Categories
উপন্যাস বিবিধ

মৃত শহরের শেষ ডাক ((দ্বিতীয় পর্ব: বাড়ি নম্বর ১৭)।

নিশিপুরের আকাশে কোনো চাঁদ ছিল না।

তবু শহরের প্রতিটি রাস্তা অদ্ভুত নীল আলোয় ভেসে যাচ্ছিল। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বাড়িগুলোর জানলায় একই মুখ। অনির্বাণের মুখ।

কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে, কেউ আবার কাচের ওপাশ থেকে হাত তুলে তাকে ডাকছে।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল একটা ব্যাপার।

প্রতিটি জানলার কাচে অনির্বাণ নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছিল। অথচ সে জানত, তার শরীরের কোনো ছায়া নেই।

সে পকেট থেকে বাবার ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির শেষ পাতায় একটা ছোট মানচিত্র আঁকা ছিল। লাল কালিতে চিহ্নিত রাস্তার নাম—মৃত্যুঞ্জয় সরণি। সেই রাস্তার শেষেই বাড়ি নম্বর ১৭।

অনির্বাণ হাঁটতে শুরু করল।

শহরের রাস্তায় কোনো যানবাহন নেই। কোনো দোকান খোলা নেই। কোথাও মানুষের স্বাভাবিক কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না। শুধু দূরে কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ।

হঠাৎ তার চোখে পড়ল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি টেলিফোন বুথ।

বুথের ভেতরে পুরোনো কালো টেলিফোন। তার পাশে একটা বোর্ডে লেখা—

“যাঁরা হারিয়ে গেছেন, তাঁরা এখানে ফোন করতে পারেন। তবে ওপাশ থেকে কেউ উত্তর দিলে নিজের পরিচয় দেবেন না।”

অনির্বাণ বোর্ডটা পড়ে এগিয়ে যেতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

তারপর থেমে গেল।

অনির্বাণ কয়েক পা এগিয়ে আবার দাঁড়াল। কেন যেন তার মনে হচ্ছিল, ফোনটা তার জন্যই বাজছে।

সে ফিরে এসে রিসিভার তুলল।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।

শুধু একটা শিশুর কান্না।

অনির্বাণের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল। এই কান্নার শব্দ তার অচেনা নয়। ছোটবেলায় বহুবার সে এই শব্দ শুনেছে বলে মনে পড়ল, যদিও তার কোনো স্পষ্ট স্মৃতি নেই।

“কে কাঁদছ?” সে জিজ্ঞেস করল।

এবার ওপাশ থেকে একটি মেয়ের গলা শোনা গেল।

“দাদা, তুমি কোথায়?”

অনির্বাণের হাত কেঁপে উঠল।

“তুমি কে?”

“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

“তোমার নাম কী?”

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমার নাম অনুরাধা। তুমি আমাকে স্টেশনে ফেলে চলে গিয়েছিলে।”

অনির্বাণের মাথার মধ্যে যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটল।

তার কোনো বোন নেই।

অন্তত সে এতদিন তাই জানত।

“আমি তোমাকে চিনি না,” সে বলল।

ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ থেমে গেল।

তারপর মেয়েটি এমন একটা কথা বলল, যা শুনে অনির্বাণের হাত থেকে রিসিভার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল।

“তুমি তো আমার সঙ্গে একই ট্রেনে মারা গিয়েছিলে, দাদা। তাহলে তুমি এখনও বেঁচে আছ কীভাবে?”

লাইন কেটে গেল।

অনির্বাণ কিছুক্ষণ বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দ্রুত টেলিফোন বুথ থেকে বেরিয়ে এল।

তার সামনে তখন একটি সরু গলি। গলির শেষ মাথায় একটা বাড়ি।

দরজার ওপরে নম্বর—১৭।


বাড়িটার সামনে এসে অনির্বাণ থামল।

বাড়িটি দেখতে ঠিক তার শৈশবের বাড়ির মতো। একই বারান্দা, একই কাঠের জানলা, একই উঠোন। এমনকি বারান্দার কোণে রাখা ভাঙা ফুলের টবটাও একই।

কিন্তু তার শৈশবের বাড়ি তো কলকাতায়।

এই বাড়ি এখানে এল কীভাবে?

সে চাবিটা বের করে তালায় ঢোকাল।

দরজা খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকতেই তার নাকে এল পুরোনো কাঠ আর চন্দনকাঠের গন্ধ। দেওয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো দেখে সে আরও অবাক হল।

একটি ছবিতে তার বাবা-মা দাঁড়িয়ে আছেন।

মায়ের কোলে একটি শিশু।

ছবির তারিখ—১২ জুন, ১৯৯৮।

এটাই তো তার জন্মদিন।

কিন্তু পরের ছবিটি দেখে তার শরীর অবশ হয়ে গেল।

সেখানে তার বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে আট-নয় বছরের একটি মেয়ে। মেয়েটির মুখে মিষ্টি হাসি। চোখ দুটো ঠিক তার মায়ের মতো।

ছবির নিচে লেখা—

“অনুরাধা ও অনির্বাণ। আমাদের দুই সন্তান।”

অনির্বাণ ছবিটা নামিয়ে দেখল, পিছনে একটি চিঠি আটকানো।

চিঠির ওপর বাবার হাতের লেখা।

“অনির্বাণ,

তুই যদি কখনও এই বাড়িতে ফিরে আসিস, তাহলে বুঝবি, আমি তোকে সব সত্যি বলতে পারিনি। তোর বোন অনুরাধার কথা তোকে ভুলিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।

আমি জানতাম, একদিন নিশিপুর তোকে আবার ডাকবে।

যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে মনে রাখিস—অনুরাধা তোর শত্রু নয়। কিন্তু যে মানুষটি তোর বাবার মুখ নিয়ে এই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে তোর বাবা নয়।

আর সবচেয়ে বড় কথা, তুই যে তারিখটাকে নিজের জন্মদিন বলে জানিস, সেটা তোর দ্বিতীয় জীবনের শুরু।

তোর প্রথম জীবন শেষ হয়েছিল ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৬-এ।

আমাকে ক্ষমা করিস।

বাবা।”

অনির্বাণ চিঠিটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল।

তার মাথায় অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছিল।

যদি তার বোন অনুরাধা থেকে থাকে, তাহলে এতদিন তার কথা কেউ বলেনি কেন? কেন তার জন্মতারিখ বদলে দেওয়া হয়েছিল? আর বাবা যদি সত্যিই ছয় মাস আগে মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে নিশিপুরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে কে?

ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে একটা শব্দ এল।

কেউ যেন ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।

অনির্বাণ উঠে দাঁড়াল।

“কে?”

কোনো উত্তর এল না।

সিঁড়ির মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন একজন মানুষ।

সাদা পাঞ্জাবি, ধূসর চুল, চোখে গোল চশমা।

অমল মিত্র।

অনির্বাণের বাবা।

“বাবা!”

অমলবাবু হাত তুলে তাকে থামালেন।

“আমার কাছে আসিস না।”

“কেন? আপনি এখানে কী করছেন? আপনি তো মারা গেছেন!”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি মারা গেছি, অনির্বাণ। কিন্তু যে জায়গায় তুই এসেছিস, সেখানে মৃত্যুও শেষ কথা নয়।”

“আপনি আমাকে সব সত্যি বলেননি কেন?”

“কারণ সত্যিটা জানলে তুই আমাকে কখনও ক্ষমা করতে পারতিস না।”

অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।

“আপনি কি আমার বোনের কথা ইচ্ছা করে লুকিয়েছিলেন?”

বাবা চোখ নামিয়ে নিলেন।

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“কারণ আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি।”


১৯৯৬ সালের ১৭ নভেম্বর।

অমল মিত্র তখন নিশিপুর জংশনের স্টেশনমাস্টার। তাঁর স্ত্রী মাধবী এবং দুই সন্তান অনির্বাণ ও অনুরাধাকে নিয়ে ছোট্ট সংসার।

সেই রাতে নিশিপুর লোকাল ট্রেনটি স্টেশনে ঢোকার কথা ছিল রাত বারোটায়।

কিন্তু ট্রেনটি এসেছিল ১২টা ১৭ মিনিটে।

সেদিন ছিল প্রচণ্ড ঝড়। লাইনের ওপর একটি পুরোনো গাছ ভেঙে পড়েছিল। ট্রেনের চালক ব্রেক কষলেও শেষের তিনটি কামরা লাইনচ্যুত হয়।

দুর্ঘটনায় বহু মানুষ মারা যান।

অনির্বাণ ও অনুরাধা তখন মায়ের সঙ্গে ট্রেনের শেষ কামরায় ছিল।

অমলবাবু দৌড়ে গিয়ে তাঁদের খুঁজে পান। মাধবী আহত অবস্থায় পড়েছিলেন। অনির্বাণকে তিনি উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, কিন্তু অনুরাধাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কয়েক ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা অনির্বাণের নিথর দেহও খুঁজে পান।

কিন্তু অমলবাবু ছেলেকে হারাতে পারেননি।

তিনি এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেন। দুর্ঘটনার পর নিশিপুরে যে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করেছিল, তার সুযোগ নিয়ে তিনি ছেলের স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অনির্বাণকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু সেই চেষ্টায় তিনি কী খুলে দিয়েছিলেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি।

নিশিপুরের মানুষ একে একে অদৃশ্য হতে লাগল। শহরের রাস্তায় সময় থেমে গেল। আর মৃত যাত্রীরা এমনভাবে ফিরে আসতে লাগলেন, যেন দুর্ঘটনা কোনোদিন ঘটেইনি।

অমলবাবু শেষ পর্যন্ত অনির্বাণকে কলকাতায় নিয়ে যান। ছেলেটির অতীত মুছে নতুন জীবন শুরু করান।

কিন্তু অনুরাধাকে তিনি খুঁজে পাননি।

আর সেই অপরাধবোধ তাঁকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে।


বাবার কথা শুনে অনির্বাণের চোখে জল এসে গেল।

“আপনি আমাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন?”

অমলবাবু মাথা নাড়লেন।

“আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমি জানি না, তুই সত্যিই আমার ছেলে কি না, নাকি আমার স্মৃতি থেকে তৈরি হওয়া একটা প্রতিচ্ছবি।”

“তাহলে আপনি আমাকে কেন এখানে ডাকলেন?”

“আমি তোকে ডাকিনি। নিশিপুর তোকে ডেকেছে।”

বাবা জানলার দিকে তাকালেন।

“এই শহরটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এর অস্তিত্ব ধরে রেখেছে একটি জিনিস—শেষ ট্রেনের যাত্রী তালিকা। সেই তালিকায় যাদের নাম আছে, তারা কেউ এই শহর ছেড়ে যেতে পারে না।”

“তাহলে আমাকে কী করতে হবে?”

“অনুরাধাকে খুঁজে বের করতে হবে। সে যদি এখনও এই শহরে থাকে, তাহলে তার কাছেই আছে আসল যাত্রী তালিকা।”

“আর যদি সে না থাকে?”

বাবা উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই বাড়ির সমস্ত আলো নিভে গেল।

দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

টক।

টক।

টক।

বাবার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“ও এসে গেছে।”

“কে?”

“যে আমার মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

দরজার ওপাশ থেকে অমলবাবুর গলা শোনা গেল।

“অনির্বাণ, দরজা খোল। আমি তোর আসল বাবা।”

অনির্বাণ অবাক হয়ে সিঁড়ির দিকে তাকাল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবাও কেঁপে উঠলেন।

দরজার ওপাশের গলাটা আবার শোনা গেল।

“যে লোকটা তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে তোকে মিথ্যে বলছে। আমি তোকে সত্যিটা বলতে এসেছি।”

অনির্বাণ দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

বাবা চিৎকার করে বললেন, “দরজা খুলিস না!”

কিন্তু ততক্ষণে দরজার নিচ দিয়ে একটা পুরোনো ছবি ভেতরে ঢুকে এসেছে।

অনির্বাণ ছবিটা তুলে নিল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৯৬ সালের সেই রেল দুর্ঘটনার পর অমল মিত্র দাঁড়িয়ে আছেন একটি স্ট্রেচারের পাশে।

স্ট্রেচারে শুয়ে আছে অনির্বাণের মৃতদেহ।

আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে অনুরাধা।

মেয়েটি জীবিত।

ছবির পিছনে লেখা—

“আমি জানি, বাবা আমাকে খুঁজতে আসবে না। তাই আমি নিজেই ওর কাছে যাব।”

তার নিচে আরও একটি লাইন—

“অনির্বাণ, তুমি যদি এই ছবিটা দেখো, তাহলে জেনে রেখো—আমাদের মধ্যে একজনই সত্যিকারের মানুষ। আর অন্যজনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কেউ একজন ইচ্ছা করে মৃত্যুর সঙ্গে চুক্তি করেছিল।”

অনির্বাণ ছবিটা শক্ত করে ধরল।

“বাবা, এর মানে কী?”

অমলবাবু চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি তোকে সব বলিনি।”

“কী লুকিয়েছেন?”

বাবা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন অমল মিত্র।

কিন্তু এবার তাঁর মুখে হাসি নেই।

তিনি অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে বললেন—

“অনির্বাণ, তুই আমার ছেলে নোস।”

অনির্বাণ পিছিয়ে গেল।

লোকটি ঘরের ভেতরে পা রাখলেন।

“তুই আমার মেয়ের স্মৃতি থেকে তৈরি হয়েছিস।”

ঘরের ভেতর একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল।

অনির্বাণের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।

“ক্ষমা করিস, বাবা।”

অনির্বাণের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।

“আপনি কী করেছেন?”

অমলবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তোর বোনকে বাঁচাতে গিয়ে আমি তোকে হারিয়েছিলাম। তারপর তোর স্মৃতি ধরে রাখতে গিয়ে অনুরাধার জীবনটাও আটকে দিয়েছি। এই শহর তোর নয়, অনির্বাণ। এই শহর অনুরাধার।”

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় অমল মিত্র এবার হাত বাড়ালেন।

“চল। তোকে তোর আসল পরিচয় দেখাই।”

অনির্বাণ তাঁর হাত ধরতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে একটি মেয়ের চিৎকার শোনা গেল।

“দাদা! ওর হাত ধরো না!”

সবাই ঘুরে তাকাল।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে সেই ছোট মেয়েটি।

অনুরাধা।

তার চোখে জল। হাতে একটি মোটা রেজিস্টার।

“দাদা, আমি এতদিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”

দ্বিতীয় অমল মিত্রের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

তিনি দাঁত চেপে বললেন, “তুমি এখানে আসতে পারবে না!”

অনুরাধা রেজিস্টারটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

“আমি সত্যিটা জানি। আমি জানি, সেদিন ট্রেন দুর্ঘটনায় কে বেঁচে গিয়েছিল।”

অনির্বাণ তার দিকে এগিয়ে গেল।

“অনুরাধা, আমাকে সব বলো।”

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “দাদা, সেদিন আমরা দুজনেই মারা গিয়েছিলাম। কিন্তু বাবা একজনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজনকে ভুলে গিয়েছিলেন।”

“কাকে?”

অনুরাধা রেজিস্টারটা খুলল।

শেষ পাতায় দুটি নাম লেখা।

অনির্বাণ মিত্র।

অনুরাধা মিত্র।

প্রথম নামের পাশে লেখা—মৃত্যু: রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

দ্বিতীয় নামের পাশে লেখা—মৃত্যু: রাত ১২টা ১৮ মিনিট।

কিন্তু দুটি নামের নিচেই লাল কালিতে একটি করে বাক্য লেখা ছিল।

অনির্বাণের নামের নিচে—

“স্মৃতি থেকে পুনর্নির্মিত।”

অনুরাধার নামের নিচে—

“জীবিত, কিন্তু মৃত শহরে বন্দি।”

অনির্বাণের পা থেকে যেন মাটি সরে গেল।

“তাহলে আমি মানুষ নই?”

অনুরাধা মাথা নাড়ল।

“তুমি আমার স্মৃতিতে বেঁচে আছ, দাদা। কিন্তু আমি তোমাকে কখনও ভুলিনি। তাই তুমি ফিরে এসেছ।”

দ্বিতীয় অমল মিত্র চিৎকার করে উঠলেন, “মিথ্যে! সব মিথ্যে!”

তিনি অনুরাধার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

অনির্বাণ মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল।

“থামুন!”

লোকটি থেমে গেলেন।

অনির্বাণ এবার তাঁর চোখের দিকে তাকাল।

“আপনি যদি আমার বাবা না হন, তাহলে আপনি কে?”

লোকটি ধীরে ধীরে হাসলেন।

“আমি সেই মানুষ, যে তোমার বাবাকে সাহায্য করেছিল। আমি সেই স্টেশনমাস্টার, যে মৃত যাত্রীদের স্মৃতি থেকে নতুন জীবন তৈরি করতে পারে। আর আমি সেই মানুষ, যে এই শহরকে ধ্বংস হতে দেয়নি।”

“কিন্তু কেন?”

“কারণ শহরটা ধ্বংস হলে আমি আর বেঁচে থাকব না।”

লোকটির মুখে ফাটল ধরতে শুরু করল। ত্বকের নিচ থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে।

অনুরাধা চিৎকার করে বলল, “দাদা, ওকে আটকাতে হলে যাত্রী তালিকাটা পুড়িয়ে দিতে হবে!”

অনির্বাণ রেজিস্টারের দিকে তাকাল।

“এটাই সেই আসল তালিকা?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তালিকাটা পুড়িয়ে দিলে এই শহরে বন্দি প্রত্যেক মানুষের স্মৃতি মুছে যাবে। কেউ আর ফিরে আসবে না।”

“তাহলে তোমার কী হবে?”

অনুরাধা মৃদু হাসল।

“আমিও মুক্তি পাব।”

দ্বিতীয় অমল মিত্র এবার বিকট চিৎকার করে উঠলেন।

বাড়ির দেওয়াল কাঁপতে লাগল। জানলার কাচ ভেঙে পড়ল। বাইরে শহরের ঘড়িগুলো একসঙ্গে বাজতে শুরু করল।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

ট্রেন দুর্ঘটনার সেই মুহূর্ত আবার ফিরে আসছে।

অনির্বাণ রেজিস্টারটা হাতে নিল।

কিন্তু আগুন ধরানোর আগেই শেষ পাতায় একটি নতুন নাম ফুটে উঠল।

নামটা দেখে তার বুকের ভেতরটা জমে গেল।

মাধবী মিত্র।

তার মা।

নামের পাশে লেখা—

“মৃত্যু: আজ রাত ১২টা ১৮ মিনিট।”

আর ঠিক তখনই বাড়ির সমস্ত দরজা-জানলা বন্ধ হয়ে গেল।

সিঁড়ির ওপর থেকে ভেসে এল এক নারীর কণ্ঠস্বর।

“অনির্বাণ, খোকা… আমি ফিরে এসেছি।”

অনুরাধা কাঁপতে কাঁপতে বলল, “দাদা, মায়ের কথা শুনবে না। মা তো সেদিনই মারা গিয়েছিলেন।”

কণ্ঠস্বরটা আরও কাছে এল।

“খোকা, তুই কি আমাকে চিনতে পারছিস না?”

অনির্বাণ চোখ তুলে তাকাল।

সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা।

হুবহু তার মায়ের মতো।

কিন্তু মহিলার হাতে রয়েছে একটি জ্বলন্ত লণ্ঠন।

আর তাঁর পায়ের নিচে—

কোনো ছায়া নেই।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *