Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা: কুসংস্কারমুক্ত চিন্তাই উন্নতির প্রধান চাবিকাঠি।

মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাস আসলে জ্ঞান, যুক্তি, অনুসন্ধান এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের ইতিহাস। একসময় মানুষ প্রকৃতির নানা ঘটনা দেখে বিস্মিত হতো, কিন্তু সেগুলির কারণ বুঝতে পারত না। বজ্রপাত, গ্রহণ, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অনেক সময় অলৌকিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই মানুষ আজ মহাকাশ অনুসন্ধান করছে, জটিল রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করছে এবং যোগাযোগ ও পরিবহণের ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি ঘটাচ্ছে।

তবুও আধুনিক সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও সর্বত্র বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠেনি। এখনও অনেক মানুষ গুজব, অন্ধবিশ্বাস এবং ভিত্তিহীন ধারণার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেন। কখনও কুসংস্কারের কারণে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়, কখনও ভুয়ো তথ্যের প্রভাবে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। তাই শুধু বিজ্ঞান শেখা নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তি, প্রমাণ এবং মানবিকতার ভিত্তিতে চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

বিজ্ঞানমনস্কতা বলতে কী বোঝায়?

বিজ্ঞানমনস্কতা বলতে শুধু বিজ্ঞান বই পড়া কিংবা বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা বোঝায় না। এর মূল কথা হল কোনও বিষয়কে প্রশ্ন করার সাহস রাখা, প্রমাণ খোঁজা, যুক্তির সাহায্যে বিচার করা এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে নিজের ধারণা সংশোধন করতে প্রস্তুত থাকা।

একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ কোনও বক্তব্যকে শুধু বক্তার পরিচিতি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা জনপ্রিয়তার কারণে সত্য বলে মেনে নেন না। তিনি জানতে চান, বক্তব্যটির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে এবং তা কীভাবে যাচাই করা যায়।

বিজ্ঞানমনস্কতার অর্থ সব কিছুকে অস্বীকার করাও নয়। কোনও বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হলে অনুসন্ধান চালানো এবং প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এর বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতাও বিজ্ঞানমনস্কতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে কেবল প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে না; ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনীতি এবং নাগরিক দায়িত্বের ক্ষেত্রেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের সমস্যা

প্রত্যেক সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি, লোকাচার এবং ঐতিহ্য রয়েছে। বহু ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক সংহতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু কোনও প্রথা যদি মানুষের ক্ষতি করে, ভয় সৃষ্টি করে কিংবা যুক্তি ও প্রমাণের বিরোধিতা করে, তাহলে সেটিকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন।

কুসংস্কার অনেক সময় মানুষের অনিশ্চয়তা ও ভয়কে কাজে লাগায়। অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা, পরীক্ষায় ব্যর্থতা কিংবা আর্থিক সংকটের সময় মানুষ দ্রুত সমাধান খোঁজেন। সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যক্তি অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করে অর্থ আদায় করতে পারেন।

কখনও গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে অপ্রমাণিত পদ্ধতির উপর নির্ভর করা হয়। আবার কখনও কোনও বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অশুভ বলে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা হয়। এই ধরনের আচরণ ব্যক্তির অধিকার, মর্যাদা এবং নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।

কুসংস্কার দূর করতে মানুষের বিশ্বাসকে অপমান করা সমাধান নয়। বরং সম্মানজনক আলোচনা, সঠিক তথ্য, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে ভুল ধারণা সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।

শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্তিনির্ভর চিন্তার গুরুত্ব

বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হল শিক্ষা। বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং নিজের যুক্তি ব্যাখ্যা করতে উৎসাহ দেওয়া দরকার।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়। একজন শিক্ষার্থী কেন একটি ঘটনা ঘটছে, তার কারণ কী এবং অন্য কোনও ব্যাখ্যা সম্ভব কি না—এই প্রশ্নগুলি করতে শিখলে তার চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে।

বিজ্ঞানের ক্লাসে শুধু সংজ্ঞা মুখস্থ করানোর পরিবর্তে ছোট ছোট পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উদ্ভিদের বৃদ্ধি, জলের বাষ্পীভবন, চুম্বকের ধর্ম কিংবা আলোর প্রতিফলনের মতো বিষয় হাতে-কলমে শেখালে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলি সহজে বুঝতে পারে।

একই সঙ্গে ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য এবং সমাজবিজ্ঞানের পাঠেও তথ্য যাচাই, উৎস বিশ্লেষণ ও যুক্তিপূর্ণ আলোচনার সুযোগ থাকা উচিত। বিজ্ঞানমনস্কতা কোনও একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি চিন্তা করার একটি পদ্ধতি।

শিক্ষকদেরও এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভুল উত্তর দেওয়ার ভয়ে প্রশ্ন করা বন্ধ করবে না। যুক্তিপূর্ণ প্রশ্নকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হলে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। বরং ভুলের কারণ বুঝিয়ে দিয়ে সঠিক ধারণায় পৌঁছনোর সুযোগ করে দেওয়া উচিত।

ডিজিটাল যুগে ভুয়ো তথ্যের বিস্তার

ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের হাতে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের খবর জানা সম্ভব। কিন্তু তথ্যের এই সহজলভ্যতার পাশাপাশি বেড়েছে ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর ছবি, সম্পাদিত ভিডিও এবং ভিত্তিহীন দাবির প্রচার।

অনেক সময় কোনও বার্তার সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম বা আবেগপ্রবণ বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়। মানুষ বিষয়টির সত্যতা যাচাই না করেই সেটি অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেন। এর ফলে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। কোনও খবর দেখলে প্রথমে তার উৎস পরীক্ষা করা উচিত। সংবাদটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কি না, ঘটনার তারিখ ও স্থান ঠিক আছে কি না এবং অন্য বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা দরকার।

ছবি বা ভিডিও দেখেই কোনও ঘটনা সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়ানো হতে পারে, আবার ভিডিওর কিছু অংশ বাদ দিলে তার অর্থও বদলে যেতে পারে।

বিশেষ করে ধর্ম, জাতি, রাজনীতি কিংবা জননিরাপত্তা সম্পর্কিত উত্তেজনাপূর্ণ বার্তা শেয়ার করার আগে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনও তথ্য যাচাই করা না গেলে সেটিকে সত্য বলে প্রচার না করাই দায়িত্বশীল আচরণ।

বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যসচেতনতা

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিজ্ঞানমনস্কতার গুরুত্ব অপরিসীম। রোগের কারণ বোঝা, সঠিক রোগনির্ণয়, প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু এখনও অনেক ক্ষেত্রে রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা মানুষের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে। কেউ কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ গ্রহণ করেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা পরামর্শকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। এই প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে।

কোনও রোগের লক্ষণ দেখা দিলে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা, অন্যের ওষুধ ব্যবহার করা কিংবা অপ্রমাণিত চিকিৎসাপদ্ধতির উপর নির্ভর করা উচিত নয়।

টিকাকরণ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ পানীয় জল, পুষ্টিকর খাদ্য এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার মতো বিষয়েও সঠিক তথ্য জানা দরকার। স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচার এমনভাবে করা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ সহজ ভাষায় তথ্য বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

বিজ্ঞানমনস্কতা মানুষকে অন্ধভাবে কোনও দাবি বিশ্বাস না করতে শেখায়। তবে এর অর্থ চিকিৎসা বা বিশেষজ্ঞদের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও যোগ্য পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক সমতা

বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা সামাজিক বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করতে পারে। সমাজে বহুদিন ধরে চলে আসা কিছু ধারণা মানুষের জন্মপরিচয়, পেশা, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে তাদের যোগ্যতা নির্ধারণ করার চেষ্টা করে।

যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়, কোনও মানুষের মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর কাজ, আচরণ, দক্ষতা এবং মানবিক গুণাবলিকে গুরুত্ব দিতে হবে। জন্মপরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের কারণে কাউকে ছোট করে দেখা যুক্তিসংগত নয়।

নারী ও পুরুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ থাকা জরুরি। একইভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করাও উন্নত সমাজের অন্যতম শর্ত।

বিজ্ঞানমনস্কতা একা সব সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু তথ্যভিত্তিক আলোচনা, বৈষম্যমূলক ধারণার সমালোচনা এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মান গড়ে তুলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিবেশ রক্ষায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং জীববৈচিত্র্যের উপর। বায়ুদূষণ, জলদূষণ, বন ধ্বংস, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সমস্যাগুলি মোকাবিলা করতে বৈজ্ঞানিক তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

কোনও নদীর জল দূষিত হলে তার কারণ নির্ণয় করতে হবে। শিল্পবর্জ্য, নিকাশি, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক কিংবা অন্যান্য দূষণকারী উপাদানের ভূমিকা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। শুধু অনুমান বা আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন।

একইভাবে কোনও অঞ্চলে গরম বাড়ছে কিংবা বৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন হচ্ছে বলে দাবি করা হলে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সাহায্যে বিষয়টি বোঝা দরকার।

পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত অভ্যাসের পাশাপাশি প্রশাসনিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা প্রয়োজন। বিজ্ঞানমনস্ক নাগরিকরা পরিবেশগত সমস্যার কারণ বুঝতে এবং প্রমাণভিত্তিক সমাধানের দাবি তুলতে সক্ষম হন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার

বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক চিকিৎসা এবং ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার সব সময় মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে না। ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে প্রযুক্তি গোপনীয়তা লঙ্ঘন, প্রতারণা, বৈষম্য এবং পরিবেশগত সমস্যার কারণ হতে পারে।

তাই নতুন প্রযুক্তিকে শুধু আকর্ষণীয় বা আধুনিক বলে গ্রহণ না করে তার সুবিধা, সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বোঝা দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি তথ্যও ভুল হতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা জরুরি।

বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ এবং সাধারণ নাগরিকদেরও প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। প্রযুক্তি যেন মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

বিজ্ঞানমনস্কতার বিকাশ শুধু বিদ্যালয় বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। পরিবার থেকেই শিশুর প্রশ্ন করার অভ্যাস তৈরি হয়। শিশু যখন কোনও অজানা বিষয় সম্পর্কে জানতে চায়, তখন তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তার কৌতূহলকে উৎসাহিত করা উচিত।

সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে জানা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে বড়রা বলতে পারেন যে বিষয়টি তাঁরা জানেন না, তবে একসঙ্গে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খুঁজে দেখা যেতে পারে। এতে শিশুরা বুঝতে শেখে যে না জানা কোনও লজ্জার বিষয় নয়; বরং শেখার সুযোগ।

গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানকেন্দ্র, বিজ্ঞানমেলা, আলোচনা সভা এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ানো যায়। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছেও সহজ ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

স্থানীয় ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা বাড়লে আরও বেশি মানুষ জটিল বিষয় সহজে বুঝতে পারবেন। বিজ্ঞানকে কেবল বিশেষজ্ঞদের বিষয় হিসেবে না দেখে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করতে হবে।

যুক্তিবাদ ও মানবিকতার সমন্বয়

বিজ্ঞানমনস্কতার সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক গভীর। যুক্তি আমাদের কোনও ঘটনার কারণ বুঝতে সাহায্য করে, আর মানবিকতা শেখায় সেই জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতে।

কেউ ভুল ধারণায় বিশ্বাস করলে তাঁকে অপমান বা উপহাস করে সংশোধন করা কঠিন হতে পারে। বরং ধৈর্য ধরে তাঁর বক্তব্য শোনা, উপযুক্ত প্রমাণ দেখানো এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বেশি কার্যকর।

একই সঙ্গে যুক্তির নামে মানুষের অনুভূতি, সংস্কৃতি কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়। বিজ্ঞানমনস্ক সমাজের লক্ষ্য মানুষের বিশ্বাসকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেওয়া এবং ক্ষতিকর ভুল ধারণা সম্পর্কে সচেতন করা।

মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আলোচনা যেন ঘৃণা, হিংসা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না হয়। তথ্য, যুক্তি এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে মতবিনিময় করলে সমাজে সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হয়।

উপসংহার

বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রক্রিয়া। এর জন্য শুধু বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যক্রম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বাধীন চিন্তা, প্রশ্ন করার অধিকার, নির্ভরযোগ্য তথ্যের সহজলভ্যতা এবং ভুল স্বীকার করার মানসিকতা।

পরিবারে শিশুদের কৌতূহলকে সম্মান করা, বিদ্যালয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা চালু করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই করা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বাড়ানো—এই ছোট ছোট পদক্ষেপ সমাজে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্ধবিশ্বাস ও গুজব মানুষের বিচারবুদ্ধিকে দুর্বল করে, আর যুক্তিনির্ভর চিন্তা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে সাহায্য করে। কোনও বক্তব্য জনপ্রিয় হলেই তা সত্য নয়, আবার কোনও ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত থাকলেই তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিটি বিষয়কে তার প্রমাণ, যুক্তি এবং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করতে শেখা দরকার।

প্রশ্ন করার সাহস, প্রমাণ খোঁজার অভ্যাস এবং সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতাই বিজ্ঞানমনস্কতার মূল ভিত্তি। এই মূল্যবোধকে শিক্ষা, পরিবার ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে কুসংস্কারমুক্ত, মানবিক, যুক্তিবাদী এবং প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *