Categories
অনুগল্প বিবিধ

নীরব ঘরের শেষ সুর।

নদিয়ার এক পুরনো পাড়ায় ছিল একটি ছোট্ট সংগীত বিদ্যালয়। একসময় সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তানপুরার সুর, তবলার বোল আর শিক্ষার্থীদের গানের আওয়াজ শোনা যেত। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা গুরুপদ মুখোপাধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে সবকিছু যেন থমকে গিয়েছিল। নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল, আর পুরনো শিক্ষার্থীরাও জীবিকার তাগিদে একে একে অন্য শহরে চলে গিয়েছিল।

বিদ্যালয়ের দায়িত্ব সামলাতেন গুরুপদবাবুর মেয়ে, শ্রেয়সী। ছোটবেলায় সে বাবার কাছে গান শিখেছিল, কিন্তু বাবার অসুস্থতার কারণে বহু বছর ধরে নিজের সংগীতচর্চা বন্ধ রেখেছিল। সংসারের খরচ চালাতে সে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। তবু প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বিদ্যালয়ের ঘর খুলে পরিষ্কার করত, যেন কোনও দিন আবার সেখানে গান শেখানো শুরু হবে।

একদিন স্থানীয় ক্লাবের কয়েকজন সদস্য এসে জানালেন, পুরনো বাড়িটি সংস্কারের জন্য বিক্রি করে দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে। তাঁদের মতে, বিদ্যালয়টি আর আগের মতো চলছে না। সেই জায়গায় নতুন বাণিজ্যিক ভবন হলে এলাকার উপকার হবে।

কথাটি শুনে শ্রেয়সীর বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে জানত, শুধু স্মৃতি আঁকড়ে ধরে একটি প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু বাবার সারাজীবনের সাধনাকে এভাবে শেষ হয়ে যেতে দেওয়ার কথাও সে ভাবতে পারছিল না।

সেই রাতেই শ্রেয়সী বাবার ঘরে ঢুকে দেখল, তিনি বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছেন। পাশে রাখা তানপুরাটির তার বহু দিন ছোঁয়া হয়নি।

শ্রেয়সী বলল, “বাবা, বিদ্যালয়টা কি সত্যিই বন্ধ হয়ে যাবে?”

গুরুপদবাবু ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বললেন, “বিদ্যালয় মানে শুধু বাড়ি নয়, মা। এখানে যদি কেউ শেখে, তবেই বিদ্যালয় বেঁচে থাকে। শুধু দরজা খুলে রাখলেই তো হয় না।”

কথাটি শ্রেয়সীকে নতুন করে ভাবতে শেখাল।

পরদিন সে এলাকার কয়েকটি বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করল। প্রস্তাব দিল, সপ্তাহে একদিন শিশুদের জন্য বিনামূল্যে সংগীত পরিচিতি শিবির করা হবে। সেখানে শুধু গান শেখানো নয়, সুর, তাল, শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়ও দেওয়া হবে।

প্রথম দিন মাত্র চারজন শিশু এল। তাদের মধ্যে কেউ গান গাইতে লজ্জা পাচ্ছিল, কেউ আবার তাল ধরতে পারছিল না। শ্রেয়সী বুঝতে পারল, বহু বছরের ব্যবধান ঘুচিয়ে আবার শিক্ষাদান শুরু করা সহজ হবে না।

তবু সে হাল ছাড়ল না। শিশুদের পরিচিত ছড়া দিয়ে তাল শেখাতে শুরু করল। হাততালি দিয়ে মাত্রা বোঝাল, ছোট ছোট সুরের খেলা তৈরি করল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চারজনের জায়গায় বারোজন শিশু আসতে শুরু করল।

একদিন শিবিরে এল রিমঝিম নামে একটি মেয়ে। সে কথা বলতে খুব সংকোচ বোধ করত, কিন্তু গান শুনতে ভালোবাসত। প্রথম কয়েকটি ক্লাসে সে কারও সঙ্গে কথা বলল না। শুধু মন দিয়ে অন্যদের গান শুনত।

শ্রেয়সী তাকে জোর করল না। একদিন ক্লাসের শেষে সে একটি সহজ সুর গেয়ে বলল, “তুমি চাইলে শুধু এই সুরটা গুনগুন করে দেখতে পারো। না পারলেও কোনও অসুবিধা নেই।”

রিমঝিম খুব আস্তে সুরটি গাইল। তার কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিক মাধুর্য। শ্রেয়সী তাকে প্রশংসা করল, কিন্তু অন্যদের সামনে বিশেষভাবে তুলে ধরল না, যাতে সে অস্বস্তিতে না পড়ে।

ধীরে ধীরে রিমঝিমের আত্মবিশ্বাস বাড়তে লাগল। কয়েক মাস পরে সে অন্য শিশুদের সঙ্গে মিলে একটি ছোট সংগীতানুষ্ঠানে অংশ নিল। তার বাবা-মা দর্শকাসনে বসে মেয়ের গান শুনে আনন্দে কেঁদে ফেললেন।

অনুষ্ঠানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকার মানুষ বিদ্যালয়টির প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখালেন। কেউ বাদ্যযন্ত্র মেরামত করে দিলেন, কেউ ঘরের রং করার ব্যবস্থা করলেন, আবার কয়েকজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী এসে স্বেচ্ছায় ক্লাস নিতে রাজি হলেন।

গুরুপদবাবু একদিন হুইলচেয়ারে বসে বিদ্যালয়ের ঘরে এলেন। বহুদিন পরে এত শিশু ও শিক্ষকের কণ্ঠে একসঙ্গে সুর শুনে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

শ্রেয়সী বাবার পাশে বসে বলল, “এবার বুঝেছি, শুধু বাড়িটা রক্ষা করলেই হতো না। আপনার শেখানো জিনিসগুলো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল আসল কাজ।”

গুরুপদবাবু মেয়ের হাত ধরে মৃদু হেসে বললেন, “আজ তুই আমার কাছে শুধু ছাত্রী নোস, তুই নিজেই একজন গুরু।”

সেই সন্ধ্যায় শ্রেয়সী বহু বছর পর নিজের তানপুরাটি হাতে তুলে নিল। প্রথমে আঙুল কাঁপছিল, গলাও ঠিকমতো খুলছিল না। কিন্তু শিশুদের মিষ্টি কণ্ঠের সঙ্গে ধীরে ধীরে তার সুর মিশে গেল।

একসময় যে ঘর নীরবতায় ডুবে গিয়েছিল, সেখানে আবার সংগীত ফিরে এল। আর শ্রেয়সী বুঝল, কোনও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শুধু অতীতকে ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; বর্তমানের মানুষের কাছে সেই স্বপ্নের দরজা খুলে দিতে হয়।

শিক্ষা: ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার জ্ঞান ও আনন্দকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে নিভে যেতে বসা সম্ভাবনাও আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *