একজন বিজ্ঞানীর পরিচয় সাধারণত তাঁর গবেষণার বিষয়, আবিষ্কার, গবেষণাপত্র কিংবা কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবনকে একটি মাত্র পরিচয়ে ধরা যায় না। তাঁরা একইসঙ্গে বিজ্ঞানী, শিল্পী, সংগীতসাধক, লেখক এবং চিন্তক।
ড. পূর্ণিমা সিনহা ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন পদার্থবিজ্ঞান ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান একটি ক্ষেত্র, তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেন পূর্ণিমা সিনহা। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে PhD অর্জনকারী প্রথম নারী। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির গঠন নিয়ে X-ray crystallography ও structural analysis। তাঁর গবেষণার পথপ্রদর্শক ছিলেন ভারতের কিংবদন্তি পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
কিন্তু তাঁর পরিচয় এখানেই শেষ নয়। তিনি সংগীত শিখেছেন, তবলা বাজিয়েছেন, ছবি এঁকেছেন, ভাস্কর্য তৈরি করেছেন, বাংলা ও ইংরেজিতে লিখেছেন এবং বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজেও যুক্ত ছিলেন।
তাঁর জীবন তাই শুধুমাত্র একজন নারী বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়—এটি এক বহুমাত্রিক মননের গল্প।
একটি উদার পরিবারে বেড়ে ওঠা
পূর্ণিমা সিনহার জন্ম ১২ অক্টোবর ১৯২৭ সালে কলকাতায়। তাঁর বাবা নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত ছিলেন আইনজীবী এবং লেখক। তিনি নারীশিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির পক্ষে ছিলেন।
এমন একটি পরিবেশেই পূর্ণিমার বেড়ে ওঠা। পরিবারের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব ছিল প্রবল। তাঁর বড় বোন সুশমা সেনগুপ্ত কলকাতায় মেয়েদের জন্য Lake School প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই পূর্ণিমার সামনে শিক্ষার একটি বিস্তৃত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
তাঁর আগ্রহও ছিল বহুমুখী। বিজ্ঞান তাঁকে আকর্ষণ করত, আবার সংগীত ও শিল্পের প্রতিও ছিল গভীর টান।
পরবর্তী জীবনে এই বহুমুখী আগ্রহই তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
পদার্থবিজ্ঞানের পথে যাত্রা
পূর্ণিমা সিনহা Asutosh College এবং Scottish Church College-এ পড়াশোনা করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের Rajabazar Science College-এ পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
তখন ভারতে মেয়েদের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণার সুযোগ আজকের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত ছিল। বিশেষ করে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে নারীদের উপস্থিতি ছিল বিরল।
তবু পূর্ণিমা নিজের আগ্রহ থেকে এই পথ বেছে নেন।
১৯৫১ সালে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অধীনে PhD গবেষণা শুরু করেন। Bose-এর Khaira Laboratory-তে তখন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষামূলক গবেষণা চলছিল। পূর্ণিমার গবেষণার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত মাটির গঠন ও তার X-ray বিশ্লেষণ।
গবেষণাগারে তৈরি যন্ত্র
পূর্ণিমা সিনহার গবেষণার গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক তাঁর হাতে-কলমে বিজ্ঞানচর্চা।
আজকের মতো আধুনিক গবেষণাগার, সহজলভ্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত প্রযুক্তি তখন ছিল না। গবেষকদের নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক যন্ত্র তৈরি বা পরিবর্তন করতে হতো।
পূর্ণিমার গবেষণার জন্যও X-ray equipment-এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই যন্ত্র সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
তাই তিনি কলকাতায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিক্রি হওয়া surplus সামরিক সরঞ্জামের অংশ সংগ্রহ করে নিজের গবেষণার প্রয়োজন অনুযায়ী X-ray apparatus তৈরির কাজে ব্যবহার করেন। Indian Academy of Sciences-এর জীবনীমূলক উপাদানেও তাঁর গবেষণাগারে নিজস্ব X-ray tube তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনাটি তাঁর বিজ্ঞানচর্চার চরিত্রটিকে খুব ভালোভাবে তুলে ধরে।
তিনি শুধু বই পড়ে বা তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে গবেষণা করেননি; প্রয়োজনে যন্ত্রের কাঠামো বুঝে সেটিকে নিজের গবেষণার উপযোগী করে তুলেছিলেন।
ভারতের মাটির বিজ্ঞান
পূর্ণিমার গবেষণার বিষয় ছিল বিভিন্ন ধরনের clay বা মাটির গঠন।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা মাটির নমুনা নিয়ে X-ray diffraction এবং অন্যান্য বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি তাদের গঠন বোঝার চেষ্টা করেন।
Indian National Science Academy-র প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক লেখায় পূর্ণিমা সিনহার কাজকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর গবেষণাগারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের clay sample-এর X-ray structural analysis-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর গবেষণা থেকে বোঝা যায়, পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূপ্রকৃতি ও উপাদানের বৈশিষ্ট্যও অনুসন্ধান করা যায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহাসিক ডক্টরেট
১৯৫৬ সালে পূর্ণিমা সিনহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেন। ভারত সরকারের India Science and Technology portal তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে PhD অর্জনকারী প্রথম নারী হিসেবে উল্লেখ করেছে। TIFR-এর ২০২৫ সালের একটি অনুষ্ঠানের বিবরণেও তাঁকে একইভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা Physics PhD হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অর্জনের গুরুত্ব বুঝতে হলে সময়টাকে মনে রাখতে হয়।
স্বাধীনতার প্রথম দশকে ভারতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের নতুন কাঠামো তৈরি করছে। সেই সময় একজন নারী পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করে ডক্টরেট অর্জন করেছিলেন।
তিনি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করেননি; পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য একটি সম্ভাবনার দরজাও খুলেছিলেন।
সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রভাব
পূর্ণিমা সিনহার জীবনে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বোস ছিলেন তাঁর গবেষণা-নির্দেশক। কিন্তু তাঁর প্রভাব শুধু গবেষণার বিষয় নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, গবেষণার স্বাধীনতা এবং নিজে পরীক্ষা করে দেখার সংস্কৃতি পূর্ণিমার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছিল।
পূর্ণিমা পরবর্তী জীবনে তাঁর শিক্ষক ও পথপ্রদর্শককে নিয়ে একাধিক লেখা লিখেছেন। বাংলা ভাষায় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জীবন ও বিজ্ঞানচর্চা নিয়ে তাঁর লেখাগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বিজ্ঞান সাধনার ধারায় সত্যেন্দ্রনাথ বসু’-র মতো কাজ।
অর্থাৎ তিনি শুধু বসুর ছাত্র ছিলেন না; পরবর্তী সময়ে বসুর বিজ্ঞানচিন্তাকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেছিলেন।
বিজ্ঞানীর পাশাপাশি সংগীতসাধক
পূর্ণিমা সিনহার জীবনের আরেকটি দিক তাঁকে অন্য অনেক বিজ্ঞানীর থেকে আলাদা করে দেয়।
তিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শিখেছিলেন। সংগীতের পাশাপাশি তিনি তবলা শেখেন। India Science and Technology portal-এর জীবনীতে তাঁর তবলা শেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তখন তবলা ছিল মূলত পুরুষশাসিত বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্র। সেই পরিবেশে একজন নারী বিজ্ঞানীর পাশাপাশি তবলা শেখা এবং সংগীতচর্চা করা ছিল তাঁর বহুমুখী আগ্রহেরই প্রকাশ।
তাঁর সংগীতচর্চা নিছক অবসর বিনোদন ছিল না। সংগীতের গঠন, শব্দ, ছন্দ এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মধ্যেও তিনি সম্পর্ক খুঁজে পেতেন।
পরবর্তী সময়ে সংগীতের ওপর তাঁর গবেষণা ও লেখালেখিও হয়।
বিজ্ঞান ও সংগীতের মিলন
পূর্ণিমা সিনহার চিন্তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি জ্ঞানকে আলাদা আলাদা বাক্সে বন্দি করে দেখতেন না।
পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক হয়েও তিনি সংগীতের গঠন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে Visva-Bharati-তে musical acoustics বা সংগীতের শব্দবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর একটি বক্তৃতা হয়। পরের বছর সেখানে সংগীতে MA কোর্স চালুর ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগের কথা সরকারি জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে বিজ্ঞান ও শিল্পের একটি সুন্দর সংযোগ দেখা যায়।
শব্দের কম্পন পদার্থবিজ্ঞানের বিষয়, কিন্তু সেই শব্দ যখন সংগীতে রূপ নেয়, তখন তা সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। পূর্ণিমার আগ্রহ ছিল এই দুই জগতের সংযোগস্থলে।
শিল্পী পূর্ণিমা
তাঁর প্রতিভা শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি ছবি আঁকতেন এবং ভাস্কর্যও তৈরি করতেন। মাটির কাজ, কাঠের খেলনা, বাঁশের সামগ্রী, লাক্ষার কাজ, পটারি এবং বিভিন্ন লোকশিল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। Visva-Bharati-র সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি বিভিন্ন শিল্প ও কারুশিল্পের প্রদর্শনী আয়োজন ও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি একজন শিল্পীর চোখে পৃথিবীকে দেখা—এই দ্বৈততা তাঁর জীবনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
একদিকে তিনি মাটির crystal structure বিশ্লেষণ করছেন, অন্যদিকে সেই মাটিকেই শিল্পের উপাদান হিসেবে দেখছেন।
লেখক ও বিজ্ঞান-প্রচারক
পূর্ণিমা সিনহা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তিনি ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। এই পত্রিকাটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর উদ্যোগে গড়ে ওঠা বাংলা বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমগুলির একটি ছিল।
তিনি ইংরেজি ও বাংলা—দুই ভাষাতেই লিখতেন।
শুধু নিজের গবেষণার বিষয় নয়, বিজ্ঞানী, সংগীত, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র নিয়ে তাঁর লেখালেখি ছিল।
এমনকি Erwin Schrödinger-এর Mind and Matter বইটির বাংলা অনুবাদও তিনি করেন। তাঁর অনুবাদের নাম ছিল ‘মন ও জড়বস্তু’। DNA নিয়ে একটি বইও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।
এভাবে তিনি বিজ্ঞানের জটিল ধারণাগুলিকে বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেন।
গবেষণার পরবর্তী অধ্যায়
পূর্ণিমা সিনহার পেশাগত জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে কলকাতার Central Glass and Ceramic Research Institute (CGCRI)-এ। ১৯৬৪ সালে বিদেশ থেকে ফিরে তিনি সেখানে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৮৬ সালে স্বেচ্ছাবসর নেন।
তাঁর কর্মজীবনের এই অধ্যায় দেখায় যে তাঁর গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিজ্ঞান ও শিল্প-প্রযুক্তির গবেষণার সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও তিনি কাজ করেছেন।
পরিবারেও বিজ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকার
পূর্ণিমা সিনহার পরিবারও পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তাঁর স্বামী ছিলেন নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুরজিতচন্দ্র সিনহা, যিনি Visva-Bharati University-এর উপাচার্যও ছিলেন। তাঁদের দুই কন্যা পরবর্তীতে বিজ্ঞানী হন।
ফলে তাঁর পরিবারে বিজ্ঞান ও মানববিদ্যার দুই ধারাই পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে।
একটি অন্যরকম উত্তরাধিকার
পূর্ণিমা সিনহার জীবনকে শুধুমাত্র “প্রথম মহিলা পদার্থবিজ্ঞানী” বলে শেষ করে দিলে তাঁর আসল বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়বে না।
তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি বিজ্ঞানকে দেখেছেন অনুসন্ধানের পথ হিসেবে, সংগীতকে দেখেছেন কাঠামো ও অনুভূতির সমন্বয় হিসেবে, শিল্পকে দেখেছেন সৃষ্টির ভাষা হিসেবে এবং লেখাকে দেখেছেন জ্ঞান ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে।
তাঁর গবেষণাগারে X-ray diffraction দিয়ে মাটির গঠন বিশ্লেষণ হয়েছে। আবার তাঁর হাতে তবলার বোলও ধ্বনিত হয়েছে। তিনি যেমন বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করেছেন, তেমনই ছবি এঁকেছেন এবং ভাস্কর্য তৈরি করেছেন। তিনি যেমন গবেষণাপত্র লিখেছেন, তেমনই সাধারণ পাঠকের জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান নিয়ে লিখেছেন।
এই বহুমাত্রিকতাই পূর্ণিমা সিনহার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শেষ কথা
বিজ্ঞান ও শিল্পকে আমরা প্রায়ই দুটি আলাদা জগৎ হিসেবে দেখি। একদিকে যুক্তি, পরীক্ষা ও পরিমাপ; অন্যদিকে সৃজনশীলতা, অনুভূতি ও সৌন্দর্য।
পূর্ণিমা সিনহার জীবন এই বিভাজনকে প্রশ্ন করে।
তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন মানুষের কৌতূহলের কোনও নির্দিষ্ট সীমানা থাকতে হয় না। পদার্থবিজ্ঞানের একটি গবেষণাগার থেকে সংগীতের আসর, সেখান থেকে শিল্পের প্রদর্শনী, আবার বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা—সবকিছুই একজন মানুষের জ্ঞানযাত্রার অংশ হতে পারে।
১৯২৭ সালে জন্ম নেওয়া সেই কিশোরী যখন পদার্থবিজ্ঞানের পথ বেছে নিয়েছিলেন, তখন হয়তো তাঁর সামনে এতগুলি পরিচয়ের ভবিষ্যৎ ছিল না। কিন্তু নিজের আগ্রহকে কখনও একটি মাত্র ক্ষেত্রের মধ্যে আটকে না রাখার কারণেই তিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র নাম হয়ে ওঠেন।
ড. পূর্ণিমা সিনহা তাই শুধু একজন নারী বিজ্ঞানীর গল্প নন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন—জ্ঞানকে যত বেশি ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, মানুষের চিন্তার জগতও তত বেশি বিস্তৃত হয়।