অভীক কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
বাইরে এখনও সেই কণ্ঠ।
“অভীক, দরজা খোলো।”
সৌমীর গলা।
একই স্বর।
একই টান।
কিন্তু ফোনের মেসেজটা তার মাথায় ঘুরছিল—
“দরজা খুলবে না। বাইরে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে সৌমী নয়।”
অভীক জানলার দিকে তাকাল।
খোলা জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে।
ঘরের ভেতর অন্ধকার।
তারপর বাইরে আবার ডাক—
“অভীক, আমি জানি তুমি ভেতরে আছ।”
এবার গলাটা বদলে গেল।
কণ্ঠে আর অনুরোধ নেই।
একটা কঠিন চাপ।
অভীক নিঃশব্দে পিছিয়ে এল।
দরজার নিচ দিয়ে বাইরে আলো দেখা যাচ্ছে।
কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ দরজার হাতল নড়ল।
অভীক বুকের ভেতর সমস্ত শক্তি জমিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর বাইরে পায়ের শব্দ।
তারপর নীরবতা।
অভীক সাহস করে দরজার কাছে গেল না।
প্রায় দশ মিনিট পর ফোনে আরেকটি মেসেজ এল—
“এখন বেরোতে পারো। পিছনের দরজা দিয়ে।”
সে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
বাড়ির পেছনের সরু গলিতে এসে থামতেই দেখল একজন দাঁড়িয়ে।
মাথায় ওড়না।
হাতে ছোট ব্যাগ।
অন্ধকারে মুখ স্পষ্ট নয়।
অভীক ধীরে বলল—
“সৌমী?”
মেয়েটি মাথা তুলল।
চোখে জল।
“হ্যাঁ।”
অভীক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
বারো বছর।
একটা মানুষকে এতদিন পর দেখলে কী বলা উচিত?
“কেমন আছ?”
“ভালো নেই।”
সৌমীর গলায় কোনও অভিযোগ নেই।
শুধু ক্লান্তি।
অভীক বলল,
“বাড়ির সামনে কে ছিল?”
সৌমী বলল,
“আমি জানি না।”
“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
“তোমাকে সাবধান করতে।”
“কিসের?”
সৌমী চারপাশে তাকাল।
তারপর বলল—
“তোমার বাবা যেটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা ওরা খুঁজছে।”
অভীক চমকে গেল।
“কী?”
“তুমি এখনও জানো না?”
“কী জানি না?”
সৌমী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“তোমার বাবার কাছে একটা নথি ছিল।”
“কী নথি?”
“একটা হিসাবের খাতা।”
অভীক মনে করার চেষ্টা করল।
“ব্যবসার?”
“না।”
“তাহলে?”
“শহরের সবচেয়ে বড় জমি-দখল চক্রের হিসাব।”
অভীক স্তব্ধ।
সৌমী তাকে নিয়ে গেল পুরনো শ্মশানের পাশের রাস্তা ধরে।
রাত তখন প্রায় এগারোটা।
রাস্তা ফাঁকা।
দূরে একটা ট্রাকের শব্দ।
অভীক হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“তুমি বারো বছর ধরে কোথায় ছিলে?”
“এই শহরেই।”
“তাহলে আমার সঙ্গে দেখা করোনি কেন?”
সৌমী থামল।
“কারণ তোমার মা আমাকে বলেছিলেন, তোমার থেকে দূরে থাকতে।”
“কেন?”
“কারণ তোমাকে বাঁচাতে।”
অভীক তিক্তভাবে হাসল।
“সবাই আমাকে বাঁচাতে চেয়েছে। অথচ কেউ আমাকে কিছু বলেনি।”
সৌমী মাথা নিচু করল।
“তোর বাবা মারা যাওয়ার পর তুই যদি সেদিন সত্যিটা জানতে পারতি, তুই হয়তো বেঁচে থাকতিস না।”
“কী সত্যি?”
“যে লোকটার সঙ্গে তোর বাবা দেখা করতে গিয়েছিল, সে প্রতাপশালী ব্যবসায়ী নয়।”
“কে?”
“একজন সরকারি ঠিকাদার।”
অভীক থামল।
“নাম?”
সৌমী বলল—
“সুশান্ত ধর।”
অভীক নামটা চিনতে পারল না।
সৌমী বলল,
“এখন শহরের বাইরে বড় নির্মাণ ব্যবসা করে।”
“আর আমার বাবার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?”
“তোমার বাবা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করছিলেন।”
“কী প্রমাণ?”
“সরকারি রাস্তা আর সেতু নির্মাণের টাকা আত্মসাৎ।”
অভীক চুপ।
সৌমী বলল,
“কিন্তু বিষয়টা শুধু টাকা ছিল না।”
“আর কী?”
“যে গ্রামগুলোকে রাস্তা বানানোর নামে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তাদের জমির কাগজ জাল করা হয়েছিল।”
“আমার বাবা সেটা জানতে পেরেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাই তাঁকে মেরে ফেলা হয়?”
সৌমী সরাসরি উত্তর দিল না।
“তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগের দিন আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।”
অভীক অবাক।
“তোমার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“তিনি একটা খাম দিয়েছিলেন।”
“কোথায় সেটা?”
সৌমী ব্যাগ থেকে একটি পুরনো কাপড়ে মোড়া খাম বের করল।
“এটা।”
অভীক খামটা নিল।
তার বাবার হাতের লেখা।
“সৌমীর কাছে নিরাপদ।”
অভীকের চোখে জল এসে গেল।
“তুমি এতদিন এটা রেখেছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে দাওনি কেন?”
সৌমী বলল,
“কারণ তোর বাবা বলেছিলেন—‘অভীক যখন নিজে ফিরে আসবে, তখনই দেবে।’”
খামের ভেতরে ছিল একটা ছোট্ট ডায়েরি।
পাতাগুলো খুব পুরনো।
প্রথম পাতায়—
“মাধবডাঙা প্রকল্প — ব্যক্তিগত নোট।”
অভীক পড়তে শুরু করল।
প্রথম কয়েকটি পাতায় বিভিন্ন জমির নম্বর।
তারিখ।
মানুষের নাম।
কোথায় কত টাকা দেওয়া হয়েছে।
কোন অফিসে কোন কাগজ বদলানো হয়েছে।
কিন্তু শেষের পাতাগুলোতে লেখা ছিল অন্যরকম।
“সবচেয়ে বড় ভুল—আমি যাকে বিশ্বাস করেছি, সে-ই তথ্য পাচার করছে।”
তার নিচে একটি নাম।
নামটা কেটে দেওয়া।
আবার লেখা।
আবার কাটা।
শেষে শুধু একটি অক্ষর—
“স”
অভীক বলল,
“সুশান্ত?”
সৌমী বলল,
“সম্ভব।”
পরের পাতায়—
“আমার মৃত্যুর পর যদি অভীক ফিরে আসে, তাকে সত্যিটা জানাতে হবে।”
অভীকের হাত থেমে গেল।
তারপর—
“কিন্তু তাকে বলবে না যে তার মা সব জানতেন।”
অভীক সৌমীর দিকে তাকাল।
“আমার মা?”
সৌমী ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“মা কী জানতেন?”
“তোর বাবার সঙ্গে কী ঘটেছিল।”
“তাহলে আমাকে বলেননি কেন?”
সৌমী বলল,
“কারণ তোর মা বিশ্বাস করতেন, সত্যিটা জানলে তুই বাবার মতোই বিপদে পড়বি।”
অভীক ডায়েরিটা বন্ধ করল।
“আমি আর কিছু শুনতে চাই না।”
সৌমী বলল,
“তুই চাই বা না চাই, সত্যিটা তোকে খুঁজে নিয়েছে।”
পরদিন সকালে অভীক মায়ের পুরনো আলমারি খুলল।
সে জানত, মায়ের কিছু জিনিস এখনও আছে।
শাড়ি।
পুরনো চিঠি।
একটা ছোট্ট মন্দির।
আর একটি লাল কাপড়ে বাঁধা পুঁটলি।
পুঁটলিটা খুলতেই একটি পুরনো হাসপাতালের কাগজ পেল।
তারিখ—
দুর্ঘটনার আগের দিন।
নাম—
সুশান্ত ধর।
হাসপাতালের কাগজে লেখা—
“হালকা আঘাত।”
অভীক অবাক।
তারপর নিচে মায়ের হাতের লেখা—
“ওকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। ও জানে কে অরুণকে মেরেছে।”
অভীক চেয়ারে বসে পড়ল।
সুশান্ত ধর তখন আহত ছিল।
আর মা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন?
কেন?
সে আরও খুঁজতে লাগল।
একটা পুরনো প্রেসক্রিপশনের পিছনে লেখা—
“অরুণের মৃত্যুর রাতে সুশান্ত ঘটনাস্থলে ছিল। কিন্তু সে খুনি নয়।”
অভীক যেন কিছুতেই বুঝতে পারছে না।
তাহলে—
খুনি কে?
সেদিন দুপুরে সে সুশান্ত ধরকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিল।
ইন্টারনেট, পুরনো সংবাদপত্র, ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রি—সব ঘেঁটে তার বর্তমান ঠিকানা বের করল।
মাধবডাঙা থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটি শিল্পাঞ্চলে তার অফিস।
অভীক সেখানে পৌঁছতেই নিরাপত্তারক্ষী তাকে থামাল।
“কাকে চান?”
“সুশান্ত ধরকে।”
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”
“না।”
“তাহলে দেখা হবে না।”
অভীক পকেট থেকে বাবার পুরনো ছবি বের করল।
“এই মানুষটাকে চিনতেন?”
নিরাপত্তারক্ষী ছবির দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে গেল।
তারপর বলল,
“উপরের অফিসে যান।”
অভীক অবাক।
“আপনি আমাকে যেতে দিচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
উপরে উঠে সে একটি বড় কাচঘেরা অফিসে ঢুকল।
সুশান্ত ধর জানলার পাশে দাঁড়িয়ে।
বয়স প্রায় ষাট।
চুল সাদা।
মুখে ক্লান্তি।
অভীক ঢুকতেই তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
সুশান্ত ধীরে বললেন,
“অবশেষে তুই এলি।”
অভীক থমকে গেল।
“আপনি আমাকে চিনতেন?”
“তোর বাবাকে চিনতাম।”
“আমাকে?”
“তোর জন্মের আগ থেকেই।”
অভীক রাগে বলল,
“আমার বাবাকে কে মেরেছিল?”
সুশান্ত চুপ।
“বলুন!”
“তোর বাবা আমাকে সন্দেহ করেছিল।”
“আপনি কি তাঁকে মেরেছিলেন?”
“না।”
“তাহলে কে?”
সুশান্ত জানলার বাইরে তাকালেন।
“তুই সত্যিই জানতে চাস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আগে একটা কথা মেনে নে।”
“কী?”
“তোর বাবা যে মানুষটাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন, সেই মানুষটাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।”
অভীক স্তব্ধ।
“কে?”
সুশান্ত একটা ড্রয়ার খুলে পুরনো ফাইল বের করলেন।
“এখানে সব আছে।”
ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন—
“কিন্তু এটা পড়ার আগে একটা কথা মনে রাখিস।”
“কী?”
“সত্যিটা জানার পর তুই হয়তো আর কাউকে নিজের বলে ভাবতে পারবি না।”
অভীক ফাইল খুলল।
প্রথম পাতায় একটি ছবি।
তার বাবা।
সৌমী।
সুশান্ত।
আর—
অভীকের মা।
কিন্তু ছবির পেছনে লেখা—
“অরুণকে যে তথ্য দিয়েছিল, সে ছিল আমাদের দলের একজন।”
অভীক পাতাটা উল্টাল।
পরের পাতায় একটি নাম।
সে নাম দেখে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ সেই নামটি—
নির্মল কাকা।
যাকে সৌমী বলেছিল তার বাবার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।
অভীক ফিসফিস করে বলল,
“নির্মল কাকা?”
সুশান্ত বললেন,
“হ্যাঁ।”
“তিনি কোথায়?”
“চরবাঁশি।”
অভীক তাকাল।
সুশান্ত বললেন,
“কিন্তু তুই সেখানে যাওয়ার আগে এটা দেখ।”
তিনি একটি ভিডিও চালু করলেন।
পুরনো সিসিটিভি ফুটেজ।
তারিখ—
বারো বছর আগের সেই রাত।
রাস্তার পাশে একটা গাড়ি।
অরুণ গাড়ি থেকে নামছেন।
তারপর আরেকজন আসে।
মুখ পরিষ্কার নয়।
অরুণ তার সঙ্গে কথা বলছেন।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা মোটরবাইক আসে।
দুজন লোক নামে।
একজন অরুণের দিকে যায়।
অন্যজন রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর স্ক্রিন কেঁপে ওঠে।
ভিডিও বন্ধ।
সুশান্ত বললেন,
“এটাই শেষ ফুটেজ।”
অভীক বলল,
“এতে তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।”
“ভালো করে দেখ।”
অভীক আবার চালাল।
এইবার সে লক্ষ্য করল—
মোটরবাইকের পেছনের নম্বরপ্লেট।
সে নম্বরটা লিখে নিল।
সুশান্ত বললেন,
“ওই বাইকটা নির্মলের নামে ছিল।”
অভীক চুপ।
“কিন্তু একটা সমস্যা আছে।”
“কী?”
“সেই রাতে নির্মল শহরেই ছিল না।”
অভীক বলল,
“তাহলে বাইক?”
সুশান্ত ধীরে বললেন—
“বাইকটা চালাচ্ছিল অন্য কেউ।”
“কে?”
সুশান্ত উত্তর দেওয়ার আগেই দরজা খুলে গেল।
সৌমী ছুটে ঢুকল।
তার মুখ সাদা।
“অভীক, এখান থেকে এখনই বেরোতে হবে।”
“কেন?”
“নির্মল কাকা মাধবডাঙায় ফিরেছে।”
অভীক চমকে উঠল।
“কী?”
সৌমী বলল,
“আর সে জানে তুমি সব জানতে পেরেছ।”
সুশান্ত উঠে দাঁড়ালেন।
“দেরি হয়ে গেছে।”
ঠিক তখনই নিচে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ির ব্রেকের শব্দ শোনা গেল।
সুশান্ত জানলার কাছে গিয়ে নিচে তাকালেন।
তার মুখের রং বদলে গেল।
“ওরা এসেছে।”
“কারা?”
সুশান্ত ধীরে বললেন—
“যাদের বিরুদ্ধে তোর বাবা প্রমাণ রেখেছিল।”
সৌমী অভীকের হাত ধরে টানল।
“পেছনের সিঁড়ি দিয়ে বেরোও।”
তিনজন ছুটে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু সিঁড়ির মাঝপথে অভীক থেমে গেল।
দেয়ালে একটা পুরনো ছবি ঝুলছে।
ছবিতে সুশান্ত, অরুণ, নির্মল—
আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন।
অভীক লোকটাকে দেখে জমে গেল।
কারণ সে লোকটাকে আজ সকালে নিজের বাড়ির সামনে দেখেছিল।
সেই মানুষ—
যে বারো বছর পরেও তাকে অনুসরণ করছে।
ছবির নিচে লেখা—
“মাধবডাঙা উন্নয়ন সমিতি — ২০০৯।”
আর ছবির একেবারে ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির নাম—
অরুণ মুখোপাধ্যায়।
অভীকের বাবা।
কিন্তু তার বাবার পাশে দাঁড়ানো আরেকজনকে দেখে তার মনে হলো—
সে মানুষটাকে সে চেনে।
খুব ভালো করে চেনে।
অভীক ফিসফিস করে বলল—
“এটা অসম্ভব…”
সৌমী জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে?”
অভীক ছবির দিকে তাকিয়ে বলল—
“এই মানুষটা তো…”
সে বাক্য শেষ করার আগেই বাইরে গুলির শব্দ হলো।
সুশান্ত চিৎকার করলেন—
“নিচু হও!”
সৌমী অভীককে মেঝেতে ফেলে দিল।
জানলার কাচ ভেঙে গেল।
আর সেই মুহূর্তে অভীক বুঝল—
বারো বছর আগে তার বাবার মৃত্যু যেখানে থেমেছিল, আজকের রাত থেকে সেই গল্প আবার শুরু হয়েছে।
চলবে…