Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে ছিল এক অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা।

১. ধুলোমাখা বেঞ্চের রহস্য

পূর্ব মেদিনীপুরের চন্দনপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছিল খুব সাধারণ। লালচে দেওয়াল, টিনের ছাদ, ছোট্ট খেলার মাঠ আর কয়েকটি পুরোনো শ্রেণিকক্ষ—এই নিয়েই স্কুলটির সংসার। তবু গ্রামের বহু মানুষের শৈশব জড়িয়ে ছিল এই স্কুলের সঙ্গে।

স্কুলের দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নয়, বরং স্কুলের পুরোনো নথিপত্র গোছানোর জন্য একদিন শিক্ষকরা কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে সাহায্য করতে বললেন। তাদের মধ্যে ছিল নবম শ্রেণির ছাত্র অর্ণব। সে পড়াশোনায় মাঝারি মানের হলেও কোনও কিছু খুঁজে বের করার ব্যাপারে তার অদ্ভুত আগ্রহ ছিল।

সেদিন বিকেলে শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে অর্ণব শেষ বেঞ্চটি একটু সরাতেই দেখতে পেল, বেঞ্চের নিচের কাঠের পাতের এক পাশে কিছু একটা আটকে আছে।

সে হাত বাড়িয়ে টেনে বের করল একটি পুরোনো খাম।

খামটির রং হলদেটে। ধুলো জমে গিয়েছে, তবু ভেতরে কাগজ থাকার আভাস স্পষ্ট। অর্ণব সাবধানে খামটি খুলল।

ভেতরে ছিল হাতে লেখা কয়েকটি পৃষ্ঠা।

প্রথম পাতার ওপরে লেখা—

‘আমাদের স্কুলের জন্য একটি প্রতিজ্ঞা।’

তারিখটি প্রায় পঁচিশ বছর আগের।

অর্ণব কৌতূহলী হয়ে পড়তে শুরু করল।

চিঠিতে লেখা ছিল, একদল ছাত্রছাত্রী প্রতিজ্ঞা করেছিল, তাদের স্কুলে যেন কোনও শিশু অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য না হয়। তারা ঠিক করেছিল, নিজেদের পুরোনো বই, খাতা ও পড়ার উপকরণ সংগ্রহ করে এমন বন্ধুদের সাহায্য করবে, যাদের সেগুলো কেনার সামর্থ্য নেই।

শেষ পাতায় কয়েকজনের নাম ছিল। তার মধ্যে একটি নামের পাশে লেখা—‘আমি কথা দিলাম, একদিন আবার ফিরে এসে এই কাজ শুরু করব।’

নামটি ছিল অনিরুদ্ধ সেন।

অর্ণবের মনে হলো, কাগজের পাতায় যেন বহু বছর আগের কিছু কণ্ঠস্বর ঘুমিয়ে আছে।

সে ছুটে গিয়ে বাংলা শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা দেবীকে চিঠিটি দেখাল।

শিক্ষিকা মন দিয়ে পড়লেন। তারপর ধীরে বললেন, “এই নামটা আমার চেনা মনে হচ্ছে। অনিরুদ্ধ সেন একসময় এই স্কুলের খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পরে তাঁর পরিবার অন্য জায়গায় চলে যায়।”

অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “দিদিমণি, উনি কি সত্যিই ফিরে এসেছিলেন?”

শিক্ষিকা মাথা নাড়লেন।

“তা আমি জানি না। তবে এই প্রতিজ্ঞাটা যদি সত্যিই বাস্তবায়িত না হয়ে থাকে, তাহলে সেটা জানার চেষ্টা করা যেতে পারে।”

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় অর্ণবের মনে হচ্ছিল, সে যেন কেবল একটি চিঠি খুঁজে পায়নি; খুঁজে পেয়েছে এমন একটি কাজের সূত্র, যা বহু বছর আগে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

২. পুরোনো নামের সন্ধান

পরদিন অর্ণব চিঠিটির কথা বন্ধু সোহম ও তনুশ্রীকে জানাল। তারা তিনজন মিলে ঠিক করল, প্রথমে স্কুলের পুরোনো নথিতে অনিরুদ্ধ সেন সম্পর্কে খোঁজ করবে।

প্রধান শিক্ষক অনুমতি দেওয়ায় তারা পুরোনো ভর্তি খাতা ও ছাত্রছাত্রীদের তালিকা দেখতে শুরু করল। অনেক নাম অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়েও গিয়েছিল। তবু একটি খাতায় অনিরুদ্ধের নাম পাওয়া গেল।

সেখানে তাঁর বাবার নাম এবং পুরোনো ঠিকানাও লেখা ছিল।

কিন্তু ঠিকানাটি এখন আর আগের মতো নেই। গ্রামের সেই পাড়ায় নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে, পুরোনো বাড়িগুলোর অনেকগুলো ভেঙে গিয়েছে।

অর্ণব হতাশ হয়ে বলল, “এভাবে কি কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব?”

