রাত তখন প্রায় তিনটে। বেলঘরিয়ার পুরোনো বাড়িটির নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধিমান দত্ত বুঝতে পারছিল, তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর হয়তো আর কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে। কিন্তু সেই উত্তরের কাছে পৌঁছনোর জন্য তাকে এমন এক অতীতের মুখোমুখি হতে হবে, যে অতীতকে সে এত বছর ধরে নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে এসেছে।
জানলার ওপারে চার আঙুলের ছেলেটি আর নেই।
অদিতি সেন টর্চের আলো ফেলে জানলার দিকে তাকাল। বাইরে ভেজা গাছের পাতা বাতাসে নড়ছে। রাস্তার আলোয় দেখা যাচ্ছে ফাঁকা উঠোন, ভাঙা সিঁড়ি আর শ্যাওলা ধরা দেওয়াল।
“ও কি সত্যিই ছিল?” অদিতি ফিসফিস করে বলল।
ঋদ্ধিমান উত্তর দিল না। তার ডান হাতের তালুতে তখনও অদ্ভুত একটা অনুভূতি। যেন কিছুক্ষণ আগে কেউ তার হাত ধরে বলেছিল, ‘তোমার নামটা মনে করো।’
কিন্তু তার নাম তো ঋদ্ধিমান দত্ত। জন্মের শংসাপত্রে এই নাম, স্কুলের নথিতে এই নাম, বাবার লেখা চিঠিতেও এই নাম।
তাহলে অরিন্দম দত্ত কেন লিখেছিলেন—জন্মের আগে তোমার নাম কী ছিল, তা জানতে চাইলে পুরোনো শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রে যাও?
“আমাদের কাল সকাল দশটায় সেখানে যেতে হবে,” ঋদ্ধিমান বলল।
অদিতি তার দিকে তাকাল।
“তুমি কি নিশ্চিত, এটা ফাঁদ নয়?”
“না। আমি কিছুতেই নিশ্চিত নই। কিন্তু এত বছর ধরে যে মানুষটা আমাকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দিয়েছে, তার পরিচয় নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আর কোনও সূত্র উপেক্ষা করতে পারব না।”
দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
বেরোনোর সময় ঋদ্ধিমান একবার ফিরে তাকিয়েছিল। নীল দরজাটি বন্ধ। অথচ দরজার নিচ দিয়ে সরু নীল আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।
সে এবার আর দরজার কাছে গেল না।
কারণ অয়নের খাতায় লেখা কথাটা তার মনে পড়ল—ঋদ্ধিমানকে নীল দরজার সামনে আসতে দিও না। সে যদি নিজের নাম বলে, তাহলে দরজাটি খুলে যাবে।
সে নিজের নাম বলেছিল কি না, তা মনে করতে পারছিল না।
কিন্তু দরজাটি খুলেছিল।
পরদিন সকাল দশটার পাঁচ মিনিট আগে তারা পৌঁছল উত্তর কলকাতার এক পুরোনো শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রে।
বাড়িটির নাম ছিল ‘শিশুমঙ্গল ক্লিনিক’। একসময় সেখানে শিশুদের সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক বিকাশ ও স্মৃতিসংক্রান্ত কিছু গবেষণাও করা হতো। এখন সেটি প্রায় পরিত্যক্ত। সামনের গেটের অর্ধেক রং উঠে গেছে। দেওয়ালে ঝোলানো বোর্ডে নামের কিছু অক্ষর মুছে গিয়েছে।
গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ নিরাপত্তারক্ষী তাদের দেখে এগিয়ে এলেন।
“কাকে চাই?”
ঋদ্ধিমান পকেট থেকে একটি খাম বের করল। আগের রাতে নীল দরজার নিচে খামটি পড়ে থাকতে দেখেছিল সে। খামের ওপরে লেখা ছিল—‘শিশুমঙ্গল ক্লিনিকের রেকর্ড বিভাগে পৌঁছে দেবে।’
ভেতরে একটি পুরোনো পরিচয়পত্র এবং হাতে লেখা কয়েকটি লাইন।
বৃদ্ধ পরিচয়পত্রটি দেখে থমকে গেলেন।
“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”
“একটা পুরোনো বাড়িতে। আমরা ডক্টর অনির্বাণ দত্তের সম্পর্কে জানতে এসেছি।”
নামটি শুনে বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।
“অনেক বছর কেউ এই নাম উচ্চারণ করে না।”
“তিনি কি এখানে কাজ করতেন?”
“কাজ করতেন। তবে শুধু চিকিৎসক হিসেবে নয়। তিনি শিশুদের স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করতেন। পরে কী হয়েছিল, সেটা আমি পুরো জানি না।”
“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?”
বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগে চারপাশে তাকালেন।
“আপনারা ভেতরে আসুন।”
ক্লিনিকের পেছনের দিকে একটি ছোট ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের। ঘরটিতে পুরোনো আলমারি, ভাঙা টেবিল এবং কাগজে ভর্তি কয়েকটি বাক্স। জানলার ধারে বসে ছিলেন সত্তরের কাছাকাছি বয়সের এক মহিলা। চুল সম্পূর্ণ সাদা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।
বৃদ্ধ বললেন, “এঁর নাম ডক্টর মৃণালিনী বসু। একসময় এখানে শিশু মনোবিজ্ঞানের বিভাগ দেখতেন।”
মহিলাটি ঋদ্ধিমানের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“তুমি ফিরে এসেছ?”
ঋদ্ধিমান চমকে উঠল।
“আপনি আমাকে চেনেন?”
“চিনি। আবার চিনি না-ও। তোমার মুখটা বদলেছে, কিন্তু চোখ দুটো বদলায়নি।”
“আমার নাম ঋদ্ধিমান দত্ত।”
মৃণালিনী দেবী চোখ বন্ধ করলেন।
“তোমার বর্তমান নামটা জানি। আমি জানতে চাই, তোমার আগের নামটা তুমি মনে করতে পারো কি না।”
ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল।
“না।”
“তাহলে বসো। তোমাদের দু’জনকেই সবটা জানতে হবে।”
মৃণালিনী দেবী আলমারি খুলে একটি ধূসর রঙের ফাইল বের করলেন। ফাইলের ওপর লেখা—‘প্রকল্প নীলপ্রহর: শিশু অংশগ্রহণকারী ও স্মৃতি পুনর্গঠন’।
“প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে,” তিনি বলতে শুরু করলেন, “কিছু শিশুদের নিয়ে একটি গবেষণা শুরু হয়েছিল। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ। শিশুদের ভয়, দুঃস্বপ্ন, মানসিক আঘাত এবং স্মৃতির পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, তা বোঝা। তখনও আমরা জানতাম, স্মৃতি কোনও ক্যামেরার মতো নিখুঁতভাবে অতীতকে ধরে রাখে না। মানুষ প্রতিবার মনে করার সময় স্মৃতিকে কিছুটা নতুন করে গড়ে তোলে।”
অদিতি মন দিয়ে শুনছিল।
মৃণালিনী দেবী বললেন, “কিন্তু গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ডক্টর অনির্বাণ দত্ত ধীরে ধীরে অন্য পথে এগিয়ে গেলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও শিশুর মনে যদি ভয়ংকর স্মৃতি তৈরি করা যায়, আবার সেই স্মৃতি বদলে দেওয়া যায়, তাহলে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত শিশুদের সাহায্য করা সম্ভব হবে।”
“এটা কি চিকিৎসার অংশ ছিল?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।
“শুরুতে তাই বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে শিশুদের সম্মতি ছাড়াই তাদের সামনে সাজানো ঘটনা দেখানো হতো। কিছু সত্য ঘটনা গোপন করা হতো, কিছু মিথ্যা ঘটনা বারবার বলা হতো। আলো, শব্দ, ছবি, ঘুমের আগে শোনানো কথোপকথন—সব মিলিয়ে তাদের স্মৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলত। কোনও শিশুকে বোঝানো হতো যে সে কিছু করেছে, অন্য কাউকে বোঝানো হতো যে ঘটনাটি সে দেখেনি।”
“অর্থাৎ মিথ্যা স্মৃতি তৈরি করা?” ঋদ্ধিমান প্রশ্ন করল।
“হ্যাঁ। তবে একটা কথা মনে রেখো—মানুষের স্মৃতি প্রভাবিত করা সম্ভব হলেও ইচ্ছেমতো সম্পূর্ণ নতুন পরিচয় তৈরি করে দেওয়া কোনও সহজ বা নিশ্চিত প্রক্রিয়া নয়। এখানে যা ঘটেছিল, তা ছিল দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বারবার বলা গল্প, ভয় এবং কিছু বাস্তব ঘটনা গোপন রাখার এক বিপজ্জনক মিশ্রণ।”
মৃণালিনী দেবী ফাইল খুললেন।
প্রথম পাতায় ছয়টি নাম।
অয়ন মুখোপাধ্যায়।
সৌম্যজিৎ পাল।
মধুরিমা দে।
ঋদ্ধিমান দত্ত।
শর্মিষ্ঠা পাল।
এবং ষষ্ঠ নামের জায়গায় লেখা—‘অংশগ্রহণকারী এন-৬’।
ঋদ্ধিমান ফাইলটির দিকে ঝুঁকে পড়ল।
“এই ষষ্ঠ শিশুটির নাম লেখা নেই কেন?”
“কারণ সে এখানে নিজের নাম নিয়ে আসেনি।”
“তার মানে?”
মৃণালিনী দেবী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“শিশুটিকে এক দুর্ঘটনার পর এখানে আনা হয়েছিল। তার পরিবার সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছিল না। সে নিজের নাম বলতে পারত না। কয়েকটি শব্দ মনে করতে পারত, কিন্তু কোনও সম্পূর্ণ পরিচয় দিতে পারত না। ডান হাতে জন্মগতভাবে একটি আঙুল কম ছিল। তাকে প্রথমে চিকিৎসার জন্য রাখা হয়েছিল। পরে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।”
অদিতি বলল, “কিন্তু একটা শিশুর নাম জানা না থাকলে তাকে গবেষণায় নেওয়ার অনুমতি কে দিয়েছিল?”
মৃণালিনী দেবী মুখ নামিয়ে নিলেন।
“সেই প্রশ্নের উত্তরই এই প্রকল্পের সবচেয়ে অন্ধকার দিক। কিছু নথিতে অভিভাবকের সম্মতির কথা লেখা আছে। কিন্তু সেই সম্মতি সত্যিই নেওয়া হয়েছিল কি না, তার প্রমাণ নেই।”
ঋদ্ধিমান ফাইলের পরের পাতা উল্টে দেখল।
একটি পুরোনো ছবি।
ছয়টি শিশু একটি টেবিলের সামনে বসে আছে। পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন তরুণ অনির্বাণ দত্ত। তাঁর পাশে আরেকজন পুরুষ—চেহারায় ঋদ্ধিমানের বাবার সঙ্গে অদ্ভুত মিল।
ছবির এক কোণে পেন্সিলে লেখা—‘প্রথম পর্যায়, ২০০০’।
ঋদ্ধিমান ছবিটি হাতে তুলে নিল।
“এই লোকটি কে?”
মৃণালিনী দেবী ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন, “অরিন্দম দত্ত।”
“তাহলে অনির্বাণ দত্ত আর অরিন্দম দত্ত—দু’জন আলাদা মানুষ?”
“হ্যাঁ। অনির্বাণ ছিলেন চিকিৎসক ও গবেষণার প্রধান। অরিন্দম ছিলেন স্থপতি। নীলপ্রহর সাংস্কৃতিক সংস্থার ভবনটি তিনিই তৈরি করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিশুদের জন্য শিল্প, গান, নাটক ও ছবি আঁকার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা দরকার। প্রথম দিকে তিনি ভেবেছিলেন, এই গবেষণা শিশুদের সাহায্য করবে।”
“পরে?”
“পরে তিনি বুঝতে পারেন, শিশুদের ওপর যা করা হচ্ছে, তা চিকিৎসা নয়। তিনি প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসতে চান। কিন্তু তার আগেই একটি ঘটনা ঘটে যায়।”
“অয়নের ঘটনা?”
মৃণালিনী দেবী মাথা নাড়লেন।
“অয়নই প্রথম বুঝেছিল যে তাদের স্মৃতির সঙ্গে খেলা হচ্ছে। সে অন্যদের বলেছিল, গবেষণার ঘরে যা ঘটছে, তার সবটা সত্য নয়। সে কিছু নথি লুকিয়ে রাখে। এক রাতে সে পালানোর চেষ্টা করে।”
“তারপর তাকে পুকুরে ডুবে মারা যেতে দেখা যায়,” ঋদ্ধিমান বলল।
মৃণালিনী দেবী তার দিকে তাকালেন।
“না। তাকে পুকুর থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নথি আমি দেখিনি।”
ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
“তাহলে অয়ন মারা যায়নি?”
“আমি তা বলছি না। আমি বলছি, তার মৃত্যুর যে গল্প তোমরা শুনেছ, তার সমর্থনে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। ঘটনার পর কিছু নথি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। একটি সংবাদপত্রে দুর্ঘটনার খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু দেহ শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত কিংবা পরিবারের আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি এই ফাইলে নেই।”
ঋদ্ধিমানের বুকের মধ্যে চাপা ব্যথা জমতে লাগল।
“আমি অয়নকে আমার বন্ধু বলে মনে করি। তার সঙ্গে পুকুরের ধারে খেলা, স্কুল থেকে ফেরার পথে ঝগড়া—সব মনে আছে।”
“তোমার মনে থাকা মানেই সেই প্রতিটি ঘটনা ঠিক সেইভাবেই ঘটেছিল, এমন নয়,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “আবার সবটাই মিথ্যা, সেটাও বলা যায় না। সত্য, ভুল স্মৃতি এবং অন্যের বলা গল্প—তিনটিই একসঙ্গে মিশে থাকতে পারে।”
ফাইলের শেষ দিকে একটি হাতে লেখা প্রতিবেদন ছিল।
প্রতিবেদনটি অরিন্দম দত্তের।
“আমি আর এই কাজের অংশ থাকতে পারি না। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। অনির্বাণ বলছে, তাদের স্মৃতিকে সংশোধন করলে তারা ভবিষ্যতের মানসিক আঘাত থেকে মুক্ত থাকবে। কিন্তু আমরা তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার ওপর বিশ্বাস হারাতে শেখাচ্ছি। কোনও শিশুকে নিজের দেখা ঘটনাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করা অপরাধ।”
এর পরের লাইনটি কাঁপা হাতে লেখা।
“এন-৬-কে প্রকল্প থেকে সরিয়ে নিতে হবে। শিশুটির প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু অনির্বাণ মনে করছে, শিশুটিই সমস্ত পরীক্ষার শেষ উত্তর।”
ঋদ্ধিমান কাগজটি শক্ত করে ধরে রইল।
“এন-৬-কে কেন দরকার ছিল?”
মৃণালিনী দেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ ওই শিশুটি অন্যদের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাত না। তাকে একটি ঘটনা বারবার মনে করাতে চাইলেও সে একই উত্তর দিত না। কখনও বলত, সে সেখানে ছিল না। কখনও বলত, সে সব দেখেছে। গবেষকেরা বুঝতে পারছিলেন না, শিশুটি সত্যিই কিছু মনে করতে পারছে না, নাকি নিজের মতো করে তথ্য সাজাচ্ছে।”
“তাই বলে তাকে বন্দি করে রাখা হবে?”
“সেই কারণেই অরিন্দম প্রতিবাদ করেছিলেন।”
অদিতি বলল, “আপনি তখন সব জানতেন। আপনি কেন কাউকে জানাননি?”
প্রশ্নটি শুনে বৃদ্ধা মাথা নিচু করলেন।
“আমি ভেবেছিলাম, প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাবে। আমি কিছু নথি সরিয়ে রেখেছিলাম, যাতে পরে প্রমাণ করা যায় কী ঘটেছিল। কিন্তু যখন অয়নের ঘটনাটি ঘটে, তখন সবাই ভয় পেয়ে যায়। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ করে থাকে, কেউ ভাবে বিষয়টি প্রকাশ পেলে শিশুদের আরও ক্ষতি হবে। আমি নিজেও ভুল করেছিলাম। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি।”
“তারপর প্রকল্প বন্ধ হয়?”
“আনুষ্ঠানিকভাবে। নীলপ্রহর সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়। কিছু শিশু অন্যত্র চলে যায়। কিছু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এন-৬ কোথায় গেল, তার কোনও পরিষ্কার নথি নেই।”
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে বলল, “আমি কি সেই ষষ্ঠ শিশু?”
মৃণালিনী দেবী সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
তিনি অন্য একটি ছোট খাম বের করলেন। খামের ভেতরে ছিল একটি জন্মনিবন্ধনের পুরোনো প্রতিলিপি, একটি হাসপাতালের কাগজ এবং একটি সাদা-কালো ছবি।
জন্মনিবন্ধনের কাগজে নাম লেখা—‘ঋদ্ধিমান দত্ত’।
জন্মতারিখের পাশে একটি লাল দাগ। নীচে হাতে লেখা—‘সংশোধিত নথি’।
হাসপাতালের কাগজে লেখা—‘পুরুষ শিশু, পরিচয় অজ্ঞাত, আনুমানিক বয়স চার বছর। ডান হাতে চারটি আঙুল। পুরোনো আঘাতের চিহ্ন। কথা বলার ক্ষমতা আছে, কিন্তু নিজের পরিচয় জানাতে অক্ষম।’
কাগজের তারিখটি ছিল ২০০০ সালের ১৭ অক্টোবর।
ঋদ্ধিমান ফিসফিস করে বলল, “আমার জন্ম তো ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে।”
“এই নথিতে তোমার নাম নেই,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তোমার বর্তমান পরিচয়ের সঙ্গে এটিকে সরাসরি যুক্ত করার প্রমাণও নেই। কিন্তু নথিটি দেখায়, ওই সময়ে একটি অজ্ঞাতপরিচয় শিশুকে এখানে আনা হয়েছিল। পরে তার চিকিৎসা ও স্থানান্তরের কাগজপত্র অসম্পূর্ণ।”
ছবিটি ছিল সেই শিশুটির।
চার বছরের একটি ছেলে, যার ডান হাতে চারটি আঙুল। চোখ দুটি বড়, মুখে অস্বস্তি আর ভয়। ছবির পেছনে লেখা—‘এন-৬, অস্থায়ী নাম: নীল।’
ঋদ্ধিমান ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
‘নীল’।
তাহলে জন্মের আগে তার নাম ছিল নীল?
“এটা কি আমার ছবি?” সে জিজ্ঞাসা করল।
“আমি নিশ্চিত নই,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তোমার মুখের সঙ্গে কিছু মিল আছে। কিন্তু এত বছর পর শুধু মুখ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তোমার বর্তমান জন্মনিবন্ধনের সংশোধনের নথি কোথায়, সেটাও খুঁজতে হবে।”
ঋদ্ধিমান ছবিটি অদিতির হাতে দিল।
“তুমি কি মনে করো, আমি এই শিশুটি?”
অদিতি কিছুক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি মনে করি, তুমি এমন কিছু জানার কাছাকাছি পৌঁছেছ, যা তোমার জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তোমার পরিচয় সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।”
এই উত্তরটাই ঋদ্ধিমানের দরকার ছিল। এতদিন ধরে সে অন্যদের কথায় নিজের স্মৃতির সত্যতা বিচার করেছে। এবার সে চেয়েছিল, অন্তত কেউ একজন তাকে তাড়াহুড়ো করে কোনও পরিচয় না দিক।
মৃণালিনী দেবী তাদের আরও একটি নথি দেখালেন।
এটি ছিল অরিন্দম দত্তের ব্যক্তিগত চিঠি। তারিখ—২০০১ সালের ৩ জানুয়ারি।
“মৃণালিনী,
আমি ছেলেটিকে নিয়ে যাচ্ছি। তার নাম এখন নীল। সে নিজের অতীত মনে করতে পারে না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার কোনও অতীত নেই। আমি তাকে এমন পরিবেশে বড় করতে চাই, যেখানে তাকে কোনও নির্দিষ্ট স্মৃতি বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হবে না।
অনির্বাণ আমাকে বলেছে, ছেলেটিকে নিজের পরিবারের পরিচয় দেওয়া যাবে না। তার মতে, এতে পরীক্ষার ফল নষ্ট হবে। আমি তাকে বলেছি, কোনও শিশুর জীবন কোনও গবেষণার ফল নয়।
আমি তাকে নিজের কাছে রাখব। কিন্তু আমার পরিচয়ও তার সামনে সহজভাবে প্রকাশ করতে পারব না। কারণ অনির্বাণ এখনও আমাদের খুঁজছে। আমি যদি তাকে জানাই যে সে কোথা থেকে এসেছে, সে হয়তো আবার সেই বাড়িতে ফিরে যেতে চাইবে। আর আমি ভয় পাচ্ছি, সেখানে ফিরে গেলে তাকে আর রক্ষা করতে পারব না।
আমি জানি, একদিন সে প্রশ্ন করবে। সেদিন তাকে সত্যিটা জানাতে হবে।
— অরিন্দম।”
চিঠিটি পড়ে ঋদ্ধিমান চেয়ারে হেলান দিল।
“তাহলে অরিন্দম দত্ত আমার বাবা ছিলেন না?”
“আইনগতভাবে তুমি তাঁর ছেলে ছিলে,” মৃণালিনী দেবী বললেন। “তিনি তোমাকে নিজের কাছে রেখেছিলেন, তোমার পরিচয় তৈরি করেছিলেন, তোমাকে বড় করেছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মদাতা কে, কিংবা তুমি কোথা থেকে এসেছিলে, তা এই নথিগুলি নিশ্চিত করে না।”
“আর অনির্বাণ?”
“তিনি ছিলেন সেই গবেষক, যিনি তোমার জীবনের প্রথম অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তোমার জন্মদাতা—এমন কোনও প্রমাণ এখানে নেই।”
ঋদ্ধিমান চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ল বাবার সঙ্গে কাটানো শৈশব। রবিবার সকালে বইয়ের দোকানে যাওয়া, ছাদের ওপর ঘুড়ি ওড়ানো, পরীক্ষার আগে বাবার পাশে বসে পড়া, অসুখ হলে রাত জেগে থাকা। সেই স্মৃতিগুলির কোনওটিই এখন তার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছিল না।
সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, পরিচয় এবং সম্পর্ক একই জিনিস নয়।
কেউ তাকে জন্ম দিয়েছেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর অজানা থাকতে পারে। কিন্তু যে মানুষ তাকে মানুষ করেছেন, তার ভালোবাসা কেবল একটি নথি দিয়ে মুছে যায় না।
তবু অরিন্দম কেন নিজের নাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর সূত্র রেখে গিয়েছিলেন?
মৃণালিনী দেবী যেন তার মনের প্রশ্ন বুঝতে পারলেন।
“অরিন্দম দত্ত তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অনির্বাণ দত্তের নাম ব্যবহার করে তিনি কিছু নথি তৈরি করেছিলেন, যাতে প্রকল্পের লোকেরা মনে করে, ছেলেটি এখনও গবেষণার অধীনে আছে। আবার নিজের নামেও কিছু নথি রেখেছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে সত্যিটা উদ্ধার করা যায়। এই দ্বৈত পরিচয়ের ফলে পরবর্তী সময়ে নথিগুলি একে অপরের সঙ্গে মেলেনি। তাঁর মৃত্যুর পর সেই বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।”
“কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর আমাকে এই চিঠি পাঠালেন কে?”
মৃণালিনী দেবী চুপ করে গেলেন।
অদিতি বলল, “হয়তো চিঠিগুলি আগে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা ছিল। আবার কেউ তাঁর নথি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আমরা নিশ্চিত নই।”
ঋদ্ধিমান বলল, “আমাকে জানতে হবে অরিন্দম সত্যিই মারা গিয়েছিলেন কি না।”
ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে তারা শর্মিষ্ঠা পালকে ফোন করল। আগের রাতে অদিতি তাকে সবকিছু জানিয়েছিল। শর্মিষ্ঠা তখন থেকেই উদ্বিগ্ন ছিল।
ফোনে ঋদ্ধিমান বলল, “তোমার কাছে অয়নের খাতা ছাড়া আর কিছু আছে?”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর শর্মিষ্ঠা বলল, “একটা পুরোনো অডিও ক্যাসেট। এত বছর কাউকে দেখাইনি। অয়ন আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, একদিন যদি কেউ সত্যিটা জানতে চায়, তাহলে যেন সেটা শোনাই।”
“তুমি এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?”
“কারণ আমিও জানতাম না, কী সত্যি আর কী মিথ্যে। ছোটবেলায় আমাদের এমনভাবে প্রশ্ন করা হতো যে, নিজেদের চোখে দেখা ঘটনাকেও সন্দেহ করতে শুরু করেছিলাম। আমি ভয় পেতাম, ক্যাসেটটা শুনলে আবার সব মনে পড়বে।”
“আমরা কি তোমার বাড়িতে আসতে পারি?”
“এসো।”
শর্মিষ্ঠার বাড়িতে পৌঁছে দেখা গেল, সে টেবিলের ওপর একটি ছোট ক্যাসেট প্লেয়ার রেখে অপেক্ষা করছে। ক্যাসেটের গায়ে অয়নের হাতের লেখা—‘শেষ রাত’।
অদিতি রেকর্ড বোতাম চালু করল, যাতে কথাগুলি ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা যায়।
ক্যাসেট চলতে শুরু করল।
প্রথমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ। তারপর একটি শিশুর কণ্ঠ।
“আমার নাম অয়ন। আজ যদি কেউ এই রেকর্ডিং শোনে, তাহলে জেনে রেখো, আমি যা বলছি, তার সবটা তোমাদের মনে থাকবে না। তোমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—আমরা ছয়জন এখানে এসেছিলাম। আমাদের মধ্যে একজনকে বলা হয়েছিল, সে অন্যদের বাঁচাতে পারবে। আরেকজনকে বলা হয়েছিল, সে সবাইকে বিপদে ফেলেছে।”
কিছুক্ষণ বিরতি।
তারপর অন্য একটি কণ্ঠ।
“আমি নীল। আমি জানি না, আমার আসল নাম কী। কিন্তু আমি জানি, ওই ঘরে যা ঘটেছে, সেটা দুর্ঘটনা ছিল না।”
ঋদ্ধিমান নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
ক্যাসেটে নীলের কণ্ঠ আবার শোনা গেল।
“অয়ন পালাতে চেয়েছিল। সে বলেছিল, আমাদের মধ্যে একজনকে মিথ্যে ঘটনার জন্য দোষী বানানো হবে। সে বলেছিল, যদি কেউ আমাদের জিজ্ঞাসা করে, কে দরজাটা খুলেছিল, তাহলে কেউ যেন নিজের স্মৃতির ওপর একা নির্ভর না করে। কারণ আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা গল্প বলা হয়েছে।”
এরপর হঠাৎ একটি দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।
“রেকর্ডিং বন্ধ করো।”
তারপর ধস্তাধস্তির শব্দ। একটি শিশুর কান্না।
অয়নের কণ্ঠ আবার ফিরে এল।
“ঋদ্ধি, যদি তুমি এটা শোনো, তাহলে আমাকে মনে করার চেষ্টা কোরো না। আমি তোমার বন্ধু ছিলাম কি না, তার চেয়েও বড় কথা—তুমি নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচতে পারো কি না। তারা তোমাকে বলেছে, তুমি কী দেখেছ। তারা তোমাকে বলেছে, তুমি কী ভুলে গেছ। কিন্তু তোমার সামনে এখনও একটা সুযোগ আছে। তুমি সবকিছু না জেনেও ভালো মানুষ হতে পারো।”
ক্যাসেটটি হঠাৎ থেমে গেল।
ঘরে কেউ কথা বলল না।
শর্মিষ্ঠার চোখে জল এসে গিয়েছিল।
“আমি এত বছর ভেবেছি, অয়ন আমাকে দোষ দিয়েছিল। কারণ ঘটনার পর আমাকে বারবার বলা হয়েছিল, আমি নাকি দরজা খুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, হয়তো সেই স্মৃতিটাই আমাকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।”
অদিতি তার হাত ধরল।
“তুমি তখন শিশু ছিলে। তোমাকে যা বিশ্বাস করানো হয়েছিল, তার দায় তোমার নয়।”
ঋদ্ধিমান ক্যাসেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “অয়ন জানত, আমাদের স্মৃতি বদলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে নিজেও কি সব জানত?”
