Categories
উপন্যাস

নীল দরজার ওপারে (তৃতীয় পর্ব)।

তৃতীয় পর্ব — শেষ দরজা

লোকটি কয়েক পা এগিয়ে এসে থামলেন।

তার মুখে সময়ের গভীর ছাপ।

চুলে পাক ধরেছে।

চোখের কোণে অসংখ্য রেখা।

কিন্তু চোখ দুটো—

অদ্রিজা সেই চোখ বহুবার দেখেছে।

পুরোনো ছবিতে।

মায়ের ডায়েরিতে।

নীলবাড়ির দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিতে।

অদ্রিজার ঠোঁট কাঁপল।

“আপনি…”

লোকটি ধীরে বললেন,

“আমি অমিতাভ।”

সায়ন কয়েক পা এগিয়ে গেল।

“আপনি সত্যিই অমিতাভ সেন?”

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মৃদু হাসলেন।

“তুমি সায়ন?”

সায়নের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

“তোমাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর।”

সায়নের চোখে জল চলে এল।

“কিন্তু…”

“আমি তোমাকে কখনও ভুলিনি।”

অদ্রিজা এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ সে বলল,

“আমাকে কেন ছেড়ে গিয়েছিলেন?”

অমিতাভের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

তিনি ধীরে মাথা নিচু করলেন।

“কারণ তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”

“এটা সবাই বলছে।”

“আমি জানি।”

“কিন্তু কেউ সত্যিটা বলছে না।”

অমিতাভ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তাহলে আজ সব বলব।”

তিনজন স্টেশনের পুরোনো প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।

আকাশে মেঘ।

দূরে বৃষ্টির রেখা।

অমিতাভ বলতে শুরু করলেন।

“১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই তোমার জন্মের রাতে আমি বুঝেছিলাম, নীলাদ্রি তোমাকে খুঁজছে।”

অদ্রিজা বলল,

“কেন?”

“কারণ তোমার জন্মের আগে আমি এমন কিছু নথি সংগ্রহ করেছিলাম, যা তার পুরো সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে পারত।”

“কী সাম্রাজ্য?”

“জমি দখল, ভুয়ো কোম্পানি, বেআইনি অর্থ লেনদেন—অনেক কিছু।”

সায়ন বলল,

“তাহলে নীলাদ্রি খুনি?”

অমিতাভ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“সে সরাসরি কাউকে হত্যা করেনি—এমন দাবি সে সবসময় করেছে। কিন্তু তার নির্দেশে মানুষ মরেছে।”

অদ্রিজা শিউরে উঠল।

“তাহলে আমার বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক?”

অমিতাভ বললেন,

“তোমার যে মানুষটি তোমাকে বড় করেছেন, তিনি নীলাদ্রির সঙ্গে কাজ করতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।”

“তাহলে তিনি আমাকে লুকিয়ে রাখলেন কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, নীলাদ্রি তোমাকে ব্যবহার করবে।”

অদ্রিজা চোখ নামিয়ে নিল।

“তাহলে আপনি?”

“আমি পালিয়ে গেলাম।”

তার গলায় তীব্র অনুশোচনা।

“তোমাকে সঙ্গে নিতে পারিনি। কারণ আমার পেছনে লোক ছিল। তোমাকে নিয়ে পালালে তোমার মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।”

“কিন্তু আপনি অন্তত আমাকে একটা চিঠি লিখতে পারতেন।”

অমিতাভের চোখ ভিজে উঠল।

“আমি লিখেছিলাম।”

অদ্রিজা তাকাল।

“কোথায়?”

“তোমার মায়ের কাছে।”

“মা তো কখনও বলেননি।”

“কারণ সেই চিঠি নীলাদ্রি নিয়ে নিয়েছিল।”

সায়ন বলল,

“আর তারপর?”

“তারপর আমি নিখোঁজ হয়ে যাই।”

অদ্রিজা ধীরে বলল,

“সবাই ভেবেছিল আপনি মারা গেছেন।”

“আমিও চেয়েছিলাম তারা তাই ভাবুক।”

“আপনি কোথায় ছিলেন?”

অমিতাভ জানালেন,

“প্রথমে পাহাড়ে। তারপর সীমান্তের ওপারে। বহু বছর অন্য নামে ছিলাম।”

সায়ন বলল,

“আর আমাকে?”

“তোমাকে খুঁজেছিলাম।”

“পাননি?”

“পেয়েছিলাম।”

সায়ন চমকে তাকাল।

“কখন?”

“তুমি যখন পনেরো বছরের।”

সায়নের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“তাহলে আমার কাছে আসেননি কেন?”

অমিতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ তখনও নীলাদ্রির লোকেরা তোমাকে নজরে রেখেছিল।”

“তাহলে এত বছর আমি ভাবলাম আমার বাবা-মা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।”

“আমি জানি।”

“আপনি জানতেন?”

“হ্যাঁ।”

সায়নের চোখে জল।

“আপনি জানেন আমি কতবার আপনাকে খুঁজেছি?”

অমিতাভ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“জানি।”

“তাহলে?”

“কারণ কখনও কখনও একজন বাবা তার সন্তানের কাছে থাকতে না পারলেও তার ছায়া হয়ে পাশে থাকে।”

সায়ন আর কিছু বলতে পারল না।

অদ্রিজা এবার প্রশ্ন করল,

“নীলাদ্রি এখন কোথায়?”

অমিতাভের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“সে এখনও বেঁচে আছে।”

“কোথায়?”

“নীলবাড়িতে।”

অদ্রিজা চমকে উঠল।

“কিন্তু আমরা তো…”

“তোমরা যাকে নীলবাড়ির নিচে দেখেছ, সে নীলাদ্রি নয়।”

সায়ন বলল,

“তাহলে কে?”

“তার ছেলে।”

অদ্রিজা স্তব্ধ।

“তার ছেলে?”

“হ্যাঁ।”

“সে কি সব জানে?”

“জানে।”

“তাহলে সে আমাদের কেন ছাড়ল?”

অমিতাভ বললেন,

“কারণ সে তার বাবার মতো নয়।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অমিতাভ পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করলেন।

“এটা নাও।”

অদ্রিজা চাবিটা নিল।

“এটা কী?”

“নীলবাড়ির নীল দরজার চাবি।”

সায়ন বলল,

“কিন্তু ওই দরজা তো আমরা খুলেছি।”

“ওটা বাইরের দরজা।”

অদ্রিজা চমকে তাকাল।

“ভেতরে আরেকটা দরজা আছে।”

অমিতাভ বললেন,

“সেই দরজার ওপারে আছে আসল প্রমাণ।”


তারা তিনজন নীলবাড়িতে ফিরে এল।

রাত নেমেছে।

বৃষ্টি থেমে গেছে।

বাড়ির ভেতর অদ্ভুত নীরবতা।

অদ্রিজা সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল।

সায়ন আর অমিতাভ তার পেছনে।

নীল দরজার ঘরে ঢুকে অদ্রিজা দেয়ালের দিকে তাকাল।

অমিতাভ বললেন,

“ওই ছবিটা সরাও।”

অদ্রিজা ছবিটা সরাতেই একটা ছোট ধাতব তালা দেখা গেল।

সে চাবিটা ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল।

দেয়ালের একটা অংশ খুলে গেল।

ভেতরে সরু ঘর।

ঘরের মাঝখানে একটা লোহার সিন্দুক।

অমিতাভ সিন্দুকের সামনে দাঁড়ালেন।

“এখানেই সব আছে।”

সিন্দুক খুলতেই পুরোনো নথির স্তূপ।

চেক।

ফটোগ্রাফ।

রেকর্ডিং।

জমির কাগজ।

ব্যাংক হিসাব।

আর একটা মোটা ডায়েরি।

অদ্রিজা ডায়েরিটা তুলে নিল।

মলাটে লেখা—

“নীলাদ্রি দত্ত — ব্যক্তিগত হিসাব।”

সায়ন বলল,

“এটাই?”

অমিতাভ মাথা নাড়লেন।

“এখানেই তার সব অপরাধের প্রমাণ।”

অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।

একটা পাতায় তার নিজের নাম।

“অদ্রিজা — ১৭/০৭/১৯৯৮।”

তার নিচে লেখা—

“শিশুটিকে নজরে রাখতে হবে। অমিতাভের দুর্বলতা।”

অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।

আরেক পাতায়—

“সায়ন — ১৭/০৭/১৯৯৮।”

সায়ন এগিয়ে এল।

তার নামের পাশে লেখা—

“অন্য পরিবারে পাঠানো হয়েছে। অমিতাভের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।”

সায়ন চোখ বন্ধ করল।

অমিতাভ বললেন,

“নীলাদ্রি তোমাদের দুজনকে দুইভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।”

“কীভাবে?”

“তোমাকে—আমার বিরুদ্ধে চাপ হিসেবে।”

“আর সায়নকে?”

“আমার কাছে পৌঁছানোর পথ হিসেবে।”

হঠাৎ নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

তিনজনই থেমে গেল।

অমিতাভ ফিসফিস করে বললেন,

“সে এসেছে।”

সায়ন বলল,

“নীলাদ্রি?”

“হ্যাঁ।”

নিচ থেকে ধীর কণ্ঠ ভেসে এল—

“অমিতাভ।”

অদ্রিজার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কণ্ঠটা বয়স্ক।

কঠিন।

আর ভয়ংকর শান্ত।

“আমি জানতাম তুমি একদিন ফিরবে।”

অমিতাভ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

“নীলাদ্রি, এবার সব শেষ।”

নিচ থেকে হাসির শব্দ।

“শেষ?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি এত বছর পালিয়ে থেকেও একই ভুল করছ।”

অমিতাভ বললেন,

“ভুল করেছি। কিন্তু এবার প্রমাণ আছে।”

“প্রমাণ?”

নীলাদ্রি হেসে উঠল।

“প্রমাণ নিয়ে তুমি কী করবে?”

অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,

“পুলিশকে দেব।”

নীলাদ্রির কণ্ঠস্বর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল।

“অদ্রিজা।”

সে থেমে গেল।

“তুমি তোমার বাবাকে খুব ভালোবাসো?”

অদ্রিজা কিছু বলল না।

“তাহলে তাকে বলো, নিচে আসতে।”

অমিতাভ সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলেন।

সায়ন তাকে থামাতে গেল।

“আপনি একা যাবেন না।”

অমিতাভ বললেন,

“আজ আর পালাব না।”

নিচে পৌঁছতেই নীলাদ্রি সামনে এল।

বয়স্ক।

হাতে লাঠি।

কিন্তু চোখে আগের মতোই কঠোরতা।

তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন যুবক।

অদ্রিজা চিনতে পারল।

নীলবাড়িতে যাকে সে প্রথম রাতে দেখেছিল।

নীলাদ্রির ছেলে।

সে অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল।

“আমি তোমাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি।”

নীলাদ্রি তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

“চুপ।”

অমিতাভ বললেন,

“তোমার নিজের ছেলে তোমার বিরুদ্ধে গেছে।”

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“তুইও?”

ছেলেটি ধীরে বলল,

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ আমি আপনার মতো হতে চাই না।”

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ তার হাত কাঁপতে শুরু করল।

সে চেয়ারে বসে পড়ল।

অমিতাভ এগিয়ে গেলেন।

“সব শেষ।”

নীলাদ্রি মৃদু হাসলেন।

“না।”

“কী বলতে চাইছ?”

“তুমি একটা জিনিস জানো না।”

অমিতাভ থেমে গেলেন।

“কী?”

নীলাদ্রি অদ্রিজার দিকে তাকাল।

“তোমার মা।”

অদ্রিজার বুক ধক করে উঠল।

“আমার মা?”

“সে তোমাকে কখনও ত্যাগ করেনি।”

অদ্রিজা এগিয়ে গেল।

“তাহলে কোথায় ছিলেন?”

নীলাদ্রি বলল,

“আমার কাছ থেকে লুকিয়ে।”

অদ্রিজা তাকিয়ে রইল।

“সে কি বেঁচে আছেন?”

নীলাদ্রি উত্তর দিল না।

অমিতাভ বললেন,

“নীলাদ্রি।”

“হ্যাঁ, বেঁচে আছে।”

অদ্রিজার চোখে জল।

“কোথায়?”

“শহরের উত্তরে একটা বৃদ্ধাশ্রমে।”

অদ্রিজার মুখ থেকে শব্দ বেরোল না।

এত বছর ধরে যে মানুষটাকে সে মৃত ভেবেছিল—

তার মা বেঁচে আছেন।

অমিতাভ ধীরে বললেন,

“আমি তোমাকে নিয়ে তার কাছে যেতে চেয়েছিলাম।”

“তাহলে যাননি কেন?”

“কারণ নীলাদ্রি তাকে নজরে রেখেছিল।”

নীলাদ্রি এবার আর কিছু বলল না।

তার চোখে প্রথমবার ক্লান্তি দেখা গেল।

সায়ন বলল,

“আপনি আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন।”

নীলাদ্রি মৃদু স্বরে বলল,

“আমি শুধু ভেবেছিলাম, শক্তিশালী হলে সবকিছু নিজের মতো করে রাখা যায়।”

অমিতাভ বললেন,

“কিন্তু মানুষকে নিজের সম্পত্তি ভাবা যায় না।”

নীলাদ্রি মাথা নিচু করলেন।

দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

অদ্রিজা অবাক হয়ে সায়নের দিকে তাকাল।

সায়ন বলল,

“আমি নথিগুলোর ছবি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।”

পুলিশ বাড়িতে ঢুকল।

নীলাদ্রি কোনও প্রতিরোধ করলেন না।

শুধু যাওয়ার আগে অদ্রিজার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তোমার জন্মের রাতটা আমি হারিয়ে দিয়েছিলাম।”

অদ্রিজা শান্ত গলায় বলল,

“কিন্তু আমার জীবন আপনি হারিয়ে দিতে পারেননি।”

নীলাদ্রি আর কিছু বললেন না।

তাকে নিয়ে যাওয়া হলো।


দুদিন পর।

শহরের উত্তরের একটি বৃদ্ধাশ্রম।

অদ্রিজা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

তার হাত কাঁপছে।

সায়ন পাশে।

অমিতাভ একটু দূরে।

একজন নার্স দরজা খুলে দিলেন।

“মাধবীদি?”

ভেতর থেকে দুর্বল কণ্ঠ—

“কে?”

অদ্রিজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

“মা।”

ঘর নিস্তব্ধ।

বিছানায় বসে থাকা বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন।

চোখে অবিশ্বাস।

তারপর—

“অদ্রি?”

অদ্রিজা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

মাধবী কাঁদতে লাগলেন।

“তুই এত বড় হয়ে গেছিস…”

“তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে কেন?”

“আমি যাইনি।”

“তাহলে?”

“আমাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।”

অদ্রিজা চোখ মুছে বলল,

“বাবা?”

মাধবী অমিতাভের দিকে তাকালেন।

দুজনের চোখে বহু বছরের ইতিহাস।

কেউ কিছু বলল না।

তারপর মাধবী হাত বাড়ালেন।

অমিতাভ এগিয়ে এলেন।

তাদের হাত এক হলো।

কোনও অভিযোগ নেই।

শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি।


এক বছর পরে।

নীলবাড়ি আর পরিত্যক্ত নয়।

বাড়িটা সংস্কার করা হয়েছে।

দোতলার সেই নীল দরজাটা এখনও আছে।

অদ্রিজা এখন সেখানে একটা ছোট পাঠাগার চালায়।

নাম দিয়েছে—

“নীল দরজা পাঠাগার।”

সায়ন মাঝে মাঝে আসে।

কখনও বই নিয়ে।

কখনও চা নিয়ে।

আর কখনও শুধু জানালার পাশে বসে থাকার জন্য।

এক বিকেলে অদ্রিজা পুরোনো একটা বাক্স খুলছিল।

তার মধ্যে একটা চিঠি পেল।

সায়নের লেখা।

তারিখ—

১৭ জুলাই ২০১০।

চিঠিটা কখনও পাঠানো হয়নি।

অদ্রিজা পড়তে শুরু করল—

“অদ্রি,

যদি কখনও তুমি আমাকে ভুলে যাও, তবু আমি তোমাকে দোষ দেব না।

কিন্তু যদি কখনও জানতে পারো, আমি কেন চলে গিয়েছিলাম, তাহলে শুধু একটা কথা মনে রেখো—

আমি তোমাকে ছেড়ে যাইনি।

আমি শুধু এমন একটা পৃথিবী থেকে তোমাকে দূরে রেখেছিলাম, যেখানে সত্যি বলারও শাস্তি ছিল।

যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, আমি তোমাকে কিছু চাইব না।

শুধু পাশে দাঁড়ানোর অনুমতি চাইব।

—সায়ন।”

অদ্রিজা চিঠিটা পড়ে হাসল।

ঠিক তখন দরজায় সায়ন এসে দাঁড়াল।

“কী পড়ছ?”

অদ্রিজা চিঠিটা লুকিয়ে ফেলল।

“কিছু না।”

“মিথ্যে।”

“তুমি তো সবসময় সত্যি খুঁজে বেড়াও।”

সায়ন হেসে বলল,

“তোমার ব্যাপারে একটু মিথ্যে চলবে।”

অদ্রিজা জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশে মেঘ জমেছে।

“বৃষ্টি আসবে।”

“ছাতা আছে?”

“নেই।”

“তাহলে?”

অদ্রিজা মৃদু হাসল।

“একসঙ্গে ভিজব।”

সায়ন কিছু বলল না।

শুধু তার পাশে এসে দাঁড়াল।

বাইরে বৃষ্টি নামল।

নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

বারো বছরের বিচ্ছেদ।

অসংখ্য মিথ্যে।

একটা হারিয়ে যাওয়া পরিবার।

একটা অন্ধকার রাত।

আর একটা নীল দরজা—

সবকিছুর শেষে এসে তারা বুঝল,

জীবনের কিছু দরজা যতই বন্ধ করে রাখা হোক,

সত্যি একদিন না একদিন তার চাবি খুঁজে নেয়।

আর ভালোবাসা?

ভালোবাসা হয়তো কখনও হারায় না।

শুধু অপেক্ষা করে—

সঠিক সময়ে আবার ফিরে আসার জন্য।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *