Categories
অনুগল্প বিবিধ

অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা মানুষেরা।

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট শহরে থাকত কুসুম। বয়স তিরিশের কাছাকাছি। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে সে তার ছেলেকে নিয়ে একাই সংসার চালাত। বাড়ির এক কোণে রাখা পুরোনো সেলাই মেশিনটাই ছিল তার একমাত্র ভরসা।

সকালে ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে সে কাজে বসত। কখনো কারও ব্লাউজ, কখনো স্কুলের পোশাক, কখনো আবার ছেঁড়া জামা মেরামত করত। কাজের বিনিময়ে যে টাকা পেত, তা দিয়ে সংসার চলত ঠিকই, কিন্তু মাসের শেষে হাতে বিশেষ কিছু থাকত না।

তবু কুসুম কখনো কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা বলত না।

তার ধারণা ছিল, নিজের দুঃখ নিজের মধ্যেই রাখা ভালো। অন্যের কাছে কষ্টের কথা বললে কেউ হয়তো সহানুভূতি দেখাবে, আবার কেউ হয়তো দুর্বল ভেবে বসবে।

একদিন দুপুরে তার বাড়িতে এল পাশের বাড়ির মঞ্জু।

মঞ্জু আগে একটি পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ করত। কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে সে কাজ খুঁজছিল। সংসারে বৃদ্ধ শাশুড়ি আর দুটি ছোট সন্তান। কাজ না পেয়ে তার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল।

মঞ্জু বলল, “কুসুম, তোর কাছে যদি কিছু সেলাইয়ের কাজ থাকে, আমাকে দিবি? আমি আগে কারখানায় কাজ করেছি। মেশিন চালাতে পারি।”

কুসুম নিজের মেশিনের দিকে তাকাল। তার কাছে তখন কয়েকটি অর্ডার ছিল, কিন্তু সব কাজ একা সামলানো কঠিন হচ্ছিল।

সে বলল, “কাজ আছে। তবে এখনই বেশি টাকা দিতে পারব না।”

মঞ্জু মাথা নেড়ে বলল, “যতটুকু পারিস দিস। অন্তত কাজটা থাকুক।”

সেদিন থেকেই মঞ্জু কুসুমের বাড়িতে এসে সেলাই করতে শুরু করল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুজনের কাজের চাপ বেড়ে গেল। আশপাশের মানুষ জানতে পারলেন, কুসুমের কাছে পোশাক তৈরি করানো যায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়।

একটি অর্ডার সময়মতো শেষ করতে না পারায় গ্রাহক বিরক্ত হলেন। আরেকটি পোশাকে মাপের ভুল ধরা পড়ল। কুসুম বুঝতে পারল, শুধু বেশি কাজ নিলেই হবে না; কাজ ভাগ করে নেওয়া, মাপের হিসাব রাখা এবং সময়মতো পোশাক পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ম দরকার।

সে একটি খাতা কিনে আনল। সেখানে প্রতিটি অর্ডারের বিবরণ লিখতে শুরু করল—গ্রাহকের নাম, পোশাকের ধরন, মাপ, কাপড় পাওয়ার তারিখ, কাজ শেষ করার সময় এবং পাওনা টাকা।

মঞ্জুও সেই নিয়ম মেনে চলতে লাগল।

কাজের সুবিধা বাড়ল। কিন্তু কয়েক মাস পর কুসুমের সামনে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। আশপাশের আরও তিনজন মহিলা তার কাছে কাজ চাইতে এলেন।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিধবা সরস্বতী, কৃষিশ্রমিকের স্ত্রী রেণু এবং দুই সন্তানের মা শিউলি। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু সেলাইয়ের অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু তাঁদের কারও নিজের মেশিন ছিল না, কারও আবার কাজ শেখার সুযোগ হয়নি।

কুসুম প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গেল।

নিজের সংসার সামলাতেই তার কষ্ট হচ্ছিল। অন্যদের কাজ দিলে তাঁদের পারিশ্রমিক দিতে হবে, কাপড় কিনতে হবে, নতুন মেশিনের ব্যবস্থা করতে হবে। সবকিছু একা সামলানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

রাতে ছেলেকে পড়াতে বসিয়ে সে বিষয়টি নিয়ে ভাবছিল। হঠাৎ তার ছেলে অর্ক জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি সারাদিন এত কাজ করো কেন?”

কুসুম হেসে বলল, “সংসার চালাতে হয় বলে।”

“তাহলে তুমি আরও লোককে কাজ শেখাও না কেন? সবাই কাজ করলে তোমার কাজও কমবে।”

ছোট ছেলের সরল কথায় কুসুম থমকে গেল।

পরদিন সে মঞ্জুর সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করল। দুজনে ঠিক করল, প্রথমে ছোট পরিসরে কাজ বাড়ানো হবে। নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে কোনো অর্ডার নেওয়া হবে না। নতুন মহিলাদের কাজ শেখানো হবে, আর লাভের হিসাব পরিষ্কার রাখা হবে।

তবে শুধু সিদ্ধান্ত নিলেই তো আর সব সমস্যা মেটে না।

কুসুমের কাছে অতিরিক্ত মেশিন কেনার টাকা ছিল না। তাই সে স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর একটি সভায় গেল। সেখানে মহিলারা নিজেদের সঞ্চয় থেকে ছোট ব্যবসায় সাহায্য করার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতেন।

কুসুম নিজের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করল। সে জানাল, তাদের উদ্দেশ্য বড় কারখানা তৈরি করা নয়; বরং কয়েকজন মহিলাকে নিয়মিত কাজের সুযোগ দেওয়া এবং সেলাইয়ের মান বজায় রেখে অল্প অল্প করে এগিয়ে যাওয়া।

গোষ্ঠীর সদস্যরা তার পরিকল্পনা শুনে আগ্রহী হলেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে একটি ছোট ঋণের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করলেন। সেই অর্থে কুসুম একটি ব্যবহৃত সেলাই মেশিন কিনল।

নতুন মেশিনটি বাড়িতে আসার দিন সবাই মিলে ঘর পরিষ্কার করল। মঞ্জু কাপড় গুছিয়ে রাখল, রেণু সুতো আর বোতাম আলাদা করল, শিউলি মাপের খাতা লেখার কাজ শিখতে লাগল।

তাদের ছোট্ট কাজের জায়গাটির নাম রাখা হলো—‘সুতোবন্ধন’।

নামটি দিয়েছিল অর্ক।

সে বলেছিল, “তোমরা তো সুতো দিয়ে জামা সেলাই করো। কিন্তু তোমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করছ বলেই তো তোমাদের মধ্যে বন্ধন তৈরি হয়েছে।”

কুসুম ছেলের কথা শুনে হেসেছিল।

কিন্তু কয়েক মাস পরেই বোঝা গেল, একসঙ্গে কাজ করার আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বও অনেক।

একদিন একটি স্কুল থেকে পঞ্চাশটি ইউনিফর্ম তৈরির অর্ডার এল। অর্ডারটি তাদের জন্য বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে এতগুলো পোশাক তৈরি করতে হলে সবাইকে পরিকল্পনা মেনে কাজ করতে হবে।

প্রথম কয়েক দিন সব ভালো চলল। তারপর হঠাৎ শিউলির সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাকে কয়েক দিন কাজ বন্ধ রাখতে হলো। রেণুর বাড়িতে কৃষিকাজের ব্যস্ততা বেড়ে গেল। মঞ্জু একা অনেক কাজ সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল।

অর্ডারের সময়সীমা এগিয়ে আসছিল।

কুসুম বুঝতে পারছিল, এবার সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হতে পারে। সে চাইলে কাউকে দোষ দিতে পারত। কিন্তু সে জানত, প্রত্যেকেরই সংসার আছে, দায়িত্ব আছে।

তাই সবাইকে নিয়ে বসে নতুন পরিকল্পনা করল।

যে কাজ বাড়িতে বসে করা যায়, তা শিউলিকে দেওয়া হলো। রেণু কৃষিকাজের ফাঁকে বোতাম লাগানোর কাজ করতে লাগল। মঞ্জু কাপড় কাটার দায়িত্ব নিল। কুসুম নিজে মাপ পরীক্ষা ও শেষ পর্যায়ের সেলাইয়ের কাজ সামলাল।

তারা একে অপরের সময় ও সামর্থ্য বুঝে কাজ ভাগ করে নিল।

শেষ পর্যন্ত অর্ডারটি নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সম্পন্ন হলো। স্কুলের কর্তৃপক্ষ পোশাকের মান দেখে সন্তুষ্ট হলেন এবং পরবর্তী সময়েও কাজ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় সবাই খুব খুশি ছিল। কিন্তু কুসুম একটি বিষয় পরিষ্কার করে জানিয়ে দিল।

“আমরা কাজ বাড়াব, কিন্তু কাউকে অসুস্থ অবস্থায় কাজ করতে বাধ্য করব না। আর যে যতটুকু কাজ করবে, তার পারিশ্রমিকের হিসাব ঠিক রাখতে হবে। আমাদের ব্যবসা ছোট হতে পারে, কিন্তু হিসাবের ব্যাপারে অস্পষ্টতা চলবে না।”

সবাই তার কথায় সম্মতি জানাল।

সময়ের সঙ্গে ‘সুতোবন্ধন’-এর কাজ বাড়তে লাগল। তাঁরা স্কুলের পোশাকের পাশাপাশি সাধারণ পোশাক মেরামত, পর্দা তৈরি এবং ছোট অনুষ্ঠানের জন্য কাপড়ের ব্যাগ তৈরির কাজও নিতে শুরু করলেন।

কুসুম একটি নিয়ম চালু করল—প্রতিটি অর্ডার গ্রহণের আগে কাজের পরিমাণ, খরচ, সময় এবং পারিশ্রমিক হিসাব করা হবে। গ্রাহকের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রিম নেওয়া হবে, যাতে নিজেদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে না হয়।

মঞ্জু ধীরে ধীরে নতুন মহিলাদের সেলাই শেখাতে শুরু করল। রেণু হিসাব রাখা শিখল। শিউলি নিজের সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি বাড়িতে বসে নির্দিষ্ট কাজ করতে পারল।

কিন্তু কুসুমের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছিল অন্য জায়গায়।

আগে সে নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলত না। এখন কাজের সঙ্গীরা তার কাছে শুধু সহকর্মী ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বাসের মানুষ। কোনো দিন তার শরীর খারাপ হলে মঞ্জু কাজ সামলে দিত। অর্কের পরীক্ষা থাকলে রেণু তাকে পড়ার জন্য শান্ত পরিবেশ তৈরি করে দিত। আবার অন্য কারও বিপদ হলে কুসুমও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়াত।

একদিন বিকেলে সরস্বতী কাজ করতে করতে হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু টাকা জমিয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের এক জরুরি চিকিৎসার খরচে সেই সঞ্চয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে।

কুসুম তাঁর কথা শুনে বলল, “তুমি একা সব সামলানোর চেষ্টা করছ কেন? আমরা বসে দেখি, কীভাবে সাহায্য করা যায়।”

কেউ কাউকে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন না। তাঁরা বরং সরস্বতীর কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে তাঁর পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নিলেন, পরিবারের অন্যান্য সহায়তার সম্ভাবনা খুঁজলেন এবং স্থানীয় একটি সহায়তা গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

সমস্যাটি একদিনে মিটে যায়নি। কিন্তু সরস্বতী আর নিজেকে একা মনে করলেন না।

এক সন্ধ্যায় কাজ শেষে সবাই উঠোনে বসেছিল। আকাশে তখন ম্লান আলো। সেলাই মেশিনের শব্দ থেমে গিয়েছে, চারদিকে নেমেছে শান্তি।

মঞ্জু বলল, “কুসুম, মনে আছে, প্রথম দিন তোর কাছে কাজ চাইতে এসেছিলাম? ভেবেছিলাম, কয়েকটা টাকা রোজগার করতে পারলেই বাঁচি। এখন বুঝি, কাজের সঙ্গে সঙ্গে একটা ভরসার জায়গাও পেয়েছি।”

রেণু বলল, “আগে কোনো সমস্যা হলে ভাবতাম, সব নিজেকেই সামলাতে হবে। এখন জানি, কথা বলার মতো কয়েকজন মানুষ আছে।”

কুসুম চুপ করে শুনছিল।

তার মনে পড়ল, একসময় নিজের দুঃখ কাউকে না জানানোকে সে শক্তি বলে মনে করত। এখন বুঝেছে, সব সময় একা কষ্ট সহ্য করাই শক্তি নয়। কখনো সাহায্য চাইতে পারা, অন্যের কথা শোনা এবং একে অপরের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করাও শক্তির পরিচয়।

পরের দিন ‘সুতোবন্ধন’-এর ছোট্ট ঘরে একটি নতুন বোর্ড লাগানো হলো।

তাতে লেখা ছিল—

‘এখানে প্রতিটি পোশাক সেলাই হয় যত্ন দিয়ে, আর প্রতিটি কাজের সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশ্বাস দিয়ে।’

বোর্ডটি দেখে অর্ক খুশিতে হাততালি দিল।

কুসুম ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসল। সে জানত, তাদের ছোট উদ্যোগ এখনও অনেক পথ হাঁটবে। হয়তো কখনো নতুন সমস্যা আসবে, কখনো কাজ কমে যাবে, কখনো ভুলও হবে। কিন্তু তারা এখন জানে, সমস্যার সময় একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে নয়, একে অপরের কথা শুনে সমাধান খুঁজলেই এগোনো যায়।

সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে কুসুম আকাশের দিকে তাকাল। রাস্তার পাশে কয়েকটি বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছিল। কোথাও কেউ রান্না করছেন, কোথাও কেউ পড়াশোনা করছেন, কোথাও হয়তো কেউ নিঃশব্দে নিজের দুশ্চিন্তা সামলাচ্ছেন।

কুসুমের মনে হলো, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আমরা হয়তো প্রতিদিন সেই বন্ধন দেখতে পাই না। কিন্তু কারও বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, কারও পরিশ্রমের মূল্য দেওয়া, কারও কথা মন দিয়ে শোনা—এই ছোট ছোট কাজই সেই সুতোকে দৃঢ় করে।

আর সেই সুতোয় বাঁধা মানুষদের শক্তি অনেক সময় তাদের একার শক্তির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

গল্পের শিক্ষা

সহযোগিতা মানে শুধু একে অপরকে সাহায্য করা নয়; বরং প্রত্যেকের সামর্থ্য, সীমাবদ্ধতা ও মর্যাদাকে সম্মান করে একসঙ্গে এগিয়ে চলা। স্বচ্ছ হিসাব, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং পারস্পরিক বিশ্বাস থাকলে ছোট উদ্যোগও বহু মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *