রাত তখন এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।
শহরের শেষ বাসটাও অনেকক্ষণ আগে চলে গেছে। রাস্তার দু’পাশে বন্ধ দোকানের শাটার। মাঝে মাঝে দূরের কোনো গলিতে কুকুরের ডাক, আর তারও দূরে কোনো অচেনা ট্রেনের হুইসেল।
অদ্রিজা ছাতাটা মাথার ওপর ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিল।
তার হাতে একটা পুরোনো চাবি।
চাবিটা সে পেয়েছিল আজ বিকেলে।
একটা অচেনা খামের ভিতরে।
খামের ওপর শুধু লেখা ছিল—
“অদ্রিজার হাতে পৌঁছবে।”
কোনও ঠিকানা নেই।
কোনও প্রেরকের নাম নেই।
শুধু নিচে ছোট করে একটা তারিখ—
১৭ জুলাই, ২০১৪।
অদ্রিজা চিঠিটা পড়ে প্রথমে হেসেছিল।
তারপর হাসিটা আর থাকেনি।
কারণ চিঠির প্রথম লাইনটা ছিল—
“তুমি যদি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে আমি আর ফিরতে পারিনি।”
চিঠির লেখাটা সে চিনতে পেরেছিল।
অনেক বছর পরেও।
সায়নের হাতের লেখা।
সায়ন।
তার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।
আবার সবচেয়ে দূরের মানুষও।
বারো বছর আগে যে মানুষটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
যার কোনও মৃতদেহ পাওয়া যায়নি।
কোনও শেষ খবর পাওয়া যায়নি।
কোনও বিদায়ও ছিল না।
শুধু একদিন সকালে অদ্রিজার ফোনে একটা ছোট্ট মেসেজ এসেছিল—
“আমাকে আর খুঁজো না।”
তারপর থেকে সায়ন নেই।
কিন্তু আজ—
বারো বছর পরে—
তার হাতের লেখা আবার ফিরে এসেছে।
আর সেই লেখার সঙ্গে এসেছে একটা চাবি।
অদ্রিজা চাবিটা মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরল।
তার সামনে এখন যে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, সেটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে গেল।
বাড়িটার নাম—
নীলবাড়ি।
শহরের একেবারে প্রান্তে, পুরোনো রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দোতলা বাড়ি।
বছরের পর বছর কেউ এখানে থাকে না।
অদ্রিজা ছোটবেলায় একবার এই বাড়িটা দেখেছিল।
সায়নের সঙ্গে।
সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।
সায়ন বলেছিল,
“একদিন আমরা এখানে থাকব।”
অদ্রিজা হেসে বলেছিল,
“ভূতের বাড়িতে?”
সায়ন বলেছিল,
“ভূত থাকলে থাকুক। তুমি থাকলে আমি ভয় পাব না।”
সেই কথাটা মনে পড়তেই অদ্রিজার চোখ জ্বালা করে উঠল।
বারো বছর।
কত কিছু বদলে গেছে।
শুধু কিছু স্মৃতি বদলায়নি।
অদ্রিজা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল।
লোহার গেটটা অর্ধেক ভাঙা।
ভেতরে আগাছা।
দোতলার জানালাগুলো কালো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—
একটা জানালায় নীল আলো জ্বলছে।
অদ্রিজার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল।
এই বাড়িতে কেউ থাকে না।
তাহলে আলো জ্বলছে কেন?
সে ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
গেটটা কড়াৎ করে শব্দ করতেই অদ্রিজা থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড চারপাশে তাকিয়ে রইল।
কেউ নেই।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল।
বাড়ির দরজায় একটা পুরোনো তালা ঝুলছে।
চাবিটা বের করল।
একবার চেষ্টা করতেই—
ক্লিক।
তালা খুলে গেল।
অদ্রিজা কিছুক্ষণ চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের ভিতর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
দেয়ালে পুরোনো ছবি।
মেঝেতে ধুলো।
কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ হচ্ছে।
অদ্রিজা মোবাইলের টর্চ জ্বালাল।
সামনের দেওয়ালে একটা ছবি দেখে তার পা থেমে গেল।
ছবিটা সায়নের।
অনেক ছোটবেলার।
সম্ভবত দশ-এগারো বছর বয়স।
ছবির পাশে আরেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
একজন বৃদ্ধ।
অদ্রিজা লোকটাকে চিনতে পারল না।
ছবির নিচে লেখা—
“সায়ন ও নীলাদ্রি — ২০০১।”
নীলাদ্রি?
এই নামটা অদ্রিজা কখনও শোনেনি।
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল।
ঠক।
অদ্রিজা চমকে উঠল।
তারপর—
ঠক… ঠক…
কেউ যেন কাঠের মেঝেতে হাঁটছে।
সে মোবাইলটা শক্ত করে ধরল।
“কে?”
কোনও উত্তর নেই।
“কে ওখানে?”
আবার নীরবতা।
তারপর ওপর থেকে খুব ধীরে একটা শব্দ ভেসে এল—
“অদ্রিজা…”
অদ্রিজার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে গেল।
এই কণ্ঠস্বর—
অসম্ভব।
সে সিঁড়ির দিকে তাকাল।
“সায়ন?”
কোনও উত্তর নেই।
অদ্রিজা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল।
প্রতিটি ধাপে কাঠ কেঁপে উঠছে।
দোতলায় উঠে সে দেখল করিডোরের শেষে একটা দরজা।
দরজাটা নীল।
ঠিক সেই নীল—
যে নীল রঙের কথা সায়ন একদিন বলেছিল।
“জানো অদ্রি, আমার একটা ঘর থাকবে। দরজা হবে নীল।”
অদ্রিজার বুকের মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল।
সে দরজার সামনে দাঁড়াল।
চাবিটা বের করল।
তারপর থেমে গেল।
ভেতর থেকে হালকা আলো বেরোচ্ছে।
কেউ আছে।
অদ্রিজা দরজার হাতল ধরল।
ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে দিল।
দরজা খুলে গেল।
ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল।
টেবিলের ওপর একটা কেরোসিন বাতি।
তার পাশে একটা পুরোনো টেপ রেকর্ডার।
আর একটা চেয়ার।
চেয়ারে কেউ বসে নেই।
অদ্রিজা কয়েক পা এগিয়ে গেল।
টেবিলের ওপর একটা খাম।
খামের ওপর লেখা—
“অদ্রি, এটা শোনার পর তুমি যা বিশ্বাস করেছ, তার সবকিছু বদলে যাবে।”
অদ্রিজার হাত কাঁপছিল।
সে টেপ রেকর্ডারটা চালু করল।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর—
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর।
“অদ্রি…”
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করে ফেলল।
সায়ন।
কোনও ভুল নেই।
সায়নই।
“যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনতে পাও, তাহলে বুঝবে পরিকল্পনাটা সফল হয়েছে।”
অদ্রিজা চোখ খুলল।
পরিকল্পনা?
সায়ন বলতে শুরু করল—
“আমি জানি তুমি ভাবছ, আমি তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ভাবছ, আমি তোমাকে ভালোবাসিনি। তুমি হয়তো আমাকে ঘৃণাও করো।”
অদ্রিজার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“কিন্তু সত্যিটা অন্য।”
টেপে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সায়ন বলল—
“বারো বছর আগে যেদিন আমি অদৃশ্য হয়েছিলাম, সেদিন আমি মরিনি।”
অদ্রিজার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
“আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।”
তারপর একটা শব্দ।
মনে হল সায়ন খুব কাছে এসে ফিসফিস করছে।
“কারণ আমি একটা ঘটনা দেখেছিলাম।”
টেপ হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“একটা খুন।”
অদ্রিজার হাত থেকে মোবাইল প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“আমি সেই খুনের সাক্ষী ছিলাম। আর যে মানুষটা খুন করেছিল, সে জানত আমি তাকে দেখেছি।”
অদ্রিজা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
সায়নের কণ্ঠস্বর এবার আরও নিচু।
“লোকটা তোমার পরিচিত।”
অদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“তুমি তাকে খুব বিশ্বাস করো।”
টেপ আবার কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।
তারপর সায়ন বলল—
“অদ্রি, তোমার বাবাকে বিশ্বাস কোরো না।”
অদ্রিজা যেন বজ্রাহত।
তার বাবা?
তার বাবা তো মারা গেছেন আট বছর আগে।
হৃদরোগে।
অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,
“বাবা?”
টেপে সায়নের কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল—
“তোমার বাবা যেদিন মারা যান, তার আগের রাতেই তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।”
অদ্রিজা চেয়ারটা ধরে দাঁড়াল।
“তিনি আমাকে বলেছিলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।”
তারপর—
“কিন্তু সবকিছু শেষ হয়নি।”
টেপের শব্দ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে গেল।
তারপর সায়নের শেষ কথাটা শোনা গেল—
“নীলবাড়ির নিচে যা আছে, সেটা খুঁজে বের করো। সেখানে তোমার বাবার আসল পরিচয় লুকিয়ে আছে।”
টেপ বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরে আবার নীরবতা।
অদ্রিজা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা খামটা খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।
ছবিতে তার বাবা।
সায়ন।
আর সেই অচেনা বৃদ্ধ—নীলাদ্রি।
তিনজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।
ছবির পেছনে লেখা—
“১৭ জুলাই ২০১৪ — শেষ সাক্ষাৎ।”
অদ্রিজার মাথা ঘুরে উঠল।
১৭ জুলাই।
যেদিন সায়ন অদৃশ্য হয়েছিল।
আর আজও—
১৭ জুলাই।
বারো বছর পর ঠিক একই তারিখে তাকে এখানে ডাকা হয়েছে।
এটা কাকতালীয় হতে পারে না।
হঠাৎ করিডোর থেকে একটা শব্দ এল।
কারও পায়ের শব্দ।
অদ্রিজা ঘুরে দাঁড়াল।
“কে?”
কেউ উত্তর দিল না।
তারপর ধীরে ধীরে নীল দরজার বাইরে একটা ছায়া দেখা গেল।
অদ্রিজা পিছিয়ে গেল।
ছায়াটা থামল।
তারপর একজন পুরুষ ঘরে ঢুকল।
অদ্রিজা প্রথমে তাকে চিনতে পারল না।
লোকটির চুলে পাক ধরেছে।
মুখে দাড়ি।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।
কিন্তু চোখদুটো—
অদ্রিজা সেই চোখ চেনে।
বারো বছর ধরে।
সে ফিসফিস করে বলল—
“সায়ন?”
লোকটা কিছু বলল না।
অদ্রিজা এক পা এগিয়ে গেল।
“তুমি… সত্যিই সায়ন?”
লোকটি মাথা তুলল।
তার চোখে জল।
“হ্যাঁ।”
অদ্রিজা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল।
“তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”
সায়ন উত্তর দিল না।
“আমাকে একটা মেসেজ করে বলেছিলে তোমাকে খুঁজতে না। কেন?”
“কারণ তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
“কিসের থেকে?”
সায়ন ধীরে ধীরে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
“যে মানুষটাকে তুমি তোমার বাবা বলে চিনতে, তার থেকে।”
অদ্রিজা মাথা নাড়ল।
“অসম্ভব।”
“আমি জানতাম তুমি বিশ্বাস করবে না।”
“আমার বাবা আমাকে ভালোবাসতেন।”
“হ্যাঁ।”
সায়ন বলল,
“তোমাকে তিনি সত্যিই ভালোবাসতেন।”
অদ্রিজা কিছুটা থমকে গেল।
“তাহলে?”
সায়ন জানালার দিকে তাকাল।
“কিন্তু ভালোবাসা আর সত্যি সবসময় একই জিনিস নয়।”
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ।
সায়ন ধীরে ধীরে বলল,
“তোমার বাবা খুনি ছিলেন না।”
অদ্রিজা চুপ।
“কিন্তু তিনি এমন একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করতেন, যে খুন করেছিল।”
“কে?”
সায়ন তার দিকে তাকাল।
“নীলাদ্রি।”
অদ্রিজা ছবির বৃদ্ধটির দিকে তাকাল।
“কে উনি?”
সায়ন উত্তর দিল,
“তোমার বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।”
“আর তুমি?”
“আমি ছিলাম তাদের দুজনের কাছে একটা ভুল।”
অদ্রিজা বুঝতে পারল না।
সায়ন টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা পুরোনো ডায়েরি বের করল।
“এটা তোমার বাবার।”
অদ্রিজা ডায়েরিটা হাতে নিল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি অদ্রিজা কখনও সত্য জানতে পারে, তাহলে তাকে সবকিছু বলবে। কিন্তু সায়নকে নয়।”
অদ্রিজা থমকে গেল।
“কেন?”
সায়ন বলল,
“কারণ তোমার বাবা জানতেন, আমি সত্যিটা জানলে তোমার জীবন বিপদে পড়বে।”
অদ্রিজা দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
এক জায়গায় এসে তার হাত থেমে গেল।
সেখানে লেখা—
“নীলাদ্রি আমার ভাই নয়। সে আমার শত্রু। কিন্তু অদ্রিজার জন্য আমাকে তার সঙ্গেই থাকতে হয়েছে।”
অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।
“কেন?”
সায়ন বলল,
“কারণ তোমার জন্মের পর থেকেই তোমাকে নিয়ে একটা গোপন বিষয় ছিল।”
“কী বিষয়?”
সায়ন উত্তর দেওয়ার আগেই—
নিচতলা থেকে প্রচণ্ড শব্দ হল।
ধাম!
দুজনেই চমকে উঠল।
তারপর দরজা ভাঙার শব্দ।
সায়ন সঙ্গে সঙ্গে বাতি নিভিয়ে দিল।
“ওরা এসেছে।”
“কারা?”
“যারা বারো বছর আগে আমাকে খুঁজছিল।”
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে সব শেষ।”
সায়ন অন্ধকারে তার হাত ধরল।
“আমি ভুল বলেছিলাম।”
বাইরে ভারী পায়ের শব্দ।
একজন বলল—
“সায়ন! আমরা জানি তুমি এখানে!”
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
সায়ন তার কানে ফিসফিস করে বলল—
“আমার সঙ্গে এসো।”
“কোথায়?”
“নীলবাড়ির নিচে।”
সে ঘরের এক কোণে গিয়ে দেওয়ালের একটা পুরোনো কাঠের প্যানেল সরাল।
তার পেছনে একটা সরু সিঁড়ি।
অদ্রিজা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“এটা কোথায় যায়?”
সায়ন বলল,
“যেখানে তোমার বাবার আসল সত্যি লুকিয়ে আছে।”
দুজনেই নিচে নামতে শুরু করল।
সিঁড়ির শেষে একটা বিশাল লোহার দরজা।
দরজার মাঝখানে তালা।
সায়ন অদ্রিজার হাতে সেই পুরোনো চাবিটা দিল।
“এটা তুমি খুলবে।”
অদ্রিজা চাবিটা তালায় ঢোকাল।
ঘুরল না।
আবার চেষ্টা করল।
না।
সায়ন বলল,
“চাবিটা উল্টো করে ধরো।”
অদ্রিজা চাবিটা উল্টে দিল।
ক্লিক।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে একটা ছোট ঘর।
দেয়ালে অসংখ্য ছবি।
ফাইল।
পুরোনো সংবাদপত্র।
আর মাঝখানে একটা বড় টেবিল।
টেবিলের ওপর একটা বাক্স।
বাক্সের ওপর লেখা—
“অদ্রিজার জন্য।”
অদ্রিজা ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল।
ভেতরে ছিল—
একটা পুরোনো জন্মসনদ।
একটা ছোট্ট রূপার লকেট।
আর একটা চিঠি।
চিঠিটা তার বাবার হাতের লেখা।
অদ্রিজা চিঠিটা খুলল।
প্রথম লাইন—
“অদ্রি, তুমি যাকে তোমার বাবা বলে জানো, সে তোমার বাবা নয়।”
অদ্রিজার চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপর দ্বিতীয় লাইন—
“তোমার আসল বাবা এখনও বেঁচে আছেন।”
সায়ন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল।
অদ্রিজা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
“তুমি জানো উনি কে?”
সায়ন মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“কে?”
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
“নীলাদ্রি।”
অদ্রিজার হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে আবার দরজা ভাঙার শব্দ এল।
আর অন্ধকার ঘরের কোথাও—
একটা পুরোনো ফোন বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
সায়ন ফোনটার দিকে তাকিয়ে বলল—
“অদ্রি… ফোনটা ধরো না।”
অদ্রিজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ফোনটা বাজতেই থাকল।
শেষ পর্যন্ত সে এগিয়ে গেল।
রিসিভার তুলল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একটা বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর—
“অদ্রিজা?”
অদ্রিজার চোখ বড় হয়ে গেল।
এই কণ্ঠস্বর সে চিনতে পারে।
এই কণ্ঠস্বর—
তার বাবার।
ওপাশ থেকে আবার বলা হল—
“আমি জানি তুমি এখন নীলবাড়ির নিচে।”
অদ্রিজা কিছু বলতে পারল না।
“আর সায়ন তোমার সঙ্গে আছে।”
সায়ন ধীরে ধীরে অদ্রিজার কাছ থেকে ফোনটা নিতে এগিয়ে এল।
কিন্তু তার আগেই ওপাশ থেকে শেষ কথাটা ভেসে এল—
“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার সন্তান নয়।”
লাইন কেটে গেল।
ঘর নিস্তব্ধ।
অদ্রিজা সায়নের দিকে তাকাল।
সায়নও তার দিকে তাকিয়ে।
দুজনের চোখে একই প্রশ্ন—
তাহলে আসল সত্যিটা কী?
বাইরে তখন ঝড় শুরু হয়ে গেছে।
আর নীলবাড়ির বহু বছরের বন্ধ দরজার ওপারে—
তাদের অতীত আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
চলবে…