
স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে নিয়মিত অরবিন্দের কাছে যেতেন। তার কথা শুনতেন। অরবিন্দের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের। পল আর মীরা স্থির করেন ‘আর্য’ নামে একটি ফিলজফিক্যাল জার্নাল প্রকাশ করার। অরবিন্দ তাদের এই ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট অরবিন্দের জন্মদিনে ‘আর্য’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
ইতিমধ্যে দেশ থেকে ডাক আসে পলের। তাকে ফ্রেঞ্চ রিজার্ভ আর্মিতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে তিনি বাধ্য হন ভারতবর্য ত্যাগ করতে। মীরার একদমই ইচ্ছে ছিল না ভারতবর্ষ ত্যাগ করে যাওয়ার। কিন্তু থাকতে পারেন না তিনি। প্রথমত স্বামী ফিরে যাচ্ছেন। দ্বিতীয়ত অরবিন্দও তাকে থাকার জন্য বলেন না। এই নিয়ে মীরার অভিযোগ এবং অভিমানও ছিল। যা তিনি নিজের লেখায় প্রকাশ করেছেন। আসলে অরবিন্দ মনে করেছিলেন মীরার এখনই এখানে থাকার সময় হয়ে ওঠেনি। সেই কারণে স্বামীর সঙ্গে ফিরে যেতে বাধ্য হন মীরা। ১৯১৫-এর ২২ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরার পথ ধরেন তিনি। পণ্ডেচেরি ত্যাগ করে যাওয়াটা মীরার মনে গভীর আঘাত দিয়েছিল। এর জন্য তিনি অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন। ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “He (Sri Aurobindo) did not keep me, what could I do? I had to go. But I left my psychic being with him, and in France I was once on the point of death: the doctors had given me Up.”
ফ্রান্সে এক বছর থাকেন পল। এক বছর পর তাকে সেনাবাহিনী থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি জাপান যান। মীরাও তার সঙ্গে যান। এখানে চার বছর কাটান তারা। ১৯১৯-এ জাপানে এক মহামারী রোগ ছড়িয়ে পড়ে। একসময় মীরাও সেই রোগে আক্রান্ত হন তিনি। কিন্তু তিনি কোনো ডাক্তার দেখান না, ঔষধও খান না। তিনি বোঝার চেষ্টা করেন এই মহামারী ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী। অসুস্থ অবস্থায় একদিন যখন শুয়েছিলেন তখন তিনি মানস চোখে দেখতে পান সৈনিকের পোশাক পরা একজন যার মাথা নেই। সেই মুণ্ডুহীন শরীর এগিয়ে এসে তার বুকের ওপর চেপে বসে। তার শরীরের শক্তি যেন শুশে নিতে থাকে। অবস্থা এমন হয় যে মীরার মনে হয় তিনি বোধহয় আর বাঁচবেন না। সহসা তিনি তার গুপ্তবিদ্যা কাজে লাগান এবং সেই মুণ্ডুহীন সত্ত্বাকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। তারপর তিনি সেরে উঠেছিলেন। মীরা বুঝতে পারেন এই মহামারী রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অসংখ্য তরুন সৈন্যের অকাল মৃত্যু হয়েছিল। তারাই চেষ্টা করছিল অন্যের শরীরে প্রবেশ করে নিজেদের ফিরে পাওয়ার। আর সেটাই এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার কারণ।
১৯২০-এর এপ্রিল মাসে মীরা স্বামীর সঙ্গে পণ্ডেচেরি আসেন। মিস ডরোথি হজসন নামে এক ইংরেজ মহিলাও তাদের সঙ্গে আসেন। এরপর তিনি আর ভারতবর্ষ ত্যাগ করে যাননি। ঋষি অরবিন্দের সংস্পর্শে এসে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় ডুবিয়ে দেন। স্ত্রীর এই ব্যাপারটা পছন্দ হয় না পলের। মীরাকে তিনি অরবিন্দের কাছ থেকে নিয়ে চলে যেতে চান। কিন্তু মীরা ততদিনে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। স্বামীর কথায় রাজি হন না তিনি। ফলে তাদের সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরে। শেষমেষ মীরাকে ছাড়া তিনি পণ্ডেচেরি ত্যাগ করেন।
মীরা ও হজসন বেয়ন্ড হাউসে থাকতেন। ১৯২০-এর ২৪ নভেম্বরের এক ভয়ংকর ঝড়ে তাদের বাড়িটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একথা জানতে পেরে অরবিন্দ তাদের নিজের বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানান। তারপর থেকে মীরা ও হজসন অরবিন্দের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন।
অরবিন্দের সংস্পর্শে আসার পর মীরা আরও বেশি করে সাধনায় ডুবে যান। অরবিন্দের বাড়িতে তারা দুজন ছাড়া আরও কয়েকজন থাকতেন। আগামীর কথা ভেবে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে মীরা একটি আশ্রম স্থাপন করেন। প্রথমে আশ্রমটি পরিকল্পিত ছিল না। একটু একটু করে আশ্রমে শিষ্যের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তথাকথিত আশ্রম বলতে আমাদের চোখের সামনে যে ছবি ফুটে ওঠে, এই আশ্রম তেমন ছিল না। ১৯২৬-এ আশ্রমে শিষ্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪ জন। মাত্র তিন বছরে সংখ্যাটি একশোতে পৌঁছে যায়। অরবিন্দ একটু একটু করে বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছিলেন নিজের সাধনার আরও বেশি করে ডুবে যাওয়ার জন্য। আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর অরবিন্দ মীরার হাতে আশ্রমের সমস্ত দায়িত্ব তুলে দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি বাইরের জগৎ থেকে সরিয়ে নেন। এই সময় থেকে অরবিন্দ মীরাকে ‘The Mother’ (শ্রীমা) নামে ডাকতে শুরু করেন।
সময় এগিয়ে চলে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হন অরবিন্দ। প্রথমটা সমস্যা তেমন গুরুতর ছিল না। সবাই আশা করেছিল তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু অসুস্থতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। অবশেষে ৫ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। অরবিন্দের মৃত্যু মায়ের কাছে ছিল বড়ো আঘাত। তাঁর মৃত্যু নিয়ে পরের দিন ড. সান্যালকে তিনি বলেছিলেন, “People do not know what a tremendous sacrifice He has made for the world.”
অরবিন্দের মৃত্যুর পর আশ্রমের সমস্ত কাজের ভার নেন শ্রীমা। প্রসঙ্গত বলার, ১৯৪৩ সাল থেকে ছোটোদের জন্য আশ্রমের মধ্যে ছোটো আকারে একটি স্কুল শুরু হয়। শ্রীমা নিজে ক্লাস নিতেন ছোটোদের। অরবিন্দের মৃত্যুর পরের বছর থেকে তিনি ছোটোদের জন্য বিশেষ ক্লাস নিতে শুরু করেন। ওই বছর তিনি একটি ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটি সেন্টার স্থাপন করার কথা ঘোষণা করেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি এর উদবোধন হয়। নাম দেওয়া হয় শ্রী অরবিন্দ ইন্যারন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটি সেন্টার। ১৯৫৯-এ এর নাম বদলে রাখা হয় শ্রী অরবিন্দ ইন্টারন্যাশন্যাল সেন্টার অব এডুকেশন। এরকম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবনা ছিল অরবিন্দের।
শ্রীমায়ের জীবনের অন্যতম কীর্তি হল অরোভিল স্থাপন। শ্রীমা স্থির করেন পরীক্ষামূলকভাবে একটি শহর স্থাপন করার। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান কার্যকর হয়। স্থির হয় হিন্দি হবে ভারতের সরকারি ভাষা। প্রথম পনেরো বছর ইংরেজির পাশাপাশি সেটি সহযোগী ভাষা হিসেবে থাকবে। ১৯৬৫ এর ২৬ জানুয়ারি থেকে ইংরেজির বদলে হিন্দি হবে সরকারি ভাষা। কিন্তু অনেক অ-হিন্দিভাষী রাজ্য এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিল না। এই নিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছিল। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তামিলনাড়ুতে হিন্দি-বিরোধী আন্দোলন প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গোটা মাদ্রাজ জুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা লুঠপাঠ চালায়। আশ্রমগুলিতেও তারা আক্রমণ চালায়। সেই দাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা পায় না মায়ের আশ্রমও। এই ব্যাপারটা শ্রীমা-এর মনকে নাড়া দেয়। অনেক দিন মনের মধ্যে লালিত করা একটি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার ভাবনা জেগে ওঠে। তিনি চান এমন একটি জায়গা তৈরি করতে যেখানে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের মানুষ সত্যের সাধনায় প্রগতিশীল জীবন কাটাতে পারবে। সেখান থেকে তার মাথায় আসে একটি শহর তৈরির পরিকল্পনা। সেই শহর হল অরোভিল।
১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমা শ্রীঅরবিন্দ সোসাইটি স্থাপন করেছিলেন। ১৯৬৪-তে এই সোসাইটির বিশ্ব সম্মেলনে অরোভিল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাশ হয়। এটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে শ্রীমা বলেছেন, “Auroville wants to be a universal town where men and women of all countries are able to live in peace and progressive harmony above all creeds, all policies and all nationalities.” মানুষের মধ্যে একতা ও একাত্মতা গড়ে তোলাই ছিল এই শহর প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য
১৯৬৮-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে দশটায় এর উদবোধন হয়। এটির নক্সা করেন স্থাপতি রোজার অ্যাঙ্গার। পঞ্চাশ হাজার লোকের থাকার মতো এই শহর। উদবোধন অনুষ্ঠানে ১২৪ টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ভারতবর্ষের ২৩ টি রাজ্যের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিল। প্রায় সকল দেশের শিশু প্রতিনিধিরা এখানে রাখা একটি পাত্রে একমুঠো করে নিজের নিজের দেশের মাটি প্রদান করে।
অরোভিলে কারা থাকতে পারবে সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে শ্রীমা বলেন, “Auroville belongs to nobody in particular. Auroville belongs to humanity as a whole. But to live in Auroville one must be the willing servitor of the divine Consciousness.” পনেরো বর্গকিলোমিটার জুড়ে এই শহর। শহরের চারটি বিভাগ – আবাসিক, শিল্প, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক।
শহরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে মাতৃমন্দির। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এর ভিত্তিপ্রস্তর দেওয়া হয়। এটি দেখতে একটি সোনালী গোলকের মতো। চারটি স্তম্ভের ওপর এই গোলকটি রয়েছে। এই চারটি স্তম্বকে মায়ের চারটি শক্তির রূপক হিসেবে ধরা হয়। যে শক্তির কথা ঋষি অরবিন্দ উল্লেখ করেছিলেন তাঁর বইতে। অরবিন্দ তার ‘The Mother’ বইতে মীরার চারটি দিকের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল জ্ঞান, শক্তি, সম্প্রীতি ও পরিপূর্ণতা। এই চারটি সত্ত্বার মধ্য দিয়ে মায়ের চারটি রূপ তুলে ধরেছেন তিনি – মহেশ্বরী, মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী। যাই হোক, মাতৃ মন্দিরের মধ্যে রয়েছে ধ্যান কক্ষ। এর ভেতরের পরিবেশ একেবারে শান্ত। মন্দিরের চারদিকে সুন্দর বাগান। এর মধ্যে সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। যখন আকাশে সূর্য থাকে না তখন এই সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আলো গোলকের ওপর পড়ে প্রতিফলিত হয়। শুরুর দুই দশকে এখানে কুড়িটি দেশের প্রায় চারশ জন বাস করতেন। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে, অরোভিলের রজতজয়ন্তী বর্ষে এখানকার লোকসংখ্যা ছিল ৫৪ টি দেশের ২৮১৪ জন। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ ভারতীয়।
এই শহরটির তৈরি করার পেছনে শ্রীমায়ের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ জাতি ধর্ম বর্ণ দেশ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা। এর থেকে মহান উদ্দেশ্য আর কী হতে পারে? মীরা আলফাসা ছিলেন অরবিন্দ আশ্রমের জননী। অরবিন্দও তাকে ‘The Mother’ সম্বোধেন সম্বোধন করতেন। আর বিশ্ব ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ নিয়ে এমন একটি মডেল শহরের জন্ম দেওয়া মহিলাকে তার জননী বললে বোধহয় খুব একটা ভুল বলা হবে না।
১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন শ্রীমা। মানুষের সঙ্গে দেক্ষাসাক্ষাৎ, ভক্তদের দর্শন দেওয়া প্রভৃতি বন্ধ করে দেন। কেবল ১৫ আগস্ট, গুরুদেব অরবিন্দের জন্মদিনের দিন শেষবার তাঁর ভক্তদের দর্শন দেন তিনি। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর মারা যান তিনি। আশ্রম ভবনের সামনের চত্ত্বরে অরবিন্দের সমাধির পাশে তাকে সমাধিস্ত করা হয়।

সৌরভকুমার ভূঞ্যা
তেরপেখ্যা, মহিষাদল
পূর্ব মেদিনীপুর, ৭২১৬২৮
৯৪৭৬৩৩০৫৩৩, ৭৪৩১৯৮৫৪৮৫

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

চন্দননগর শহরের ৩ টি দর্শনীয় ভ্রমণ স্থান।

ঘুরতে কে না ভালোবাসে। বিশেষ করে বাঙালিরা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে ভ্রমনের নেশায়। কেউ পাহাড়, কেউ সমুদ্র আবার কেউ প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থান ভালোবাসে ভ্রমণ করতে। প্রকৃতি কত কিছুই না আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। কতটুকুই বা আমরা দেখেছি। এ বিশাল পৃথিবীতে আমরা অনেক কিছুই দেখিনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় আজ গোটা পৃথিবীটা হাতের মুঠোয়় এলেও প্রকৃতিকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করা এ এক আলাদা রোমাঞ্চ, আলাদা অনুভূতি যার রেষ হৃদয়ের মনিকোঠায় থেকে যায় চিরকাল।। তাইতো আজও মানুষ বেরিয়ে পড়়ে প্রকৃতির কে গায়ে মেখে  রোমাঞ্চিত হওয়ার নেশায়। কেউ চায় বিদেশে ভ্রমণে, আবার কেউ চায় দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণে। এমনি এক ভ্রমণ এর জায়গা হলো  দাওয়াইপানি।

 

আপনি যখন গ্রীষ্মের তাপ থেকে বাঁচতে চান, তখন আপনার মাথায় সবচেয়ে বেশি চিন্তা আসে কী?  শহর খাদ এবং একটি হিল স্টেশনের দিকে রওনা, তাই না?  যাইহোক, আমাদের নিজস্ব দার্জিলিং-এর দিকে রওনা হওয়া লক্ষাধিক লোকে আপনি যদি হতাশ হয়ে পড়েন, তাহলে হারাবেন না।  আশেপাশে অনেক বিচিত্র ছোট অফ-ট্র্যাক পর্যটন গন্তব্য রয়েছে যা আপনার অবস্থানকে স্মরণীয় করে তুলতে পারে।

যারা দার্জিলিং  এ ঘুরতে যান তারা অবশ্যই দার্জিলিং এ পর্যটকদের ভিড় সম্পর্কে জানেন,তাই অনেকে  দার্জিলিং এর কাছাকাছি অফবিট লোকেশান এর খোজ করেন যেখানে তারা শান্ত মনে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারবেন ও তার সাথে রাজকীয় কাঞ্চঞ্জঙ্ঘার দর্শন পাওয়া গেলে তো কোন কোথায় হয় না । হ্যাঁ ঠিক এমনি একটি ভ্রমণ স্থান দাওয়াইপানি।দার্জিলিং শহর থেকে প্রায় ২০ কিমি দূরে অবস্থিত একটি অখ্যাত গ্রাম হল এই দাওয়াইপানি, দাওয়াইপানি গ্রামটির উচ্চতা হল ৬৫০০ ফিট । প্রায় ৬ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে যে সাদায় মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য দেখা যাবে তা বলা বাহুল্য। বরং বলা চলে, দাওয়াইপানি থেকে ধরা দেবে হিমালয়ের এক প্যানোরমিক ভিউ। তার মধ্যে নেপাল ও ভুটান হিমালয়ের নামজাদা শৃঙ্গও রয়েছে।

 

দাওয়াইপানি কথাটির মানে হোল ঔষধের জল , এই গ্রামে একটি স্থানিয় নদি আছে যেটির নাম হোল ‘খোলা’ এই নদীর জল খনিজ পদার্থে পরিপুষ্ট , কোন ক্ষত স্থানে এই জল লাগালে সেটি নিরাময় হয়ে যায়। বহু কাল পূর্বে এক ইংরেজ অফিসার এই গ্রামে এই ঔষধীয় জলের আবিস্কার করেন তারপর থেকে এই স্থানটির নাম হয় দাওাইপানি।

দাওয়াইপানির নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী। সেখানে ব্রিটিশদের তৈরি করা একটি সেতুও রয়েছে। ইচ্ছা হলে পাহাড়ি গ্রামের রাস্তা ধরে ঘুরে নিতে পারেন। যদিও দাওয়াইপানি শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ আপনাকে এই গ্রামের প্রেমে ফেলতে বাধ্য। প্রকৃতির মাঝে কটা দিন কাটিয়ে যাওয়ার এক দুরদান্ত ঠিকানা।

চারিদিকে সবুজ অরণ্যে ঘেরা ,মেঘমুক্ত আকাশ, পাখিদের কোলারব এবং তার সাথে কাঞ্চজঙ্ঘার হাতছানি যা প্রকৃতি প্রেমিদের কাছে সর্গ থেকে কিছু কম নয় এইসব হোল এই দাওয়াইপানির মুল বৈশিষ্ট্য । এখানে দরকার পরবে না কোন Alarm Clock এর পাখিদের মিষ্টি কুঞ্জন আপনাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুলবে।
দাওাইপানির হমস্তে রুম থেকেই আকাশ পরিস্কার থাকলে দেখতে পাবেন কাঞ্চজঙ্ঘার গোটা পর্বতশৃঙ্খলা ও তার সাথে পাহাড়ি উপত্যকার এবং তার মাঝ দিয়ে খেলা করা মেঘেদের অসাধারন ভিউ ।

 

দাওয়াইপানি আউটডোর কার্যকলাপ:

ট্রেকিং – যাযাবর হোমস্টে – দাওয়াইপানি থেকে পেশোক রোড পর্যন্ত এক ঘন্টার একটি জনপ্রিয় হালকা ট্রেক।  গুরুতর ট্রেকারদের জন্য মাঝারি থেকে উচ্চ অসুবিধার স্তরের আরও কয়েকটি ট্রেকিং ট্রেইল রয়েছে।
জঙ্গলে হাইক – এই জায়গাটিকে ঘিরে ঘন হিমালয় বনাঞ্চল।  তাই একটি হাইকিং অ্যাডভেঞ্চারে যান এবং প্রকৃতির রহস্যগুলি আবিষ্কার করুন।
পাখি পর্যবেক্ষন – ঘন জঙ্গল হল বিভিন্ন ধরণের পাখির প্রাকৃতিক আবাস।
খামার পরিদর্শন – সবজি এবং ফলের স্থানীয় খামার পরিদর্শন উপভোগ করুন।
ঐতিহ্যবাহী নৃত্য – স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের সাক্ষী হয়ে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপে নিমগ্ন হন।

দাওয়াইপানি কাছাকাছি আকর্ষণ:

রিসোর্টটি দার্জিলিং শহর থেকে অল্প দূরত্বে এবং তাই এখান থেকে বেশ কয়েকটি জায়গায় পৌঁছানো সহজ।
দার্জিলিং – পাহাড়ের রাণী রাজকীয় টাইগার হিল ভিউপয়েন্ট থেকে শুরু করে, টয় ট্রেন রাইড, মল এরিয়া শপিং থেকে শুরু করে বিশ্ব বিখ্যাত দার্জিলিং চায়ের সূক্ষ্ম স্বাদ গ্রহণের জন্য সমস্ত ধরণের পর্যটন আকর্ষণ অফার করে।
রিসোর্টটি লামাহাট্টা, সিটং বা ‘কমলা গ্রাম’, কালিম্পং ইত্যাদির মতো অন্যান্য শহরের কাছাকাছিও।

 

কিভাবে যাবেন:
ট্রেনে: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে চড়ুন, NJP-এ নামুন।  দাওয়াইপানি গ্রাম থেকে ৭৬ কিমি দূরে।  রাস্তার অবস্থার উপর নির্ভর করে দাওয়াইপানি পৌঁছাতে প্রায় ২ ঘন্টা, ৫০ মিনিট সময় লাগে।
ফ্লাইটে: বাগডোগরা বিমানবন্দরটি গ্রাম থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং বিমানবন্দর থেকে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে।

শিলিগুড়ি থেকে দাওয়াইপানির দূরত্ব প্রায় ৭০ কিমি এবং এনজেপি রেল স্টেশন থেকে দূরত্ব প্রায় ৭৬কিমি ও বাগদোগরা বিমানবন্দর থেকে দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিমি. ।দার্জিলিং থেকে এক ঘণ্টার পথ দাওয়াইপানি। আর শিলিগুড়ি দিয়ে গেলে গাড়িতে সময় লাগবে মাত্র দেড় ঘণ্টা। দার্জিলিং থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থিত হলেও ঘুম স্টেশন থেকে মাত্র কুড়ি মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারবেন দাওয়াইপানি।

 

যেহেতু দাওয়াইপানি উচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত, তাই সারা বছরই এখানে শীতল আবহাওয়া থাকে।  বর্ষা এখানে বিশ্বাসঘাতক কারণ দাওয়াইপানিতে জুলাই এবং আগস্ট মাসে খুব ভারী বৃষ্টিপাত হয়।  সুতরাং, এই মাসগুলি ব্যতীত, আপনি বছরের যে কোনও সময় আপনার ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন।  একটি সতর্কীকরণ: দাওয়াইপানি পরিদর্শন করার সময় ভারী পশমের সাথে নিজেকে বন্ধন করতে ভুলবেন না।

 

শান্ত, নিরিবিলি, ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। হাওয়া-জল বদল করতে ঘুরে আসতে পারেন দাওয়াইপানি। ‘দাওয়াই’ কথাটার অর্থ ওষুধ। আর ‘পানি’ মানে জল-হাওয়া। সুতরাং উত্তরবঙ্গের এই গ্রামে এলে আপনার শরীর আর মন দুটোই ভাল হয়ে যাবে নিমেষে।যারা দৈনিক জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিতে চান তাদের কাছে এই স্থানটি একটি আদশ স্থান হতে পারে, হাতে দু-দিন সময় থাকলে তা অনায়াসে এখানে কেটে যাবে ।

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

চন্দননগর শহরের ৩ টি দর্শনীয় ভ্রমণ স্থান।

ঘুরতে কে না ভালোবাসে। বিশেষ করে বাঙালিরা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ে ভ্রমনের নেশায়। কেউ পাহাড়, কেউ সমুদ্র আবার কেউ প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থান ভালোবাসে ভ্রমণ করতে। প্রকৃতি কত কিছুই না আমাদের জন্য সাজিয়ে রেখেছে। কতটুকুই বা আমরা দেখেছি। এ বিশাল পৃথিবীতে আমরা অনেক কিছুই দেখিনি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়ায় আজ গোটা পৃথিবীটা হাতের মুঠোয়় এলেও প্রকৃতিকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করা এ এক আলাদা রোমাঞ্চ, আলাদা অনুভূতি যার রেষ হৃদয়ের মনিকোঠায় থেকে যায় চিরকাল।। তাইতো আজও মানুষ বেরিয়ে পড়়ে প্রকৃতির কে গায়ে মেখে  রোমাঞ্চিত হওয়ার নেশায়। কেউ চায় বিদেশে ভ্রমণে, আবার কেউ চায় দেশের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণে। এমনি এক ভ্রমণ এর জায়গা হলো  হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত চন্দননগর। এর মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ রাখতে বাধ্য।চন্দননগর , এটির পূর্ব নাম চন্দেরনাগর এবং ফরাসি নাম চন্দ্রনাগর দ্বারাও পরিচিতভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার একটি শহর। এটি চন্দননগর মহকুমার সদর দফতর এবং এটি কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (কেএমডিএ) দ্বারা আচ্ছাদিত এলাকার একটি অংশ।  হুগলি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এই শহরটি ফরাসি ভারতের পাঁচটি জনবসতির মধ্যে একটি ছিল । ঔপনিবেশিক বাংলোগুলিতে ইন্দো-ফরাসি স্থাপত্য দেখা যায়, যার বেশিরভাগই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।।

এই নিবন্ধে আপনি চন্দননগরের নিম্নলিখিত তিনটি জনপ্রিয় ভ্রমণ স্থান সম্পর্কে জানতে পারবেন—

 

(ক) চন্দননগর স্ট্র্যান্ড।

(খ) চন্দননগর মিউজিয়াম।

(খ) পাতাল বাড়ি।

 

আসুন এই স্থানগুলির প্রতিটি বিস্তারিতভাবে দেখি…

 

(ক) চন্দননগর স্ট্র্যান্ড—–

 

চন্দননগর স্ট্র্যান্ড হল চন্দন নগরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং সুন্দর ভ্রমণের পথ।  চন্দননগর একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও অনেক উন্নত।  এই দৌড় ঝাপ ভরা জীবনে একবেলার ছুটি কাটানোর জন্য চলে আসুন চন্দননগর স্ট্যান্ড ঘাটে। পরিবার পরিজনের সঙ্গে বিকেলের আমেজ উপভোগ করার একটি আদর্শ জায়গা এটি।সুন্দর সারির গাছ এবং আলো দ্বারা সারিবদ্ধ দর্শনীয় গঙ্গা নদী, স্ট্র্যান্ডের আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্র। সন্ধ্যার সময় পরিবেশটি শান্তিপূর্ণ থাকে, কারণ চারিদিক আলোকিত হয় এবং হালকা বাতাস বয়ে যায় যা জায়গাটিকে আরও ঐশ্বরিক করে তোলে।চন্দননগর স্ট্র্যান্ড পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে সুন্দর অলঙ্কৃত নদীপথ হিসাবে স্বীকৃত।  পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকায় অসংখ্য রেস্টুরেন্ট রয়েছে।হাওড়া থেকে চন্দননগর যাওয়ার যে কোনো ট্রেনে উঠতে হবে। নামতে হবে চন্দননগর স্টেশনে। স্টেশন থেকে অটো অথবা টোটোর মাধ্যমে আপনি পৌঁছাতে পারেন এই ঘাটে। উনবিংশ শতকের চন্দননগরের এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী দুর্গাচরণ রক্ষিত। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি ফ্রান্সের ‘লিজিয়ঁ দ্য অনার’ সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন । তাঁর নামেই এই ফলক ।  তাই একদিনের ছুটি কাটানোর জন্য বেশি দেরি না করে চলে আসুন চন্দননগর স্ট্যান্ড ঘাটে।

 

 

(খ) চন্দননগর মিউজিয়াম–

 

হুগলি রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৭ কিমি দূরে চন্দননগর মিউজিয়াম হল পশ্চিমবঙ্গের হুগলির চন্দননগর শহরতলিতে অবস্থিত একটি পুরাতন জাদুঘর।  ডুপ্লেক্স প্যালেস নামেও পরিচিত, এটি পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম যাদুঘরগুলির মধ্যে একটি এবং হুগলিতে দেখার জন্য সেরা জায়গাগুলির মধ্যে একটি।

চন্দননগর জাদুঘর বা ইনস্টিটিউট ডি চন্দননগর ডুপ্লেক্স হাউসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, চন্দননগর প্রদেশের ফরাসি গভর্নরের পূর্ববর্তী সরকারি বাসভবন।  ১৯৫১ সালে চন্দননগরের বন্ধের চুক্তির অনুসরণে, ১৯৫২ সালে ভারত সরকার বিদেশ মন্ত্রকের অধীনে ‘মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারি’ নামে একটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে।  এটি ২৫০ বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণ করে এবং উভয় দেশের যৌথ ঐতিহ্যের প্রতীক।

জাদুঘরটি প্রাচীনকালের উপঢৌকন, হরিহর সেট, ‘ফ্রি সিটি অফ চন্দননগর’-এর প্রথম রাষ্ট্রপতি, একজন সমাজ সংস্কারক এবং জনহিতৈষী-এর উপহার থেকে একটি মূল সংগ্রহ নিয়ে স্থাপন করা হয়েছিল।  তিনি ১৯৩৪ সালে ফরাসি সরকার কর্তৃক শেভালিয়ার দে লা লিজিওন ডি’অনারে পুরস্কৃত হন। এটি বিরল ফরাসি প্রাচীন জিনিসের একটি সংগ্রহের গর্ব করে, যেমন অ্যাংলো-ফরাসি যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান (জনপ্রিয়ভাবে কর্নাটিক যুদ্ধ নামে পরিচিত), ফরাসি গভর্নর-জেনারেলদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং কাঠের তৈরি জিনিসপত্র, যা বিশ্বের অন্য যেকোন স্থানে খুঁজে পাওয়া কঠিন।  প্রদর্শনীর মধ্যে রয়েছে ডুপ্লেক্সের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, যেমন তার একটি মার্বেল আবক্ষ, এবং চন্দননগরের ফরাসি ঔপনিবেশিক ও স্থানীয় ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ।

এছাড়াও, যাদুঘরটি প্রবেশদ্বারের ঠিক পাশে অবস্থিত মারিয়ানের (ফ্রান্সের জাতীয় প্রতীক) একটি সুন্দর বাগান এবং একটি মূর্তি রক্ষণাবেক্ষণ করেছে।  এছাড়াও, জাদুঘর এবং ইনস্টিটিউট নিয়মিত ফরাসি ক্লাস অফার করে।

 

পশ্চিমবঙ্গের সেরা এবং প্রাচীনতম যাদুঘরগুলির মধ্যে একটি হল চন্দননগর মিউজিয়াম। অতএব, আপনি যদি ফরাসি ঔপনিবেশিক নিয়মের ইতিহাসে আগ্রহী হন তবে এই যাদুঘরটি দেখার মতো স্থান।

 

 

(গ) পাতাল বাড়ি—

 

পাতাল বাড়ি চন্দননগরের স্থাপত্য এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের একটি অত্যাশ্চর্য চিত্র। ভবনটি সেই আগের দিনের মানুষের স্থাপত্যের জ্ঞান এবং নান্দনিক বোধের অগ্রগতির আরেকটি সুন্দর উদাহরণ।  এর নিচতলা গঙ্গা নদীতে নিমজ্জিত।  মহান সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর চন্দননগর সফরের সময় এই বাড়িতেই থাকতেন।
নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায়ই জায়গাটি পরিদর্শন করেন এবং ভবনটির অনেক প্রশংসা করেন।  তিনি অনুভব করেছিলেন যে স্থানটি তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে প্রসারিত করেছে।  তিনি তাঁর বহু বিখ্যাত উপন্যাসে পাতাল-বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন।  বাড়িটির মালিক ছিল পাশের বাঁশবেড়িয়ার শাসক পরিবারের।  এই রহস্যময় সুন্দর জায়গাটি চন্দননগরের একটি প্রাচীন মনোমুগ্ধকর স্থান যা আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে।

 

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

মহা নায়ক উত্তম কুমার, বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি, প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

উত্তম কুমার ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাংলা সিনেমার একজন কিংবদন্তী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ মহানায়ক রূপে পূজিত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলার প্রথম সুপারস্টার হলেন উত্তম কুমার। তার সময়ে তাকে ম্যাটিনি আইডল বলা হত।উত্তম কুমার, যিনি মহানায়ক নামে পরিচিত, ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, সুরকার এবং গায়ক যিনি মূলত বাংলা সিনেমায় কাজ করতেন।  কুমার অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (১৯৬৭), এবং চিরিয়াখানা (১৯৬৭) ছবিতে কাজের জন্য সেরা অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।  কুমার ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং প্রভাবশালী অভিনেতা।  কুমারের কর্মজীবন ১৯৪০-এর দশকের শেষ থেকে ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তিন দশক ধরে বিস্তৃত ছিল।
তিনি ২০০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, এবং তার কিছু বিখ্যাত কাজ হল অগ্নি পরীক্ষা, হারানো সুর, বিচারক, সপ্তপদী, ঝিন্দর বান্দি, দেয়া নেয়া, লাল পাথর, জতুগৃহ, থানা থেকে আসছি।

 

জন্ম ও পরিবার—

 

অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায় মাতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মা চপলা দেবী।  তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন।  তার দুই ভাই ছিল, বরুণ কুমার ও তরুণ কুমার।  তার ছোট ভাই তরুণ কুমারও একজন অভিনেতা ছিলেন।  “উত্তম” ডাকনাম তাকে তার মাতামহ দিয়েছিলেন।

 

ছেলেবেলা—-

উত্তম কুমারকে চক্রবেরিয়া হাই স্কুলে ভর্তি করা হয় এবং পরে সাউথ সাবারবান স্কুলে ভর্তি হন যেখানে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন।  স্কুলে পড়ার সময় তিনি “লুনার ক্লাব” নামে একটি নাট্যদলের নেতৃত্ব দেন।  কুমারের প্রথম ভূমিকা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুকুটে।  দশ বছর বয়সে, তিনি নাটকে তার ভূমিকার জন্য একটি ট্রফি জিতেছিলেন।  তিনি তার উচ্চ শিক্ষার জন্য গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে যোগদান করেছিলেন, কিন্তু তার পরিবারের আর্থিক অসুবিধার কারণে এই শিক্ষাটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি।  তারপর তিনি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কে ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন, যেখানে তিনি প্রতি মাসে ৭৫ টাকা বেতন পেতেন। নিদানবন্ধু ব্যানার্জির কাছে গান শেখেন।  তিনি লাঠি খেলা শিখেছিলেন এবং কুস্তি অনুশীলন করতেন।  তিনি পরপর তিন বছর ভবানীপুর সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনে সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন হন।  তার পরিবার সুহৃদ সমাজ নামে একটি অপেশাদার নাট্যদলে যুক্ত হন।

 

 

কর্মজীবন—-

 

নিম্ন মধ‍্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিলেন। তাই পারিবারিক আর্থিক অনটনের জন‍্য চলচ্চিত্র জগতে আসা সহজ ছিলো না। তাই এক সাধারণ পরিবারের বড়োছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে চাকরির খোঁজ শুরু করেন তিনি। অনেক খুঁজে ১৯৪৬ সালে কলকাতা বন্দরে কেরানির চাকরি নেন উত্তম কুমার। চাকরি করার জন‍্য কলেজ শেষ করতে পারেননি তিনি। যখন তিনি শেষ বর্ষের ছাত্র তখন তাঁকে কলেজ ছাড়তে হয় কাজের চাপে। পড়াশোনা খুব বেশি দূর করতে না পারার আক্ষেপ ছিলো তাঁর বরাবর। কলকাতা বন্দরে কেরানির চাকরিতে মাসিক ২৭৫ টাকা মাইনে দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। তবে চাকরি করলেও অভিনয় থেকে বিরত থাকতে পারেননি।

 

চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার—

 

শুরুতে অরুণ কুমার নামে কিছু বানিজ্যিক ভাবে অসফল সিনেমা দিয়ে নিজের কেরিয়ার শুরু করলেও কিছু সময় পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার সব থেকে জনপ্রিয় নায়ক।  কুমার ১৯৪৭ সালে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করেন, হিন্দি ফিল্ম মায়াডোরে অতিরিক্ত হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন, যেটি কখনও মুক্তি পায়নি।  তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল ১৯৪৮ সালের চলচ্চিত্র দৃষ্টিদান, যা নিতিন বোস পরিচালিত এবং অসিত বারান অভিনীত।  পরের বছর, তিনি কামোনা ছবিতে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন, আবার তার নাম পরিবর্তন করে উত্তম চ্যাটার্জি রাখা হয়।  পরে তিনি আবার নিজের নাম পরিবর্তন করে অরুণ কুমার রাখেন।  পাহাড়ী সান্যালের পরামর্শে ১৯৫১ সালের ছবি সহযাত্রী প্রথম যেখানে তিনি উত্তম কুমার নামটি ব্যবহার করেছিলেন।  কুমারের প্রথম দিকের অনেক ছবিই ফ্লপ ছিল এবং তাকে ডাকনাম দেওয়া হয়েছিল “ফ্লপ মাস্টার জেনারেল”।
১৯৫২ সালে, নির্মল দে পরিচালিত বাসু পরীবারে কুমারের একটি সহায়ক ভূমিকা ছিল, যেটি ছিল তার প্রথম ভূমিকা যা প্রশংসা লাভ করে।  পরের বছর, তিনি একই স্টুডিও এবং পরিচালকের সাথে শেরে চুয়াত্তর চলচ্চিত্রে কাজ করেন, যেটি তার প্রথমবার সুচিত্রা সেনের সাথে জুটি বেঁধেছিল। তার প্রথম যুগান্তকারী ভূমিকা ছিল ১৯৫৪ সালে অগ্রদূতের চলচ্চিত্র অগ্নিপরীক্ষাতে।

 

 

উত্তম কুমার ১৯৬৬ সালে নায়ক ছবিতে প্রথমবার সত্যজিৎ-এর সাথে কাজ করেন।  নায়ক-এ কুমারকে দেখার পর, অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলর তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং কাজ করতে চেয়েছিলেন এবং তার সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালে, উত্তম কুমার রায়ের সাথে চিরিয়াখানায় কাজ করেন।  ভারত সরকার যখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তন করে, তখন উত্তম কুমার ছিলেন প্রথম অভিনেতা যিনি চিরিয়াখানা এবং অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৬৮ সালে ১৫তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

 

উত্তম কুমার প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সিনেমায় কাজ করেছেন, ১৯৪৮ সালে তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দৃষ্টিদান থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির সংখ্যা মোট ২০২টি, যার মধ‍্যে ১৫টি হিন্দি ছবিও আছে। তাঁর মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলির মধ‍্যে অগ্নিপরীক্ষা, হারানো সুর, সপ্তপদী, ঝিন্দের বন্দী, জতুগৃহ, লাল পাথর, থানা থেকে আসছি, রাজদ্রোহী, নায়ক, এন্টনী ফিরিঙ্গি, চৌরঙ্গী, এখানে পিঞ্জর, স্ত্রী, অমানুষ, অগ্নীশ্বর, সন্ন‍্যাসী রাজা ইত্যাদি অন‍্যতম। উত্তম কুমার ভারতের প্রথম অভিনেতা যিনি ১৯৬৮ সালে জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পান। ১৯৬৭ সালের চলচ্চিত্র চিড়িয়াখানা ও এন্টনী ফিরিঙ্গির জন‍্য, তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচাইতে জনপ্রিয় ও সফল অভিনেতা হিসেবে ধরা হয়।

 

উত্তম কুমারের সাথে জুটি—

 

উত্তম-সুচিত্রা—

সুচিত্রা সেন উত্তম কুমার – এই জুটি বাংলা সিনেমার অমর জুটি নামে খ্যাত। তারা দুজন এক সাথে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং সবক’টি ছবি চুড়ান্ত সাফল্যলাভ করেছে। তাদের অভিনীত কিছু উল্লেখযোগ্য ছবি হল – হারানো সুর, অগ্নী পরীক্ষা, প্রিয় বান্ধবী, শাপমোচন, ইন্দ্রাণী, সপ্তপদী ইত্যাদি।

 

উত্তম-সুপ্রিয়া—

সোনার হরিণ থেকে তাদের জুটির জয়যাত্রা শুরু। এরপর তারা একে একে উত্তরায়ণ, কাল তুমি আলেয়া, সন্যাসী রাজা, বন পলাশীর পদাবলী, বাঘ বন্দীর খেলা ইত্যাদি জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করেন।

 

উত্তম-সাবিত্রী—

শেষ দিকে উত্তম কুমারের সাথে সাবিত্রী চ্যাটার্জীর জুটি খুবই জনপ্রিয় হয়। তাদের করা উল্লেখ যোগ্য কিছু ছবি হল হাত বাড়ালেই বন্ধু, দুই ভাই, নিশি পদ্ম, মমের আলো ইত্যাদি। ধন্যি মেয়ে বা মৌচাকের মত কমেডি ছবিতে সাবিত্রীর সাথে জুটি বেঁধে উত্তম কুমারের হাসির অভিনয় আজও সকল দর্শকের মন জয় করে।

 

ব্যক্তিগত জীবন—

 

তিনি ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত গৌরী দেবীর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। এবং গৌতম চট্টোপাধ্যায় নামে এক সন্তান ছিল। তবে গৌতম চট্টোপাধ্যায়  পরবর্তীকালে ক্যান্সারে মারা যান। ১৯৬৩ সালে তিনি পরিবার ছেড়ে চলে যান এবং জীবনের শেষ ১৭ বছর তিনি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সাথেই ছিলেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে সুপ্রিয়া দেবীর গভীর সম্পর্কে ছিল। শোনা যায় তিনি সুপ্রিয়া দেবীকে বিয়েও করেছিলেন।

 

পুরস্কার এবং স্বীকৃতি—

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—

 

১৯৬১: বাংলায় দ্বিতীয় সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য সার্টিফিকেট অফ মেরিট – সপ্তপদী (প্রযোজক হিসেবে)

১৯৬৩: বাংলায় সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার – উত্তর ফাল্গুনী (প্রযোজক হিসেবে)

১৯৬৭: সেরা অভিনেতার জন্য জাতীয় পুরস্কার – অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, চিরিয়াখানা।

 

প্রয়াণ—-

 

বাংলা সিনেমার মহানায়ক উত্তম কুমার টলিউডকে কার্যত খ্যাতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই। অথচ মাত্র ৫৪ বছর বয়সেই আচমকা কাউকে কিছু টের পেতে না দিয়েই খাতির মধ্য গগনে থাকতে থাকতেই প্রয়াত হন তিনি। সেই সময় ওগো বঁধু সুন্দরী সিনেমার শুটিং করছিলেন। শেষ দিনের শুটিং চলাকালীন হার্ট অ্যাটাকে তার মৃত্যু হয়। তারকার মতই নিঃশব্দে মৃত্যু হয়েছিল তার। ১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই, তারিখটা টলিউডের এর জন্য একটা কালো দিন। কারণ এই দিনেই প্রয়াত উত্তম কুমার। তার মৃত্যু বাংলা সিনেমা জগতে নেমে আসে এক গভীর শোকের ছায়া। তার অন্তিম যাত্রায় সারা কলকাতা রাজ পথে বেরিয়ে আসে।  তার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে কলকাতার বহু মানুষ শোক প্রকাশ করেন। বাংলা সিনেমা যতদিন থাকবে উত্তম কুমার মহানায়ক হয়েই রয়ে যাবেন সকল বাঙালীর মনে।

 

।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

 

Share This