“হয়তো না,” অদিতি বলল। “সে যা জানত, সেটুকুই আমাদের বলতে চেয়েছিল।”
ঋদ্ধিমান হঠাৎ একটি কথা মনে করল।
“ক্যাসেটের শুরুতে অয়ন বলল, আমরা ছয়জন এসেছিলাম। কিন্তু শেষে নীল বলল, অয়ন পালাতে চেয়েছিল। তাহলে নীল আর অয়ন আলাদা মানুষ।”
শর্মিষ্ঠা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। আমি দু’জনকেই চিনতাম। অয়ন ছিল চঞ্চল, সবসময় প্রশ্ন করত। নীল ছিল চুপচাপ। তার ডান হাতে চারটি আঙুল ছিল। কিন্তু একটা কথা আমি কখনও বুঝতে পারিনি—অয়ন কেন তোমাকে এত গুরুত্ব দিত।”
ঋদ্ধিমান বলল, “হয়তো কারণ আমি কিছু দেখেছিলাম।”
“কী দেখেছিলে?”
“মনে নেই।”
অদিতি বলল, “তাহলে সেই স্মৃতি জোর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব না। আগে নথি খুঁজব। ঘটনাগুলি মিলিয়ে দেখব।”
সেদিন বিকেলে তারা আবার নীলপ্রহর বাড়িতে ফিরে গেল। এবার তাদের উদ্দেশ্য ছিল নীল দরজার রহস্যের সমাধান করা, কোনও অজানা কণ্ঠের নির্দেশ মানা নয়।
অদিতি সঙ্গে এনেছিল বাড়ির পুরোনো নকশা, মৃণালিনী দেবীর দেওয়া নথির অনুলিপি এবং ক্যাসেটের রেকর্ডিং।
বাড়ির নিচতলার ঘরগুলিতে খোঁজ করতে করতে তারা একটি ছোট বৈদ্যুতিক বাক্স খুঁজে পেল। বাক্সটি বহু বছর আগে দেয়ালের ভেতরে বসানো হয়েছিল। বাইরে থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও ভেতরে একটি স্বল্পক্ষমতার ব্যাটারি এবং পুরোনো টাইমার সার্কিটের অবশিষ্টাংশ ছিল।
অদিতি বলল, “এই বাড়ির আলো জ্বলার একটা প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা আছে। কেউ হয়তো ব্যাটারি বদলেছে, কিংবা অন্য কোনও গোপন সংযোগ রেখেছিল।”
“কিন্তু ঠিক রাত ২টা ১৭ মিনিটে কেন?”
অদিতি সার্কিটের পাশে লেখা একটি সংখ্যা দেখাল।
‘২:১৭ — সেশন ট্রিগার।’
“এটা কোনও সময়সূচির অংশ ছিল। সম্ভবত গবেষণার সময় শিশুদের নির্দিষ্ট আলো বা শব্দ দেখানো হতো। একই সময়ে বারবার ঘটানো হলে সেই সময়টা তাদের মনে ভয়ের সংকেত হয়ে দাঁড়াতে পারে।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “তাহলে নীল আলো কোনও অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়।”
“এখন পর্যন্ত তার প্রমাণ নেই,” অদিতি উত্তর দিল। “কিন্তু কে এত বছর ধরে এই ব্যবস্থা চালু রেখেছে, সেটাই প্রশ্ন।”
তারা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। নীল দরজার সামনে এসে ঋদ্ধিমান থামল।
দরজার গায়ে কোনও তালা নেই। তবু দরজাটি ঠেলে খুলতে গেলে মনে হচ্ছিল, অন্য দিক থেকে কেউ ঠেকিয়ে রেখেছে।
অদিতি নকশার সঙ্গে দরজার অবস্থান মিলিয়ে দেখল।
“ঘর ছয়ের দরজা এটা নয়,” সে বলল। “ঘর ছয়ের প্রবেশপথ এই দেওয়ালের পেছনে।”
তারা দেওয়ালের কাঠের প্যানেল সরিয়ে একটি সরু ফাঁক খুঁজে পেল। ভেতরে ছোট একটি সুইচবোর্ড, পুরোনো তার এবং একটি যান্ত্রিক লক। লকটির পাশে লেখা—‘পর্যবেক্ষণ কক্ষ—প্রবেশের আগে রেকর্ড চালু করুন।’
অদিতি লকটি পরীক্ষা করে বলল, “এটা সাধারণ যান্ত্রিক ব্যবস্থা। তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় আটকে আছে।”
কিছু চেষ্টা করার পর দরজাটি খুলে গেল।
ঘরটি ছোট, জানলাহীন। মাঝখানে একটি চেয়ার। সামনে আয়না, পাশে পুরোনো রেকর্ডিং যন্ত্র। দেওয়ালে ছয়টি ছোট বাতি বসানো। পাঁচটি নিভে আছে। ষষ্ঠটির ওপর নীল রঙের কাচ।
ঋদ্ধিমান ঘরে ঢুকতেই একটি স্বয়ংক্রিয় রেকর্ডার চালু হয়ে গেল। স্পিকারে ভেসে এল অরিন্দম দত্তের কণ্ঠ।
“যদি তুমি এই ঘরে এসে থাকো, তার মানে তুমি নিজের অতীতের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছ। আমি জানি না, তুমি সবটা মনে করতে পারবে কি না। আমি এটাও জানি না, আমার রেখে যাওয়া নথিগুলি তোমার হাতে পৌঁছবে কি না। তাই আমি এই রেকর্ডিং রেখে যাচ্ছি।”
ঋদ্ধিমানের চোখ ভিজে উঠল।
বাবার কণ্ঠ এত বছর পর শুনছে সে।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
“তুমি যখন এখানে এসেছিলে, তখন তোমার নাম ছিল নীল। তুমি চার বছরের একটি শিশু ছিলে। তোমার ডান হাতে চারটি আঙুল ছিল। তুমি খুব কম কথা বলতে, কিন্তু তোমার স্মৃতির প্রতিক্রিয়া অন্য শিশুদের থেকে আলাদা ছিল। তুমি কিছু ঘটনা ভুলে যেতে, আবার কিছু ঘটনা এমনভাবে মনে রাখতে, যা অন্যরা অস্বীকার করত।
“আমি তোমাকে এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাই। তোমার নিরাপত্তার জন্য তোমাকে নতুন পরিচয় দেওয়া হয়। আমি তোমাকে বলেছিলাম, আমি তোমার বাবা। আইনগতভাবে তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। তোমাকে কোনও মিথ্যা স্মৃতি জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইনি। কিন্তু তোমার আগের জীবনের সব তথ্যও জানাতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম, তুমি বড় হলে সব বলব।
“তার আগেই আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনির্বাণের লোকেরা আবার তোমার খোঁজ শুরু করে। আমি তোমাকে নীলপ্রহর থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম। আমি ভুল করেছিলাম—কারণ সত্যিটা গোপন রাখতে গিয়ে তোমাকে এমন এক জীবনে রেখে গেলাম, যেখানে তোমার নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ ছিল না।
“তোমার মনে যদি অয়নের স্মৃতি ফিরে আসে, তাহলে মনে রেখো, অয়ন তোমার বন্ধু ছিল। কিন্তু তোমার সব স্মৃতি নির্ভুল নয়। ঘটনার রাতে সে তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। তোমরা দু’জন ঘর থেকে বেরোতে চেয়েছিলে। দরজার সামনে ধস্তাধস্তির সময় সে আহত হয়। তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে কোথায় সরিয়ে নেওয়া হয়, আমি জানতে পারিনি।
“তোমাদের বলা হয়েছিল, সে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। সেই খবরের সত্যতা আমি কখনও যাচাই করতে পারিনি। আমি শুধু জানি, তাকে জীবিত অবস্থায় শেষবার দেখেছিলাম ক্লিনিকের পেছনের ঘরে।
“তুমি যদি তাকে খুঁজতে যাও, তাহলে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবো। আর একটা কথা—তুমি নীল ছিলে বলে আজও তোমাকে নীল হয়ে থাকতে হবে না। তুমি যে মানুষ হয়েছ, সেই মানুষটিও সত্যি।”
রেকর্ডিং শেষ হলো।
ঘরে কেবল যন্ত্রের ক্ষীণ গুঞ্জন।
ঋদ্ধিমান চোখ মুছে নিল।
“তাহলে অয়নকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?”
অদিতি বলল, “এই রেকর্ডিংয়ের তারিখ খুঁজতে হবে। তারপর ক্লিনিকের স্থানান্তর নথি। হয়তো সেখানেই উত্তর আছে।”
ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়াল থেকে ক্ষীণ শব্দ এল।
তিনবার টোকা।
তারপর একটি পুরুষ কণ্ঠ।
“ঋদ্ধি?”
ঋদ্ধিমান স্থির হয়ে গেল।
এই কণ্ঠ সে চেনে।
অথচ এত বছর ধরে যে স্মৃতির সঙ্গে এই কণ্ঠকে মিলিয়ে এসেছে, তা হয়তো সম্পূর্ণ সত্য ছিল না।
দেওয়ালের সরু দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ মানুষ। সাদা চুল, কাঁপা হাত, চোখে ক্লান্তি। তাঁর মুখে সময়ের গভীর রেখা। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত পরিচিতি।
লোকটি বললেন, “আমাকে চিনতে পারছ?”
ঋদ্ধিমান কোনও উত্তর দিল না।
লোকটি নিজেই বললেন, “আমি অনির্বাণ দত্ত।”
অদিতি সঙ্গে সঙ্গে সামনে এগিয়ে এল।
“আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?”
“যেখানে থাকা উচিত ছিল না,” বৃদ্ধ বললেন। “আমি নিজের কাজের পরিণতি থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছি।”
ঋদ্ধিমান কঠিন গলায় বলল, “আপনি কি আমার স্মৃতি বদলে দিয়েছিলেন?”
অনির্বাণ দত্ত চোখ নামিয়ে নিলেন।
“আমি সেই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আমি শিশুদের ওপর এমন পরীক্ষা চালাতে দিয়েছিলাম, যার নৈতিক সীমা বহু আগেই অতিক্রম করা হয়েছিল। তোমার স্মৃতির ওপরও প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু তোমার প্রতিটি স্মৃতি আমি তৈরি করিনি। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই বুঝতে পারিনি, কোথায় সত্য শেষ হচ্ছে আর আমাদের ব্যাখ্যা শুরু হচ্ছে।”
“অয়নের কী হয়েছিল?”
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“অয়ন পালানোর রাতে আহত হয়েছিল। তাকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার চিকিৎসা হয়েছিল। সে বেঁচে ছিল। কিন্তু তার পরিবার তাকে অন্যত্র নিয়ে যায়। প্রকল্পের অনিয়ম প্রকাশ্যে এলে তাদের ওপরও চাপ পড়বে—এই ভয়ে তারা পরিচয় গোপন করে চলে যায়। আমি তাদের খুঁজিনি। আমার খোঁজ করা উচিত ছিল।”
“তাহলে পুকুরে ডুবে মৃত্যুর খবর?”
“সেটা ছিল একটি সাজানো খবর। প্রকল্পের ব্যর্থতা এবং শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে আড়াল করতে কয়েকজন মিলে দুর্ঘটনার গল্প ছড়িয়ে দেয়। আমি তা থামাইনি। সেটাই আমার অপরাধগুলির একটি।”
“আপনি জানতেন, আমি অয়নকে মৃত মনে করে বড় হচ্ছি?”
“জানতাম।”
“তাহলে আমাকে সত্যিটা জানাননি কেন?”
অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।
“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। প্রথমে নিজের অপরাধ প্রকাশ পাওয়ার ভয়, পরে তোমাকে আবার সেই অতীতের মুখোমুখি করার ভয়। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝেছি, আমার নীরবতা তোমাকে রক্ষা করেনি। বরং তোমাকে প্রশ্নহীন একটি মিথ্যার মধ্যে আটকে রেখেছে।”
ঋদ্ধিমান চুপ করে রইল।
অনির্বাণ বললেন, “তোমার আগের নাম ছিল নীল। কিন্তু তোমাকে সেই নামেই বাঁচতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। অরিন্দম তোমাকে যে নাম দিয়েছিলেন, তা তিনি ভালোবাসা থেকে দিয়েছিলেন। তিনি তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তোমার জীবনের সত্যিটা অসম্পূর্ণ ছিল, কিন্তু তাঁর স্নেহ মিথ্যা ছিল না।”
“অরিন্দম কোথায় মারা গিয়েছিলেন?”
“তিনি বহু বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর শেষ দিনগুলিতে আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম। তিনি চেয়েছিলেন, তুমি প্রাপ্তবয়স্ক হলে সত্যিটা জানো। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন, সত্যি জানার সঙ্গে সঙ্গে তুমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারো। তাই তিনি নথি রেখে গিয়েছিলেন, কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি।”
ঋদ্ধিমান বলল, “আপনি আমাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন?”
অনির্বাণ মাথা নাড়লেন।
“কিছু বার্তা আমি পাঠিয়েছি। কিছু পুরোনো নথিতে আগে থেকে লেখা ছিল। সব বার্তা আমার নয়। অরিন্দম একটি নির্দিষ্ট সময়ে চিঠিগুলি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আর নীল দরজার আলো—সেটি আমি কয়েক বছর আগে আবার চালু করি। ভেবেছিলাম, তুমি হয়তো একদিন ফিরে আসবে। কিন্তু আমি ভুল করেছি। তোমাকে কোনও সংকেত দিয়ে এখানে টেনে আনার অধিকার আমার ছিল না।”
“আপনি কেন ২টা ১৭ মিনিট বেছে নিয়েছিলেন?”
অনির্বাণ বললেন, “সেই রাতে প্রথম বড় ঘটনাটি ঘটে রাত ২টা ১৭ মিনিটে। দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিশুরা ঘরের মধ্যে আটকে পড়েছিল। সেই সময় থেকেই ওই আলো ও শব্দের সংকেত ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে সেটিকে পরীক্ষার নির্দিষ্ট সময় হিসেবে রাখা হয়। আমরা ভেবেছিলাম, একই সংকেতের মাধ্যমে শিশুদের প্রতিক্রিয়া বোঝা যাবে। কিন্তু সেটি তাদের মধ্যে আতঙ্কের স্মৃতি তৈরি করেছিল।”
অদিতি প্রশ্ন করল, “আপনি কি জানতেন, এই বাড়িতে এখনও যন্ত্র কাজ করছে?”
“হ্যাঁ। আমি মাঝেমধ্যে এসে পরীক্ষা করতাম। কিছু নথি এখানে রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, কোনও দিন সাহস করে সব প্রকাশ করব। কিন্তু সাহস আসেনি।”
ঋদ্ধিমান বৃদ্ধের দিকে তাকাল।
“এখন আপনি কী চান?”
“আমি চাই, সব নথি প্রকাশ্যে আসুক। শিশুদের নাম, তাদের ওপর করা অন্যায়, প্রকল্পের সত্য—সবকিছু। আমি নিজের দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত।”
ঋদ্ধিমান বলল, “শুধু দুঃখ প্রকাশ করলে হবে না। যারা বেঁচে আছে, তাদের বক্তব্যও সামনে আনতে হবে। শর্মিষ্ঠা, সৌম্যজিৎ, মধুরিমা—সবাইকে খুঁজতে হবে। অয়নকে খুঁজতে হবে। আর আমার পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।”
অনির্বাণ মাথা নাড়লেন।
“তুমি ঠিক বলেছ।”
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ছিল দীর্ঘ অনুসন্ধানের সময়।
অদিতি পুরোনো সংবাদপত্রের আর্কাইভ খুঁজল। মৃণালিনী দেবী ক্লিনিকের সংরক্ষিত রেজিস্টার থেকে কিছু স্থানান্তর নথি উদ্ধার করলেন। শর্মিষ্ঠা এবং অন্য প্রাক্তন অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। প্রত্যেকের স্মৃতি আলাদা ছিল, কিন্তু নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অয়নকে ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে আহত অবস্থায় একটি অন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে তার এক আত্মীয়ের কাছে পাঠানো হয়। পরিবারটি অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিল। নথিতে তার পূর্ণ পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল, কারণ প্রকল্পের লোকেরা তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল।
আরও অনুসন্ধানের পর একটি পুরোনো ঠিকানা পাওয়া গেল।
সেখানে গিয়ে ঋদ্ধিমান জানতে পারল, অয়ন বহু বছর আগে নিজের নাম বদলেছে। সে এখন জীবিত, তবে দীর্ঘদিন ধরে নিজের অতীত নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলে না। তাকে খুঁজে পাওয়ার পর প্রথমে সে দেখা করতে রাজি হয়নি। পরে অরিন্দমের চিঠি এবং পুরোনো ক্যাসেটের রেকর্ডিং শোনানো হলে সে সম্মতি দেয়।
তাদের দেখা হয়েছিল একটি ছোট বইয়ের দোকানের পেছনের ঘরে।
ঋদ্ধিমান দরজা খুলে ঢুকতেই দেখল, জানলার পাশে বসে আছে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ। মুখে দাড়ি, চোখে চশমা, চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে সেই পুরোনো চঞ্চলতার ছায়া রয়ে গেছে।
লোকটি উঠে দাঁড়াল।
“ঋদ্ধি?”
ঋদ্ধিমান থমকে গেল।
এই সম্বোধনটি সে এত বছর পর শুনল।
“অয়ন?”
লোকটি মৃদু হাসল।
“এই নামটা অনেক দিন কেউ ডাকেনি।”
ঋদ্ধিমান কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে হচ্ছিল, এত প্রশ্ন করবে যে কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু মুখ থেকে প্রথমে বেরোল অন্য কথা।
“তুমি বেঁচে আছ।”
অয়ন দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“হ্যাঁ। কিন্তু আমি জানতাম না, তুমি কোনও দিন সত্যিটা জানতে পারবে কি না।”
“আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি পুকুরে ডুবে মারা গেছ।”
“আমাকে বলা হয়েছিল, তোমার স্মৃতি এতটাই বদলে গেছে যে তুমি আমাকে চিনতেই পারবে না। আমাদের দু’জনকেই আলাদা গল্প বলা হয়েছিল।”
“তুমি কেন যোগাযোগ করোনি?”
“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তখন আমার পরিবার ভয় পেয়েছিল। আমি নিজেও দীর্ঘদিন চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম। পরে যখন স্বাভাবিক জীবন শুরু করি, তখন মনে হয়েছিল, তোমাকে খুঁজে বের করে আবার সেই অতীতের মধ্যে টেনে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি জানতাম না, তুমি কতটা মনে রেখেছ।”
ঋদ্ধিমান চেয়ারে বসে পড়ল।
“আমার মনে আছে, আমরা বন্ধু ছিলাম। আবার এমন অনেক কিছু মনে আছে, যা হয়তো সত্যি নয়। আমি আর বুঝতে পারি না, কোনটা আমার নিজের স্মৃতি।”
অয়ন শান্ত গলায় বলল, “সব স্মৃতির নিখুঁত প্রমাণ পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যা জানি, তা দিয়ে সত্যের কাছাকাছি যেতে পারি। আমার মনে আছে, তুমি আমাকে ঘর থেকে বেরোতে সাহায্য করেছিলে। তোমার মনে না থাকলেও ঘটনাটি মুছে যায় না।”
“তারপর কী হয়েছিল?”
“সেই রাতে আমরা ঘর ছয় থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম। নীল আমাদের পথ দেখিয়েছিল। দরজার কাছে একজন গবেষক আমাদের থামায়। ধস্তাধস্তির সময় আমি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাই। আমাকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার পরিবার আমাকে নিয়ে চলে যায়। নীলকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আমি জানতাম না।”
“নীল ছিলাম আমি।”
অয়ন মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি শুধু নীল নও। তুমি সেই ঋদ্ধিমানও, যে অরিন্দমের কাছে বড় হয়েছে। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নিতে হবে না।”
ঋদ্ধিমান চুপ করে রইল।
অয়ন বলল, “তুমি কি জানো, আমি তোমার নাম কেন লিখেছিলাম?”
“কেন?”
“কারণ তুমি অন্যদের মতো সবকিছু মেনে নিতে না। আমাদের বলা হতো, কোনও ঘটনা ঘটেনি, অথচ তুমি প্রশ্ন করতে—তাহলে আমাদের ভয় লাগছে কেন? আমরা জানতাম না, তুমি কতটা মনে রেখেছ। কিন্তু তুমি প্রশ্ন করা বন্ধ করোনি।”
ঋদ্ধিমান মৃদু হেসে ফেলল।
“আমি এখন স্থপতি। পুরোনো বাড়ি আর নকশা নিয়ে কাজ করি। হয়তো সেই জন্যই পুরোনো দরজাগুলির পেছনে কী আছে, তা জানতে ইচ্ছে হয়।”
“তাহলে এবার একটা কাজ করো,” অয়ন বলল। “আমাদের স্মৃতি নিয়ে যে বাড়িতে পরীক্ষা হয়েছিল, সেই বাড়িটাকে আর গোপন রহস্যের জায়গা করে রেখো না। ওটাকে এমন জায়গা করো, যেখানে কেউ নিজের স্মৃতি হারানোর ভয় পাবে না।”
কয়েক মাস পরে নীলপ্রহর বাড়ির সামনে একটি নতুন ফলক বসানো হলো।
নীলপ্রহর স্মৃতি ও শিশু-অধিকার কেন্দ্র
নীচে লেখা—
“এই বাড়িতে একসময় শিশুদের স্মৃতি ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনৈতিক গবেষণা চালানো হয়েছিল। এখানে যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের অভিজ্ঞতা, সাহস এবং নীরবতার ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। কোনও শিশুর স্মৃতি, পরিচয় বা সম্মতিকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।”
অরিন্দম দত্তের রেখে যাওয়া নথি, মৃণালিনী দেবীর সাক্ষ্য, অয়নের রেকর্ডিং এবং প্রাক্তন অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য নিয়ে একটি সংরক্ষণাগার তৈরি করা হলো। অনির্বাণ দত্ত নিজের ভূমিকার কথা লিখিতভাবে স্বীকার করলেন। তদন্ত শুরু হলো। বহু প্রশ্নের উত্তর আর কখনও পাওয়া যাবে না—কিছু নথি হারিয়ে গেছে, কিছু মানুষের স্মৃতি অসম্পূর্ণ, কিছু ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আর বেঁচে নেই।
তবু নীরবতার দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরেছিল।
ঋদ্ধিমান নিজের জন্মপরিচয় সম্পর্কে আরও অনুসন্ধান চালিয়ে গেল। তার জন্মদাতা কে, সে কোথায় জন্মেছিল, তার প্রথম পরিবারের কী হয়েছিল—এসব প্রশ্নের সব উত্তর পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাকেন্দ্রের নথি থেকে জানা গেল, তাকে চার বছর বয়সে অজ্ঞাতপরিচয় শিশু হিসেবে আনা হয়েছিল। তার আগের জীবনের কোনও নির্ভরযোগ্য নথি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আইনগতভাবে নিজের পরিচয় নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়া শুরু করল সে। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে নিজের নাম বদলানোর সিদ্ধান্ত নিল না।
সে রইল ঋদ্ধিমান দত্ত।
কারণ এই নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার বাবার হাত ধরে হাঁটতে শেখা, প্রথম স্কুলে যাওয়া, প্রথম ব্যর্থতার পর সাহস ফিরে পাওয়া, এবং অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত। সেই স্মৃতিগুলি অসম্পূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেগুলি তার জীবনের অংশ।
একদিন বিকেলে অদিতি তাকে নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।
দরজাটি এখন খোলা। ঘরের ভেতরে কোনও নীল আলো নেই। পুরোনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা খুলে ফেলা হয়েছে। দেয়ালে শিশুদের আঁকা নতুন ছবি ঝুলছে।
অদিতি পাশে এসে দাঁড়াল।
“কী ভাবছ?”
ঋদ্ধিমান বলল, “ভাবছি, একটা দরজা এত বছর ধরে আমার কাছে প্রশ্ন হয়ে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ওটার ওপারে এমন একটা সত্য আছে, যা জানলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
“এখন কী মনে হচ্ছে?”
“সত্যি জানার পরও সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। কিন্তু অন্তত কোন প্রশ্নগুলো আমার নিজের, সেটা বুঝতে পারছি।”
অদিতি হাসল।
“তাহলে তুমি কি এখন অতীতকে ভয় পাও না?”
ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ভয় পাই। কিন্তু আর নিজের স্মৃতিকে শত্রু ভাবি না। আমি জানি, স্মৃতি ভুল করতে পারে। মানুষও পারে। তাই স্মৃতির পাশাপাশি প্রমাণ, অন্যের অভিজ্ঞতা আর নিজের বিবেককে গুরুত্ব দিতে হবে।”
ঠিক তখনই অয়ন এসে পৌঁছল। তার হাতে একটি ছোট বাক্স।
“তোমাদের জন্য কিছু এনেছি।”
বাক্স খুলে দেখা গেল, একটি পুরোনো কাঠের খেলনা। ছয়টি ছোট কাঠের ঘর একসঙ্গে জোড়া লাগানো। প্রতিটি ঘরের ওপর একটি করে নাম খোদাই করা—অয়ন, সৌম্যজিৎ, মধুরিমা, শর্মিষ্ঠা, নীল এবং ঋদ্ধিমান।
“এটা আমরা ছোটবেলায় বানিয়েছিলাম,” অয়ন বলল। “আমাদের মনে ছিল, একদিন এমন একটা বাড়ি তৈরি করব, যেখানে কেউ কাউকে আটকে রাখতে পারবে না। পরে খেলনাটা হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক বছর পর আমার পরিবারের পুরোনো বাক্সে পেলাম।”
ঋদ্ধিমান খেলনাটির ওপর আঙুল বোলাল।
“তাহলে আমাদের স্বপ্নটা পুরো হারিয়ে যায়নি।”
“না,” অয়ন বলল। “শুধু অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
তারা তিনজন বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে রইল। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। দূরে রাস্তার ওপর দিয়ে মানুষ চলেছে, দোকানের শাটার উঠছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। পৃথিবী তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে যাচ্ছে।
ঋদ্ধিমান একবার নীল দরজার দিকে তাকাল।
এখন দরজাটি আর কোনও গোপন সংকেত নয়। আর কোনও অজানা কণ্ঠের উৎস নয়। এটি কেবল একটি পুরোনো দরজা, যার ওপারে একসময় অন্যায় ঘটেছিল, আর যার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ সেই অন্যায়ের কথা বলতে শিখেছে।
সে বুঝতে পারল, নিজের অতীতকে জানা মানে অতীতের কাছে বন্দি হয়ে থাকা নয়। বরং অতীতের সত্য যতটুকু জানা যায়, তা স্বীকার করে ভবিষ্যতের জন্য নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
তার জন্মের আগে কী নাম ছিল, সে কোথা থেকে এসেছিল, তার প্রথম পরিবার কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল—এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর হয়তো চিরকাল অজানা থেকে যাবে।
কিন্তু এখন সে জানে, কোনও অজানা পরিচয় তাকে অসম্পূর্ণ মানুষ করে দেয় না।
তার নাম ঋদ্ধিমান দত্ত।
তার স্মৃতিতে আলো আছে, অন্ধকার আছে, ভুল আছে, সত্যের টুকরো আছে। তার জীবনে অরিন্দমের ভালোবাসা আছে, অয়নের বন্ধুত্ব আছে, শর্মিষ্ঠার সাহস আছে, অদিতির প্রশ্ন করার ক্ষমতা আছে। আর আছে নিজের ভুল স্বীকার করে এগিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব।
নীল দরজার ওপারে কোনও অলৌকিক উত্তর অপেক্ষা করছিল না।
অপেক্ষা করছিল কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠ, কিছু অসমাপ্ত সত্য, আর নিজের জীবনকে নতুন করে বোঝার সুযোগ।
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে দরজাটি বন্ধ করল।
এবার দরজার ওপার থেকে কোনও আলো বেরোল না।
কারণ আর কিছু গোপন রাখার প্রয়োজন ছিল না।
— সমাপ্ত —