শান্তিপুরের একটি স্কুলে প্রতি বছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। দৌড়, লং জাম্প, অঙ্কের কুইজ, গান—সব বিভাগেই ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিত। যারা প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হত, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হত পুরস্কার।
কিন্তু এবছর প্রধান শিক্ষক অরুণবাবু ঘোষণা করলেন, স্কুলে একটি নতুন প্রতিযোগিতা হবে। নাম—‘সবচেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতা’।
ঘোষণাটি শুনে ছাত্রছাত্রীরা অবাক হয়ে গেল।
সপ্তম শ্রেণির রুদ্র বন্ধুদের বলল, “ভালো মানুষ হওয়ার আবার প্রতিযোগিতা হয় নাকি? কে কত ভালো, সেটা মাপবে কী দিয়ে?”
তার বন্ধু সায়ন হেসে বলল, “হয়তো যে সবচেয়ে বেশি ভালো কথা বলতে পারবে, সে জিতবে!”
ক্লাসের সবাই হেসে উঠল।
পরদিন অরুণবাবু প্রতিযোগিতার নিয়ম বুঝিয়ে দিলেন। আগামী সাত দিন ছাত্রছাত্রীদের প্রতিদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের চেষ্টা লক্ষ করা হবে। কোনও নির্দিষ্ট নম্বরের তালিকা থাকবে না। শিক্ষকেরা বিভিন্ন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবেন, তবে কাউকে কোনও ভালো কাজ করতে বাধ্য করা হবে না।
রুদ্র প্রতিযোগিতাটিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে নিল। সে ঠিক করল, যেভাবেই হোক তাকে জিততেই হবে।
প্রথম দিন সে শ্রেণিকক্ষের মেঝে থেকে একটি কাগজ তুলে ডাস্টবিনে ফেলল। তারপর পাশের বন্ধুকে বলল, “দেখেছিস? আমি কত ভালো কাজ করলাম!”
দ্বিতীয় দিন সে একজন সহপাঠীকে পেনসিল ধার দিল। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই তিনবার তাকে মনে করিয়ে দিল, যেন শিক্ষককে বিষয়টি জানায়।
তৃতীয় দিন সে লাইনে দাঁড়িয়ে এক ছোট ছাত্রকে আগে যেতে দিল। তারপর বন্ধুদের কাছে গিয়ে বলল, “এমন সুযোগ পেলে তোমরাও কিন্তু আমাকে ভোট দেবে!”
তার বন্ধুরা হাসলেও রুদ্র বুঝতে পারল না, কেন তারা তার প্রশংসা করছে না।
অন্যদিকে একই ক্লাসের মেঘলা কোনও প্রতিযোগিতার কথা বিশেষ ভাবছিল না। একদিন সে দেখল, নতুন ছাত্র রাহুল বাংলা পড়তে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে। মেঘলা নিজের কাজ শেষ করে তাকে পড়াটা বুঝিয়ে দিল।
আরেক দিন স্কুলের এক কর্মচারীর হাত থেকে কিছু কাগজ মাটিতে পড়ে গেলে সে সেগুলো কুড়িয়ে দিল। কেউ দেখেছে কি না, সে দিকে তার কোনও খেয়াল ছিল না।
সপ্তম দিনের সকালে রুদ্র স্কুলে এসে দেখল, তার প্রিয় ফুটবলটি শ্রেণিকক্ষের জানালার পাশে পড়ে আছে। আগের দিন সে বলটি সেখানে রেখেছিল। হঠাৎ তার মনে হল, প্রতিযোগিতায় ভালো নম্বর পেতে হলে আজও কিছু একটা করতে হবে।
সে বলটি হাতে নিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় দেখল, স্কুলের ছোট্ট বাগানের পাশে একটি টব উল্টে পড়ে আছে। গাছটি মাটি থেকে প্রায় উপড়ে এসেছে। রুদ্র চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।
প্রথমে সে ভাবল, গাছটি ঠিক করে দিলে হয়তো শিক্ষকরা দেখতে পাবেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ল, প্রতিযোগিতা শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। এত সময় নষ্ট করলে ফুটবল খেলতে পারবে না।
সে এগিয়ে গেল মাঠের দিকে।
কিছুদূর যাওয়ার পর তার চোখে পড়ল মেঘলা। সে হাঁটু গেড়ে বসে টবের গাছটিকে আবার মাটিতে বসাচ্ছে। তার স্কুলের পোশাকে মাটি লেগে গেছে। মেঘলা খুব সাবধানে গাছটির চারপাশে মাটি চেপে দিচ্ছিল, যাতে শিকড়গুলো ঠিকমতো বসে যায়।
রুদ্র জিজ্ঞাসা করল, “তুই এখানে কী করছিস? প্রতিযোগিতা তো আজ শেষ!”
মেঘলা মাথা না তুলে বলল, “গাছটা পড়ে ছিল। এভাবে থাকলে শুকিয়ে যাবে।”
“কিন্তু শিক্ষকরা তো দেখছেন না!”
মেঘলা এবার তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “গাছটাকে বাঁচানোর জন্য শিক্ষককে দেখানোর দরকার কী?”
কথাটা রুদ্রকে থামিয়ে দিল।
সে নিজের ফুটবলটি পাশে রেখে মেঘলাকে সাহায্য করতে বসে পড়ল। দুজনে মিলে টবটি সোজা করল, মাটি ভরল এবং জল দিল। কাজ শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। মাঠে পৌঁছে রুদ্র দেখল, তার বন্ধুরা খেলা শুরু করে দিয়েছে।
সেদিন বিকেলে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অরুণবাবু মঞ্চে উঠলেন। তিনি জানালেন, এই প্রতিযোগিতায় কোনও প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নেই। বরং স্কুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে নিজের আচরণ সম্পর্কে ভাবার জন্য একটি করে ডায়েরি দেওয়া হবে।
রুদ্র একটু হতাশ হল। সে ভেবেছিল, অন্তত একটি পুরস্কার পাবে।
অনুষ্ঠান শেষে অরুণবাবু তাকে কাছে ডাকলেন।
“রুদ্র, তুমি কি জানো, এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী ছিল?”
রুদ্র মাথা নাড়ল।
শিক্ষক বললেন, “ভালো কাজের জন্য প্রশংসা পাওয়া আনন্দের। কিন্তু প্রশংসা পাওয়ার আশায় ভালো কাজ করলে নিজের উদ্দেশ্যটাই ছোট হয়ে যায়। আসল পরিবর্তন তখনই আসে, যখন কেউ না দেখলেও আমরা ঠিক কাজটি করি।”
রুদ্র চুপ করে রইল। তার মনে পড়ল, মেঘলার সঙ্গে গাছটি ঠিক করার সময় কোনও পুরস্কারের কথা তার মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছিল, গাছটিকে বাঁচানো দরকার।
বাড়ি ফেরার পথে সে সিদ্ধান্ত নিল, পরের দিন থেকে নিজের কাজের হিসাব অন্যদের কাছে দেওয়ার বদলে প্রতিদিন রাতে ডায়েরিতে লিখবে—কোথায় সে ভালো করেছে, কোথায় ভুল করেছে এবং পরদিন কীভাবে নিজেকে একটু ভালো করতে পারে।
কয়েক মাস পর রুদ্রের আচরণে সত্যিই পরিবর্তন এল। সে আগের মতোই খেলত, হাসত, বন্ধুদের সঙ্গে মজা করত। কিন্তু ভালো কাজ করার পর আর কারও কাছে তার হিসাব দিত না।
স্কুলের বাগানে সেই টবের গাছটিও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল।
একদিন তার প্রথম ফুলটি ফুটলে রুদ্র আর মেঘলা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ ছবি তুলল না, কেউ পুরস্কার দিল না।
তবু দুজনের মনেই সেদিন এক অদ্ভুত আনন্দ জন্মেছিল।
শিক্ষা: ভালো মানুষ হওয়া কোনও প্রতিযোগিতা নয়। অন্যের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার জন্য ভালো কাজ করাই প্রকৃত মানবিকতা।