Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : কুয়াশার ওপারে যে মানুষটি অপেক্ষা করছিল।

কুয়াশার ওপারে যে মানুষটি অপেক্ষা করছিল

শীতের সকাল। চারদিকে ঘন কুয়াশা। গ্রামের সরু রাস্তাটা যেন সাদা চাদরের নিচে হারিয়ে গেছে। দূরের তালগাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে কিছু খুঁজছে। রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। দোকানের টিনের চাল থেকে টুপটাপ করে শিশির পড়ছে।

সেই দোকানের সামনের বেঞ্চে প্রতিদিন সকাল সাতটায় এসে বসতেন একজন বৃদ্ধ। তাঁর নাম শশাঙ্কবাবু। পরনে পুরোনো ধূসর সোয়েটার, হাতে কালো ছাতা, আর চোখে মোটা কাচের চশমা। তিনি দোকানে চা খেতেন না, কারও সঙ্গে বিশেষ কথাও বলতেন না। শুধু রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

গ্রামের লোকেরা তাঁকে চিনত, কিন্তু তাঁর এই প্রতিদিনের অপেক্ষার কারণ কেউ জানত না।

কেউ বলত, তাঁর ছেলে শহরে থাকে, হয়তো ছেলের ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন। কেউ বলত, বৃদ্ধের বয়স হয়েছে, তাই হয়তো পুরোনো দিনের কথা মনে করে এখানে আসেন।

কিন্তু সত্যিটা ছিল অন্য রকম।

শশাঙ্কবাবু অপেক্ষা করতেন একটি বাসের জন্য। সেই বাসে কেউ প্রতিদিন আসত না। এমনকি বাসটি ঠিক কোন সময়ে আসবে, তাও নিশ্চিত ছিল না। তবু তিনি প্রতিদিন একই সময়ে সেখানে এসে বসতেন।

কারণ, পঁয়ত্রিশ বছর আগে এক শীতের সকালে তিনি একজন মানুষকে কথা দিয়েছিলেন—যদি কখনও দেখা হয়, তবে এই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে তিনি তার জন্য অপেক্ষা করবেন।

সেই মানুষটির নাম ছিল অরুণ।

শশাঙ্কবাবু তখন গ্রামের উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। অরুণ ছিল তাঁর ছাত্র। দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে অভাব থাকলেও অরুণের চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্বপ্ন। সে বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চেয়েছিল।

কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তার জীবনে নেমে এসেছিল বিপর্যয়। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছিল তার কাঁধে। পড়াশোনা ছেড়ে তাকে কাজের সন্ধানে শহরে চলে যেতে হয়েছিল।

যেদিন সে গ্রাম ছেড়েছিল, সেদিন শশাঙ্কবাবু তাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছিলেন।

অরুণ বলেছিল, “স্যার, জানি না আর কখনও ফিরতে পারব কি না।”

শশাঙ্কবাবু তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, “জীবন কোথায় নিয়ে যাবে, কেউ জানে না। তবে মনে রাখিস, ফিরে আসার ইচ্ছেটা যেন হারিয়ে না যায়। কোনো দিন যদি ফিরিস, এই মোড়ে আমাকে খুঁজে নিস।”

অরুণ হেসে বলেছিল, “আপনি কি তত দিন অপেক্ষা করবেন?”

শিক্ষকও হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “যত দিন পারি।”

সেদিনের পর অরুণ আর গ্রামে ফেরেনি।

প্রথম দিকে দু-একবার তার চিঠি এসেছিল। শহরে একটি কারখানায় কাজ পেয়েছে, রাতে পড়াশোনা করার চেষ্টা করছে—এমন খবর লিখেছিল সে। তারপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

শশাঙ্কবাবু অনেক বছর অপেক্ষা করেছিলেন। প্রথমে চিঠির আশায়, পরে পরিচিত কারও মুখে কোনো খবর শোনার আশায়। সময়ের সঙ্গে তাঁর নিজের জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। তিনি অবসর নিয়েছেন, স্ত্রীকে হারিয়েছেন, ছেলেমেয়েরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তবু শীতের সকাল এলেই তাঁর মনে পড়ত সেই ছেলেটির কথা।

একদিন গ্রামের চায়ের দোকানে নতুন এক যুবক এসে দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করল, “এখানে কি শশাঙ্ক মাস্টারমশাই থাকেন?”

দোকানদার বলল, “থাকেন তো। কিন্তু আপনি কে?”

যুবকটি একটু থেমে বলল, “আমি তাঁর এক পুরোনো ছাত্রের খোঁজ করছি। অরুণ নামে একজন।”

দোকানদার অবাক হয়ে তাকাল। “অরুণ? সেই যে অনেক বছর আগে শহরে চলে গিয়েছিল?”

যুবকটি মাথা নাড়ল।

দোকানদার বলল, “আপনি কি ওর আত্মীয়?”

যুবকটি উত্তর দিল না। শুধু বলল, “মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করা দরকার।”

কিন্তু সেদিন শশাঙ্কবাবু দোকানে আসেননি। শরীর খারাপ হওয়ায় তিনি বাড়িতে ছিলেন।

যুবকটি ফিরে যাওয়ার আগে দোকানদারকে বলে গেল, “তাঁকে বলবেন, অরুণের খবর এসেছে। আর বলবেন, এবার হয়তো অপেক্ষার শেষ হবে।”

পরদিন সকালে দোকানদার কথাগুলো শশাঙ্কবাবুকে জানাল।

বৃদ্ধের হাত কেঁপে উঠল।

“অরুণের খবর? কে দিয়েছে?”

“একজন যুবক এসেছিল। নাম বলেনি। বলেছে, আবার আসবে।”

সেই দিন থেকে শশাঙ্কবাবুর অপেক্ষা যেন আরও বেড়ে গেল। তিনি প্রতিদিন একটু আগে দোকানে আসতেন। দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। বাসের শব্দ শুনলেই বুকের ভেতর কেমন একটা আলোড়ন উঠত।

কিন্তু দিন চলে যেত, কেউ আসত না।

এক সপ্তাহ পর এক বিকেলে গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর বাড়িতে এলেন। সঙ্গে ছিলেন সেই অচেনা যুবক।

শশাঙ্কবাবু যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কি অরুণের খোঁজ জানো?”

যুবকটি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আমি অরুণের ছেলে। আমার নাম সৌরভ।”

শশাঙ্কবাবু চমকে উঠলেন। “অরুণের ছেলে!”

সৌরভ একটি পুরোনো খাম বের করল। তার ভেতরে ছিল কয়েকটি ছবি এবং একটি ছোট্ট চিঠি।

চিঠিটি অরুণের লেখা।

‘প্রিয় স্যার,

অনেক দিন ধরে আপনাকে চিঠি লিখব ভেবেছি। কিন্তু সময়ের অভাব নয়, আসলে নিজের ব্যর্থতার কথা বলতে লজ্জা পেয়েছি। চিকিৎসক হতে পারিনি। সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হয়েছে। তবে আপনার শেখানো কথাগুলো ভুলিনি। রাতে কাজের পর পড়াশোনা করেছি, পরে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সহকারীর কাজ পেয়েছি। সেখান থেকেই মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি।

এখন আমার ছেলে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়ছে। ওর মধ্যে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের ছায়া দেখি। ওকে বলেছি, একদিন যেন আপনাকে খুঁজে বের করে।

আপনি যদি এখনও সেই পুরোনো মোড়ে যান, তবে জানবেন—আমি আমার কথা ভুলিনি। একদিন ফিরব।’

চিঠির নিচে কোনো তারিখ ছিল না।

শশাঙ্কবাবু চিঠিটি বুকে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

সৌরভ বলল, “বাবা এখন খুব অসুস্থ। দীর্ঘদিনের অসুখ। তিনি নিজে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চিকিৎসকেরা আপাতত দীর্ঘ যাত্রা করতে বারণ করেছেন। আমাকে পাঠিয়েছেন। বলেছেন, আপনি যেন মনে না করেন, তিনি কথা ভুলে গেছেন।”

বৃদ্ধ দীর্ঘক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

“তোমার বাবার কাছে আমাকে নিয়ে যাবে?”

সৌরভ একটু ইতস্তত করে বলল, “যাওয়া সম্ভব, তবে পথটা অনেক দূর। আপনার শরীর—”

“শরীরের কথা এত দিন ভেবেছি। এবার মনটার কথা ভাবতে দাও।”

পরদিন সকালে গ্রামের কয়েকজনের সাহায্যে শশাঙ্কবাবু শহরের উদ্দেশে রওনা হলেন। বাসের জানালা দিয়ে তিনি তাকিয়ে রইলেন। পরিচিত মাঠ, গাছ, পুকুর পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের কতগুলো বছর যেন একসঙ্গে পেছনে ফিরে যাচ্ছে।

শহরের একটি ছোট্ট বাড়িতে থাকতেন অরুণ। দরজা খুলে সৌরভ যখন শশাঙ্কবাবুকে ভেতরে নিয়ে গেল, তখন বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি মুখ ফেরাল।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

প্রথম কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলতে পারল না।

অরুণের চুল সাদা হয়ে গেছে, মুখে বয়সের ছাপ। কিন্তু চোখ দুটো সেই আগের মতোই। শশাঙ্কবাবু এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরলেন।

“এত দিন লাগল ফিরতে?”

অরুণের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।

“স্যার, আমি তো ফিরেছিলাম অনেকবার—মনে মনে। শুধু পথটা খুঁজে পাইনি।”

শশাঙ্কবাবু তার হাত আরও শক্ত করে ধরলেন।

“পথ হারিয়ে গেলে মানুষকে বলতে হয়। একা একা সব বোঝা বহন করতে নেই।”

অরুণের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“আপনাকে আমার ব্যর্থতার কথা বলতে ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো ভাববেন, আপনার ছাত্র কিছুই করতে পারেনি।”

শশাঙ্কবাবু মাথা নাড়লেন।

“তুই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিস, নিজের ছেলেকে শিক্ষিত করেছিস, কঠিন সময়েও পড়াশোনা ছাড়িসনি। এগুলো কি ব্যর্থতা? জীবনের সব স্বপ্ন একই রকমভাবে পূরণ হয় না, অরুণ। কোনো কোনো স্বপ্ন অন্য পথ দিয়ে পূর্ণতা পায়।”

অরুণ চোখ বন্ধ করে রইল। বহু বছর ধরে জমে থাকা অপরাধবোধ যেন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে এল।

দুজনের মধ্যে তারপর অনেক কথা হলো। গ্রামের কথা, স্কুলের কথা, পুরোনো সহপাঠীদের কথা। অরুণ জানল, তার একসময়ের শিক্ষক এখনও গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খোঁজ নেন। শশাঙ্কবাবু জানলেন, অরুণ নিজের কাজের পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছে।

সন্ধ্যার দিকে সৌরভ ঘরে ঢুকে দেখল, তার বাবা আর শশাঙ্কবাবু পাশাপাশি বসে আছেন। দুজনের মুখেই প্রশান্তির ছাপ।

সৌরভ বলল, “বাবা, এবার তো তোমার অপেক্ষা শেষ হলো?”

অরুণ ধীরে ধীরে উত্তর দিল, “অপেক্ষা শেষ হয়েছে কি না জানি না। তবে আজ মনে হচ্ছে, এত দিন যে কথাটা বলতে পারিনি, সেটা বলতে পেরেছি।”

শশাঙ্কবাবু মৃদু হেসে বললেন, “আর আমি বুঝলাম, কাউকে ফিরে পেতে সব সময় তার পায়ের শব্দ শোনার দরকার হয় না। কখনও কখনও তার সত্যিটা জানাও অনেক বড় পাওয়া।”

কয়েক দিন পর শশাঙ্কবাবু গ্রামে ফিরে এলেন। আগের মতোই শীতের সকালে তিনি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসতেন। তবে এবার তাঁর চোখে আর আগের মতো অস্থিরতা ছিল না।

একদিন গ্রামের এক কিশোর তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, “মাস্টারমশাই, আপনি কি এখনও কারও জন্য অপেক্ষা করেন?”

শশাঙ্কবাবু হাসলেন।

“অপেক্ষা করি। তবে এখন অরুণের জন্য নয়। অপেক্ষা করি, তোমাদের মতো ছেলেমেয়েরা যেন নিজেদের কষ্ট লুকিয়ে না রাখে, ভুল করলে যেন আবার শুরু করতে শেখে, আর দূরে চলে গেলেও যেন ফিরে আসার পথ ভুলে না যায়।”

সেদিন কুয়াশা একটু পাতলা ছিল। রাস্তার ওপারে সূর্যের আলো ফুটে উঠছিল ধীরে ধীরে।

শশাঙ্কবাবু বুঝেছিলেন, সব অপেক্ষার শেষ মিলনে হয় না। কোনো কোনো অপেক্ষার শেষ হয় সত্যিটা জানার মধ্যে, ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে, কিংবা বহু বছর ধরে বুকের মধ্যে আটকে থাকা একটি কথাকে অবশেষে বলে ফেলার মধ্যে।

আর কখনও কখনও, কুয়াশার ওপারে কেউ সত্যিই অপেক্ষা করে থাকে—শুধু ফিরে আসার জন্য নয়, নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যও।

গল্পের শিক্ষা: জীবনের পথে ব্যর্থতা, অভাব কিংবা পরিস্থিতির চাপে আমরা অনেক সময় প্রিয়জনদের থেকে দূরে সরে যাই। কিন্তু নীরবতা ও লজ্জা সেই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিজের কষ্ট ভাগ করে নেওয়া, অন্যের পরিস্থিতি বোঝা এবং পুরোনো সম্পর্ককে আরেকটি সুযোগ দেওয়া—এই ছোট কাজগুলোই জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি এনে দিতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *