Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

কাশ্মীর—পৃথিবীর স্বর্গে এক স্বপ্নময় ভ্রমণ।

ভারতের মানচিত্রে এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়, তুষার, নীল আকাশ, সবুজ উপত্যকা আর নির্মল জল। কাশ্মীর সেই রকমই এক স্বপ্নের ভূখণ্ড। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত এই উপত্যকার সৌন্দর্য বহু শতাব্দী ধরে কবি, শিল্পী, পর্যটক এবং প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে এসেছে।

কাশ্মীরকে প্রায়ই বলা হয় ‘ভূস্বর্গ’। এই উপাধি কেন দেওয়া হয়েছে, তা এখানে না গেলে বোঝা কঠিন। শীতকালে বরফে ঢাকা পাহাড়, বসন্তে বাদাম ও চেরি ফুল, গ্রীষ্মে সবুজ উপত্যকা, শরতে চিনারের লাল-সোনালি পাতা এবং বর্ষার পরে ধুয়ে যাওয়া পাহাড়—প্রতিটি ঋতু কাশ্মীরকে নতুন করে সাজিয়ে দেয়।

কাশ্মীর ভ্রমণ শুধু কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখার বিষয় নয়। এটি একটি অনুভূতি। ডাল লেকের জলে ভেসে থাকা শিকারা, দূরে বরফঢাকা পাহাড়, পাহাড়ি পথে গাড়ির যাত্রা, আপেল বাগান, কাশ্মীরি চা, কাঠের বাড়ি, উলের পোশাক এবং স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে কাশ্মীর এক সম্পূর্ণ ভ্রমণকাব্য।

কাশ্মীরের ভৌগোলিক সৌন্দর্য

কাশ্মীর উপত্যকা হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতশ্রেণির মধ্যে অবস্থিত। চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে বিস্তৃত উপত্যকা এবং তার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নদী ও জলধারা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকে অসাধারণ করে তুলেছে।

Jhelum বা ঝিলম নদী কাশ্মীরের ইতিহাস ও ভূগোলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বহু জনপদ।

কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন উচ্চতার কারণে একই সফরে একাধিক ধরনের প্রকৃতি দেখা যায়। কোথাও সবুজ বন, কোথাও ঘাসের চারণভূমি, আবার কোথাও সারাবছর বরফ দেখা যায়।

শ্রীনগর—কাশ্মীর ভ্রমণের হৃদয়

কাশ্মীর ভ্রমণের প্রধান কেন্দ্র হল শ্রীনগর।

ঝিলম নদী, ডাল লেক, নৈসর্গিক বাগান, পুরোনো শহর এবং পাহাড়ি দৃশ্য শ্রীনগরকে এক অনন্য চরিত্র দিয়েছে।

শ্রীনগরের সকাল অন্যরকম। চারপাশে পাহাড়, ঠান্ডা বাতাস, দূরে আজানের ধ্বনি এবং ডাল লেকের জলে ধীরে ধীরে চলা শিকারা—এই পরিবেশ পর্যটককে মুহূর্তেই অন্য জগতে নিয়ে যায়।

ডাল লেক

কাশ্মীরের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে ছবিটি জড়িয়ে আছে, সেটি সম্ভবত ডাল লেকের।

বিশাল হ্রদের জলে ভাসছে শিকারা ও হাউসবোট। চারপাশে পাহাড়। সকালে সূর্যের আলো জলে পড়লে পুরো দৃশ্যটি যেন ছবির মতো হয়ে ওঠে।

ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ কাশ্মীর সফরের অন্যতম আবশ্যিক অভিজ্ঞতা।

শিকারায় ভেসে চলা

শিকারা দেখতে ছোট নৌকার মতো হলেও এটি কাশ্মীরি জীবন ও পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

নৌকার ওপর বসে ধীরে ধীরে হ্রদের মধ্যে এগিয়ে যাওয়ার সময় চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

অনেক শিকারায় ফুল, ফল, হস্তশিল্প বা কাশ্মীরি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থাও দেখা যায়।

ভোরবেলার শিকারা ভ্রমণের সৌন্দর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চারপাশ শান্ত, জল স্থির এবং পাহাড়ের ওপর নরম আলো—এমন দৃশ্য সহজে ভোলা যায় না।

হাউসবোট

ডাল লেকের হাউসবোট কাশ্মীর ভ্রমণের একটি ঐতিহ্যবাহী অভিজ্ঞতা।

কাঠের তৈরি এই নৌকাগুলোর অনেকগুলিতে ঘর, বসার জায়গা, খাবার এবং থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

জলের ওপর রাত কাটানো মানে জানালার বাইরে শহরের বদলে দেখা যাবে হ্রদ, পাহাড় এবং জলের প্রতিফলন।

যারা ধীরগতির ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাদের জন্য হাউসবোটে থাকা বিশেষ আকর্ষণীয়।

মুঘল গার্ডেন

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও মনোরম করে তুলেছে মুঘল আমলের বাগানগুলো।

শালিমার বাগ, নিশাত বাগ এবং চশমে শাহী বিশেষভাবে পরিচিত।

পাহাড়ের ঢালে পরিকল্পিত বাগান, জলধারা, সিঁড়ি এবং ফুলের সমন্বয় মুঘল বাগানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

শালিমার বাগ

Shalimar Bagh-এর সঙ্গে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও নূরজাহানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

সুশৃঙ্খল বাগান, জলধারা এবং চিনার গাছের ছায়া এই স্থানকে ঐতিহাসিক ও নান্দনিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

নিশাত বাগ

Nishat Bagh ডাল লেকের তীরে অবস্থিত।

বাগানের বিভিন্ন স্তর থেকে নিচে হ্রদ ও দূরের পাহাড় দেখা যায়।

বসন্তকালে ফুলের সৌন্দর্য এবং শরতে চিনারের রঙ এই বাগানের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেয়।

চশমে শাহী

Chashme Shahi তার প্রাকৃতিক ঝরনা ও সুন্দর বাগানের জন্য পরিচিত।

পাহাড়ের ঢালে ছোট হলেও এই বাগানের পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম।

শ্রীনগরের পুরোনো শহর

শ্রীনগরের Old City বা পুরোনো অংশে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া যায়।

সরু রাস্তা, পুরোনো কাঠের বাড়ি, বাজার, মসজিদ এবং কারুশিল্পের দোকান—সব মিলিয়ে এই অংশের পরিবেশ আলাদা।

জামা মসজিদ

শ্রীনগরের ঐতিহাসিক Jama Masjid কাশ্মীরের ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

কাঠের ব্যবহার ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির কারণে মসজিদটির চরিত্র অন্য অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার থেকে আলাদা।

হজরতবাল

Hazratbal Shrine ডাল লেকের তীরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান।

এর সাদা স্থাপত্য এবং হ্রদের পটভূমি স্থানটিকে দৃশ্যতও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

ধর্মীয় স্থান পরিদর্শনের সময় অবশ্যই স্থানীয় নিয়ম ও শালীনতা বজায় রাখা উচিত।

গুলমার্গ—বরফের রাজ্য

শ্রীনগর থেকে Gulmarg কাশ্মীরের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্য।

শীতকালে বরফে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

স্কি, স্নোবোর্ড এবং তুষারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য গুলমার্গ বিশেষভাবে পরিচিত।

গন্ডোলা রাইড

Gulmarg Gondola বিশ্বের অন্যতম উচ্চতায় অবস্থিত কেবল কার ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে পরিচিত।

কেবল কারে পাহাড়ের ওপর উঠতে উঠতে নিচের উপত্যকা ও তুষারাবৃত ঢাল দেখা যায়।

শীতকালে পুরো দৃশ্য সাদা হয়ে গেলে অভিজ্ঞতাটি আরও আকর্ষণীয় হয়।

গুলমার্গের গ্রীষ্ম

শুধু শীতেই গুলমার্গ সুন্দর নয়।

গ্রীষ্মে বরফের পরিবর্তে সবুজ ঘাসের ঢাল, ফুল এবং পরিষ্কার পাহাড়ি আকাশ দেখা যায়।

তখন এটি হাঁটা, প্রকৃতি দেখা এবং পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে।

পাহেলগাম—নদী ও উপত্যকার দেশ

কাশ্মীরের আরেকটি বিখ্যাত গন্তব্য পাহেলগাম।

Lidder River-এর তীরে অবস্থিত এই পাহাড়ি শহর চারপাশের সবুজ উপত্যকা ও পাহাড়ের জন্য পরিচিত।

নদীর স্বচ্ছ জল, পাইন ও দেবদারু গাছ এবং পাহাড়ের ঢাল মিলিয়ে এখানকার দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর।

বেতাব ভ্যালি

Pahalgam-এর কাছে Betaab Valley একটি জনপ্রিয় পর্যটনস্থান।

সবুজ উপত্যকা, নদী এবং পাহাড়ের সমন্বয়ে তৈরি এই অঞ্চল সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়।

আরু ভ্যালি

Aru Valley তুলনামূলক শান্ত এবং প্রকৃতিনির্ভর।

পাহাড়ের মধ্যে ছোট গ্রাম, সবুজ তৃণভূমি ও নদীর উপস্থিতি এই অঞ্চলকে বিশেষ করে তুলেছে।

যারা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির কাছে থাকতে চান, তাদের জন্য এটি আকর্ষণীয়।

চন্দনওয়াড়ি

Pahalgam অঞ্চলের Chandannwari একটি পরিচিত পাহাড়ি স্থান।

শীতকালে বরফের কারণে এর দৃশ্য বদলে যায়।

উচ্চ পাহাড়ের পথে যাওয়ার আগে আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য নেওয়া জরুরি।

সোনমার্গ—সোনালি তৃণভূমি

Sonamarg-এর অর্থ ‘সোনার তৃণভূমি’।

উঁচু পাহাড়, নদী, তৃণভূমি এবং বরফের কারণে এই অঞ্চল কাশ্মীরের অন্যতম সুন্দর স্থান।

গ্রীষ্মকালে সবুজ এবং শীতকালে তুষার—দুই ঋতুতেই সোনমার্গের আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে।

থাজিওয়াস হিমবাহ

Sonamarg-এর কাছে Thajiwas Glacier একটি জনপ্রিয় আকর্ষণ।

বরফ ও পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে পর্যটকরা এখানে যান।

তবে উচ্চতর অঞ্চলে যাওয়ার ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা, আবহাওয়া এবং স্থানীয় গাইডের পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

কাশ্মীরের ফুলের ঋতু

বসন্তে কাশ্মীর যেন নতুন করে জেগে ওঠে।

বাদাম ফুল, চেরি ফুল এবং বিভিন্ন বসন্তের ফুল পাহাড়ি পরিবেশকে রঙিন করে তোলে।

শ্রীনগরের Tulip Garden বসন্তকালে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

টিউলিপ গার্ডেন

Indira Gandhi Memorial Tulip Garden এশিয়ার বৃহৎ টিউলিপ বাগানগুলোর মধ্যে পরিচিত।

বসন্তকালে নানা রঙের টিউলিপ ফুটলে পুরো বাগান রঙিন হয়ে ওঠে।

দূরে পাহাড় এবং সামনে ফুলের সারি—ছবির জন্য এটি অসাধারণ একটি স্থান।

শরতের কাশ্মীর

কাশ্মীরের শরৎও অসাধারণ।

চিনার গাছের পাতাগুলো লাল, কমলা ও সোনালি হয়ে যায়।

রাস্তার পাশে পড়ে থাকা শুকনো চিনার পাতা এবং গাছের রঙিন ছায়া কাশ্মীরকে একেবারে অন্যরকম করে তোলে।

প্রকৃতির এই পরিবর্তন দেখতে শরৎকাল বিশেষ আকর্ষণীয়।

কাশ্মীরি খাবার

কাশ্মীরের ভ্রমণ খাবার ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।

Rogan Josh, Yakhni, Dum Aloo, Gushtaba এবং বিভিন্ন কাশ্মীরি ভাতের পদ বিশেষভাবে পরিচিত।

মশলার ব্যবহার থাকলেও প্রতিটি খাবারের নিজস্ব স্বাদ রয়েছে।

কাহওয়া

কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী পানীয় হল Kahwa।

সবুজ চা, জাফরান, দারুচিনি, এলাচ এবং বাদামের সংমিশ্রণে তৈরি কাহওয়া ঠান্ডা পাহাড়ি পরিবেশে অত্যন্ত উপভোগ্য।

বরফের শহরে গরম কাহওয়ার এক কাপ ভ্রমণের স্মৃতিকে আরও সুন্দর করে দিতে পারে।

কাশ্মীরি হস্তশিল্প

কাশ্মীরের হস্তশিল্প বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

Pashmina, কাশ্মীরি শাল, কার্পেট, কাঠের কাজ, কাগজের মণ্ডের শিল্প এবং সূচিকর্ম পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

তবে পণ্য কেনার সময় আসল ও নকলের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।

প্যাশমিনা

Pashmina শালের সঙ্গে কাশ্মীরের নাম গভীরভাবে জড়িত।

সূক্ষ্ম ও উষ্ণ এই বস্ত্র ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের অংশ।

ভালো মানের পণ্য কিনতে নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে কেনাকাটা করা উচিত।

আপেল বাগান

কাশ্মীর ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আপেল উৎপাদন অঞ্চল।

পাহাড়ের ঢালে সারি সারি আপেল গাছ এবং ফলভরা বাগান পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।

ফলের মৌসুমে বাগানের দৃশ্য বিশেষ সুন্দর হয়ে ওঠে।

কাশ্মীরের গ্রামজীবন

শহরের পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে কাশ্মীরের গ্রামাঞ্চলে জীবন অনেক শান্ত।

কাঠ ও পাথরের বাড়ি, ছোট ক্ষেত, ভেড়া, আপেল বাগান এবং পাহাড়ি পথ—সব মিলিয়ে এক আলাদা জীবনচিত্র তৈরি হয়।

স্থানীয় মানুষের জীবনকে সম্মান করে ছবি তোলা এবং ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি সচেতন থাকা উচিত।

কাশ্মীর ভ্রমণের সেরা সময়

কাশ্মীর সারা বছরই সুন্দর, তবে ভ্রমণের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সময় নির্বাচন করা ভালো।

বসন্ত: ফুল ও বাগানের সৌন্দর্যের জন্য।

গ্রীষ্ম: উপত্যকা, পাহাড় ও প্রকৃতি দেখার জন্য।

শরৎ: চিনারের লাল-সোনালি রঙ দেখার জন্য।

শীত: তুষার ও বরফের অভিজ্ঞতার জন্য।

বরফ দেখতে চাইলে উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া ও রাস্তার পরিস্থিতি আগে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

কাশ্মীরে কীভাবে যাবেন?

কাশ্মীরে পৌঁছানোর জন্য বিমানপথ সবচেয়ে দ্রুত উপায়গুলোর একটি।

শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকে শহর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে সড়কপথে যাওয়া যায়।

রেলপথে Jammu পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথেও কাশ্মীর উপত্যকায় যাওয়া সম্ভব।

ভ্রমণের সময় রাস্তার অবস্থা, আবহাওয়া এবং স্থানীয় নির্দেশনা সম্পর্কে আগে থেকে তথ্য নেওয়া ভালো।

কাশ্মীর ভ্রমণে পোশাক

শীতকালে কাশ্মীরে উষ্ণ পোশাক অত্যন্ত জরুরি।

থার্মাল, জ্যাকেট, গ্লাভস, মোজা এবং ভালো জুতো সঙ্গে রাখা উচিত।

গ্রীষ্মেও পাহাড়ি অঞ্চলে রাতের দিকে ঠান্ডা থাকতে পারে।

তাই ঋতু অনুযায়ী পোশাক পরিকল্পনা করা দরকার।

কাশ্মীর ভ্রমণে সতর্কতা

পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

বরফে হাঁটার সময় সাবধানতা জরুরি।

উচ্চতায় গেলে শরীরের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখতে হবে।

অপরিচিত পাহাড়ি পথে একা না যাওয়াই ভালো।

স্থানীয় প্রশাসন বা পর্যটন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা সবসময় মেনে চলা উচিত।

সাত দিনের একটি সম্ভাব্য কাশ্মীর ভ্রমণ পরিকল্পনা

প্রথম দিন—শ্রীনগর

ডাল লেক, শিকারা এবং সন্ধ্যায় স্থানীয় বাজার।

দ্বিতীয় দিন—শ্রীনগর

শালিমার বাগ, নিশাত বাগ, চশমে শাহী ও হজরতবাল।

তৃতীয় দিন—গুলমার্গ

গন্ডোলা, পাহাড় ও বরফের অভিজ্ঞতা।

চতুর্থ দিন—পাহেলগাম

Lidder River, Betaab Valley ও Aru Valley।

পঞ্চম দিন—সোনমার্গ

পাহাড়, নদী ও তুষার অঞ্চল ঘুরে দেখা।

ষষ্ঠ দিন—শ্রীনগর

পুরোনো শহর, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও কেনাকাটা।

সপ্তম দিন

অবসর, স্থানীয় খাবার ও শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা করে ফিরে আসা।

সময় বেশি থাকলে গুরেজ, ইয়াসমার্গ বা অন্যান্য অঞ্চলের পরিকল্পনা করা যেতে পারে, তবে রাস্তা ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।

পরিবার নিয়ে কাশ্মীর

পরিবার নিয়ে কাশ্মীর ভ্রমণ অত্যন্ত আনন্দদায়ক হতে পারে।

শ্রীনগর, পহেলগাম, গুলমার্গ এবং সোনমার্গ—এই চারটি অঞ্চল নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যায়।

বয়স্ক মানুষ বা ছোট শিশু থাকলে অতিরিক্ত দীর্ঘ পাহাড়ি যাত্রা এড়িয়ে আরামদায়ক পরিকল্পনা করা ভালো।

কাশ্মীর ও ফটোগ্রাফি

ফটোগ্রাফারদের জন্য কাশ্মীর এক বিশাল প্রাকৃতিক স্টুডিও।

ডাল লেকের প্রতিফলন, পাহাড়ের সূর্যোদয়, শিকারা, চিনার গাছ, তুষারাবৃত রাস্তা, ফুলের বাগান এবং গ্রামীণ জীবন—সবই ছবির বিষয় হতে পারে।

তবে মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া উচিত।

কাশ্মীরের প্রকৃতি সংরক্ষণ

পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের ওপর চাপও বাড়ছে।

প্লাস্টিক না ফেলা, জলদূষণ না করা, পাহাড়ে আবর্জনা না ফেলা এবং বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত না করা প্রত্যেক পর্যটকের দায়িত্ব।

কাশ্মীরের সৌন্দর্য শুধু আজকের পর্যটকের জন্য নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষণ করা দরকার।

কেন কাশ্মীর বারবার ডাক দেয়?

অনেক পর্যটক একবার কাশ্মীর ঘুরে আবার ফিরে যেতে চান।

কারণ কাশ্মীরের সৌন্দর্য এক সফরে শেষ হয় না।

একবার দেখা হয় ডাল লেক, অন্যবার গুলমার্গের বরফ, কখনও পহেলগামের সবুজ উপত্যকা, কখনও শরতের চিনার বন।

ঋতু বদলালে কাশ্মীরও বদলে যায়।

শেষ কথা

কাশ্মীর এমন এক ভ্রমণভূমি, যেখানে প্রকৃতি তার অসংখ্য রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।

ডাল লেকের শান্ত জল, শিকারা ভ্রমণ, গুলমার্গের তুষার, পহেলগামের নদী, সোনমার্গের পাহাড়, শ্রীনগরের বাগান, শরতের চিনার পাতা, বসন্তের টিউলিপ এবং এক কাপ গরম কাহওয়া—সব মিলিয়ে কাশ্মীরের স্মৃতি দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়।

কাশ্মীরকে শুধু ‘স্বর্গ’ বলে থামিয়ে দেওয়া যায় না। কারণ স্বর্গের ধারণা যেখানে মানুষের কল্পনায়, কাশ্মীর সেখানে প্রকৃতির বাস্তব সৃষ্টির এক অনন্য উদাহরণ।

পাহাড়ের নীরবতা, জলের শান্তি এবং সবুজের গভীরতা মানুষের ব্যস্ত মনকে কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দেয়।

যে মানুষ শহরের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলতে চান, যে মানুষ বরফ দেখতে চান, যে মানুষ পাহাড়ের ভোর অনুভব করতে চান, যে মানুষ হ্রদের জলে নৌকায় ভেসে যেতে চান—তাঁদের জন্য কাশ্মীর নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ গন্তব্য।

শেষ পর্যন্ত কাশ্মীর থেকে মানুষ শুধু ছবি নিয়ে ফেরে না; সঙ্গে নিয়ে ফেরে কিছু নীরব সকাল, কিছু পাহাড়ি বাতাস, কিছু রঙিন স্মৃতি এবং মনে গেঁথে থাকা একটি অনুভূতি—

পৃথিবীর সৌন্দর্যকে যদি একবার খুব কাছ থেকে দেখতে হয়, তবে হিমালয়ের কোলে কাশ্মীরের পথে যেতেই হয়।

==========  শেষ ==========

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *