Categories
গল্প বিবিধ

বাঁশের ফাঁকে দেখা আকাশ।।

বেলতলা গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় একটা ছোট্ট বাড়িতে থাকত কেয়া।

বয়স তার মাত্র ষোলো।

বাবা অনেকদিন আগে মারা গিয়েছেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু কেয়ার স্বপ্নের অভাব ছিল না।

তাদের বাড়ির পেছনে একটা পুরোনো বাঁশঝাড় ছিল।

সেই বাঁশঝাড় থেকেই বাঁশ কেটে কেয়ার মা ছোট ছোট ঝুড়ি, কুলো আর ডালা বানাতেন।

কাজটা শিখেছিলেন তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে।

কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের ঝুড়ি আসার পর বাঁশের জিনিসের চাহিদা কমে গিয়েছিল।

একদিন মা একটা অর্ধেক তৈরি ঝুড়ি হাতে নিয়ে বললেন,

—এগুলো আর কেউ কিনতে চায় না রে।

কেয়া বলল,

—তাহলে নতুন কিছু বানাও।

মা হেসে বললেন,

—নতুন কী?

কেয়া ঝুড়িটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখল।

—এটা শুধু ঝুড়ি নয়। এটা দিয়ে আরও কত কিছু বানানো যায়।

—যেমন?

কেয়া উত্তর দিল,

—আমি জানি না। ভাবব।


পরদিন স্কুল থেকে ফিরে কেয়া মায়ের পাশে বসে বাঁশের সরু ফালি হাতে নিল।

মা বললেন,

—আঙুল কেটে যাবে।

—শিখব।

—তোর পড়াশোনা?

—সেটাও করব।

প্রথম দিন কেয়ার বানানো জিনিসটা এতটাই বেঁকে গেল যে দেখে মা হেসে ফেললেন।

কেয়াও হাসল।

—কী হয়েছে?

—এটা ঝুড়ি না, হাঁসের বাসা।

কেয়া বলল,

—তাহলে হাঁসের বাসা হিসেবেই বিক্রি করব।

দুজনেই হেসে উঠল।

কিন্তু কেয়া ছাড়ল না।

দিনের পর দিন সে শিখতে লাগল।

বাঁশের ফালি কতটা সরু হবে।

কোথায় চাপ দিতে হবে।

কোন অংশ ভিজিয়ে নরম করতে হবে।

কীভাবে গোল বাঁক তৈরি করতে হয়।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার হাতেও কাজ আসতে শুরু করল।


একদিন স্কুলে শিল্পশিক্ষার শিক্ষক অনিরুদ্ধ স্যার বললেন,

—তোমাদের বাড়িতে কেউ হাতের কাজ করে?

কেয়া হাত তুলল।

—আমার মা।

—কী কাজ?

—বাঁশের জিনিস বানান।

স্যার বললেন,

—কিছু নিয়ে আসতে পারবে?

পরদিন কেয়া একটা ছোট বাঁশের কলমদানি নিয়ে এল।

স্যার সেটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন।

—এটা কে বানিয়েছে?

—আমি।

স্যার অবাক হলেন।

—তুমি?

কেয়া মাথা নাড়ল।

স্যার বললেন,

—এটা শুধু কলমদানি নয়। এটা একটা গল্প।

কেয়া বুঝল না।

স্যার বললেন,

—তোমার গ্রামের পুরোনো একটা কাজ তুমি নিজের হাতে বাঁচিয়ে রাখছ। এটাকে আরও ভালোভাবে শেখো।

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় কেয়ার মনে হল, তাদের কাজটা হয়তো এত ছোট নয়।


কেয়া নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।

সে বাঁশ দিয়ে ছোট ব্যাগ বানাল।

তারপর মোবাইল রাখার কভার।

বই রাখার ঝুড়ি।

ফুল রাখার পাত্র।

দেওয়ালে ঝোলানোর সাজসজ্জার জিনিস।

এমনকি ছোট্ট একটা গোল আয়নার চারপাশেও বাঁশের নকশা বসাল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—এত কিছু মাথায় আসে কী করে?

কেয়া হেসে বলল,

—বাঁশের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখি তো!

মা বুঝতে পারলেন না।

কেয়া বলল,

—বাঁশের গাছের দিকে তাকালে তো শুধু বাঁশ দেখা যায়। কিন্তু একটু ফাঁক দিয়ে তাকালে আকাশ দেখা যায়। কাজটাকেও তেমন করে দেখতে হয়।

মা চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।


কেয়া তার বানানো জিনিস নিয়ে গ্রামের সাপ্তাহিক হাটে গেল।

প্রথম দিন কেউ তেমন কিনল না।

একজন দোকানি বললেন,

—প্লাস্টিকের জিনিস পঞ্চাশ টাকায় পাওয়া যায়। এগুলো কিনবে কে?

কেয়া কিছু বলল না।

দুপুর পর্যন্ত বসে থাকল।

শেষে একজন বৃদ্ধা এসে একটা ছোট বাঁশের ঝুড়ি কিনলেন।

তিনি বললেন,

—আমার নাতনির জন্য।

সেটাই ছিল সেদিনের একমাত্র বিক্রি।

কেয়া বাড়ি ফিরে মাকে বলল,

—একটা বিক্রি হয়েছে।

মা খুশি হয়ে বললেন,

—তাহলে আজ আমাদের উৎসব।

কেয়া বলল,

—একটা জিনিস বিক্রি হয়েছে বলে উৎসব?

মা উত্তর দিলেন,

—হ্যাঁ। কারণ প্রথম পা-টা সবসময় সবচেয়ে কঠিন।


কিছুদিন পর কেয়া স্কুলের বন্ধুদের সাহায্যে তার কাজের ছবি তুলতে শুরু করল।

বন্ধু রিমি বলল,

—অনলাইনে দিলে কেমন হয়?

কেয়া বলল,

—আমরা পারব?

—শিখব।

তারা মোবাইলে ছবি তুলল।

প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে লিখল—

‘বেলতলার বাঁশের কাজ—হাতে তৈরি।’

প্রথম সপ্তাহে কোনও অর্ডার এল না।

দ্বিতীয় সপ্তাহেও না।

তৃতীয় সপ্তাহে একটা ফোন এল।

কলকাতা থেকে একজন মহিলা কথা বললেন।

—আপনাদের বাঁশের ঝুড়ি কি সত্যিই হাতে তৈরি?

কেয়া বলল,

—হ্যাঁ।

—দশটা দিতে পারবেন?

কেয়া উত্তেজনায় মায়ের দিকে তাকাল।

—পারব।

ফোন কেটে যাওয়ার পর মা বললেন,

—কিন্তু দশটা!

কেয়া বলল,

—আমরা বানাব।


তারপর শুরু হল দিনরাত কাজ।

মা বাঁশ কাটতেন।

কেয়া ফালি করত।

পাড়ার আরও দুজন মহিলা এসে যোগ দিলেন।

কেউ বুনতেন।

কেউ কিনারা বাঁধতেন।

কেউ পালিশ করতেন।

একসময় কাজটা শুধু কেয়া আর তার মায়ের রইল না।

পুরো পাড়ার কয়েকটি পরিবার যুক্ত হয়ে গেল।

যে কাজ একসময় লোকসানের বলে সবাই ছেড়ে দিতে চাইছিল, সেই কাজেই আবার মানুষের আগ্রহ তৈরি হল।


কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে সমস্যা এল।

একদিন প্রচণ্ড ঝড়ে বাঁশঝাড়ের অনেকটা অংশ ভেঙে পড়ল।

পরদিন সকালে কেয়া ছুটে গিয়ে দেখল, বহু বাঁশ মাটিতে পড়ে আছে।

তার চোখে জল এসে গেল।

মা বললেন,

—সব শেষ হয়ে গেল নাকি?

কেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—না।

—কীভাবে?

—যে বাঁশগুলো পড়ে গেছে, সেগুলোই তো এখন আমাদের কাজের উপকরণ।

মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন।

—তুই সত্যিই বদলে গেছিস।

কেয়া বলল,

—না মা। আমি শুধু জিনিসগুলোকে অন্যভাবে দেখতে শিখেছি।


কয়েক মাস পরে বেলতলায় একটা ছোট কারুশিল্প মেলা হল।

কেয়াদের স্টলে নানা রকম বাঁশের জিনিস সাজানো।

দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এল।

একজন শহরের ব্যবসায়ী এসে কেয়ার কাজ দেখে বললেন,

—তোমরা কি নিয়মিত সরবরাহ করতে পারবে?

কেয়া বলল,

—পারব।

—কতজন কাজ করেন?

কেয়া চারপাশে তাকিয়ে বলল,

—আগে দুজন ছিলাম।

—এখন?

কেয়া হাসল।

—এখন পুরো পাড়া।

ব্যবসায়ী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।


বছরখানেক পর কেয়া স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের মহিলাদের নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করল।

নাম দিল—

‘বাঁশের ফাঁকে আকাশ।’

দলের নিয়ম ছিল—যে শিখবে, সে অন্য একজনকে শেখাবে।

কেয়ার মা বললেন,

—তুই তো এখন শিক্ষক হয়ে গেলি।

কেয়া হেসে বলল,

—তুমি আমাকে শিখিয়েছিলে।

মা বললেন,

—আমি তো শুধু বাঁশ বুনতে শিখিয়েছিলাম।

কেয়া মায়ের হাত ধরে বলল,

—তুমি আমাকে ধৈর্য বুনতে শিখিয়েছিলে।

সন্ধ্যায় দুজনে বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়ের সামনে দাঁড়াল।

সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে।

বাঁশের সরু ফাঁক দিয়ে আকাশের শেষ আলো দেখা যাচ্ছে।

মা বললেন,

—তুই ছোটবেলায় বলেছিলি, বাঁশের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়।

কেয়া মৃদু হেসে বলল,

—এখনও যায়।

—তাহলে বল তো, ওই আকাশে কী দেখিস?

কেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—সুযোগ।

মা অবাক হলেন।

কেয়া বলল,

—জীবনে চারপাশে যত বাঁশের বেড়াই থাকুক, একটু ফাঁক খুঁজে নিতে পারলে আকাশ দেখা যায়।

মা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।

দূরে তখন বাঁশপাতা বাতাসে দুলছিল।

মনে হচ্ছিল, পুরো বাঁশঝাড়টাই যেন কেয়ার কথার সঙ্গে একমত।

আর সেই দিন থেকে বেলতলার মানুষ একটা কথা বলতে শুরু করল—

‘যে মানুষ বাঁশের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখতে পারে, তার কাছে কোনও ছোট কাজই ছোট নয়।’

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *