Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে জানালাটি খুলে দিয়েছিল নতুন জীবনের পথ।

শহরের পুরোনো পাড়াটিতে একটি বাড়ি ছিল, যার দোতলার উত্তর দিকের জানালাটি প্রায় পনেরো বছর ধরে বন্ধ। জানালার কাঠে ধুলো জমেছিল, পাল্লার গায়ে শ্যাওলা ধরেছিল, আর লোহার ছিটকিনিতে মরচে পড়েছিল। পাড়ার লোকেরা বলত, বাড়িটির ওই ঘরে কেউ থাকে না। একসময় সেখানে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি বাড়ির বেশির ভাগ ঘর বন্ধ করে একতলায় থাকতে শুরু করেছিলেন।

বাড়ির পাশেই থাকত ষোলো বছরের মেয়ে অন্বেষা। সে পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার জীবনে একটা বড় সমস্যা ছিল—সে কথা বলতে ভয় পেত। স্কুলে কোনও প্রশ্নের উত্তর জানলেও হাত তুলত না। বন্ধুরা কোনও বিষয়ে আলোচনা করলে নিজের মতামত প্রকাশ করত না। এমনকি নিজের পছন্দ-অপছন্দ জানাতেও তার অসুবিধা হতো।

তার বাবা ছোট্ট একটি ওষুধের দোকান চালাতেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। দুজনেই মেয়েকে ভালোবাসতেন, কিন্তু অন্বেষার নীরবতার কারণ বুঝতে পারতেন না।

মা প্রায়ই বলতেন, “তুই সব জানিস, তবু মুখ খুলিস না কেন?”

অন্বেষা উত্তর দিতে পারত না। তার মনে হতো, কথা বলতে গিয়ে ভুল করলে সবাই হাসবে। ছোটবেলায় একবার স্কুলের অনুষ্ঠানে কবিতা বলতে গিয়ে সে কয়েকটি লাইন ভুলে গিয়েছিল। কয়েকজন সহপাঠী হেসেছিল। সেই হাসি তার মনে এমন গভীর দাগ কেটেছিল যে তারপর থেকে মানুষের সামনে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছিল।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, পাশের পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের জানালার সামনে একজন মিস্ত্রি দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির মালিক শশাঙ্কবাবু তাঁকে বলছেন, জানালাটা খুলে পরিষ্কার করতে।

অন্বেষা কৌতূহলী হয়ে দাঁড়াল।

শশাঙ্কবাবু তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী দেখছ মা?”

সে একটু ইতস্তত করে বলল, “জানালাটা এত দিন বন্ধ ছিল কেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “কখনও কখনও মানুষ ঘরের জানালা বন্ধ করতে করতে নিজের মনের জানালাও বন্ধ করে ফেলে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।”

অন্বেষা কথাটির অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না। তবু তার মনে প্রশ্ন জাগল।

পরদিন বিকেলে সে দেখল, জানালার পাল্লা খুলে দেওয়া হয়েছে। ঘরের ভিতরে জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার হচ্ছে। বহু বছর পর সূর্যের আলো ঢুকছে ঘরটিতে।

সেদিন স্কুলের একটি ঘটনা অন্বেষাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। শিক্ষক ক্লাসে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বলেছিলেন। অন্বেষার কাছে ভালো একটি উত্তর ছিল। কিন্তু সে বলতে পারেনি। অন্য এক সহপাঠী ভুল উত্তর দেওয়ার পরও সবাই তাকে উৎসাহ দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে অন্বেষার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দিনই নিজের কথা বলতে পারবে না।

সন্ধ্যায় সে পুরোনো বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াল। জানালাটি খোলা। ভিতরে শশাঙ্কবাবু একটি চেয়ারে বসে বই পড়ছেন।

বৃদ্ধ তাকে দেখে ডাকলেন, “ভিতরে আসবে?”

অন্বেষা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল।

ঘরটিতে পুরোনো বইয়ের তাক, কাঠের টেবিল আর একটি বড় আয়না ছিল। জানালা দিয়ে দূরের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। শশাঙ্কবাবু তাকে বসতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার মন খারাপ কেন?”

অন্বেষা অবাক হলো। সে তো কিছুই বলেনি!

বৃদ্ধ বললেন, “মানুষের মুখ সব সময় কথা বলে না, কিন্তু তার চোখ অনেক সময় মনের খবর জানিয়ে দেয়।”

অন্বেষা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজের সমস্যার কথা জানাল। সে বলল, কীভাবে একবার ভুল করার পর থেকে মানুষের সামনে কথা বলতে ভয় পায়। শশাঙ্কবাবু মন দিয়ে সব শুনলেন। কোনও তাড়াহুড়ো করে উপদেশ দিলেন না।

তারপর তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই জানালাটা পনেরো বছর বন্ধ ছিল। তুমি জানো কেন?”

অন্বেষা মাথা নাড়ল।

“আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এই ঘরটায় আসতে কষ্ট হতো। এই জানালার পাশে বসেই আমরা দুজনে বই পড়তাম, বৃষ্টির শব্দ শুনতাম। ও চলে যাওয়ার পর জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বাইরের আলো ঢুকতে না দিলে ভিতরের কষ্টও হয়তো কমবে।”

তিনি একটু থামলেন।

“কিন্তু কষ্ট কমেনি। বরং ঘরটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বইগুলো ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল। একদিন বুঝলাম, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আলো বন্ধ করে রাখা যায় না।”

অন্বেষা চুপচাপ শুনছিল।

শশাঙ্কবাবু বললেন, “ভুল করার ভয়ে তুমি নিজের কথা বলছ না। কিন্তু জানো, ভুল না করলে মানুষ শেখে কীভাবে? জানালাটা খুললে যেমন আলো ঢোকে, তেমনই কথা বললে কখনও প্রশংসা আসবে, কখনও সমালোচনা। দুটোই গ্রহণ করতে শেখা দরকার।”

সেদিন বাড়ি ফেরার আগে বৃদ্ধ তাকে একটি ছোট্ট ডায়েরি দিলেন।

“প্রতিদিন এই ডায়েরিতে তিনটি কথা লিখবে। আজ কী শিখলে, কোন কাজটি করতে ভয় পেয়েছিলে, আর আগামীকাল সেই ভয়ের মুখোমুখি হতে কী করবে।”

অন্বেষা ডায়েরিটি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরল।

প্রথম দিন সে লিখল—‘আজ নিজের সমস্যার কথা একজনকে বলেছি।’

দ্বিতীয় দিন লিখল—‘আজ দোকানে গিয়ে নিজের পছন্দের কলমটি চেয়েছি।’

তৃতীয় দিন লিখল—‘আজ ক্লাসে উত্তর জানতাম, কিন্তু বলতে পারিনি। কাল চেষ্টা করব।’

পরের দিনও সে পুরোপুরি সাহস পায়নি। তবে শিক্ষক যখন প্রশ্ন করলেন, তখন সে ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার গলা কাঁপছিল, কথাও একটু আটকে যাচ্ছিল। তবু সে উত্তরটি বলল।

উত্তরটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না। শিক্ষক একটি অংশ সংশোধন করে দিলেন। অন্বেষার মনে প্রথমে অস্বস্তি হলো, কিন্তু তারপর সে বুঝল, ভুল হওয়া মানেই অপমানিত হওয়া নয়। শিক্ষক তাকে আরও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন।

সেদিন বাড়ি ফিরে ডায়েরিতে সে লিখল—‘আজ ভুল করেছি, কিন্তু কেউ আমাকে নিয়ে হাসেনি। আমি আবার চেষ্টা করতে পারব।’

এরপর থেকে সে প্রতিদিন ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করতে লাগল। কখনও দোকানে আসা ক্রেতাকে পরিষ্কারভাবে কথা বলত, কখনও বন্ধুর সঙ্গে নিজের মতামত ভাগ করত। মাঝে মাঝে ব্যর্থ হতো, আবার নতুন করে চেষ্টা করত।

শশাঙ্কবাবুর ঘরটিও ধীরে ধীরে বদলে গেল। অন্বেষা মাঝে মাঝে সেখানে যেত। বৃদ্ধের বইয়ের তাক গুছিয়ে দিত, জানালার পাশে রাখা ফুলের টবে জল দিত। একদিন তার মাথায় একটি ভাবনা এল।

সে শশাঙ্কবাবুকে বলল, “এই ঘরটা যদি পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য খুলে দেওয়া যায়? এখানে তো অনেক বই আছে। আমরা বিকেলে এসে পড়তে পারি।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “চমৎকার ভাবনা। তবে শুধু বই পড়লেই হবে না। তোমরা এখানে নিজেদের কথা বলবে, গল্প করবে, কেউ কিছু শেখাতে চাইলে অন্যদের শেখাবে।”

অন্বেষা প্রথমে ভয় পেল। এতগুলো মানুষের সামনে কথা বলবে কীভাবে? কিন্তু ডায়েরির পাতাগুলো মনে পড়ল। সে ঠিক করল, এবার পিছিয়ে যাবে না।

পাড়ার কয়েকজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে শুরু হলো ছোট্ট একটি পাঠচক্র। প্রথম দিন অন্বেষা সবাইকে স্বাগত জানানোর সময় কাগজ দেখে কথা বলেছিল। দ্বিতীয় দিন কাগজ না দেখে দু-একটি বাক্য বলল। কয়েক সপ্তাহ পর সে নিজেই একটি গল্প পড়ে শোনাতে শুরু করল।

একদিন শশাঙ্কবাবু তাকে বললেন, “তোমার গলায় এখন আর আগের মতো ভয় শুনতে পাই না।”

অন্বেষা হেসে বলল, “ভয় এখনও আছে। শুধু এখন ভয় পেলেই পালিয়ে যাই না।”

বৃদ্ধের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল।

কয়েক মাস পরে স্কুলে বার্ষিক অনুষ্ঠান হলো। শিক্ষক অন্বেষাকে মঞ্চে উঠে একটি ছোট্ট বক্তব্য দিতে বললেন। বিষয় ছিল—‘আমার জীবনের একটি শিক্ষা’।

অন্বেষা প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর বাড়ি ফিরে ডায়েরি খুলল। তার মনে হলো, এই বক্তব্য শুধু মঞ্চের জন্য নয়; নিজের পুরোনো ভয়কে সামনে দাঁড়িয়ে দেখারও একটা সুযোগ।

অনুষ্ঠানের দিন হলঘর ভর্তি মানুষ। মঞ্চে ওঠার সময় তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। সামনে বসা অনেক মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, সে হয়তো সব ভুলে যাবে।

তারপর চোখে পড়ল শেষ সারিতে বসে থাকা শশাঙ্কবাবুকে। তাঁর মুখে শান্ত হাসি।

অন্বেষা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলতে শুরু করল—

“একসময় আমি ভাবতাম, ভুল করলে সবাই আমাকে ছোট করবে। তাই নিজের কথা বলতাম না। কিন্তু একজন মানুষ আমাকে শিখিয়েছেন, জানালা বন্ধ রাখলে বাইরের আলোও ঢুকতে পারে না। নিজের ভয়কে সব সময় এড়িয়ে চললে আমরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ হারাই।”

সে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলল। কীভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপ তাকে সাহসী করেছে, কীভাবে ভুল থেকে শেখা যায়, আর কীভাবে অন্যের কথা মন দিয়ে শুনলে মানুষ নিজেকে একা মনে করে না।

বক্তব্য শেষ হলে হলঘরে করতালি উঠল। অন্বেষা বুঝতে পারল, তার সাফল্য করতালির মধ্যে নয়। সাফল্য হলো, সে ভয় থাকা সত্ত্বেও নিজের কথা বলতে পেরেছে।

অনুষ্ঠানের পর সে শশাঙ্কবাবুর কাছে গেল।

“আপনি না থাকলে হয়তো আমি কোনও দিন মঞ্চে উঠতে পারতাম না,” সে বলল।

শশাঙ্কবাবু মাথা নাড়লেন।

“আমি শুধু জানালাটা খুলেছি। বাইরে তাকানোর সাহসটা তোমাকেই অর্জন করতে হয়েছে।”

কয়েক বছর পর সেই পুরোনো ঘরটি পাড়ার ছোট্ট পাঠাগার ও আলোচনা কেন্দ্র হয়ে উঠল। জানালাটি আর কখনও বন্ধ করা হয়নি। সকালে সূর্যের আলো বইয়ের তাক ছুঁয়ে যেত, বিকেলে শিশুরা সেখানে বসে পড়ত, আর সন্ধ্যায় নানা বয়সের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিত।

দরজার পাশে একটি ছোট্ট ফলকে লেখা ছিল—

‘এই ঘরে ভুল করা নিষেধ নয়। প্রশ্ন করা নিষেধ নয়। নিজের কথা বলাও নিষেধ নয়।’

অন্বেষা বড় হয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিল। তার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা চুপচাপ থাকত, তাদের সে কখনও জোর করে কথা বলাত না। বরং তাদের সময় দিত, মন দিয়ে শুনত এবং বোঝাত—প্রত্যেক মানুষের নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে।

আর শশাঙ্কবাবু? তিনি প্রায়ই জানালার পাশে বসে বই পড়তেন। স্ত্রীর স্মৃতি তখনও তাঁকে কষ্ট দিত, কিন্তু সেই কষ্ট আর তাঁকে অন্ধকারে আটকে রাখতে পারত না।

তিনি বুঝেছিলেন, জীবন থেকে কিছু হারিয়ে গেলে তার শূন্যতা মুছে যায় না। তবু সেই শূন্যতার মধ্যেও নতুন সম্পর্ক, নতুন কাজ আর নতুন আনন্দের জন্য জায়গা তৈরি করা যায়।

একটি জানালা খুলেছিল একটি ঘরকে। সেই ঘর খুলে দিয়েছিল একটি মেয়ের সাহসের পথ। আর সেই মেয়ের সাহস একদিন আরও অনেক মানুষের জন্য তৈরি করেছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে কেউ নিজের কথা বলতে ভয় পেত না।

শিক্ষা: ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করার অপেক্ষায় থাকলে জীবনের অনেক দরজা বন্ধই থেকে যায়। ভয়কে সঙ্গে নিয়েই ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হয়। আর অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা কখনও কখনও তার জীবনে নতুন আলো জ্বালাতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *