Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

মাউন্ট আবু: রাজস্থানের মরুভূমির বুকে সবুজ পাহাড়, নাক্কি লেক ও প্রাচীন মন্দিরের অপূর্ব জগৎ।

রাজস্থান বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোনালি বালিয়াড়ি, বিশাল দুর্গ, রাজপ্রাসাদ, উটের সারি এবং মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর। কিন্তু এই শুষ্ক রাজ্যের বুকেই রয়েছে এমন এক পাহাড়ি শহর, যেখানে সবুজ বন, কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, শান্ত হ্রদ এবং প্রাচীন মন্দির একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ। সেই শহরটির নাম মাউন্ট আবু।

রাজস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে আরাবল্লি পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত মাউন্ট আবু রাজ্যের অন্যতম পরিচিত পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্র। গ্রীষ্মের তীব্র গরম থেকে স্বস্তি পেতে বহু মানুষ এখানে আসেন। কেউ আসেন নাক্কি লেকের শান্ত জলে নৌকাবিহার করতে, কেউ গুরু শিখরের চূড়া থেকে পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে, কেউ আবার দিলওয়ারা জৈন মন্দিরের অসাধারণ মার্বেল স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

মাউন্ট আবুর আকর্ষণ কেবল প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রাচীন স্থাপত্য, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, স্থানীয় জনজাতির সংস্কৃতি এবং রাজস্থানের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। ফলে এটি এমন একটি গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতিপ্রেমী, ইতিহাসপ্রেমী, ধর্মীয় পর্যটক, ফটোগ্রাফার এবং পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা মানুষ—প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে আনন্দ খুঁজে পেতে পারেন।

মাউন্ট আবুর পরিচয়

মাউন্ট আবু রাজস্থানের সিরোহি জেলার একটি পাহাড়ি শহর। আরাবল্লি পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত এই অঞ্চল রাজস্থানের অন্যান্য শুষ্ক এলাকার তুলনায় বেশি সবুজ এবং তুলনামূলকভাবে শীতল আবহাওয়ার জন্য পরিচিত।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শহরটি যথেষ্ট উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জলবায়ু আশপাশের সমতল অঞ্চলের থেকে আলাদা। পাহাড়ের ঢালে বনভূমি, পাথুরে চূড়া, ছোট জলধারা এবং প্রাকৃতিক উপত্যকা দেখা যায়।

মাউন্ট আবু শুধু রাজস্থানের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি আরাবল্লি পর্বতমালার পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা, পাখি, সরীসৃপ এবং বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। পাহাড়ি পরিবেশের এই বৈচিত্র্য মাউন্ট আবুকে রাজস্থানের সাধারণ মরুপ্রকৃতির থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

শহরের মধ্যে আধুনিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, বাজার এবং পর্যটন পরিষেবা রয়েছে। একই সঙ্গে শহরের বাইরে বেরোলেই পাওয়া যায় বনভূমি, পাহাড়ি রাস্তা এবং প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ।

আরাবল্লি পর্বতমালা: মাউন্ট আবুর প্রাকৃতিক ভিত্তি

মাউন্ট আবুর সৌন্দর্য বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হয় আরাবল্লি পর্বতমালার কথা।

আরাবল্লি ভারতের অন্যতম প্রাচীন পর্বতশ্রেণি। এটি পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এবং রাজস্থানের ভূপ্রকৃতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এই পর্বতমালার মধ্যে মাউন্ট আবু একটি উল্লেখযোগ্য পাহাড়ি অঞ্চল। আশপাশের শুষ্ক ভূভাগের তুলনায় এখানে বেশি গাছপালা ও তুলনামূলকভাবে আর্দ্র পরিবেশ দেখা যায়।

পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা পাথর, ঢালু পথ, বনভূমি এবং উপত্যকা একসঙ্গে মিলে মনোরম দৃশ্য তৈরি করেছে। বর্ষাকালে পাহাড়ের রং আরও গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও মেঘ পাহাড়ের গা ছুঁয়ে চলে যায়, আবার কোথাও কুয়াশার আবরণে দূরের চূড়াগুলি আংশিকভাবে ঢেকে থাকে।

প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এই ভূদৃশ্য বিশেষ আকর্ষণীয়। তবে পাহাড়ি পরিবেশের সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় নির্দিষ্ট পথ ধরে চলা এবং বনভূমির মধ্যে আবর্জনা না ফেলা জরুরি।

নাক্কি লেক: পাহাড়ের বুকে শান্ত জলের আয়না

মাউন্ট আবুর অন্যতম পরিচিত আকর্ষণ হলো নাক্কি লেক। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই হ্রদ পর্যটকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়।

পাহাড় ও গাছপালায় ঘেরা হ্রদের জলে আকাশের রং, আশপাশের সবুজ এবং পাহাড়ের ছায়া প্রতিফলিত হয়। সকালবেলা আলো যখন ধীরে ধীরে হ্রদের উপর পড়ে, তখন জলের দৃশ্য বিশেষভাবে সুন্দর হয়ে ওঠে।

নাক্কি লেককে ঘিরে স্থানীয় লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। জনপ্রিয় কাহিনি অনুসারে, নখ দিয়ে খুঁড়ে এই হ্রদ তৈরি করা হয়েছিল বলে এর নাম নাক্কি লেক হয়েছে। এটি একটি প্রচলিত লোকবিশ্বাস; হ্রদের নাম ও উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা শোনা যায়।

হ্রদে নৌবিহারের ব্যবস্থা থাকলে পর্যটকেরা জলের উপর থেকে পাহাড় ও আশপাশের পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন। তবে নৌবিহারের সময়সূচি, ভাড়া এবং নিরাপত্তার নিয়ম ঋতু ও স্থানীয় ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে।

হ্রদের চারপাশে হাঁটার জন্যও সুন্দর পরিবেশ রয়েছে। কেউ বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন, কেউ ছবি তুলতে পারেন, আবার কেউ হ্রদের ধারের দোকান থেকে হালকা খাবার কিনে উপভোগ করতে পারেন।

সন্ধ্যার সময় নাক্কি লেকের পরিবেশ অন্য রূপ নেয়। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আকাশের রং বদলে যায় এবং জলে সেই রঙের প্রতিফলন দেখা যায়। চারপাশের আলো জ্বলে উঠলে হ্রদের ধারে মানুষের আনাগোনা বাড়ে।

তবে ছুটির দিন ও পর্যটনের ব্যস্ত মরসুমে এখানে ভিড় হতে পারে। শান্ত পরিবেশে হ্রদ দেখতে চাইলে সকালবেলা যাওয়া ভালো।

দিলওয়ারা জৈন মন্দির: মার্বেলের গায়ে শিল্পের বিস্ময়

মাউন্ট আবুর সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির একটি হলো দিলওয়ারা জৈন মন্দিরসমূহ। এগুলি জৈন ধর্মীয় স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

মধ্যযুগে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত এই মন্দিরগুলিতে সাদা মার্বেলের উপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম খোদাই করা হয়েছে। স্তম্ভ, ছাদ, প্রবেশপথ, গম্বুজসদৃশ কাঠামো এবং অলংকৃত প্যানেলে এমন সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়, যা দর্শকদের বিস্মিত করে।

দিলওয়ারা মন্দিরসমূহের মধ্যে বিভিন্ন মন্দির রয়েছে। এগুলির নির্মাণকাল, পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থাপত্যের ধরনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে সবগুলির মধ্যেই মার্বেল খোদাইয়ের দক্ষতা এবং ধর্মীয় স্থাপত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট।

মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে মার্বেলের উজ্জ্বলতা। আলো ও ছায়ার সমন্বয়ে খোদাই করা নকশাগুলি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোথাও ফুলের পাপড়ি, কোথাও জ্যামিতিক নকশা, কোথাও পৌরাণিক দৃশ্য কিংবা অলংকৃত মানবমূর্তি দেখা যায়।

এই সূক্ষ্ম কাজের জন্য বিপুল দক্ষতা, সময় এবং পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়েছিল। পাথরের মতো শক্ত উপাদানের উপর এত সূক্ষ্ম নকশা তৈরি করা মধ্যযুগীয় শিল্পীদের অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার পরিচয় দেয়।

দিলওয়ারা মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়; এটি ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য এবং কারুশিল্পের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মন্দিরে প্রবেশের সময় পোশাক, ছবি তোলা, জুতো খোলা এবং অন্যান্য নিয়ম মেনে চলতে হয়। ধর্মীয় পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত। ছবি তোলার অনুমতি সম্পর্কে আগে জেনে নেওয়া ভালো, কারণ সব অংশে ফটোগ্রাফি অনুমোদিত নাও হতে পারে।

গুরু শিখর: আরাবল্লির সর্বোচ্চ চূড়ার দিকে

মাউন্ট আবু ভ্রমণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হলো গুরু শিখর। এটি আরাবল্লি পর্বতমালার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৭২২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।

গুরু শিখরে যাওয়ার পথে পাহাড়ি রাস্তা, পাথুরে ঢাল এবং বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়ে। উপরে পৌঁছলে আশপাশের পাহাড়, উপত্যকা এবং দূরের ভূপ্রকৃতির বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়।

এখানে গুরু দত্তাত্রেয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধর্মীয় স্থান রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে দত্তাত্রেয়কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। ফলে গুরু শিখর প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকের পাশাপাশি ধর্মীয় পর্যটকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

গুরু শিখরের দিকে যাওয়ার সময় আবহাওয়া বিবেচনা করা দরকার। কুয়াশা বা বৃষ্টির সময় দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে। পাহাড়ি পথে চলাফেরা করার সময় সাবধানে হাঁটা এবং নির্ধারিত পথ ব্যবহার করা ভালো।

সকালের দিকে আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে দূরের পাহাড় দেখার সুযোগ বেশি হতে পারে। তবে আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে বলে যাওয়ার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি জেনে নেওয়া উচিত।

সানসেট পয়েন্ট: দিনের শেষ আলোয় পাহাড়ের সৌন্দর্য

মাউন্ট আবুর জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে সানসেট পয়েন্ট বিশেষভাবে পরিচিত। নাম থেকেই বোঝা যায়, সূর্যাস্ত দেখার জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় জায়গা।

বিকেলের দিকে এখানে গেলে পাহাড়ের উপর সূর্যের আলো ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা যায়। দিনের সোনালি আলো একসময় কমলা ও লালচে আভা ধারণ করে। দূরের পাহাড়ের রেখাগুলি তখন আকাশের পটভূমিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সূর্যাস্তের সময় আকাশের রং ও আবহাওয়ার পরিবর্তন প্রতিদিন একরকম হয় না। কখনও আকাশ পরিষ্কার থাকে, কখনও মেঘের উপস্থিতিতে দৃশ্য অন্য রকম হয়ে ওঠে। এই অনিশ্চয়তাই প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করে।

সানসেট পয়েন্টে পৌঁছতে কিছুটা হাঁটতে হতে পারে। তাই আরামদায়ক জুতো পরা ভালো। সূর্যাস্তের পর অন্ধকার নামতে শুরু করলে ফেরার পথে সতর্ক থাকা জরুরি।

ছুটির দিনে ভিড় বেশি হতে পারে। তাই সূর্যাস্তের কিছুটা আগে পৌঁছলে সুবিধা হয়।

হানিমুন পয়েন্ট: পাহাড়ি দৃশ্যের আরেকটি ঠিকানা

মাউন্ট আবুর আরেকটি পরিচিত স্থান হলো হানিমুন পয়েন্ট। এখান থেকে আশপাশের পাহাড় ও উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়।

নামটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পর্যটকদের কাছে জায়গাটির জনপ্রিয়তা। যুগলদের পাশাপাশি অনেক পরিবার ও সাধারণ পর্যটকও এখানে আসেন।

পাহাড়ি দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা, কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রকৃতির পরিবেশ উপভোগ করা এখানে ভ্রমণের অংশ হতে পারে।

তবে পাহাড়ের কিনারার কাছে ছবি তোলার সময় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং নির্ধারিত পর্যবেক্ষণস্থল ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

অচলগড় দুর্গ: পাহাড়ের উপর ইতিহাসের চিহ্ন

মাউন্ট আবু থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে অচলগড় দুর্গ। এই দুর্গ অঞ্চলটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের পরিচয় বহন করে।

দুর্গের সঙ্গে মধ্যযুগীয় রাজপুত ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান কাঠামোর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন সময়ের নির্মাণ ও সংস্কারের সাক্ষ্য বহন করে।

দুর্গের আশপাশে পাহাড়ি পরিবেশ এবং পাথুরে ভূপ্রকৃতি দেখা যায়। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এটি আকর্ষণীয়, কারণ এখানে শুধু স্থাপত্য নয়, পাহাড়ি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধারণাও পাওয়া যায়।

অচলগড় অঞ্চলের সঙ্গে অচলেশ্বর মহাদেব মন্দিরের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। মন্দিরটি স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত এবং বহু ভক্ত এখানে আসেন।

দুর্গ ও মন্দির ঘুরতে গেলে পর্যাপ্ত সময় রাখা ভালো। কিছু অংশে হাঁটা বা সিঁড়ি ব্যবহার করতে হতে পারে। প্রবেশের নিয়ম এবং স্থানীয় যাতায়াতের সুবিধা আগে যাচাই করা উচিত।

অচলেশ্বর মহাদেব মন্দির

অচলগড় অঞ্চলের অচলেশ্বর মহাদেব মন্দির মাউন্ট আবুর গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলির একটি।

মন্দিরটি শিবের উপাসনার সঙ্গে যুক্ত। এখানে স্থানীয় ভক্তদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরাও উপস্থিত হন।

মন্দিরের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনি ও লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এসব কাহিনি স্থানীয় মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তবে প্রচলিত বিশ্বাস এবং ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করা তথ্যকে আলাদা করে দেখা উচিত।

মন্দিরে প্রবেশের সময় ধর্মীয় রীতি মেনে চলা এবং স্থানীয় নির্দেশ অনুসরণ করা জরুরি। উৎসব বা বিশেষ পূজার দিনে ভিড় বাড়তে পারে।

ট্রেভরস ট্যাঙ্ক: প্রকৃতির নীরব আশ্রয়

প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য মাউন্ট আবুর আরেকটি আকর্ষণ হলো ট্রেভরস ট্যাঙ্ক। এটি একটি জলাধার ও প্রাকৃতিক পরিবেশসমৃদ্ধ এলাকা, যা পাখি এবং বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণের জন্য পরিচিত।

এখানে পাহাড়ি পরিবেশের মধ্যে জলাধার, পাথুরে ভূমি এবং গাছপালা দেখা যায়। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর উপস্থিতি অঞ্চলটিকে জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

যারা প্রকৃতির ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য এটি একটি উপযোগী স্থান হতে পারে। তবে বন্যপ্রাণী দেখার নিশ্চয়তা নেই। প্রাণীর উপস্থিতি ঋতু, আবহাওয়া এবং দিনের সময়ের উপর নির্ভর করে।

প্রাণীদের খাবার দেওয়া, তাদের কাছে যাওয়া বা বিরক্ত করা উচিত নয়। নীরবে পর্যবেক্ষণ করা এবং নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করাই দায়িত্বশীল পর্যটনের অংশ।

ট্রেভরস ট্যাঙ্কে যাওয়ার আগে প্রবেশের সময়, টিকিট এবং স্থানীয় বিধিনিষেধ সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।

মাউন্ট আবুর বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য

মাউন্ট আবুর প্রাকৃতিক পরিবেশ রাজস্থানের অন্যান্য অনেক এলাকার তুলনায় আলাদা। এখানে বিভিন্ন ধরনের গাছ, ঝোপঝাড়, ঘাস এবং পাহাড়ি উদ্ভিদ দেখা যায়।

এই অঞ্চলে পাখির বৈচিত্র্যও উল্লেখযোগ্য। সকালবেলা বনভূমির কাছে হাঁটলে নানা ধরনের পাখির ডাক শোনা যেতে পারে। কিছু এলাকায় সরীসৃপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতিও রয়েছে।

মাউন্ট আবু বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য অঞ্চলটির জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

প্রকৃতির মধ্যে ভ্রমণ করার সময় মনে রাখা দরকার, বনভূমি শুধু পর্যটকদের বিনোদনের স্থান নয়; এটি অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, আবর্জনা ফেলা বা প্রাণীদের বিরক্ত করা পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সর্বোত্তম উপায় হলো পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

মাউন্ট আবুর আদিবাসী ও স্থানীয় সংস্কৃতি

মাউন্ট আবু ও আশপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। তাঁদের জীবনযাত্রা, পোশাক, উৎসব, খাদ্যসংস্কৃতি এবং লোকবিশ্বাস এই এলাকার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

রাজস্থানের বহু অঞ্চলে ভিলসহ বিভিন্ন জনজাতির ঐতিহাসিক উপস্থিতি রয়েছে। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, সামাজিক রীতি, লোকসংগীত এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে সব সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রা একরকম নয়। অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে।

স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে নির্ভরযোগ্য গাইড বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে শুধু পর্যটনের আকর্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, মর্যাদা এবং সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।

মাউন্ট আবুর বাজার ও কেনাকাটা

মাউন্ট আবুর বাজারে রাজস্থানি হস্তশিল্প, পোশাক, স্মারক, গয়না, চামড়াজাত পণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় সামগ্রী পাওয়া যায়।

নাক্কি লেকের আশপাশে পর্যটকদের জন্য দোকান রয়েছে। শহরের বাজারে রঙিন কাপড়, হাতে তৈরি সামগ্রী, ছোট সাজসজ্জার জিনিস এবং বিভিন্ন স্মারক কেনার সুযোগ পাওয়া যায়।

রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের উজ্জ্বল রং ও সূচিকর্ম বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। তবে কোনও পণ্য হাতে তৈরি কি না, তার উপাদান কী এবং দাম কত—এসব সম্পর্কে দোকানির কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

কেনাকাটার সময় দরদাম করা যেতে পারে, তবে তা ভদ্রভাবে করা উচিত। স্থানীয় কারুশিল্পীদের তৈরি পণ্য কিনলে তাঁদের কাজকে সমর্থন করা হয়।

ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে ছোট কোনও স্মারক কেনা যেতে পারে। তবে পরিবেশ বা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করে এমন পণ্য কেনা এড়িয়ে চলা উচিত।

মাউন্ট আবুর খাবার

মাউন্ট আবুর খাবারে রাজস্থানি ঐতিহ্যের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রের বহুমুখী খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। এখানে রাজস্থানি থালি, ডাল-बाटি-চুরমা, গাট্টে কি সবজি, বিভিন্ন ধরনের রুটি, মিষ্টি এবং স্থানীয় নাশতা পাওয়া যায়।

ডাল-बाटি-চুরমা রাজস্থানের অন্যতম পরিচিত খাবার। ডাল, বেক করা বা সেঁকা बाटি এবং মিষ্টি চুরমার সমন্বয়ে তৈরি এই খাবার রাজস্থানি খাদ্যসংস্কৃতির পরিচিত উদাহরণ।

গাট্টে কি সবজি বেসন দিয়ে তৈরি গাট্টা এবং মশলাদার গ্রেভির সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়। এটি সাধারণত রুটি বা ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়।

কের সাংরি রাজস্থানের শুষ্ক অঞ্চলে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী পদ। মরু অঞ্চলের নির্দিষ্ট উদ্ভিদজাত উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবার স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এছাড়া পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার কারণে মাউন্ট আবুতে উত্তর ভারতীয়, দক্ষিণ ভারতীয় এবং অন্যান্য ধরনের খাবারও পাওয়া যায়। ক্যাফে ও রেস্তোরাঁয় চা, কফি, নাশতা এবং হালকা খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে।

খাবার বেছে নেওয়ার সময় পরিচ্ছন্নতা ও নিজের খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া ভালো। গরমের দিনে পর্যাপ্ত জল পান করা এবং দীর্ঘ ভ্রমণের আগে হালকা খাবার খাওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।

মাউন্ট আবুর ক্যাফে ও সন্ধ্যার পরিবেশ

মাউন্ট আবুর পর্যটন এলাকায় বিভিন্ন ক্যাফে, ছোট রেস্তোরাঁ এবং খাবারের দোকান রয়েছে। দিনের বেলায় পাহাড় ও মন্দির ঘুরে সন্ধ্যায় ক্যাফেতে বসে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে।

নাক্কি লেকের আশপাশে সন্ধ্যার পরিবেশ বিশেষ আকর্ষণীয়। পর্যটকদের আনাগোনা, দোকানের আলো এবং হ্রদের ধারে হাঁটতে থাকা মানুষের ভিড় শহরটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

কেউ চা বা কফি হাতে বসে থাকতে পারেন, কেউ স্থানীয় খাবার চেখে দেখতে পারেন, আবার কেউ দিনের ভ্রমণের ছবি সাজিয়ে নিতে পারেন।

তবে পাহাড়ি শহরের রাতের পরিবেশ সব সময় একরকম নয়। পর্যটকের সংখ্যা ও ঋতু অনুযায়ী দোকানপাটের ব্যস্ততা বদলে যায়। তাই নির্দিষ্ট কোনও অনুষ্ঠান বা রাতের কার্যকলাপের পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকে তথ্য যাচাই করা ভালো।

মাউন্ট আবুর ঔপনিবেশিক ইতিহাস

মাউন্ট আবুর ইতিহাসে ঔপনিবেশিক সময়েরও একটি অধ্যায় রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে এই পাহাড়ি অঞ্চল গরমের সময় অবকাশযাপন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হতো।

রাজস্থানের সমতল ও শুষ্ক এলাকার তুলনায় মাউন্ট আবুর আবহাওয়া অনেক সময় আরামদায়ক হওয়ায় এটি একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল।

এই সময়ে কিছু ভবন, বাংলো এবং অন্যান্য স্থাপত্য তৈরি হয়। শহরের কিছু অংশে আজও পুরনো স্থাপত্যের ছাপ দেখা যায়।

ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পাশাপাশি মাউন্ট আবুর প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই ভিন্ন সময়ের প্রভাব শহরটিকে বহুমাত্রিক পরিচয় দিয়েছে।

মাউন্ট আবু ভ্রমণের সেরা সময়

মাউন্ট আবু সারা বছরই পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তবে ঋতুভেদে অভিজ্ঞতা আলাদা হয়।

অক্টোবর থেকে মার্চ: এই সময় আবহাওয়া সাধারণত তুলনামূলক আরামদায়ক থাকে। পাহাড়ি রাস্তা, মন্দির, হ্রদ এবং বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য এটি জনপ্রিয় সময়।

শীতকালে সকাল ও রাতে ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে। তাই গরম পোশাক সঙ্গে রাখা ভালো।

এপ্রিল থেকে জুন: রাজস্থানের সমতল এলাকায় প্রচণ্ড গরম থাকলেও মাউন্ট আবু তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক হতে পারে। গ্রীষ্মের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ে। ফলে হোটেল ও পরিবহনের চাহিদা বেশি থাকতে পারে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর: বর্ষাকালে পাহাড়ের সবুজ সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। মেঘ, কুয়াশা এবং বৃষ্টির পর সতেজ পরিবেশ অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয়। তবে বৃষ্টির কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হতে পারে এবং দূরের দৃশ্য দেখা কঠিন হতে পারে।

ভ্রমণের তারিখ বেছে নেওয়ার সময় আবহাওয়া, পর্যটকের ভিড়, থাকার খরচ এবং নিজের পছন্দ বিবেচনা করা ভালো।

কীভাবে মাউন্ট আবু পৌঁছবেন

মাউন্ট আবুতে পৌঁছনোর জন্য রেল ও সড়কপথ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। যাত্রার পরিকল্পনা করার আগে বর্তমান পরিবহন পরিষেবা যাচাই করা উচিত।

রেলপথে

মাউন্ট আবুর নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন হলো আবু রোড। এখান থেকে মাউন্ট আবু শহরে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি, বাস বা অন্যান্য স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করা যায়।

আবু রোড থেকে পাহাড়ি শহরে পৌঁছতে সড়কপথে আরও কিছুটা যাত্রা করতে হয়। ট্রেনের সময়সূচি এবং টিকিটের প্রাপ্যতা আগেভাগে দেখে নেওয়া ভালো।

সড়কপথে

রাজস্থানের বিভিন্ন শহর এবং গুজরাটের কিছু অঞ্চল থেকে সড়কপথে মাউন্ট আবু পৌঁছনো যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্যাক্সি কিংবা বাস ব্যবহার করা যেতে পারে।

পাহাড়ি রাস্তায় ওঠানামা রয়েছে, তাই চালকের অভিজ্ঞতা ও গাড়ির অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। রাতের বেলায় অপরিচিত পাহাড়ি রাস্তায় যাত্রা করার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো।

বিমানপথে

মাউন্ট আবুর নিজস্ব নিয়মিত বাণিজ্যিক বিমানবন্দর নেই। ভ্রমণকারীরা সুবিধাজনক বিমানবন্দর পর্যন্ত উড়ে সেখান থেকে রেল বা সড়কপথে যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেন। কোন বিমানবন্দর ব্যবহার করা সুবিধাজনক হবে, তা ফ্লাইটের রুট, খরচ এবং মোট যাত্রাসময়ের উপর নির্ভর করে।

মাউন্ট আবুর মধ্যে যাতায়াত

শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান একে অপরের থেকে দূরে অবস্থিত। নাক্কি লেক ও শহরের বাজারের মতো কিছু স্থান কাছাকাছি হলেও গুরু শিখর, দিলওয়ারা মন্দির, অচলগড় এবং ট্রেভরস ট্যাঙ্কে যেতে আলাদা পরিবহন প্রয়োজন হতে পারে।

ট্যাক্সি বা স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে একাধিক স্থান ঘুরে দেখা যায়। একদিনের জন্য গাড়ি নিলে আগে থেকে ভাড়া, অপেক্ষার সময় এবং কোন কোন স্থান অন্তর্ভুক্ত থাকবে তা স্পষ্ট করে নেওয়া উচিত।

শহরের মধ্যে কিছু জায়গায় হাঁটা উপভোগ্য হতে পারে। তবে পাহাড়ি রাস্তা, ঢাল এবং আবহাওয়া বিবেচনা করে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটার পরিকল্পনা করা ভালো।

তিন দিনের মাউন্ট আবু ভ্রমণ পরিকল্পনা

প্রথম দিন: নাক্কি লেক ও শহরের পরিবেশ

সকালে নাক্কি লেক দিয়ে ভ্রমণ শুরু করা যায়। হ্রদের ধারে হাঁটা, নৌবিহার এবং আশপাশের দৃশ্য উপভোগ করার পর শহরের বাজার ঘুরে দেখা যেতে পারে।

বিকেলে হানিমুন পয়েন্ট বা সানসেট পয়েন্টে যাওয়া যায়। সূর্যাস্তের পর শহরের কোনও রেস্তোরাঁয় রাজস্থানি খাবার খেয়ে দিন শেষ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয় দিন: দিলওয়ারা মন্দির ও গুরু শিখর

সকালে দিলওয়ারা জৈন মন্দির ঘুরে দেখা যেতে পারে। স্থাপত্যের সূক্ষ্ম কাজ ভালোভাবে দেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা উচিত।

এরপর গুরু শিখরের দিকে যাত্রা করা যায়। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকলে পাহাড়ি দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব।

ফেরার পথে সময় ও যাতায়াতের সুবিধা অনুযায়ী অন্য কোনও দর্শনীয় স্থান দেখা যেতে পারে।

তৃতীয় দিন: অচলগড় ও প্রকৃতি

তৃতীয় দিন অচলগড় দুর্গ ও অচলেশ্বর মহাদেব মন্দির ঘুরে দেখা যায়।

প্রকৃতিপ্রেমীরা ট্রেভরস ট্যাঙ্ক বা অন্য কোনও উপযুক্ত প্রাকৃতিক স্থানে সময় কাটাতে পারেন। বনভূমির মধ্যে গেলে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

এই পরিকল্পনায় শহরের প্রধান আকর্ষণগুলির সঙ্গে প্রকৃতি ও ইতিহাস—দুই ধরনের অভিজ্ঞতাই পাওয়া যায়।

পাঁচ দিনের মাউন্ট আবু ভ্রমণ পরিকল্পনা

পাঁচ দিন সময় থাকলে আরও ধীরে মাউন্ট আবু ঘুরে দেখা সম্ভব।

প্রথম দিন নাক্কি লেক, শহরের বাজার এবং সূর্যাস্তের স্থানগুলি।

দ্বিতীয় দিন দিলওয়ারা জৈন মন্দির ও গুরু শিখর।

তৃতীয় দিন অচলগড় দুর্গ, অচলেশ্বর মহাদেব মন্দির এবং আশপাশের ঐতিহাসিক স্থান।

চতুর্থ দিন ট্রেভরস ট্যাঙ্ক ও প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ।

পঞ্চম দিন বিশ্রাম, কেনাকাটা এবং পছন্দের কোনও স্থান আবার ঘুরে দেখা।

এই ধরনের পরিকল্পনায় প্রতিদিন অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করতে হয় না। পাহাড়ি পরিবেশে ধীরে সময় কাটানোই অনেক সময় ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে ওঠে।

পরিবার নিয়ে মাউন্ট আবু ভ্রমণ

মাউন্ট আবু পরিবার নিয়ে বেড়ানোর জন্য জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য, হ্রদ, মন্দির, বাজার এবং সহজে পৌঁছনো যায় এমন কিছু পর্যটনস্থল রয়েছে।

শিশুদের নিয়ে নাক্কি লেকের ধারে সময় কাটানো বা প্রকৃতির দৃশ্য দেখা আনন্দদায়ক হতে পারে। তবে নৌবিহারের সময় নিরাপত্তার নিয়ম মানা জরুরি।

বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে ভ্রমণ করলে পাহাড়ি সিঁড়ি, হাঁটার দূরত্ব এবং বিশ্রামের সুযোগ বিবেচনা করা উচিত। সব দর্শনীয় স্থান একই দিনে ঘোরার চেষ্টা না করে আরামদায়ক পরিকল্পনা করা ভালো।

হোটেল বেছে নেওয়ার সময় লিফট, যাতায়াতের সুবিধা, খাবার এবং চিকিৎসা পরিষেবার দূরত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়া যেতে পারে।

যুগলদের জন্য মাউন্ট আবু

পাহাড়ি দৃশ্য, নাক্কি লেকের শান্ত পরিবেশ এবং সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের কারণে মাউন্ট আবু যুগলদের কাছেও জনপ্রিয়।

সকালে হ্রদের ধারে হাঁটা, বিকেলে পাহাড়ের দৃশ্য দেখা এবং সন্ধ্যায় ক্যাফেতে সময় কাটানো—এই ধরনের সাধারণ অভিজ্ঞতাই ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলতে পারে।

তবে কোনও জায়গাকে শুধু রোমান্টিক গন্তব্য হিসেবে না দেখে তার প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও উপলব্ধি করা ভালো।

ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে হোটেল ও পরিবহনের ব্যবস্থা আগে থেকে করে রাখলে ভ্রমণ আরও স্বচ্ছন্দ হয়।

মাউন্ট আবুতে কী কী সঙ্গে রাখবেন

মাউন্ট আবু ভ্রমণের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখা উপকারী।

  • আরামদায়ক হাঁটার জুতো।
  • গরমের সময় হালকা পোশাক, টুপি ও সানগ্লাস।
  • শীতকালে সকাল ও রাতের জন্য গরম পোশাক।
  • বর্ষাকালে ছাতা বা রেইনকোট।
  • পর্যাপ্ত পানীয় জল।
  • ব্যক্তিগত ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী।
  • ফোন, ক্যামেরা ও চার্জার।
  • প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র এবং বুকিংয়ের তথ্য।

পাহাড়ি পরিবেশে আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে পারে। তাই একাধিক ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা ভালো।

ভ্রমণ বাজেট কীভাবে পরিকল্পনা করবেন

মাউন্ট আবুতে ভ্রমণের খরচ নির্ভর করে যাতায়াত, হোটেল, খাবার, স্থানীয় পরিবহন এবং দর্শনীয় স্থানের প্রবেশমূল্যের উপর।

কম বাজেটে ভ্রমণ করতে চাইলে আগেভাগে ট্রেনের টিকিট বুক করা, সাধারণ হোটেল বা অতিথিশালা বেছে নেওয়া এবং স্থানীয় খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

মাঝারি বাজেটের ভ্রমণে ভালো মানের হোটেল, নির্দিষ্ট দর্শনীয় স্থানে গাড়ি ভাড়া এবং কিছু বিশেষ খাবারের অভিজ্ঞতা যুক্ত করা যায়।

বিলাসবহুল ভ্রমণের ক্ষেত্রে উন্নত হোটেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অতিরিক্ত পরিষেবা নেওয়া সম্ভব।

নির্দিষ্ট কোনও বাজেট ঠিক করার আগে হোটেল ও পরিবহনের বর্তমান দাম যাচাই করা উচিত। উৎসব বা ছুটির মরসুমে খরচ বেড়ে যেতে পারে।

দায়িত্বশীল পর্যটন: পাহাড়কে পরিষ্কার রাখুন

মাউন্ট আবুর সৌন্দর্য তার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে পরিবেশের উপর চাপও বাড়তে পারে।

তাই ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের আবর্জনা যেখানে-সেখানে না ফেলা, হ্রদে কোনও বর্জ্য না ফেলা এবং বনভূমির মধ্যে নির্দিষ্ট পথ ব্যবহার করা জরুরি।

বন্যপ্রাণীকে খাবার দেওয়া বা তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণে হস্তক্ষেপ করলে তাদের ক্ষতি হতে পারে।

ধর্মীয় স্থানে স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা, শব্দ কম রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনার কোনও অংশে ক্ষতি না করা প্রত্যেক পর্যটকের দায়িত্ব।

পরিবেশবান্ধব ভ্রমণ শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা করে না; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এই সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

মাউন্ট আবু কেন অন্যরকম?

রাজস্থানের পরিচিত শহরগুলির মধ্যে যোধপুর তার নীল বাড়ি ও বিশাল দুর্গের জন্য, জয়সলমের তার সোনালি বালিয়াড়ি ও মরুপ্রাসাদের জন্য এবং উদয়পুর তার হ্রদ ও রাজপ্রাসাদের জন্য পরিচিত।

মাউন্ট আবুর পরিচয় আলাদা। এখানে মরুভূমির রাজ্যের মধ্যে পাহাড়ি আবহাওয়া, সবুজ বন, শান্ত হ্রদ এবং প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্য একসঙ্গে রয়েছে।

একদিকে নাক্কি লেকের জলের শান্তি, অন্যদিকে গুরু শিখরের উচ্চতা। একদিকে দিলওয়ারা মন্দিরের সূক্ষ্ম মার্বেল খোদাই, অন্যদিকে পাহাড়ি বনভূমির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। এই বৈপরীত্যই মাউন্ট আবুকে বিশেষ করে তুলেছে।

শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েক দিন কাটাতে চাইলে এই পাহাড়ি অঞ্চল একটি সুন্দর বিকল্প হতে পারে।

শেষকথা: রাজস্থানের বুকে এক টুকরো পাহাড়ি স্বর্গ

মাউন্ট আবু এমন একটি গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। নাক্কি লেকের শান্ত জল, গুরু শিখরের বিস্তৃত পাহাড়ি দৃশ্য, দিলওয়ারা জৈন মন্দিরের অসাধারণ স্থাপত্য, অচলগড়ের ইতিহাস এবং বনভূমির জীববৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে এই পাহাড়ি শহর ভ্রমণকারীর মনে আলাদা জায়গা করে নিতে পারে।

এখানে এসে কেউ হয়তো হ্রদের ধারে বসে দীর্ঘ সময় কাটাবেন, কেউ মার্বেলের সূক্ষ্ম খোদাই দেখে বিস্মিত হবেন, কেউ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দূরের দৃশ্য উপভোগ করবেন। আবার কেউ স্থানীয় বাজারে ঘুরে রাজস্থানি হস্তশিল্প ও খাবারের সঙ্গে পরিচিত হবেন।

মাউন্ট আবুর সৌন্দর্য শুধু তার দর্শনীয় স্থানগুলিতে নয়, বরং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার পথে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট মুহূর্তেও। পাহাড়ি রাস্তার বাঁক, গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা আকাশ, বৃষ্টির পরে ভেজা পাথর, সন্ধ্যার ঠান্ডা বাতাস এবং নাক্কি লেকের জলে প্রতিফলিত আলো—এসবই ভ্রমণের স্মৃতিকে গভীর করে তোলে।

রাজস্থানের মরুভূমির গল্পের বাইরে যদি কোনও সবুজ, শান্ত এবং ইতিহাসসমৃদ্ধ পাহাড়ি গন্তব্য খুঁজে থাকেন, তবে মাউন্ট আবু আপনার ভ্রমণতালিকায় রাখার মতো একটি জায়গা। এটি এমন এক শহর, যেখানে পাহাড়ের নীরবতা, মানুষের বিশ্বাস, শিল্পের নিপুণতা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

==========  শেষ ==========

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *