Categories
উপন্যাস বিবিধ

অন্ধকারের তেরো নম্বর ঘর ((তৃতীয় পর্ব: শেষ জন্মের অভিশাপ))।

ঘড়িতে তখন ২টা ১৩ মিনিট।

অন্ধকারের নিচে দাঁড়িয়ে অদিতি তাকিয়ে ছিল সেই অচেনা লোকটির দিকে। লোকটির মুখে তার নিজের ছায়া, চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা। অথচ সে দাবি করছে, অদিতির জন্মদাতা বাবা সে-ই।

“তুমি আমার বাবা নও!” অদিতি চিৎকার করে উঠল।

লোকটি মৃদু হাসল।

“তোর মনে নেই, তাই না? মনে থাকার কথাও নয়। তোকে তো বারবার নতুন করে জন্ম দেওয়া হয়েছে।”

“এসবের মানে কী?”

“এই বাড়ির তেরো নম্বর ঘর শুধু একটা ঘর নয়। এটা এমন একটা দরজা, যার ওপারে সময় আটকে থাকে। এখানে যে মারা যায়, সে সব সময়ের জন্য হারিয়ে যায় না। আর যে বেঁচে থাকে, সে সব সময় নিজের জীবন নিয়ে বাঁচে না।”

লোকটি হাত তুলে ঘরের দেওয়ালের দিকে দেখাল।

সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল।

অদিতি দেখল, ১৯৪৩ সালের এক বৃষ্টিভেজা রাত। বাড়ির পেছনে একটা কুয়ো। কুয়োর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আট বছরের মেয়ে মীরা। তার হাত ধরে রেখেছে এক যুবক।

যুবকটি মীরাকে ঠেলে কুয়োর মধ্যে ফেলে দিল।

মীরা চিৎকার করল।

কিন্তু কেউ তাকে বাঁচাতে এল না।

তারপর দৃশ্যটা বদলে গেল।

একটি ঘরে বসে আছেন মৃণালিনী দেবী। তাঁর কোলে একটা নবজাতক। পাশে দাঁড়িয়ে এক পুরুষ বলছে, “এই শিশুকে বাঁচাতে হলে অন্য একটা শিশুকে মরতে হবে।”

মৃণালিনী দেবী কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়লেন।

“না! আমি আর কোনো শিশুকে মরতে দেব না!”

কিন্তু পুরুষটি তাঁর হাত থেকে শিশুটিকে কেড়ে নিল।

দৃশ্যটা আবার বদলে গেল।

১৯৯২ সালের রাত।

অদিতির মা প্রসবযন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে অদিতির বাবা। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে হরিপদ।

হঠাৎ ঘরের আলো নিভে গেল।

একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

তারপর আরেকটি।

দুটি শিশু জন্মেছিল সেই রাতে।

একটি শিশুকে মায়ের বুকে তুলে দেওয়া হল। অন্যটিকে নিয়ে যাওয়া হল তেরো নম্বর ঘরের দিকে।

তারপর দৃশ্যের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল।

অদিতি চোখ বন্ধ করে ফেলল।

“বন্ধ করো! আমি আর দেখতে পারছি না!”

দৃশ্যগুলো মিলিয়ে গেল।

লোকটি বলল, “এবার বুঝতে পারছিস? তুই জন্মেছিলি দুজনের সঙ্গে। একজন এই পৃথিবীতে বড় হয়েছে। আর অন্যজনকে এই বাড়ি নিজের কাছে রেখে দিয়েছে।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“না। আমি একাই জন্মেছিলাম। আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন, আমার বাবা আমাকে বড় করেছিলেন।”

“তোর বাবা তোকে বড় করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তিনি তোর আসল পরিচয় জানতেন না।”

“তাহলে তুমি জানো?”

লোকটি এবার গম্ভীর হয়ে উঠল।

“আমি জানি, কারণ এই বাড়ির অভিশাপ আমারই তৈরি।”

সে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল।

“আমার নাম রুদ্রনারায়ণ। ১৯৪৩ সালে মীরাকে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিলাম আমি। সে আমার অপরাধের সাক্ষী ছিল। আমি ভেবেছিলাম, তাকে সরিয়ে দিলেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মীরার মৃত্যু এই বাড়িকে বদলে দিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতি তেরো বছরে এই বাড়িতে একজন শিশু জন্মায়, যার জীবন অন্য এক মৃত শিশুর সঙ্গে বাঁধা থাকে।”

“কেন?”

“কারণ মৃত্যুর মুহূর্তে মীরা একটা অভিশাপ দিয়েছিল। সে বলেছিল, যে তার জীবন কেড়ে নিয়েছে, তার বংশে কেউ নিজের জীবন সম্পূর্ণভাবে পাবে না।”

অদিতির বুকের মধ্যে ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

“কিন্তু আমার বাবা তো রুদ্রনারায়ণ ছিলেন না!”

“তোর যে বাবাকে তুই চিনতিস, তিনি ছিলেন দেবব্রত সেন। তিনি তোকে নিজের সন্তান হিসেবেই ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু তোর জন্মের রাতের সত্যিটা তিনি জানতেন না। তোর মা জানতেন কিছুটা, আর হরিপদ জানতেন বাকিটা।”

“তাহলে তুমি কীভাবে আমার বাবা হলে?”

রুদ্রনারায়ণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি তোর জন্মদাতা নই। আমি এই অভিশাপের উৎস। তোকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এই বাড়ি আমার মুখ দেখাচ্ছে।”

অদিতি স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে একটু আগেই তুমি কেন বললে—”

“কারণ এই বাড়ি মিথ্যে বলে। যে সত্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছে যায়, তাকে ভুল পথে চালিত করাই তার কাজ।”

হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে মীরার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“সব কথা সত্যি নয়, অদিতি!”

সাদা ফ্রক পরা মেয়েটি প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে এবার আর আগের আতঙ্ক নেই।

“রুদ্রনারায়ণ মিথ্যে বলছে। অভিশাপের কথা সত্যি, কিন্তু তোর জন্মের কথা নয়।”

অদিতি মীরার দিকে ছুটে গেল।

“তুমি জানো আমি কে?”

মীরা মাথা নাড়ল।

“জানি। তুই সেই মেয়ে, যাকে তোর মা নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন।”

“কিন্তু এখানে তো বলা হচ্ছে, আমি দুবার জন্মেছি!”

“তোর জন্ম একবারই হয়েছিল। কিন্তু এই বাড়ি তোর স্মৃতিকে ভাগ করে দিয়েছে। তোর শৈশবের কিছু স্মৃতি, তোর মায়ের স্মৃতি, এমনকি তোর নিজের প্রতিবিম্ব—সবই এই ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে।”

অদিতি বুঝতে পারছিল না, কাকে বিশ্বাস করবে।

মীরা এবার তাকে একটা ছোট্ট আয়না দিল।

“এটা তোর মায়ের। এতে একবার তাকিয়ে দেখ।”

অদিতি আয়নায় তাকাল।

প্রথমে সে নিজের মুখ দেখতে পেল।

তারপর মুখটা ঝাপসা হয়ে গেল।

আয়নার মধ্যে দেখা গেল একটা ছোট মেয়ে, যে বিছানায় বসে কাঁদছে। তার পাশে এক মহিলা বসে আছেন। মহিলা শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন, “ভয় পাস না। একদিন তুই সব মনে করতে পারবি।”

মেয়েটি জিজ্ঞেস করছে, “মা, তুমি কোথায় যাবে?”

মহিলা উত্তর দিচ্ছেন, “আমি একটু ঘুমোতে যাচ্ছি, মা। কিন্তু তুই যখন বড় হবি, তখন এই বাড়িতে ফিরে এসে আমাকে জাগিয়ে তুলবি।”

দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

অদিতির চোখ ভিজে উঠল।

“মা আমাকে এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার মনে ছিল না।”

মীরা মাথা নাড়ল।

“কারণ তোর বাবা তোকে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় তোর স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়েছিল। তোর মা তোকে বাঁচাতে নিজের স্মৃতিগুলো এই ঘরে রেখে গিয়েছিলেন।”

“কেন?”

“কারণ এই বাড়ি তোর মাকে আটকে রেখেছিল। তুই যদি ছোটবেলায় সব জানতে পারতিস, তাহলে তোরও মৃত্যু হতে পারত।”

অদিতি মীরার হাত চেপে ধরল।

“তাহলে আমার মা কোথায়?”

মীরা প্রদীপটা উঁচু করল।

ঘরের শেষ প্রান্তে একটা ছোট দরজা দেখা গেল।

“ওই দরজার ওপারে।”

অদিতি দরজার দিকে এগোতেই রুদ্রনারায়ণ চিৎকার করে উঠল।

“ওদিকে যাস না! তোর মা তোকে বাঁচাতে পারেনি। এবার তুই নিজেই মরবি!”

তার চিৎকারে ঘরের দেওয়াল কেঁপে উঠল। ছাদের ওপর থেকে ধুলো ঝরে পড়তে লাগল। প্রদীপের শিখা দপদপ করে উঠল।

মীরা অদিতির হাত ধরে টানল।

“দৌড়ো!”

দুজনেই দরজার দিকে ছুটল।

কিন্তু দরজার সামনে পৌঁছতেই অদিতি দেখল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পোড়া মুখের সেই মহিলা।

মহিলা মৃদু হেসে বললেন, “এবার তোকে আর কোথাও যেতে দেব না।”

অদিতি পিছিয়ে এল।

“তুমি কে?”

মহিলাটি ধীরে ধীরে মুখের ওপর হাত বোলালেন।

পোড়া চামড়া খসে পড়তে লাগল।

তার নিচে দেখা গেল এক তরুণীর মুখ।

অদিতি সেই মুখ আগে দেখেছে।

পুরোনো ছবিতে।

তার মায়ের পাশে দাঁড়ানো মহিলাটির মুখ।

“তুমি…?”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

“আমি তোর মায়ের বোন, মাধবী।”

“কিন্তু মা তো কখনও বলেননি তাঁর কোনো বোন ছিল!”

“কারণ তোর মা আমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিল। আমি তেরো নম্বর ঘরের দরজা খুলেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, মীরাকে মুক্ত করলে আমার জীবন ফিরে পাব। কিন্তু দরজার ওপাশ থেকে যে বেরিয়ে এসেছিল, সে মীরা ছিল না।”

মাধবী কাঁদতে লাগলেন।

“সেই রাত থেকে আমি এই বাড়িতে আটকে আছি। আমার মুখ, আমার স্মৃতি, আমার জীবন—সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”

মীরা চিৎকার করে উঠল, “ওর কথা বিশ্বাস করিস না! ও-ই তোকে দরজা খুলতে বাধ্য করবে!”

মাধবী এবার অদিতির দিকে হাত বাড়ালেন।

“আমাকে মুক্ত কর, অদিতি। তোর মা বেঁচে আছে। কিন্তু তাকে বাঁচাতে হলে তোর নিজের স্মৃতি আমাকে দিতে হবে।”

অদিতি থমকে গেল।

“আমার স্মৃতি দিলে মা বাঁচবে?”

“হ্যাঁ।”

“আর আমি?”

মাধবী কোনো উত্তর দিলেন না।

অদিতি বুঝতে পারল, এই বাড়ির প্রত্যেকেই তার কাছ থেকে কিছু একটা চাইছে। কেউ তার জীবন, কেউ তার স্মৃতি, কেউ তার বিশ্বাস।

কিন্তু কেউই তাকে সম্পূর্ণ সত্যিটা বলছে না।

ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে তার মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“অদিতি! মা, আমার কথা শোন!”

অদিতি কেঁদে ফেলল।

“মা!”

“তুই যদি আমাকে বাঁচাতে চাস, তবে তোর বাবার ঘড়িটা ভেঙে ফেল। ওই ঘড়ির মধ্যেই সব বন্দি আছে।”

অদিতি নিজের পকেটে হাত দিল।

বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ঘর থেকে সে একটা পুরোনো পকেটঘড়ি পেয়েছিল। ঘড়িটা সে সঙ্গে করে এনেছে। এতক্ষণ সেটা তার পকেটেই ছিল।

সে ঘড়িটা বের করল।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে ২টা ১৩ মিনিটে।

মীরা ফিসফিস করে বলল, “ওটাই এই বাড়ির সময়ের চাবি। ঘড়িটা ভাঙতে পারলে সব শেষ হয়ে যাবে।”

কিন্তু মাধবী চিৎকার করে উঠলেন, “না! ঘড়িটা ভাঙিস না! ওটা ভাঙলে তোর মা চিরতরে হারিয়ে যাবে!”

অদিতি ঘড়িটা দুহাতে চেপে ধরল।

তার সামনে দুটি পথ।

ঘড়ি ভেঙে মাকে হারানোর ঝুঁকি নেওয়া, অথবা ঘড়ি অক্ষত রেখে এই অভিশাপের মধ্যে চিরকাল আটকে থাকা।

হঠাৎ তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় বাবা তাকে একটা কথা বলেছিলেন।

“যে সত্যি তোকে ভালোবাসে, সে কখনও তোকে নিজের জন্য অন্ধকারে আটকে রাখবে না।”

অদিতি মাধবীর দিকে তাকাল।

“তুমি যদি সত্যিই আমার মায়ের বোন হও, তাহলে তুমি আমাকে নিজের স্মৃতি দিতে বলছ কেন?”

মাধবী থমকে গেলেন।

অদিতি আবার বলল, “আর যদি তুমি সত্যিই মাকে বাঁচাতে চাও, তাহলে আমাকে ঘড়ি ভাঙতে বাধা দিচ্ছ কেন?”

মাধবীর মুখ বিকৃত হয়ে গেল।

তারপর তাঁর শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বেরোতে লাগল।

“বোকা মেয়ে! তুই কিছুই বুঝিস না!”

পরের মুহূর্তে মাধবীর মুখটা আবার বদলে গেল।

এবার সেই মুখ অদিতির নিজের।

কিন্তু চোখ দুটো রক্তের মতো লাল।

“আমি তোর মা নই, মাধবীও নই। আমি সেই অন্ধকার, যাকে তোরা এত বছর ধরে এই বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিস!”

মীরার হাতে থাকা প্রদীপটা হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

সে চিৎকার করল, “এবার! ঘড়িটা ভেঙে ফেল!”

অদিতি সমস্ত শক্তি দিয়ে পকেটঘড়িটা মেঝেতে ছুড়ে মারল।

ঝনঝন শব্দে ঘড়িটা ভেঙে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল।

দেওয়াল ফেটে গেল।

ছাদ থেকে পাথর পড়তে লাগল।

তেরো নম্বর ঘরের ভেতর থেকে শত শত মানুষের কান্না, চিৎকার আর আর্তনাদ একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

অন্ধকারের মধ্যে অদিতি দেখল, একে একে অসংখ্য ছায়া ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ বৃদ্ধ, কেউ যুবক, কেউ শিশু। তাদের মধ্যে একজন সাদা শাড়ি পরা মহিলা।

তার মা।

অদিতি ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল।

এবার মায়ের শরীরের মধ্য দিয়ে তার হাত চলে গেল না।

মা তাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিলেন।

“আমি জানতাম, তুই একদিন ফিরে আসবি।”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা, এত বছর তুমি কোথায় ছিলে?”

মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“আমি এই বাড়ির সময়ের মধ্যে আটকে ছিলাম। তুই যখন ঘড়িটা ভেঙেছিস, তখন সব স্মৃতি মুক্ত হয়ে গেছে।”

“মীরা?”

মা পিছনে তাকালেন।

মীরা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে শান্ত হাসি।

“ও এবার মুক্তি পাবে,” মা বললেন। “কিন্তু তার আগে তোকে একটা কথা জানতে হবে।”

অদিতি মায়ের দিকে তাকাল।

“কী কথা?”

মা তার হাত দুটো নিজের হাতে নিলেন।

“এই বাড়ির অভিশাপ শুরু হয়েছিল মীরার মৃত্যুর দিন। কিন্তু সেটা শেষ হবে কেবল তখনই, যখন তুই তাকে ক্ষমা করতে পারবি, যে তাকে মেরেছিল।”

অদিতি অবাক হয়ে গেল।

“রুদ্রনারায়ণকে?”

মা মাথা নাড়লেন।

“না, অদিতি। রুদ্রনারায়ণ বহু বছর আগেই মারা গিয়েছিল। এই বাড়ির মধ্যে তার মুখ নিয়ে যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে ছিল অন্য কেউ।”

“কে?”

মা ধীরে ধীরে ঘরের শেষ প্রান্তের দিকে তাকালেন।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে হরিপদ।

কিন্তু তাঁর মুখে আর বৃদ্ধের চেহারা নেই।

তিনি এখন তরুণ।

তাঁর চোখে সেই একই অন্ধকার।

অদিতির গলা শুকিয়ে গেল।

“হরিপদকাকা?”

লোকটি মৃদু হাসল।

“এত বছর ধরে তোকে খুঁজেছি, অদিতি। তোর বাবা তোকে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুই নিজেই ফিরে এলি।”

মা অদিতিকে নিজের পিছনে টেনে নিলেন।

“ওর কথা শুনিস না!”

হরিপদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“মীরা আমার বোন ছিল। রুদ্রনারায়ণ তাকে কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল, ঠিকই। কিন্তু আমি তাকে বাঁচাতে পারতাম। আমি বাঁচাইনি। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। সেই অপরাধবোধই আমাকে এই বাড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।”

মীরা মাথা নিচু করল।

“তুমি আমাকে বাঁচাতে পারতে, দাদা।”

হরিপদ কেঁদে ফেললেন।

“আমি জানি, মীরা। আমি জানি।”

অদিতি বুঝতে পারল, এতদিন ধরে এই বাড়ির রহস্যের মধ্যে যে মানুষটি তাকে সাহায্য করার ভান করছিল, সে-ই আসলে সত্যিটা জানত। তার অপরাধবোধ, তার ভয়, তার মিথ্যে—সব মিলিয়ে এই অভিশাপ এত বছর ধরে বেঁচে ছিল।

মীরা ধীরে ধীরে তার ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেল।

“আমি তোমাকে ঘৃণা করি না, দাদা। কিন্তু তোমাকে নিজের অপরাধ স্বীকার করতেই হবে।”

হরিপদ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

“আমি স্বীকার করছি। আমি কাপুরুষ ছিলাম। আমি আমার বোনকে বাঁচাইনি।”

এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শরীর থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এল। ধোঁয়াটা আকাশের দিকে উঠে মিলিয়ে গেল।

মীরা চোখ বন্ধ করল।

তারপর তার শরীরটাও ধীরে ধীরে আলোর মধ্যে মিশে যেতে লাগল।

যাওয়ার আগে সে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার তুই বাড়ি ফিরে যা। আর কখনও রাত ২টা ১৩ মিনিটে ভয় পাবি না।”

অদিতি হাত বাড়িয়ে দিল।

“তুমি কোথায় যাবে?”

মীরা হাসল।

“যেখানে কোনো বন্ধ দরজা নেই।”

তারপর সে মিলিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তেরো নম্বর ঘর ভেঙে পড়ল। বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরল। অদিতি তার মাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল।

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।

বহু বছরের পুরোনো বাড়িটা ধীরে ধীরে ধসে পড়ল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার ভেতর থেকে আর কোনো চিৎকার শোনা গেল না।

শুধু একটা পুরোনো আয়না অক্ষত অবস্থায় পড়ে রইল।

অদিতি আয়নার সামনে দাঁড়াল।

এবার সেখানে তার প্রতিবিম্ব স্পষ্ট।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার মা।

আর দূরে, অনেক দূরে, সাদা ফ্রক পরা একটা ছোট মেয়ে হাত নাড়ছে।

অদিতি চোখ মুছে আবার তাকাল।

মেয়েটা নেই।

আয়নায় শুধু সে নিজে।


ছয় মাস পরে।

অদিতি কলকাতায় ফিরে এসেছে। মায়ের সঙ্গে তার নতুন জীবন শুরু হয়েছে। পুরোনো বাড়ির জমিতে একটা ছোট শিশু আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। নাম দিয়েছে—‘মীরার আলো’।

কোনো শিশুকে যেন আর অন্ধকারে একা থাকতে না হয়।

একদিন রাতে অদিতি মায়ের ঘরে বসে পুরোনো কাগজপত্র গোছাচ্ছিল। হঠাৎ একটা খাম পেল। খামের ওপরে বাবার হাতের লেখা।

“অদিতির জন্য, যদি কখনও সে সব সত্যি জানতে পারে।”

অদিতি কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।

বাবা লিখেছিলেন—

“মা, আমি তোকে নিজের মেয়ে হিসেবেই ভালোবেসেছি। তোর জন্মের রহস্য আমি কখনও পুরোপুরি জানতে পারিনি। শুধু জানতাম, তোর মধ্যে এমন একটা আলো আছে, যা এই বাড়ির অন্ধকারকে হারাতে পারবে। যদি কখনও তুই সব জানতে পারিস, তবে মনে রাখিস—মানুষের পরিচয় তার জন্মে নয়, তার ভালোবাসায়।”

চিঠিটা বুকে চেপে ধরে অদিতি কেঁদে ফেলল।

তারপর জানলার বাইরে তাকাল।

দূরে একটা ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।

রাত ২টা ১৩ মিনিট।

অদিতি আর ভয় পেল না।

সে জানত, মীরা মুক্তি পেয়েছে। তার মা তার পাশে আছেন। আর তেরো নম্বর ঘরের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো আয়নাটার কাচে একটা অক্ষর ফুটে উঠল।

লাল কালিতে লেখা—

“দরজাটা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ওপাশে যে ছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”

অদিতি ধীরে ধীরে আয়নার দিকে এগিয়ে গেল।

আয়নায় তার প্রতিবিম্ব হাসছে।

কিন্তু অদিতি হাসছে না।

প্রতিবিম্বটি ঠোঁট নাড়ল।

“এবার আমার পালা।”

তারপর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *