রাত শেষ হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে যেত কুসুমের।
ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটে।
চারদিক অন্ধকার। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িতে তখনও সবাই ঘুমিয়ে।
কুসুম চুপচাপ উঠে রান্নাঘরে যেত। চুলায় জল বসিয়ে এক কাপ চা বানাত। তারপর একটা পুরোনো ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত।
তার কাজ ছিল ফুল সংগ্রহ করা।
গ্রামের চারপাশে অনেক বাড়িতে শিউলি, গাঁদা, জুঁই, রজনীগন্ধা, অপরাজিতা—নানা ফুলের গাছ ছিল। ভোরবেলা কুসুম সেগুলো সংগ্রহ করত। তারপর সাইকেলে করে পাশের শহরের ফুলবাজারে নিয়ে যেত।
এই কাজ করেই তার সংসার চলত।
বৃদ্ধ বাবা, ছোট ভাই আর নিজের মেয়েকে নিয়ে চারজনের সংসার।
কুসুমের মেয়ে মেঘা তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।
মেয়েটা পড়াশোনায় খুব ভালো।
কিন্তু তার একটা অভ্যাস ছিল—
ভোরে মায়ের সঙ্গে উঠতে চাইত।
কুসুম বলত,
—“তুই ঘুমা। ভোরে ওঠার দরকার নেই।”
মেঘা বলত,
—“আমি তোমাকে সাহায্য করব।”
কুসুম হেসে বলত,
—“তুই পড়াশোনা কর। আমার সাহায্য করার দরকার নেই।”
একদিন মেঘা জেদ করেই মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
ভোরের কুয়াশায় মা-মেয়ে গ্রামের পথ ধরে হাঁটছে।
মেঘা অবাক হয়ে দেখল, অন্ধকারের মধ্যেও কুসুম প্রতিটি বাড়ির ফুলগাছ চিনে ফেলছে।
—“মা, এত অন্ধকারে তুমি কীভাবে সব চিনতে পারো?”
কুসুম বলল,
—“যে কাজ ভালোবাসা দিয়ে করা হয়, তার রাস্তা চোখ বন্ধ করেও চিনে নেওয়া যায়।”
মেঘা হাসল।
সেদিন প্রথমবার সে মায়ের কাজটা কাছ থেকে দেখল।
শিউলি কুড়োতে কুড়োতে তার মনে হল—
ফুল সংগ্রহ করাও যেন একটা শিল্প।
কোন ফুল কখন তুলতে হয়, কোনটা না তুললেই গাছ ভালো থাকে, কোন ফুল বাজারে বেশি দাম পায়—সবকিছু কুসুম জানে।
কিন্তু সেই বছর বর্ষার পরে একটা সমস্যা হল।
গ্রামের অনেক ফুলগাছ নষ্ট হয়ে গেল।
কেউ গাছ কেটে ফেলল, কেউ বাড়ির উঠোন পাকা করে দিল।
ফুলের পরিমাণ কমতে শুরু করল।
কুসুমের আয়ও কমে গেল।
একদিন বাজার থেকে ফিরে সে হিসাব করছিল।
মেঘা জিজ্ঞেস করল,
—“মা, আজ কম টাকা?”
কুসুম বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“ফুল কম।”
মেঘা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—“আমরা নিজেরা ফুলের গাছ লাগালে কেমন হয়?”
কুসুম হেসে বলল,
—“আমাদের নিজের জমি কোথায়?”
মেঘা বলল,
—“জমি না থাকলে?”
—“তাহলে?”
—“বাড়ির ছাদ আছে।”
কুসুম মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন থেকেই মেঘা কাজ শুরু করল।
পুরোনো টব, ভাঙা বালতি, প্লাস্টিকের বোতল—যা পেল, সব জোগাড় করল।
স্কুলের শিক্ষককে বলল,
—“স্যার, আমি ছাদে ফুলের বাগান করতে চাই।”
স্যার তাকে কিছু বীজ দিলেন।
মেঘা বাড়ির ছাদে মাটি ভরল।
কুসুমও সাহায্য করল।
কয়েক সপ্তাহ পর ছোট ছোট চারা বেরোল।
মেঘার আনন্দ দেখে কুসুমের মুখেও হাসি ফুটল।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
ছাদে এত ফুল দিয়ে সংসার চলবে না।
মেঘা বলল,
—“একটা বাড়ি দিয়ে হবে না। সবাইকে করতে হবে।”
সে গ্রামের কয়েকজন মহিলার সঙ্গে কথা বলল।
বলল,
—“আপনারা যদি বাড়ির উঠোনে ফুল লাগান, মা আপনাদের ফুল কিনে নেবে।”
প্রথমে কেউ রাজি হল না।
একজন বলল,
—“ফুল লাগিয়ে কত টাকা পাব?”
আরেকজন বলল,
—“গাছ বড় হতে সময় লাগবে।”
মেঘা বলল,
—“আজ লাগালে কালই টাকা পাবেন না। কিন্তু কয়েক মাস পরে গাছই আপনাদের টাকা দেবে।”
কথাটা কয়েকজনের ভালো লাগল।
ধীরে ধীরে পাঁচটা বাড়ি, তারপর দশটা বাড়ি, তারপর পঁচিশটা বাড়ি ফুল লাগাতে শুরু করল।
কেউ গাঁদা লাগাল।
কেউ জুঁই।
কেউ রজনীগন্ধা।
কেউ শিউলি।
ছয় মাস পর গ্রামের চেহারা বদলে গেল।
ভোর হলেই দেখা যেত—বাড়ির উঠোনে ফুল ফুটেছে।
কুসুম আর দূরের গ্রামে ফুল খুঁজতে যেত না।
নিজের গ্রামের বাড়িগুলো থেকেই ফুল সংগ্রহ করত।
মহিলারা ফুল বিক্রি করে নিজেরা টাকা পেতে শুরু করলেন।
কেউ সেই টাকা দিয়ে ছেলের বই কিনলেন।
কেউ মেয়ের স্কুলের ফি দিলেন।
কেউ আবার বাড়িতে নতুন হাঁড়ি কিনলেন।
একদিন গ্রামের বৃদ্ধা সরস্বতী বললেন,
—“মেঘা, তুই না থাকলে আমি কখনও ভাবতাম না ফুল থেকেও টাকা আয় করা যায়।”
মেঘা হাসল।
—“ফুল তো আগেও ছিল ঠাম্মি। আমরা শুধু তার দাম বুঝতাম না।”
কুসুমের কাজও সহজ হয়ে গেল।
আগে তাকে প্রতিদিন ভোরে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হত।
এখন গ্রামের মধ্যেই ফুল সংগ্রহ করে সে বাজারে যায়।
তার আয়ও বেড়ে গেল।
একদিন বাজার থেকে ফিরে সে মেয়েকে একটা নতুন স্কুলব্যাগ দিল।
মেঘা অবাক।
—“আমার জন্য?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
কুসুম বলল,
—“তুই আমার কাজকে বদলে দিয়েছিস। এটা তোর জন্য।”
মেঘা মাকে জড়িয়ে ধরল।
কয়েক বছর পর মেঘা কলেজে পড়তে গেল।
সে কৃষি ও উদ্যানবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করল।
ছুটিতে বাড়ি ফিরে গ্রামের মহিলাদের নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করল।
ফুলের পাশাপাশি তারা ফুল থেকে তৈরি করতে শুরু করল—
মালা, গজরা, শুকনো ফুলের সাজসজ্জা, পুজোর প্যাকেট।
মেঘা শহরের কয়েকটি দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
গ্রামের ফুল সরাসরি শহরে যেতে শুরু করল।
মহিলাদের আয় আরও বাড়ল।
একদিন গ্রামের মাঠে একটা ছোট অনুষ্ঠানের আয়োজন হল।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মেঘাকে সম্মান জানানো হল।
গ্রামের প্রধান বললেন,
—“একটা মেয়ের ছোট্ট ভাবনা আজ গোটা গ্রামের বহু পরিবারের আয়ের পথ খুলে দিয়েছে।”
মেঘা মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“আমি একা কিছু করিনি। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন, ছোট কাজ বলে কিছু নেই। ফুল কুড়োনোর কাজটাও যদি সম্মানের সঙ্গে করা যায়, সেটাই বড় কাজ।”
দূরে দাঁড়িয়ে কুসুম চোখ মুছছিল।
মেয়ের কথা শুনে তার মনে পড়ল সেই প্রথম ভোরের কথা।
সাড়ে তিনটার অন্ধকার।
একটা ছোট্ট মেয়ে মায়ের পিছু পিছু ফুল কুড়োতে বেরিয়েছিল।
সেদিন সে জানত না—
সেই ভোর একদিন শুধু তার নিজের সংসার নয়,
পুরো একটা গ্রামের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে।
আজও ভোর হলে শিমুলতলার পথ দিয়ে কুসুমের সাইকেল যায়।
তবে এখন তার ঝুড়ি আর আগের মতো ছোট নয়।
তার সঙ্গে আরও অনেক মহিলার ফুল থাকে।
সাইকেলের সামনে লেখা—
“ভোরের ফুল—শিমুলতলার মহিলাদের হাতে তৈরি।”
কুসুম মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকায়।
তারপর মৃদু হেসে বলে,
—“ফুলেরও সময় লাগে ফুটতে। মানুষও তেমন।”
আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে মেঘা মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সে জানে—
জীবনের বড় পরিবর্তন সবসময় বড় কোনো স্বপ্ন থেকে আসে না।
কখনও কখনও—
এক মুঠো ফুল,
একটা ছোট্ট ছাদ,
আর একজন মায়ের পরিশ্রমের পাশে দাঁড়ানো এক কিশোরীর সাহসই যথেষ্ট।