জীবনে হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা কখনও কখনও মানুষের সামনে এমন এক বাস্তবতা এনে দেয়, যা সে আগে কল্পনাও করেনি। কেউ সেই বাস্তবতার কাছে হার মেনে নেয়, আবার কেউ নিজের জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে নেয়। ভারতের প্যারা-শুটার অবনী লেখরা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। এক দুর্ঘটনার পর হুইলচেয়ার-নির্ভর জীবন শুরু হলেও তিনি থেমে থাকেননি। বরং শুটিংয়ের লক্ষ্যভেদী দুনিয়ায় প্রবেশ করে এমন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, যা ভারতীয় ক্রীড়ার পাতায় বিশেষভাবে লেখা থাকবে।
টোকিও ২০২০ প্যারালিম্পিকসে তিনি ১০ মিটার এয়ার রাইফেল SH1 বিভাগে সোনা জিতে ভারতের প্রথম মহিলা প্যারালিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হন। সেই জয়ের সঙ্গে তিনি একটি প্যারালিম্পিক রেকর্ডও গড়েছিলেন এবং ২৪৯.৬ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বরেকর্ডের সমান স্কোর করেছিলেন।
কিন্তু অবনীর গল্পের আসল সৌন্দর্য শুধুমাত্র সেই সোনার পদকে নয়। তার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল লড়াই।
দুর্ঘটনা বদলে দিল জীবন
অবনী লেখরার জন্ম ৮ নভেম্বর ২০০১ সালে রাজস্থানের জয়পুরে। ছোটবেলায় তাঁর জীবন ছিল অন্য অনেক শিশুর মতোই। পড়াশোনা, পরিবার, স্বাভাবিক জীবন—সবকিছুই নিজের গতিতে এগোচ্ছিল।
কিন্তু ২০১২ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনা তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। তখন তিনি মাত্র দশ বছরের শিশু। দুর্ঘটনার ফলে তাঁর মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে এবং কোমরের নিচের অংশে স্থায়ীভাবে চলাচলের ক্ষমতা হারান।
একটি শিশুর জন্য এই পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত কঠিন। হঠাৎ করে দৌড়ানো, হাঁটা, খেলাধুলা—স্বাভাবিক জীবনের বহু পরিচিত বিষয় তাঁর নাগালের বাইরে চলে যায়।
কিন্তু এখানেই অবনী ও তাঁর পরিবারের দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁরা তাঁকে অসহায় হিসেবে দেখতে চাননি। বরং নতুন বাস্তবতার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নিতে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
শুটিংয়ের সঙ্গে পরিচয়
অবনীর জীবনে শুটিংয়ের প্রবেশ ঘটে এক বিশেষ অনুপ্রেরণার মাধ্যমে। তাঁর বাবা তাঁকে প্যারা-শুটিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিংবদন্তি শুটার অভিনব বিন্দ্রার আত্মজীবনীও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শুটিংয়ের প্রথমদিকে এটি ছিল একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু ধীরে ধীরে অবনী বুঝতে শুরু করেন, এই খেলায় তাঁর মনোযোগ, ধৈর্য এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগানো সম্ভব।
শুটিং এমন একটি খেলা যেখানে কয়েক মিলিমিটারের পার্থক্যও ফলাফল বদলে দিতে পারে। নিশানা ঠিক রাখতে যেমন শারীরিক নিয়ন্ত্রণ দরকার, তেমনই প্রয়োজন মানসিক স্থিরতা।
অবনী সেই মানসিক স্থিরতাকে নিজের শক্তিতে পরিণত করতে শুরু করেন।
প্রশিক্ষণের কঠিন পথ
সাফল্যের পিছনে শুধু প্রতিভা থাকলেই হয় না। প্যারা-শুটিংয়ের মতো খেলায় দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতার চাপ সামলানোর ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবনী প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে শুরু করেন।
শুরুতে তিনি যে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে তাঁর সামনে ছিলেন অভিজ্ঞ শুটাররা। কিন্তু তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস হারাননি।
প্রতিটি প্রতিযোগিতা তাঁর কাছে ছিল শেখার সুযোগ। একটি খারাপ শট তাঁকে পরের শটের জন্য আরও প্রস্তুত করত। একটি হার তাঁকে পরবর্তী প্রতিযোগিতায় নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিত।
এই মানসিকতা পরবর্তীকালে তাঁর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
টোকিও ২০২০: ইতিহাসের দিন
২০২১ সালের ৩০ আগস্ট—ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন।
টোকিও প্যারালিম্পিকসে অবনী লেখরা অংশ নেন মহিলাদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল SH1 ইভেন্টে। প্রতিযোগিতাটি ছিল অত্যন্ত চাপের। কিন্তু অবনী নিজের মনোযোগ ধরে রাখেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি ২৪৯.৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে সোনা জেতেন।
এই জয়ের গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথম মহিলা প্যারালিম্পিক সোনা জয়ী। একই সঙ্গে শুটিংয়ে এটিই ছিল প্যারালিম্পিকসে ভারতের প্রথম পদক।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে অবনী যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তা শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না। এটি ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের জন্যও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
একটি সোনার পরেই আরেকটি পদক
টোকিওতে অবনীর সাফল্য শুধু সোনায় থেমে থাকেনি।
মহিলাদের ৫০ মিটার রাইফেল ৩ পজিশন SH1 ইভেন্টে তিনি ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। ফলে একই প্যারালিম্পিকসে তিনি দুটি পদক জয় করেন।
একজন তরুণ ক্রীড়াবিদের জন্য এটি ছিল অসাধারণ সাফল্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রথমবার প্যারালিম্পিকসে অংশ নিয়ে তিনি যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর পারফরম্যান্স।
সাফল্যের পর চাপও বেড়েছিল
একজন ক্রীড়াবিদ প্রথমবার বড় সাফল্য পাওয়ার পর সাধারণত একটি নতুন সমস্যার মুখোমুখি হন—পরবর্তী প্রতিযোগিতায় সেই সাফল্য ধরে রাখার চাপ।
অবনীর ক্ষেত্রেও তা ঘটেছিল।
টোকিওর পর তিনি আর অজানা প্রতিযোগী ছিলেন না। সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশা বেড়েছিল।
কিন্তু একজন চ্যাম্পিয়নের আসল পরীক্ষা হয় তখনই, যখন সে সাফল্যের পরও নিজের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।
অবনী সেই পরীক্ষাতেও সফল হন।
প্যারিস ২০২৪: সাফল্যের পুনরাবৃত্তি
টোকিওর তিন বছর পর আসে প্যারিস প্যারালিম্পিকস।
২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট আবারও ১০ মিটার এয়ার রাইফেল SH1-এর ফাইনালে অবনী লেখরা সোনা জেতেন। অর্থাৎ টোকিওর সাফল্যকে তিনি প্যারিসেও পুনরাবৃত্তি করেন।
প্যারিসে তিনি ২৪৯.৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করেন, যা নতুন প্যারালিম্পিক রেকর্ড ছিল।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—টোকিও এবং প্যারিস, দুই প্যারালিম্পিকসেই তাঁর সোনার দিন ছিল ৩০ আগস্ট। তাঁর ক্যারিয়ারের এই বিশেষ মিলটি পরবর্তীকালে নিজেও উল্লেখ করেছেন।
একই দিনে তিন বছর ব্যবধানে দুটি প্যারালিম্পিক সোনা—এটি তাঁর ধারাবাহিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ।
শুধু প্রতিভা নয়, মানসিক প্রস্তুতি
শুটিংয়ে একজন খেলোয়াড়ের হাত স্থির থাকা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি মন স্থির রাখা।
একটি ফাইনালে যখন প্রতিটি শটের সঙ্গে পদকের সম্ভাবনা বদলে যায়, তখন সামান্য উদ্বেগও পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
অবনী তাঁর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বারবার দেখিয়েছেন যে মানসিক প্রস্তুতি শুটিংয়ের একটি বড় অংশ।
তিনি তরুণ শুটারদের জন্য শারীরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। তাঁর নিজের ক্যারিয়ারই তার বাস্তব উদাহরণ।
খেলাধুলার বাইরেও একটি বার্তা
অবনী লেখরার সাফল্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি প্রতিবন্ধী মানুষদের সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
প্রতিবন্ধকতা মানেই সীমাবদ্ধতা—এই ধারণা তাঁর জীবনকে দেখলে নতুনভাবে ভাবতে হয়।
তাঁর শরীরের একটি অংশের কার্যক্ষমতা হারিয়েছিল। কিন্তু তাঁর স্বপ্নের কার্যক্ষমতা হারায়নি।
তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের সক্ষমতা নির্ধারণ করতে শুধু শরীরের একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতার দিকে তাকালে পুরো মানুষটিকে বোঝা যায় না।
একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীও বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে দেশের জন্য সোনা জিততে পারেন। একজন তরুণীও এমন একটি খেলায় বিশ্বমানের সাফল্য অর্জন করতে পারেন, যেখানে নিখুঁত মনোযোগই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সম্মানের স্বীকৃতি
অবনীর ক্রীড়া সাফল্যের জন্য ভারত সরকার তাঁকে মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন পুরস্কার প্রদান করে। সরকারি তালিকায় ২০২১ সালের খেলরত্ন পুরস্কারপ্রাপকদের মধ্যে তাঁর নাম প্যারা-শুটিং বিভাগে রয়েছে।
এই সম্মান তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের গুরুত্বও আরও সামনে নিয়ে আসে।
তবে একজন ক্রীড়াবিদের কাছে পুরস্কার যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, প্রতিযোগিতার মুহূর্তে আসল পরিচয় তৈরি হয় পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। অবনী সেই পরিচয় তৈরি করেছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
অবনী লেখরার গল্পের সবচেয়ে মূল্যবান দিক সম্ভবত তাঁর পদক নয়—তাঁর প্রভাব।
ভারতের বহু শিশু ও তরুণ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরা তাঁর সাফল্য দেখে বুঝতে পেরেছেন যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন তাঁদের জন্যও উন্মুক্ত হতে পারে।
একজন ক্রীড়াবিদ যখন ইতিহাস তৈরি করেন, তখন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ কিছুটা সহজ হয়ে যায়।
অবনীর আগে ভারতের প্যারা-শুটিংয়ের পরিচিতি সীমিত ছিল। তাঁর সাফল্যের পরে এই খেলাটি অনেক বেশি মানুষের নজরে আসে।
আজ তিনি শুধু একজন শুটার নন; তিনি ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের অন্যতম পরিচিত মুখ।
লক্ষ্যভেদ থেকে জীবনের শিক্ষা
অবনী লেখরার জীবন আমাদের একটি সহজ কিন্তু গভীর শিক্ষা দেয়—পরিস্থিতি সবসময় আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, কিন্তু পরিস্থিতির প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া অনেকটাই আমাদের হাতে থাকে।
২০১২ সালের দুর্ঘটনা তিনি বেছে নেননি। কিন্তু তার পরের জীবনকে কীভাবে গড়ে তুলবেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর ছিল।
তিনি নিজের দুর্বলতার দিকে তাকিয়ে থেমে থাকেননি। বরং নিজের শক্তিকে খুঁজে নিয়েছেন।
শুটিংয়ের লক্ষ্যবস্তুতে চোখ রেখে তিনি যেন নিজের জীবনকেও একটি লক্ষ্য দিয়েছিলেন।
সেই লক্ষ্য ছিল—নিজেকে প্রমাণ করা।
শেষ কথা
অবনী লেখরার কাহিনি তাই শুধু একজন প্যারালিম্পিক চ্যাম্পিয়নের জীবনী নয়। এটি এক তরুণীর আত্মবিশ্বাসের গল্প। এটি পরিবারের সমর্থনের গল্প। এটি কঠোর প্রশিক্ষণের গল্প। আর সবচেয়ে বেশি, এটি প্রতিকূলতার সামনে মাথা নত না করার গল্প।
টোকিওতে ইতিহাস, প্যারিসে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি—দুটি সোনার পদক তাঁর নামকে প্যারালিম্পিক ইতিহাসে বিশেষ জায়গা দিয়েছে।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো অন্য কোথাও।
যে শিশু একদিন দুর্ঘটনার পরে নিজের স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছিল, সেই শিশুই একদিন কোটি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছে—জীবনের লক্ষ্য বদলাতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য রাখার সাহস হারানো উচিত নয়।
অবনীর হাতে রাইফেল, সামনে লক্ষ্যবস্তু, চারপাশে নিস্তব্ধতা—তারপর একটি নিখুঁত শট।
সেই শট শুধু একটি পদক জেতেনি।
সেটি ভেঙেছে বহু মানসিক বাধা।
আর তাই অবনী লেখরার গল্প আজ শুধু ক্রীড়ার গল্প নয়—এটি অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহসের গল্প।