তনুশ্রী বলল, “একেবারে অসম্ভব নয়। গ্রামের প্রবীণ মানুষদের জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।”

তারা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী নৃপেনবাবুর কাছে গেলেন। তিনি বহু বছর এই স্কুলে কাজ করেছেন।

চিঠিটি দেখে নৃপেনবাবু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“অনিরুদ্ধ! ও খুব ভালো ছেলে ছিল। সব সময় অন্যদের বই ধার দিত। একবার এক সহপাঠীর বই হারিয়ে গিয়েছিল বলে নিজের বই ভাগ করে পড়েছিল।”

অর্ণব জিজ্ঞেস করল, “উনি এখন কোথায় থাকেন জানেন?”

নৃপেনবাবু বললেন, “অনেক বছর আগে শুনেছিলাম, কলকাতায় চাকরি করেন। ঠিক কোথায়, সেটা জানি না। তবে তাঁর পরিবারের একজন আত্মীয় এই গ্রামেই থাকেন বলে মনে হয়।”

পরের কয়েক দিনে তারা গ্রামের প্রবীণদের কাছ থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করল। কারও মনে ছিল তাঁর বাবার নাম, কারও মনে ছিল তাঁদের বাড়ির পাশের পুরোনো মন্দিরটির কথা।

অবশেষে এক বৃদ্ধ জানালেন, অনিরুদ্ধের পরিবারের এক আত্মীয় এখনও পাশের পাড়ায় থাকেন। তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা যেতে পারে।

কয়েক দিনের মধ্যে অর্ণবদের কাছে একটি ফোন নম্বর এল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রথমে যোগাযোগ করে তাঁদের উদ্দেশ্য জানালেন। তারপর অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো।

ফোনের ওপার থেকে একটি শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

“হ্যাঁ, আমি অনিরুদ্ধ বলছি।”

অর্ণব নিজের পরিচয় দিয়ে চিঠিটির কথা জানাল।

কিছুক্ষণ কোনও উত্তর এল না।

তারপর অনিরুদ্ধবাবু ধীরে বললেন, “চিঠিটা এখনও আছে?”

অর্ণব বলল, “হ্যাঁ। আমরা যত্ন করে রেখেছি।”

ওপার থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

“আমি ভেবেছিলাম, ওই প্রতিজ্ঞার কথা সবাই ভুলে গেছে।”

৩. ফিরে আসার দিন

এক সপ্তাহ পর অনিরুদ্ধবাবু স্কুলে এলেন।

তাঁর বয়স এখন চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে সাধারণ পোশাক, কাঁধে একটি ব্যাগ। স্কুলের গেট পেরিয়ে মাঠে পা রাখতেই তিনি কিছুক্ষণ থেমে গেলেন।

“কিছুই যেন পুরোপুরি বদলায়নি,” তিনি বললেন। “আবার কত কিছু বদলেও গিয়েছে।”

অর্ণব তাঁকে সেই শ্রেণিকক্ষে নিয়ে গেল, যেখানে চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল।

অনিরুদ্ধবাবু শেষ বেঞ্চটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “এই বেঞ্চেই বসতাম। আর ওই জানালার পাশে বসত রতন।”

তিনি জানালেন, তাঁদের সময়ে রতনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। বই কেনার টাকা না থাকায় সে প্রায়ই অন্যদের কাছ থেকে বই ধার নিত। একবার সে স্কুল ছেড়ে কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

সেই ঘটনায় অনিরুদ্ধ ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। তাঁরা ঠিক করেছিলেন, যাদের বই কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য পুরোনো বই সংগ্রহ করবেন। নিজেদের পকেটখরচ থেকেও সামান্য টাকা জমাবেন।

কিন্তু তার কিছুদিন পর অনিরুদ্ধের বাবার বদলি হয়। পরিবারকে অন্য শহরে চলে যেতে হয়। নতুন স্কুল, নতুন পরিবেশ, পড়াশোনা এবং পরবর্তী জীবনের ব্যস্ততায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।

“আমি ভেবেছিলাম, একদিন ফিরে এসে কাজটা আবার শুরু করব,” অনিরুদ্ধবাবু বললেন। “কিন্তু বছর কেটে গিয়েছিল। তারপর মনে হতো, এত দেরি হয়ে গেছে যে আর ফিরে গিয়ে কী হবে!”

অর্ণব চিঠিটি তাঁর হাতে তুলে দিল।

অনিরুদ্ধবাবু কাগজের শেষ পাতায় নিজের নামের পাশে লেখা বাক্যটি পড়লেন।

‘আমি কথা দিলাম, একদিন আবার ফিরে এসে এই কাজ শুরু করব।’

তাঁর চোখের কোণে জল জমল।

“দেখো, একটা ছোট প্রতিজ্ঞা কত বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকতে পারে!”

অর্ণব বলল, “কিন্তু এখন তো আপনি ফিরে এসেছেন।”

অনিরুদ্ধবাবু ছেলেটির দিকে তাকালেন।

“হ্যাঁ। এবার আর শুধু প্রতিজ্ঞা করে চলে যাব না।”

৪. সাহায্য, কিন্তু সম্মান বজায় রেখে

পরের সপ্তাহে স্কুলে একটি বৈঠক হলো। অনিরুদ্ধবাবু, প্রধান শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষক, অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন, তিনি কিছু অর্থ দিয়ে উদ্যোগটি শুরু করতে চান। তবে তাঁর প্রস্তাব ছিল, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাই যেন কাজটির পরিচালনায় অংশ নেয়।

শর্মিষ্ঠা দেবী বললেন, “সাহায্য অবশ্যই দরকার। কিন্তু কারা সাহায্য পাবে, তা নির্ধারণ করার সময় শিশুদের সম্মান ও গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।”

সবাই একমত হলেন।

সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, প্রথমে স্কুলের শিক্ষকরা প্রয়োজনীয় বই ও পড়ার উপকরণের ঘাটতি সম্পর্কে অভিভাবকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। কোনও শিশুকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে তার অভাবের কথা বলতে হবে না।

তারপর পুরোনো কিন্তু ব্যবহারযোগ্য পাঠ্যবই সংগ্রহ করা হবে। বইগুলো শ্রেণি অনুযায়ী সাজানো হবে, প্রয়োজনমতো মেরামত করা হবে এবং শিক্ষকেরা দেখে নেবেন সেগুলো বর্তমান পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মেলে কি না।

যে বইগুলো আর কাজে লাগবে না, সেগুলো জোর করে কাউকে দেওয়া হবে না। আর নতুন বই কেনার প্রয়োজন হলে স্কুলের অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে তা করা হবে।

অর্ণব ও তার বন্ধুরা কাজের দায়িত্ব পেল। তারা একটি খাতা তৈরি করল, যেখানে সংগ্রহ করা বই, বইয়ের অবস্থা এবং বিতরণের হিসাব রাখা হতো।

প্রথম সপ্তাহে মাত্র বারোটি বই জমা পড়ল। কিন্তু পরের সপ্তাহে গ্রামের আরও অনেকে এগিয়ে এলেন।

কেউ তাঁর সন্তানের পুরোনো পাঠ্যবই দিলেন। কেউ গল্পের বই দিলেন। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কয়েকটি অভিধান ও রেফারেন্স বই উপহার দিলেন।

কয়েক মাসের মধ্যে স্কুলে একটি ছোট বই-সহায়তা কেন্দ্র গড়ে উঠল।

অনিরুদ্ধবাবু কোনও বড় নামফলক লাগাতে দিলেন না।

তিনি বললেন, “এটা আমার একার উদ্যোগ নয়। এই কাজ অনেক বছর আগে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী শুরু করতে চেয়েছিল। আজকের ছাত্রছাত্রীরা তাকে বাস্তব করছে। এখানে কোনও একজনের নাম বড় করে লেখার প্রয়োজন নেই।”

৫. রতনের ফিরে আসা

একদিন স্কুলে বই গোছানোর সময় অর্ণব জানতে পারল, অনিরুদ্ধবাবুর পুরোনো বন্ধু রতন এখনও এই অঞ্চলে থাকেন। তিনি এখন একটি ছোট দোকান চালান।

অর্ণবের অনুরোধে অনিরুদ্ধবাবু রতনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

কয়েক দিন পর রতন স্কুলে এলেন।

অনিরুদ্ধবাবুকে দেখে তিনি প্রথমে অবাক হয়ে গেলেন। তারপর দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুরোনো বন্ধুত্ব যেন মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এল।

রতন হেসে বললেন, “তুই তো একদিন বলেছিলি, আমাদের বইয়ের ব্যবস্থা করবি। তারপর কোথায় হারিয়ে গেলি?”

অনিরুদ্ধবাবু মাথা নিচু করে বললেন, “হারিয়ে গিয়েছিলাম নিজের জীবন নিয়েই। কিন্তু তোর কথাটা ভুলিনি।”

রতন জানালেন, শেষ পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, পড়াশোনার সুযোগ হারানোর কষ্ট কতটা গভীর।

“আমি চাই না, আমার দোকানে কাজ করতে আসা কোনও ছোট ছেলে শুধু বই কেনার টাকা নেই বলে স্কুল ছেড়ে দিক,” তিনি বললেন।

তিনি নিজের দোকানের এক পাশে একটি ছোট তাক তৈরি করে পুরোনো গল্পের বই রাখার প্রস্তাব দিলেন। যে শিশু বই পড়তে চাইবে, সে দোকানে এসে বই নিয়ে যেতে পারবে এবং পরে ফেরত দিতে পারবে।

স্কুলের শিক্ষকরা এই উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত বই বেছে দিলেন। রতন নিজের দোকানের জায়গা দিলেন, আর গ্রামের কয়েকজন অভিভাবক বইয়ের দেখাশোনায় সাহায্য করতে রাজি হলেন।

অর্ণব বুঝতে পারল, একটি প্রতিজ্ঞা শুধু তার পুরোনো লেখককে ফিরিয়ে আনেনি; বহু বছর আগে যে সমস্যাটি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটিকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগও তৈরি করেছে।

৬. অসমাপ্ত কথার পূর্ণতা

বছরের শেষে স্কুলে একটি ছোট অনুষ্ঠান হলো। সেখানে কোনও বিশাল মঞ্চ ছিল না, কোনও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনও ছিল না। ছিল ছাত্রছাত্রীদের হাতে সাজানো বইয়ের তাক, কিছু চেয়ার আর বহু মানুষের মুখে হাসি।

অনিরুদ্ধবাবু সেই পুরোনো চিঠিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দিলেন। সেটিকে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হলো, যাতে ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীরাও দেখতে পারে—একসময় তাদেরই মতো কয়েকজন শিক্ষার্থী কী স্বপ্ন দেখেছিল।

অর্ণবকে অনুষ্ঠানে কিছু বলতে বলা হলো।

সে বলল, “আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, বেঞ্চের নিচে পাওয়া চিঠিটি শুধু পুরোনো কাগজ। পরে বুঝেছি, সেটা ছিল এমন একটি কাজের স্মৃতি, যা শেষ হয়নি। আমরা হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু আগে কেউ কোনও ভালো কাজের কথা ভেবেছিল বলে সেই কাজ চিরকাল অসমাপ্ত থাকবে, এমন তো নয়।”

সবাই হাততালি দিলেন।

অনুষ্ঠানের শেষে অনিরুদ্ধবাবু শেষ বেঞ্চটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি বেঞ্চের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর অর্ণবকে বললেন, “জীবনে অনেক প্রতিজ্ঞা করা হয়। সব প্রতিজ্ঞা পূরণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু কোনও প্রতিজ্ঞা যদি সত্যিই মানুষের উপকার করতে পারে, তাহলে সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে নতুন করে শুরু করা যায়।”

স্কুল থেকে বেরিয়ে অনিরুদ্ধবাবু একবার পিছন ফিরে তাকালেন। জানালা দিয়ে বিকেলের আলো শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে পড়েছে। বেঞ্চগুলো আগের মতোই সারি দিয়ে রাখা।

শুধু একটি জায়গায় পরিবর্তন এসেছে।

শেষ বেঞ্চের নিচে আর কোনও অসমাপ্ত প্রতিজ্ঞা লুকিয়ে নেই।

সেই প্রতিজ্ঞা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বইয়ের পাতায়, ছাত্রছাত্রীদের কাজে এবং গ্রামের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

অর্ণব সেদিন বাড়ি ফিরে নিজের খাতায় একটি বাক্য লিখল—

‘ভালো কাজের সময় কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। কেউ একজন আবার শুরু করতে পারলেই তার নতুন সকাল আসে।’

নৈতিক শিক্ষা: জীবনের ব্যস্ততায় অনেক ভালো ইচ্ছা অসমাপ্ত থেকে যায়। কিন্তু অতীতের ভুল বা বিলম্বকে অজুহাত না করে, বর্তমানের সামর্থ্য দিয়ে সেই কাজ আবার শুরু করা যায়। আর কোনও ভালো উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ জরুরি।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *