রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।
কলকাতার আকাশে ঘন মেঘ। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি অন্ধকার শহরটাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য আলোকিত করে দিচ্ছে। রাস্তার অধিকাংশ দোকান বন্ধ। বৃষ্টির জলে ফাঁকা রাস্তাগুলো চকচক করছে।
উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো বাড়ির তিনতলায় বসে ল্যাপটপে খবর লিখছিল সাংবাদিক ঋত্বিক চৌধুরী।
বয়স তিরিশ। একটি জনপ্রিয় বাংলা সংবাদপোর্টালে ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে কাজ করে সে। গত ছয় বছর ধরে খুন, অপহরণ, প্রতারণা এবং রাজনৈতিক অপরাধের খবর করতে করতে মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস অনেকটাই কমে গিয়েছে।
তবু একটা ব্যাপারে সে এখনও বিশ্বাস করে—প্রমাণ ছাড়া কোনও ঘটনাকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া যায় না।
সেদিন রাতেও সে একটি পুরোনো খুনের মামলা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করছিল। ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা ফোনটি বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
ঋত্বিক ফোন ধরল।
“হ্যালো, কে বলছেন?”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনও উত্তর এল না।
তারপর একজন পুরুষের চাপা গলা শোনা গেল।
“ঋত্বিকবাবু, কাল সকালে আপনি একটা খুনের খবর করবেন।”
ঋত্বিক বিরক্ত হয়ে বলল, “কে আপনি? এসব মজা করার সময় নয়।”
লোকটি শান্ত গলায় বলল, “আমি মজা করছি না। আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে কলকাতার শ্যামবাজারের কাছে একটি পুরোনো বাড়িতে একজন মানুষকে খুন করা হবে।”
ঋত্বিক চেয়ারে সোজা হয়ে বসল।
“আপনি কীভাবে জানলেন?”
“কারণ খুনটা যে করবে, সে আমার খুব পরিচিত।”
“খুনির নাম কী?”
“এখন বলতে পারব না। তবে মৃত মানুষের নাম বলতে পারি।”
ঋত্বিক কলমটা হাতে নিল।
“বলুন।”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“অমিতাভ রায়। বয়স সাতচল্লিশ। পেশায় আইনজীবী। তাঁর বুকের বাঁ দিকে ছুরি মারা হবে। পুলিশ প্রথমে ঘটনাটাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করবে।”
ঋত্বিকের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“একজন মানুষকে খুন করা হবে, আর আপনি আমাকে ফোন করে জানাচ্ছেন? আপনার কাছে প্রমাণ আছে?”
“প্রমাণ পাবেন আগামীকাল সকালে। শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোড় থেকে পুরোনো বাড়িটির দিকে গেলে একটি বন্ধ ওষুধের দোকান দেখতে পাবেন। তার পাশের নর্দমার উপর একটি কালো খাম রাখা থাকবে। খামটি খুললেই বুঝবেন, আমি মিথ্যে বলছি না।”
ঋত্বিক আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ফোন কেটে গেল।
সে নম্বরটিতে আবার ফোন করল।
যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল—নম্বরটি বর্তমানে পরিষেবার বাইরে।
ঋত্বিক নিজের মনে বলল, “কেউ হয়তো আমাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।”
কিন্তু রাতটা আর স্বাভাবিকভাবে কাটল না।
পরদিন সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে সে ক্যামেরা, নোটবুক এবং ফোন নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
শ্যামবাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল আটটা পাঁচ।
চারপাশে তখন ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। দোকান খুলছেন ব্যবসায়ীরা, বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন যাত্রীরা, রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে ভিড় জমেছে।
ঋত্বিক বন্ধ ওষুধের দোকানটি খুঁজে পেল।
দোকানের পাশের নর্দমার উপর সত্যিই একটি কালো খাম পড়ে রয়েছে।
সে চারপাশে তাকিয়ে খামটি তুলে নিল।
ভিতরে ছিল তিনটি জিনিস—একটি পুরোনো ছবি, একটি ছোট্ট চাবি এবং হাতে লেখা একটি কাগজ।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, অমিতাভ রায় একটি ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর পাশে আরও দুজন মানুষ। একজন মধ্যবয়সি মহিলা, অন্যজন বছর পঁচিশের এক যুবক।
ছবির পিছনে লেখা—
‘এই তিনজনের মধ্যে একজন আজ মারা যাবে। আর একজন জানে, কেন মৃত্যু অবধারিত।’
ঋত্বিক কাগজটি খুলল।
সেখানে লেখা—
“ঘড়িতে যখন আটটা দশ বাজবে, তখন বাড়ির দোতলার উত্তর দিকের ঘরে তাকাবেন। আপনি যা দেখবেন, তা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় খবর হবে।”
ঋত্বিক ঘড়ির দিকে তাকাল।
সকাল আটটা সাত।
সে দ্রুত পুরোনো বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল।
বাড়িটির রং উঠে গিয়েছে। বারান্দার রেলিংয়ে মরচে। দরজার সামনে একটি পুরোনো নামফলক—‘রায় ভিলা’।
দরজা সামান্য খোলা।
ঋত্বিক ভিতরে ঢুকে দেখল, এক বৃদ্ধ দারোয়ান চেয়ারে বসে সংবাদপত্র পড়ছেন।
“অমিতাভ রায়বাবু আছেন?”
বৃদ্ধ মাথা তুলে তাকালেন।
“আপনি কে?”
“আমি সাংবাদিক। ওঁর সঙ্গে একটু কথা ছিল।”
বৃদ্ধ সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বললেন, “বাবু এখন কারও সঙ্গে দেখা করবেন না।”
ঠিক তখনই দোতলা থেকে একজন মহিলার চিৎকার শোনা গেল।
“বাঁচান! কেউ আছেন?”
ঋত্বিক সিঁড়ি দিয়ে ছুটে উঠল।
উত্তর দিকের ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। সে ধাক্কা দিতে লাগল।
“দরজা খুলুন! কী হয়েছে?”
কোনও উত্তর নেই।
ঘড়িতে সকাল আটটা দশ।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিতর থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল।
ঋত্বিক আর অপেক্ষা করল না। দারোয়ানের সাহায্যে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল।
মেঝেতে পড়ে আছেন অমিতাভ রায়।
তাঁর বুকের বাঁ দিকে রক্তের দাগ। পাশে পড়ে রয়েছে একটি ছুরি।
ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন ছবিতে দেখা সেই মধ্যবয়সি মহিলা।
ঋত্বিক দ্রুত পুলিশে ফোন করল।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এসে পৌঁছল। মৃতদেহ পরীক্ষা করে প্রাথমিকভাবে একজন পুলিশকর্মী বললেন, “দেখে তো আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে।”
ঋত্বিক প্রতিবাদ করল, “কিন্তু আমাকে গত রাতে ফোন করে বলা হয়েছিল, এই সময়ে এখানে খুন হবে!”
পুলিশের এক অফিসার তার দিকে ঘুরে তাকালেন।
“আপনাকে কে ফোন করেছিল?”
“জানি না। অচেনা নম্বর।”
“ফোনের রেকর্ড আছে?”
ঋত্বিক ফোন দেখাল। নম্বরটি রয়েছে, কিন্তু সেটিতে কলব্যাক করলে কোনও সংযোগ হচ্ছে না।
অফিসার বললেন, “আপনি আমাদের সঙ্গে থানায় চলুন। আপনার বক্তব্য নথিভুক্ত করতে হবে।”
ঋত্বিক বুঝতে পারছিল, বিষয়টি আর সাধারণ কোনও অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটি তখনও বাকি ছিল।
পুলিশ যখন মৃতদেহ সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ঋত্বিকের ফোন আবার বেজে উঠল।
একই অচেনা নম্বর।
সে পুলিশ অফিসারের সামনেই ফোন ধরল।
“আপনি কে? কীভাবে সব জানলেন?”
ওপাশের লোকটি বলল, “প্রথম খবরটা পেয়ে গেছেন তো?”
ঋত্বিক দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি কি খুনটা করেছেন?”
“না।”
“তাহলে কে করেছে?”
“যে মানুষটি মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।”
ঋত্বিকের চোখ ধীরে ধীরে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলার দিকে গেল।
মহিলা তখনও কাঁদছেন।
লোকটি আবার বলল, “তবে তাঁকে গ্রেপ্তার করলেই সত্যি জানা যাবে না। কারণ অমিতাভ রায়ের মৃত্যু হয়েছে আজ নয়, বারো বছর আগে।”
ঋত্বিক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কী বলছেন আপনি?”
“আজ যে মানুষটিকে মৃত অবস্থায় দেখছেন, সে অমিতাভ রায় নয়। সে এমন একজন, যে বারো বছর ধরে মৃত মানুষের পরিচয় নিয়ে বেঁচে ছিল।”
ঋত্বিকের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন?”
ওপাশের লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল—
“দোতলার ঘরের আলমারির নীচের ড্রয়ার খুলুন। সেখানে একটি লাল ফাইল পাবেন। ফাইলের প্রথম পাতায় আপনার বাবার নাম লেখা আছে।”
ঋত্বিকের বুকের ভিতরটা যেন থেমে গেল।
তার বাবা, অনিরুদ্ধ চৌধুরী, বারো বছর আগে একটি রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। ঋত্বিক তখন কলেজে পড়ে। বাবার মৃত্যুর পর পুলিশ জানিয়েছিল, দুর্ঘটনাটি নিছকই একটি দুর্ঘটনা।
কিন্তু অচেনা লোকটি তার বাবার নাম জানল কীভাবে?
সে ফিসফিস করে বলল, “আমার বাবার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“আপনার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি, ঋত্বিকবাবু।”
ঋত্বিকের চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এল।
“তাহলে কী হয়েছিল?”
লোকটি বলল, “সেটা জানতে হলে আপনাকে নিজের বাবার মৃত্যুর তদন্ত আবার শুরু করতে হবে। আর তাড়াতাড়ি করতে হবে। কারণ আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে দ্বিতীয় খুনটি ঘটবে।”
“কার খুন?”
ওপাশ থেকে একটি নাম ভেসে এল।
“ডাক্তার সৌম্যদীপ বসু।”
ঋত্বিক দ্রুত নামটি লিখে নিল।
“কোথায়?”
“কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের পুরোনো রেকর্ড রুমে।”
“কিন্তু আপনি কে?”
এবার লোকটি এমন একটি কথা বলল, যা শুনে ঋত্বিকের বুকের ভিতর বরফ জমে গেল।
“আমি সেই মানুষ, যাকে আপনার বাবা শেষবার ফোন করেছিলেন।”
“আপনি কি বাবাকে চিনতেন?”
“শুধু চিনতাম না। আপনার বাবার মৃত্যুর রাতেও আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।”
ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “আপনি যদি সব জানেন, তাহলে এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”
লোকটি ধীরে ধীরে বলল—
“কারণ আপনার বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে বড় না হওয়া পর্যন্ত আমি সত্যিটা প্রকাশ করব না।”
“আপনার নাম বলুন!”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল—
“আমার নাম অমিতাভ রায়।”
ঋত্বিকের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
যে মানুষটির মৃতদেহ তার সামনে পড়ে রয়েছে, সেই মানুষই তাকে ফোন করছে!
সে তাড়াতাড়ি ঘরের মেঝের দিকে তাকাল।
কিন্তু পরের মুহূর্তে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।
মেঝেতে পড়ে থাকা মৃতদেহটির মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল, মৃত মানুষটি অমিতাভ রায় নন।
মুখটি তার নিজের বাবার মতো দেখতে।
অনিরুদ্ধ চৌধুরী!
ঋত্বিক চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে শেষ কথাটি ভেসে এল—
“ঋত্বিক, এবার তোমার পালা। আগামীকাল সকাল আটটা দশ মিনিটে যে মানুষটি মারা যাবে, সে আর কেউ নয়—তুমি নিজে।”
কল কেটে গেল।
ঋত্বিক অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল।
ঘড়ির কাঁটা আবার আটটা দশ মিনিটে ফিরে এসেছে।
এবং মৃতদেহের পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে এমন একজন মানুষ, যাকে ঋত্বিক নিজের চোখে বারো বছর আগে কবর দিতে দেখেছিল।
তার বাবা।
প্রথম পর্ব সমাপ্ত।