Categories
গল্প বিবিধ

আয়নার ওপারে নিজের মুখ।

মল্লিকপুরের পুরোনো বাড়িটিতে একটি বড় কাঠের আয়না ছিল। আয়নাটির চারপাশে খোদাই করা লতাপাতার নকশা, নিচে ছোট্ট একটি ড্রয়ার, আর উপরে সময়ের দাগে কালচে হয়ে যাওয়া কাঠের ফ্রেম। বাড়ির অন্য আসবাবের মতো সেটিও বহু পুরোনো। কিন্তু বাড়ির মেয়ে মেঘলার কাছে আয়নাটি ছিল বিশেষ কিছু।

ছোটবেলায় মা তাকে সেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে চুল আঁচড়ে দিতেন। স্কুলে যাওয়ার আগে জামার বোতাম ঠিক করে দিতেন। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, “নিজের ওপর বিশ্বাস রাখিস।”

সেই কথাগুলো মেঘলা কখনও ভুলতে পারেনি।

কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের প্রতি বিশ্বাস যেন একটু একটু করে কমে গেল।

মেঘলা পড়াশোনায় ভালো ছিল, ছবি আঁকতে পারত, সুন্দর করে কথা বলতে পারত। তবু তার মনে হতো, অন্যদের তুলনায় সে কোনও দিক থেকেই যথেষ্ট ভালো নয়।

কেউ পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেলে সে ভাবত, তার নিজের পড়াশোনা দুর্বল। কোনও বান্ধবী সুন্দর পোশাক পরে এলে নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি হতো। সামাজিক মাধ্যমে অন্যদের সাফল্যের ছবি দেখলে মনে হতো, সবাই যেন জীবনে এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু সে-ই কোথাও আটকে আছে।

তার এই অস্বস্তি বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছাল যে, আয়নার সামনে দাঁড়ালেও সে নিজের মুখের মধ্যে ত্রুটি খুঁজতে শুরু করত।

একদিন কলেজ থেকে ফিরে মেঘলা ব্যাগটি বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “মা, আমার কিছুই ভালো লাগে না।”

মা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে?”

“সবাই কত সুন্দর, কত আত্মবিশ্বাসী! সবাই কিছু না কিছু করছে। আমার মনে হয়, আমি কিছুই পারি না।”

মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বুঝলেন, এটি শুধু এক দিনের মন খারাপ নয়। অনেক দিন ধরে মেয়েটি নিজের সঙ্গে লড়াই করছে।

তিনি তাড়াহুড়ো করে উপদেশ দিলেন না। পাশে বসে শুধু বললেন, “তুই কি নিজের সঙ্গে অন্যদের তুলনা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিস?”

মেঘলা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

মা তার হাত ধরে বললেন, “তাহলে আজ থেকে একটা কাজ কর। প্রতিদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখবি ঠিকই, কিন্তু নিজের সম্পর্কে কোনও রায় দেওয়ার আগে ভাববি—তুই কি সত্যিই নিজেকে দেখছিস, নাকি অন্যদের চোখ দিয়ে নিজেকে বিচার করছিস?”

কথাটা মেঘলার মনে রয়ে গেল।

১. তুলনার অদৃশ্য প্রতিযোগিতা

পরের দিন কলেজে গিয়ে মেঘলা দেখল, তার বান্ধবী সায়ন্তিকা একটি আন্তঃকলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। সবাই তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। মেঘলাও হাসিমুখে শুভেচ্ছা জানাল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার মন খারাপ হয়ে গেল।

সে ভাবল, সায়ন্তিকা কত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে! আর সে নিজে? ক্লাসে কোনও প্রশ্ন করতে গেলেও দশবার ভাবে।

বাড়ি ফেরার পথে সে বারবার নিজের ব্যর্থতার কথা ভাবতে লাগল।

সন্ধ্যায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার চোখ পড়ল ফ্রেমের এক কোণে আটকে থাকা পুরোনো কাগজের টুকরোর দিকে। ছোটবেলায় সে সেখানে একটি কাগজ লাগিয়েছিল। কাগজে নিজের হাতে লেখা ছিল—

“আমি বড় হয়ে অনেক কিছু শিখব।”

লেখাটি দেখে তার মনে পড়ল, একসময় সে কত সহজে নতুন কিছু শেখার আনন্দ পেত। ছবি আঁকতে গিয়ে ভুল হলে আবার আঁকত। সাইকেল চালাতে গিয়ে পড়ে গেলে উঠে দাঁড়াত। তখন অন্য কেউ কতটা ভালো করছে, তা নিয়ে তার মাথাব্যথা ছিল না।

সে শুধু নিজের কাজটা ভালোবাসত।

কবে যে সেই আনন্দের জায়গায় অন্যদের সঙ্গে তুলনা এসে বসেছে, মেঘলা বুঝতেই পারেনি।

পরদিন সে একটি খাতা কিনল। খাতার প্রথম পাতায় লিখল, ‘নিজেকে জানার খাতা’।

সে ঠিক করল, প্রতিদিন রাতে তিনটি বিষয় লিখবে—সেদিন কী শিখেছে, কী ভালো করেছে এবং কোন জায়গায় আরও উন্নতি করা দরকার।

প্রথম দিন লিখতে গিয়ে সে থমকে গেল।

কী ভালো করেছে?

অনেকক্ষণ ভেবে লিখল, “আজ বন্ধুর সাফল্যে আমি ঈর্ষা অনুভব করেছি, কিন্তু তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি।”

তারপর লিখল, “আজ বুঝেছি, অন্যের সাফল্যে আমার মূল্য কমে যায় না।”

লেখাটি পড়ে তার নিজেরই একটু হাসি পেল।

এত ছোট উপলব্ধিও যে খাতায় লেখার মতো হতে পারে, আগে সে ভাবেনি।

২. যে মানুষটি নিজের সাফল্য ভুলে গিয়েছিলেন

মেঘলাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শশীভূষণবাবু। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি একাই থাকতেন। অবসর নেওয়ার পর থেকে খুব কম মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন।

একদিন মেঘলা কলেজ থেকে ফেরার সময় দেখল, তিনি বাড়ির সামনে বসে পুরোনো বই গোছাচ্ছেন। কয়েকটি বইয়ের পাতা নষ্ট হয়ে গেছে, কয়েকটির মলাট খুলে পড়েছে।

মেঘলা এগিয়ে গিয়ে বলল, “কাকু, এত বই একা একা গুছোচ্ছেন কেন? কাউকে ডাকেননি?”

শশীভূষণবাবু হেসে বললেন, “নিজের জিনিস নিজেকেই তো সামলাতে হয়।”

মেঘলা একটি বই হাতে নিয়ে দেখল, বইয়ের প্রথম পাতায় অনেক ছাত্রছাত্রীর নাম লেখা। পাশে ছোট ছোট মন্তব্য—‘খুব ভালো লিখেছে’, ‘আরও চেষ্টা করো’, ‘নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে শিখছে’।

সে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো আপনার ছাত্রছাত্রীদের খাতা থেকে লেখা?”

বৃদ্ধ বললেন, “হ্যাঁ। বহু বছর পড়িয়েছি। কিন্তু এখন মনে হয়, আমি তেমন কিছু করতে পারিনি।”

মেঘলা অবাক হয়ে বলল, “কেন বলছেন?”

“আমার ছাত্রছাত্রীদের কেউ বড় কর্মকর্তা হয়েছে, কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যবসা করছে। আর আমি? একটা ছোট স্কুলে পড়িয়ে জীবন কাটিয়ে দিলাম।”

মেঘলার বুকের ভিতর কেমন একটা অনুভূতি হলো। যে মানুষটির কাছ থেকে বহু ছাত্রছাত্রী জীবনের শিক্ষা পেয়েছে, তিনিও নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে নিজের কাজকে ছোট করে দেখছেন!

সে বলল, “কিন্তু আপনি তো অনেক মানুষের জীবন গড়তে সাহায্য করেছেন।”

শশীভূষণবাবু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “সেটা তো আমার কাজ ছিল।”

মেঘলা শান্ত গলায় বলল, “তাহলে একজন ডাক্তার অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করলে সেটাও কি শুধু তাঁর কাজ বলে ছোট হয়ে যায়? একজন শিক্ষক মানুষকে শেখালে তার মূল্য কমে যায়?”

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না।

মেঘলা বইগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল, “আপনার কাছে পড়ে কেউ যদি নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখে থাকে, তাহলে সেটাও তো বড় সাফল্য।”

কথাটা বলে সে বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু তার মনে হলো, নিজের সমস্যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে অন্য একজনের সমস্যাও চিনতে শিখছে।

৩. নিজের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ

সেই সপ্তাহে কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি বেরোল। সেখানে ছবি আঁকা, প্রবন্ধ লেখা, বিতর্ক এবং নাটকের প্রতিযোগিতা ছিল।

মেঘলা ছবি আঁকতে ভালোবাসত, কিন্তু দীর্ঘদিন কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। তার ভয় ছিল, অন্যদের ছবি তার চেয়ে ভালো হবে। বিচারকেরা পছন্দ করবেন না। বন্ধুরা হয়তো হাসবে।

বিজ্ঞপ্তিটি পড়ে সে খাতা বন্ধ করে দিল।

সন্ধ্যায় নিজের খাতায় লিখতে বসে প্রশ্নটি আবার সামনে এল—সে কি সত্যিই ছবি আঁকতে চায়, নাকি শুধু হেরে যাওয়ার ভয়ে নিজেকে আটকে রাখছে?

পরদিন সে আবার বিজ্ঞপ্তিটি খুলল। ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় নাম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ তখনও পেরোয়নি।

মেঘলা নিজের নাম লিখে দিল।

কিন্তু নাম লেখানোই শেষ ছিল না। এবার তাকে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। সে প্রতিদিন কিছুটা সময় ছবি আঁকার জন্য রাখল। প্রথম কয়েক দিন তার আঁকা নিজের পছন্দ হচ্ছিল না। কখনও রং ঠিকমতো মিলছিল না, কখনও ছবির অনুপাত ভুল হয়ে যাচ্ছিল।

আগে হলে সে খাতা বন্ধ করে অন্যদের ছবি দেখতে বসত। এবার সে নিজের ভুলগুলো লিখে রাখল এবং পরের দিন সেগুলো ঠিক করার চেষ্টা করল।

একদিন তার মা ঘরে এসে দেখলেন, মেঘলা একটি পাহাড়ি পথের ছবি আঁকছে।

মা জিজ্ঞাসা করলেন, “এবারের ছবিতে কী দেখাতে চাইছিস?”

মেঘলা বলল, “একটা পথ। পথটা খুব সহজ নয়, কিন্তু দূরে আলো দেখা যাচ্ছে।”

মা ছবিটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“তোর নিজের গল্পও তো এমন হতে পারে।”

মেঘলা উত্তর দিল না। কিন্তু সে জানত, ছবিটি আঁকতে গিয়ে সে নিজের মনের কথাই কাগজে তুলে আনছে।

৪. ফলাফলের দিন

প্রতিযোগিতার দিন কলেজের বড় হলঘরে বহু ছাত্রছাত্রী জমা হয়েছিল। কারও হাতে জলরং, কারও হাতে পেন্সিল, কেউ আবার নানা রকম মাধ্যম ব্যবহার করেছিল।

মেঘলা নিজের ছবিটি নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে কিছুটা দূরে দাঁড়াল। চারদিকে অন্যদের কাজ দেখে তার আবার অস্বস্তি হতে লাগল।

একটি ছবিতে অসাধারণ সূক্ষ্ম নকশা ছিল। আরেকটিতে রঙের ব্যবহার এত সুন্দর যে মেঘলার মনে হলো, তার নিজের ছবি যেন খুব সাধারণ।

তার মনে পুরোনো কথাগুলো ফিরে এল—‘আমি পারব না’, ‘আমার কাজ ভালো নয়’, ‘অন্যরা আমার চেয়ে এগিয়ে’।

কিন্তু এবার সে নিজের খাতার কথা মনে করল। সে তো নাম লিখিয়েছিল প্রথম হওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে নয়; নিজের ভয়কে অতিক্রম করার জন্য।

সে গভীর শ্বাস নিল এবং ছবিটির দিকে আর একবার তাকাল।

ছবির পথটি তার কাছে সত্যিই সুন্দর মনে হলো। হয়তো নিখুঁত নয়, কিন্তু সেটি তার নিজের হাতে তৈরি। প্রতিটি রেখার সঙ্গে তার অনুশীলন জড়িয়ে আছে।

ফলাফল ঘোষণার সময় মেঘলার নাম প্রথম তিনজনের মধ্যে ছিল না।

এক মুহূর্তের জন্য তার মন খারাপ হলো। সে পুরস্কার পেতে চেয়েছিল, আর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি।

কিন্তু সে বাড়ি ফিরে নিজের খাতাটি খুলল। সেখানে লিখল—

“আজ আমি পুরস্কার পাইনি। মন খারাপ হয়েছে। তবু আমি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। নিজের কাজ অন্যদের সামনে রেখেছি। ভয়ের কারণে পিছিয়ে আসিনি। আগামী দিনে আরও শিখব।”

লেখাটি শেষ করে সে খাতাটি বন্ধ করল।

সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো, ব্যর্থতা স্বীকার করা মানেই নিজেকে ব্যর্থ মানুষ বলে মেনে নেওয়া নয়।

৫. একটি অপ্রত্যাশিত কথা

কয়েক দিন পর শশীভূষণবাবু মেঘলাকে ডেকে পাঠালেন।

তিনি একটি পুরোনো খাতা হাতে নিয়ে বসেছিলেন।

“মা, একটা কথা বলব?”

“বলুন, কাকু।”

বৃদ্ধ খাতাটি খুলে একটি পাতার দিকে আঙুল দেখালেন। সেখানে বহু বছর আগের এক ছাত্রের লেখা ছিল। ছাত্রটি লিখেছিল, সে পড়াশোনায় খুব দুর্বল, তাই কখনও বড় কিছু করতে পারবে না।

পাশে শশীভূষণবাবুর নিজের হাতে লেখা মন্তব্য—‘তোমার বর্তমান ফলাফল তোমার ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। চেষ্টা চালিয়ে যাও।’

বৃদ্ধ বললেন, “এই ছেলেটা পরে নিজের চেষ্টায় ভালো ফল করেছিল। আজ সে একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে। কিছুদিন আগে দেখা হয়েছিল। সে বলল, আমার ওই কথাটা নাকি এখনও মনে রেখেছে।”

মেঘলা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল।

শশীভূষণবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এত দিন আমি ভাবতাম, বড় কিছু করতে পারিনি। কিন্তু ওই একটি কথাও যদি কারও কাজে এসে থাকে, তাহলে আমার কাজটা একেবারে মূল্যহীন ছিল না।”

তিনি একটু থেমে বললেন, “তুই সেদিন আমাকে নিজের কাজের মূল্য বুঝিয়েছিলি। আজ আমিও তোকে একটা কথা বলতে চাই—নিজেকে বিচার করার সময় শুধু তোর ব্যর্থতাগুলো দেখিস না। তুই কী শিখেছিস, কাকে সাহায্য করেছিস, কোথায় সাহস দেখিয়েছিস, সেগুলোও দেখবি।”

মেঘলা অনুভব করল, কথাগুলো তার নিজের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যাচ্ছে।

৬. আয়নার সামনে নতুন সকাল

তারপর থেকে মেঘলা এক দিনে বদলে যায়নি। কোনও কোনও দিন এখনও অন্যদের সাফল্য দেখে তার মনে হতো, সে পিছিয়ে পড়ছে। কোনও ভুল করলে পুরোনো আত্মসন্দেহ ফিরে আসত।

কিন্তু এখন সে নিজের অনুভূতিগুলোকে চিনতে শিখেছে। ঈর্ষা হলে নিজেকে খারাপ মানুষ বলে দোষ দিত না; বরং ভাবত, অন্যের কোন গুণটি তার ভালো লেগেছে এবং সে নিজে কী শিখতে পারে।

কেউ প্রশংসা করলে সে তা গ্রহণ করতে শিখল। কেউ গঠনমূলক সমালোচনা করলে রাগ না করে বুঝতে চেষ্টা করল, কোন অংশটি তার উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে। আবার অন্যায়ভাবে কেউ ছোট করলে সেটিকে নিজের সত্যিকারের মূল্য বলে মেনে নিত না।

একদিন সকালে সে পুরোনো কাঠের আয়নাটির সামনে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে রোদ এসে তার মুখে পড়েছে। আয়নার ফ্রেমে আটকে থাকা ছোট কাগজটি এখনও সেখানে।

“আমি বড় হয়ে অনেক কিছু শিখব।”

মেঘলা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে হাসল।

সে জানত, তার চেহারা অন্য কারও মতো নয়। তার প্রতিভাও অন্য কারও প্রতিভার অনুলিপি নয়। জীবনে সে অনেক ভুল করবে, কিছু কাজে সফল হবে, কিছু কাজে ব্যর্থ হবে। তার পথ অন্যদের পথের মতো হবে না।

কিন্তু এত দিন ধরে সে যে জিনিসটি ভুলে গিয়েছিল, সেটি আবার মনে পড়েছে—নিজের জীবনের মূল্য বোঝার জন্য অন্য কারও জীবনকে মাপকাঠি বানাতে হয় না।

সেদিন কলেজে যাওয়ার আগে সে আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করল। তারপর ব্যাগ তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মা পিছন থেকে বললেন, “কী রে, আজ তোকে বেশ ফুরফুরে লাগছে!”

মেঘলা ফিরে তাকিয়ে বলল, “আজ নিজেকে সবার চেয়ে ভালো মনে হচ্ছে না, মা। কিন্তু নিজেকে আর সবার চেয়ে খারাপও মনে হচ্ছে না।”

মা হেসে ফেললেন।

মেঘলা দরজা পেরিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেল। সামনে ছিল নতুন দিন, নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন ভুল এবং নতুন শেখার সুযোগ।

আর বহু বছর ধরে যে আয়নাটি শুধু তার চেহারা দেখিয়েছিল, সেই আয়না তাকে যেন এবার একটি নতুন সত্য শিখিয়েছিল—নিজেকে ভালোবাসা মানে নিজেকে নিখুঁত ভাবা নয়; নিজের অসম্পূর্ণতাকে স্বীকার করেও নিজের পাশে দাঁড়াতে শেখা।

নৈতিক শিক্ষা: অন্যের সঙ্গে অতিরিক্ত তুলনা করলে নিজের শক্তি ও সম্ভাবনাকে চিনতে অসুবিধা হয়। প্রত্যেক মানুষের পথ, প্রতিভা ও শেখার গতি আলাদা। নিজের ভুল থেকে শেখা, অন্যের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া এবং প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নতি করার মধ্যেই আত্মবিশ্বাসের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *