Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ঐশ্বর্যা শ্রীধর: ক্যামেরার চোখে প্রকৃতিকে রক্ষার লড়াই করা এক তরুণ মহীয়সী নারী।

একটি ক্যামেরা কখনও শুধু ছবি তোলে না। কখনও একটি ছবি হয়ে ওঠে কোনও হারিয়ে যেতে বসা বনভূমির দলিল, কখনও কোনও বিপন্ন প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ, আবার কখনও মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম।

এই বিশ্বাসকে নিজের কাজের কেন্দ্রে রেখে খুব অল্প বয়সেই আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেছেন ঐশ্বর্যা শ্রীধর। তিনি বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, পরিবেশকর্মী এবং National Geographic Explorer। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখানো নয়—প্রকৃতির যে অংশগুলি মানুষের অবহেলা ও উন্নয়নের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলির গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরা।

মাত্র এগারো বছর বয়সে হাতে এসেছিল ক্যামেরা

ঐশ্বর্যার প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক কোনও পেশাগত পরিকল্পনা দিয়ে শুরু হয়নি। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে একটি ক্যামেরা পেয়েছিলেন তিনি। সেই ক্যামেরাই ধীরে ধীরে তাঁর চোখ খুলে দেয় চারপাশের অন্য এক পৃথিবীর দিকে।

শহরের পরিচিত দৃশ্যের বাইরে তিনি দেখতে শুরু করেন পাখি, পোকামাকড়, গাছপালা, জলাভূমি এবং বন্যপ্রাণীর জগত।

ক্রমে ছবি তোলার নেশা পরিণত হয় অনুসন্ধানের আগ্রহে। কোনও প্রাণীর ছবি তুলতে গেলে তার জীবন সম্পর্কে জানতে হয়। কোনও জলাভূমির ছবি তুলতে গেলে বুঝতে হয় সেই জলাভূমি কেন গুরুত্বপূর্ণ। কোনও বনভূমিতে গেলে শুধু সুন্দর দৃশ্য নয়, মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবও চোখে পড়ে।

এইভাবেই ক্যামেরা তাঁর কাছে হয়ে ওঠে গবেষণা ও গল্প বলার মাধ্যম।

কিশোরী বয়সেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ঐশ্বর্যার প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই নজরে আসে। তাঁর নিজস্ব জীবনী অনুযায়ী, মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করার কাজে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন। ২০১১ সালে তিনি Sanctuary Asia Young Naturalist Award পান এবং সেই সময় তিনি এই পুরস্কারপ্রাপ্ত সবচেয়ে কনিষ্ঠ ও প্রথম মেয়ে প্রাপক ছিলেন।

এই স্বীকৃতি তাঁর কাছে শুধু একটি পুরস্কার ছিল না। এটি তাঁকে আরও বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ছবি তুলে কীভাবে প্রকৃতিকে রক্ষা করার কাজে বাস্তব পরিবর্তন আনা যায়?

এই প্রশ্নই পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজের দিক নির্ধারণ করে।

একটি ছবি যখন ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে

২০২০ সালে ঐশ্বর্যা শ্রীধরের জীবনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সাফল্য।

তাঁর তোলা ‘Lights of Passion’ ছবিটি Natural History Museum, London-এর Wildlife Photographer of the Year প্রতিযোগিতায় Highly Commended হয়। এই ছবির বিষয় ছিল হাজার হাজার জোনাকির আলোয় আলোকিত একটি গাছ।

ছবিটি তুলতে তাঁকে অন্ধকার, বন্যপ্রাণীসমৃদ্ধ একটি জঙ্গলের মধ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। Natural History Museum-এর বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটার পর তিনি এমন একটি গাছ খুঁজে পান, যা হাজার হাজার জোনাকির bioluminescence-এ সোনালি হয়ে উঠেছিল। ছবিটি তৈরির জন্য তিনি ২৪ সেকেন্ডের সময়সীমায় ২৭টি ছবি ধারণ করে focus-stacking প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।

এই কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ পরিচিতি দেয়। National Geographic-এর Explorer profile অনুযায়ী, ২০২০ সালে তিনি Wildlife Photographer of the Year Awards-এ প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে এই স্বীকৃতি অর্জন করেন।

একটি অন্ধকার জঙ্গলে জোনাকির আলো—দৃশ্যটি যতটা সুন্দর, তার পিছনে ছিল ততটাই ধৈর্য, প্রযুক্তি এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর মনোযোগ।

ফটোগ্রাফি থেকে সংরক্ষণ

ঐশ্বর্যার কাজের আসল গুরুত্ব এখানেই যে তিনি পুরস্কার পাওয়ার পর শুধু আরও ছবি তোলার দিকে এগিয়ে যাননি।

তিনি বুঝেছিলেন, প্রকৃতির ছবি মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে; কিন্তু সেই মুগ্ধতাকে যদি সংরক্ষণের ইচ্ছায় পরিণত করা যায়, তবেই ছবির প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।

এই ভাবনা থেকেই তাঁর কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় জলাভূমি রক্ষা।

মুম্বইয়ের নাভি মুম্বই অঞ্চলের Panje Wetland-এর ওপর তিনি কাজ করেন। সেখানে তিনি ছবি, ভিডিও এবং গল্পের মাধ্যমে জলাভূমিটির পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তাঁর তৈরি তথ্যচিত্র ‘Panje – The Last Wetland’ DD National-এ সম্প্রচারিত হয় এবং Save Panje Wetland campaign-এর অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। National Geographic-এর Explorer profile অনুযায়ী, তাঁর তৈরি visual documentation পরিবেশবাদীদের আইনি লড়াইয়েও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরে Bombay High Court জলাভূমি রক্ষার পক্ষে রায় দেয় এবং ২০২২ সালে National Green Tribunal-ও Panje wetlands-এর সুরক্ষার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়।

এখানে একজন আলোকচিত্রীর ভূমিকা একেবারে নতুন মাত্রা পায়।

তিনি শুধু ঘটনাটি ক্যামেরায় বন্দি করেননি; ছবিকে পরিণত করেছেন পরিবেশ সংরক্ষণের যুক্তির অংশে।

‘Panje—The Last Wetland’: একটি জলাভূমির গল্প

শহর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলাভূমির ওপর চাপ বাড়ে। অনেক সময় মানুষের চোখে জলাভূমি মানে শুধু ফাঁকা জমি বা জল জমে থাকা এলাকা। কিন্তু পরিবেশবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি জলাভূমি অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল, জলধারণের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা এবং একটি বৃহত্তর ecosystem-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঐশ্বর্যা তাঁর চলচ্চিত্রে এই অদৃশ্য গুরুত্বকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছেন।

স্থানীয় মানুষ, জেলে সম্প্রদায়, পরিবেশকর্মী এবং প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে তিনি জলাভূমির গল্পকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন। National Geographic-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর Panje-সংক্রান্ত কাজ পরবর্তীকালে সেই এলাকার পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল হয়ে ওঠে।

এই ঘটনা দেখায়, একজন তরুণী আলোকচিত্রীর হাতে থাকা ক্যামেরা কখনও কখনও আদালতের নথির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাঘের গল্পেও মানুষের কাছে পৌঁছনো

ঐশ্বর্যার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ বাঘকে কেন্দ্র করে।

মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি Tadoba-র বিখ্যাত বাঘিনী Maya-র জীবন পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছিলেন। বহু বছর ধরে সংগ্রহ করা ফুটেজের ভিত্তিতে তিনি তৈরি করেন ‘Tiger Queen of Taru’। National Geographic-এর তথ্য অনুযায়ী, এই ছবির জন্য তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে ফুটেজ সংগ্রহ করেছিলেন। পরে ছবিটি Big Cat Week-এ প্রদর্শিত হয় এবং National Geographic WILD ও Disney+ Hotstar-এ সম্প্রচারিত হয়।

বন্যপ্রাণী নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

প্রাণী কখন কোথায় থাকবে, কখন কী আচরণ করবে—তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, কখনও দিনের পর দিন।

তার সঙ্গে থাকে আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড, নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

কিন্তু সেই অপেক্ষার মধ্যেই একজন wildlife storyteller প্রাণীর এমন মুহূর্ত ধরে ফেলতে পারেন, যা সাধারণ মানুষের চোখে কখনও ধরা পড়ে না।

ক্যামেরার পাশাপাশি কলম

ঐশ্বর্যার পরিচয় শুধু photographer হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি প্রকৃতি নিয়ে কবিতা লেখেন, প্রবন্ধ লেখেন এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর ছবি ও লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নিজের ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি প্রকৃতি নিয়ে ২০০-রও বেশি কবিতা লিখেছেন। তাঁর লেখা ও ছবি BBC Wildlife, Guardian, Mongabay, Sanctuary Asia, Saevus, Times of India, Hindustan Times-সহ বিভিন্ন প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

একজন বিজ্ঞানী অনেক সময় তথ্য দিয়ে মানুষকে বোঝান।

একজন সাংবাদিক ঘটনার বিবরণ দেন।

একজন শিল্পী অনুভূতি তৈরি করেন।

ঐশ্বর্যা এই তিনটি পদ্ধতির মাঝামাঝি একটি জায়গা তৈরি করেছেন—ছবি দিয়ে তথ্য, গল্প দিয়ে অনুভূতি এবং চলচ্চিত্র দিয়ে প্রশ্ন।

National Geographic Explorer

২০২২ সালে ঐশ্বর্যা National Geographic Explorer হিসেবে যুক্ত হন। National Geographic-এর নিজস্ব প্রোফাইল অনুযায়ী, তাঁর কাজের অন্যতম উদ্দেশ্য হল visual storytelling-এর মাধ্যমে conservation impact তৈরি করা। তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির নথিবদ্ধকরণ করেছেন এবং নানা কঠিন ভূখণ্ডে কাজ করেছেন।

Lion-tailed macaque থেকে desert fox—বিভিন্ন প্রজাতিকে নথিবদ্ধ করতে তিনি ভারতের নানা পরিবেশে কাজ করেছেন।

এটি শুধু ভ্রমণ নয়।

বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার অর্থ হল তার habitat-এর সঙ্গে পরিচিত হওয়া। প্রাণীটিকে দেখতে হলে তার খাবার, চলাফেরা, প্রজনন, আশ্রয়স্থল এবং মানুষের সঙ্গে তার সংঘাত—সবকিছু সম্পর্কে জানতে হয়।

ফলে একটি ছবি অনেক সময় একটি সম্পূর্ণ ecosystem-এর গল্প বহন করে।

তরুণদের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত

ঐশ্বর্যার সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর বয়স।

অনেক সময় পরিবেশ সংরক্ষণকে আমরা প্রবীণ বিজ্ঞানী, বনকর্মী বা বড় সংগঠনের কাজ বলে মনে করি। কিন্তু ঐশ্বর্যার যাত্রা দেখায়, একজন তরুণও নিজের দক্ষতা দিয়ে এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

তিনি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যম ব্যবহার করেছেন।

চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন।

আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ভারতীয় বন্যপ্রকৃতির গল্প পৌঁছে দিয়েছেন।

আবার প্রয়োজনে স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে মাঠে কাজও করেছেন।

এই সমন্বয়ই তাঁর কাজকে আলাদা করে তুলেছে।

প্রকৃতিকে দেখার নতুন চোখ

একটি বাঘের ছবি দেখে আমরা বাঘকে সুন্দর মনে করি।

একটি জোনাকির ছবি দেখে আমরা মুগ্ধ হই।

একটি জলাভূমির ছবি দেখে হয়তো তার সৌন্দর্য উপভোগ করি।

কিন্তু ঐশ্বর্যার কাজ আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে শেখায়—

এই বাঘের বন কি নিরাপদ?

এই জোনাকির habitat কি টিকে থাকবে?

এই জলাভূমি কি আগামী প্রজন্মের জন্য থাকবে?

এই প্রশ্নগুলিই তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তাঁর ছবিতে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; প্রকৃতি একটি জীবন্ত ব্যবস্থা, যার অস্তিত্বের সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যৎও জড়িত।

ক্যামেরার ওপারে যে দায়িত্ব

ঐশ্বর্যা শ্রীধরের জীবন এখনও দীর্ঘ পথের শুরুতে। কিন্তু অল্প বয়সেই তিনি যে কাজের পরিধি তৈরি করেছেন, তা উল্লেখযোগ্য—wildlife photography, filmmaking, writing, conservation campaign, wetland protection এবং international exploration।

তাঁর কাজের সবচেয়ে মূল্যবান দিক সম্ভবত কোনও একটি পুরস্কার নয়।

বরং তিনি দেখিয়েছেন, শিল্প ও সংরক্ষণ একে অপরের বিপরীত নয়।

একটি সুন্দর ছবি মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে।

একটি ভালো গল্প তাকে ভাবাতে পারে।

একটি তথ্যচিত্র তাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে।

আর সেই প্রশ্ন থেকেই কখনও তৈরি হতে পারে প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলন।

ঐশ্বর্যা শ্রীধরের ক্যামেরা তাই শুধু বন্যপ্রাণীর ছবি তোলে না—তা মানুষের সামনে প্রকৃতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি প্রশ্নও রেখে যায়।

জঙ্গলের অন্ধকারে হাজার হাজার জোনাকির আলো যেমন অন্ধকারকে ভেদ করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তেমনই তাঁর কাজও আমাদের ব্যস্ত জীবনের মধ্যে প্রকৃতির জন্য একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলো জ্বালিয়ে দেয়।

সেই আলোর নাম—সচেতনতা।

আর সেই আলোকে আরও দূরে পৌঁছে দেওয়ার যাত্রায় ঐশ্বর্যা শ্রীধর আজকের প্রজন্মের এক অনুপ্রেরণাদায়ী মহীয়সী নারী।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *