Categories
অনুগল্প

ভুল ঠিকানার পার্সেল।

গ্রামের ছোট্ট ডাকঘরটায় পোস্টমাস্টার ছিলেন দেবাশিসবাবু।

বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে। তবু প্রতিদিন সকাল ন’টায় তিনি ঠিক সময়ে ডাকঘরের দরজা খুলতেন।

সেদিনের ডাকের মধ্যে একটি অদ্ভুত পার্সেল ছিল।

ঠিকানায় লেখা—

“শিউলি দাস,
পশ্চিমপাড়া,
বটতলা সংলগ্ন বাড়ি।”

সমস্যা হল, পশ্চিমপাড়ায় শিউলি দাস নামে কেউ নেই।

দেবাশিসবাবু গ্রামের পুরনো তালিকা দেখলেন।

কোথাও নাম নেই।

তিনি পার্সেলটা আলাদা করে রেখে দিলেন।

তিন দিন পরেও কেউ এল না।

চতুর্থ দিন এক বৃদ্ধ ডাকঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন,

—“শিউলি দাসের নামে কোনও পার্সেল এসেছে?”

দেবাশিসবাবু চমকে গেলেন।

—“আপনি কে?”

বৃদ্ধ বললেন,

—“আমি হরেন।”

—“শিউলি আপনার কী হন?”

বৃদ্ধ একটু থেমে বললেন,

—“যে মানুষটার কাছে আমার একটা কথা পৌঁছানো দরকার।”

দেবাশিসবাবু পার্সেলটা বের করলেন।

—“আপনি কি জানেন উনি কোথায় থাকেন?”

হরেন মাথা নাড়লেন।

—“না।”

—“তাহলে ঠিকানা দিলেন কীভাবে?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

—“ঠিকানা আমি দিইনি।”

—“তাহলে?”

—“যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি দিয়েছেন।”

দেবাশিসবাবু অবাক হয়ে বললেন,

—“কে পাঠিয়েছেন?”

হরেন বললেন,

—“আমার ছেলে।”

তারপর ধীরে ধীরে গল্পটা খুলল।

চল্লিশ বছর আগে হরেন আর শিউলি একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

তাঁদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন আগে হরেন শহরে কাজের সন্ধানে চলে যান।

একটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে শিউলি ভেবেছিলেন, হরেন আর ফিরবেন না।

দু’জনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

হরেন পরে জানতে পারেন, শিউলি অন্যত্র বিয়ে করেছেন।

তারপর তিনিও সংসার করেন।

বছর কেটে যায়।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একদিন তাঁর ছেলে বাবার পুরনো বাক্স খুলতে গিয়ে শিউলির লেখা একটি চিঠি পায়।

চিঠিটি কখনও পাঠানো হয়নি।

হরেন বললেন,

—“চিঠিটা পড়ে আমার ছেলে আমাকে বলল, ‘বাবা, এত বছর ধরে একটা ভুল বোঝাবুঝি বয়ে বেড়াচ্ছ কেন?’”

দেবাশিসবাবু চুপ করে শুনছিলেন।

—“তারপর?”

—“সে শিউলিকে খুঁজতে বের হয়।”

—“পেয়েছে?”

হরেন মাথা নাড়লেন।

—“শিউলি মারা গেছেন তিন বছর আগে।”

দেবাশিসবাবু স্তব্ধ।

—“তাহলে পার্সেলটা?”

হরেন পার্সেলটার দিকে তাকালেন।

—“শিউলির মেয়ে এখন পাশের শহরে থাকে। আমার ছেলে তার কাছে এই পার্সেল পাঠিয়েছে।”

দেবাশিসবাবু বললেন,

—“তাহলে এখানে ভুল ঠিকানা কেন?”

হরেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“কারণ আমার ছেলে বলেছে, এই চিঠিটা প্রথমে সেই ডাকঘরেই আসা দরকার, যেখান থেকে একদিন শিউলি আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।”

দেবাশিসবাবুর বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।

তিনি পুরনো রেজিস্টার খুললেন।

পাতা উল্টাতে উল্টাতে অবশেষে একটি নাম পেলেন।

শিউলি দাস।

চল্লিশ বছর আগের একটি নিবন্ধিত চিঠি।

চিঠিটি ফেরত গিয়েছিল।

প্রাপক—হরেন দাস।

দেবাশিসবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর হরেনকে বললেন,

—“আপনি জানেন, আপনার জীবনের সেই চিঠিটা হয়তো হারিয়ে যায়নি।”

হরেন তাকিয়ে রইলেন।

দেবাশিসবাবু পুরনো রেকর্ডের একটি কপি বের করে দেখালেন।

হরেনের চোখ ভিজে উঠল।

—“তাহলে শিউলি সত্যিই লিখেছিল?”

—“হ্যাঁ।”

হরেন ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।

অনেকক্ষণ পর বললেন,

—“আমি ভেবেছিলাম… সে আমাকে ভুলে গেছে।”

দেবাশিসবাবু বললেন,

—“কখনও কখনও চিঠি পৌঁছায় না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে কথাগুলো বলা হয়নি।”

হরেন পার্সেলটা হাতে নিলেন।

ভেতরে ছিল একটি পুরনো শাড়ি, কয়েকটি ছবি এবং শিউলির সেই চিঠির ফটোকপি।

সবশেষে একটি ছোট্ট কাগজ।

তাতে লেখা—

“বাবা, মানুষ চলে যায়। কিন্তু অসমাপ্ত কথাগুলোকে সবসময় চলে যেতে হয় না।”

হরেন চোখ মুছলেন।

তারপর দেবাশিসবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“আজ মনে হচ্ছে, চল্লিশ বছর পরে হলেও চিঠিটা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছে।”

দেবাশিসবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“ডাকঘরের কাজই তো সেটা—ঠিক মানুষটির কাছে কথা পৌঁছে দেওয়া।”

বৃদ্ধ উঠে চলে গেলেন।

ডাকঘরের দরজা বন্ধ করার আগে দেবাশিসবাবু সেই পুরনো রেজিস্টারের পাতায় হাত রাখলেন।

পাতাটা চল্লিশ বছর পুরনো।

কালি ফিকে হয়ে গেছে।

তবু একটি নাম এখনও স্পষ্ট—

শিউলি দাস।

আর তার পাশে একটি অসম্পূর্ণ ঠিকানা।

কখনও কখনও ভুল ঠিকানায় আসা চিঠিও আমাদের ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে বহু বছর ধরে একটা উত্তর অপেক্ষা করে থাকে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *