Categories
উপন্যাস

যে গ্রামে রাত নামে না (দ্বিতীয় পর্ব)।

দ্বিতীয় পর্ব — রাত ২:১৭

অনন্যা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।

তার সামনে পুকুর।

পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি তারই মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

একই চোখ।

একই নাক।

একই চুল।

এমনকি বাঁ ভ্রুর ওপর সেই ছোট্ট দাগটাও আছে—যে দাগটা অনন্যার হয়েছিল আট বছর বয়সে সাইকেল থেকে পড়ে।

কিন্তু একটা পার্থক্য ছিল।

লোকটির মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই।

একেবারে স্থির।

পাথরের মতো।

অনন্যা পিছিয়ে এল।

রেকর্ডার তখনও চলছে।

স্পিকারে তার নিজের কণ্ঠ—

“ওটা মৌ নয়।”

তারপর—

“দরজা খুলিস না।”

অনন্যা রেকর্ডারটা হাতে তুলে নিল।

“কে তুমি?”

কোনও উত্তর নেই।

সে জানলার কাঁচে হাত রাখল।

ওপারের মানুষটিও একইভাবে হাত তুলল।

দুই হাতের তালু যেন কাঁচের দুই পাশে একে অপরকে অনুসরণ করছে।

অনন্যা ফিসফিস করে বলল,

“তুমি কে?”

লোকটির ঠোঁট নড়ল।

কিন্তু কোনও শব্দ এল না।

তারপর সে পুকুরের দিকে ফিরে হাঁটতে শুরু করল।

অনন্যা আর নিজেকে আটকাতে পারল না।

দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

বারান্দা ফাঁকা।

উঠোন ফাঁকা।

আকাশ এখনও অদ্ভুত আলোয় ভরা।

সে দৌড়ে পুকুরের দিকে গেল।

কিন্তু সেখানে কেউ নেই।

শুধু পুকুরের জলে একটা বৃত্ত তৈরি হচ্ছে।

যেন কেউ একটু আগেই জলে পাথর ফেলেছে।

অনন্যা টর্চ জ্বালিয়ে চারদিকে তাকাল।

তারপর তার চোখ পড়ল কাদার ওপর।

পায়ের ছাপ।

দুটো মানুষের পায়ের ছাপ।

একটি তার নিজের।

আর অন্যটি—

তার থেকেও ছোট।

শিশুর পা।

অনন্যা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

পায়ের ছাপের পাশে একটা লাল ফিতা পড়ে আছে।

এইবার সে ফিতেটা তুলল না।

কারণ তার মনে হল—

ফিতেটা যেন তাকে দেখছে।


“তুই পুকুরের কাছে গিয়েছিলি?”

সকালে হরিপদবাবুর গলা শুনে অনন্যা চমকে উঠল।

সে চুপ করে রইল।

লোকটি আবার বললেন,

“আমি তোকে বলেছিলাম বাইরে যেতে না।”

“আপনি আমাকে কিছু বলেননি।”

“তোর যাওয়া উচিত ছিল না।”

“কেন?”

হরিপদবাবু উত্তর দিলেন না।

অনন্যা এবার দৃঢ় গলায় বলল,

“আমার বোন এখানে এসেছিল।”

লোকটি চুপ।

“নির্মলবাবু বলেছেন।”

হরিপদবাবু এবার তার দিকে তাকালেন।

“নির্মল তোকে কী বলেছে?”

“মৌকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল।”

হরিপদবাবুর মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“ওর সঙ্গে আর দেখা করিস না।”

“কেন?”

“কারণ সে তোকে সব বলবে না।”

“আপনি বলবেন?”

লোকটি চুপ করে রইলেন।

অনন্যা বলল,

“আমার বোন পনেরো বছর ধরে নিখোঁজ। আমি সত্যিটা জানতে এসেছি।”

হরিপদবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তুই সত্যি শুনতে প্রস্তুত?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আগে একটা কথা মনে রাখ।”

“কী?”

“চাঁদপুরায় রাত নামে না।”

অনন্যা বিরক্ত হয়ে বলল,

“আমি সেটা দেখেছি।”

“না।”

হরিপদবাবু মাথা নাড়লেন।

“তুই আলো দেখেছিস। রাত দেখিসনি।”

অনন্যা চুপ করে গেল।

লোকটি বললেন,

“এখানে রাত আসে। কিন্তু সবার জন্য একই সময়ে আসে না।”


দুপুরের পর অনন্যা আবার স্কুলে গেল।

নির্মলবাবু একা বসে ছিলেন।

অনন্যাকে দেখে তিনি বললেন,

“তুই গিয়েছিলি।”

“হ্যাঁ।”

“কী দেখলি?”

“আমার মতো দেখতে একজনকে।”

নির্মলবাবু চোখ বন্ধ করলেন।

“তাহলে ও তোকে দেখতে শুরু করেছে।”

“কে?”

“যাকে তুই নিজের ছায়া ভাবছিস।”

অনন্যা চেয়ার টেনে বসল।

“আমাকে সব বলুন।”

নির্মলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“পনেরো বছর আগে, তোর বোন মৌকে যখন এখানে আনা হয়েছিল, তখন ওর বয়স আট।”

“কে এনেছিল?”

“তুই।”

অনন্যা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“অসম্ভব!”

“তুই তখনও আট বছরের।”

অনন্যা তাকিয়ে রইল।

নির্মলবাবু বললেন,

“সেদিন তোমরা দু’বোন এখানে এসেছিলে।”

“কেন?”

“একজন আত্মীয়ের সঙ্গে।”

“কোন আত্মীয়?”

“তোর মামা।”

অনন্যা মাথা নাড়ল।

“আমার কোনও মামা নেই।”

নির্মলবাবু শান্ত গলায় বললেন,

“তুই মনে রাখিস না।”

“কেন মনে রাখব না?”

“কারণ সেই রাতের পর তোর স্মৃতি বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

অনন্যা হেসে ফেলল।

“এটা কী বলছেন?”

“যেটা ঘটেছিল, সেটা এত ভয়ঙ্কর ছিল যে তোর মস্তিষ্ক নিজের মতো করে কিছু অংশ মুছে দিয়েছে।”

“আপনি ডাক্তার?”

“না।”

“তাহলে এসব জানেন কীভাবে?”

নির্মলবাবু জানলার বাইরে তাকালেন।

“কারণ সেই রাতের পরে তোর বাবাকে আমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

অনন্যা থমকে গেল।

“আমার বাবা?”

“হ্যাঁ।”

“আমার বাবা তো বলেছিলেন, সেদিন রাতে তিনি বাড়িতেই ছিলেন।”

নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন,

“তোর বাবা অনেক কিছু বলেছিলেন।”

“মৌ কোথায়?”

“জানি না।”

“আপনি মিথ্যে বলছেন।”

“না।”

“তাহলে কী জানেন?”

নির্মলবাবু এবার নিচু গলায় বললেন,

“আমি জানি, মৌ মারা যায়নি।”

অনন্যার বুকের ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি মারল।

“আপনি নিশ্চিত?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে সে কোথায়?”

নির্মলবাবু উত্তর দিলেন না।

অনন্যা তার হাত চেপে ধরল।

“দয়া করে বলুন।”

বৃদ্ধ শিক্ষক বললেন,

“সে এখনও এই গ্রামে আছে।”

অনন্যার মুখ শুকিয়ে গেল।

“কোথায়?”

নির্মলবাবু ধীরে ধীরে বললেন,

“তুই গত রাতে যার গলা শুনেছিস—”

তিনি থামলেন।

“সেটা মৌ।”

অনন্যা কেঁপে উঠল।

“কিন্তু আপনি বলেছিলেন ওটা মৌ নয়!”

“আমি বলিনি ওটা মৌ নয়।”

“রেকর্ডারে আমার নিজের গলা বলেছিল—”

“সেটাই সমস্যা।”

“কী?”

নির্মলবাবু অনন্যার দিকে তাকালেন।

“এই গ্রামে কেউ যখন তোকে ডাকে, তখন তার গলা তোর পরিচিত কারও মতো শোনায়।”

“কেন?”

“কারণ চাঁদপুরা মানুষের ভয় থেকে শব্দ তৈরি করে।”


সেদিন বিকেলে অনন্যা গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

সে ব্যাগ গুছিয়ে ফেলল।

ক্যামেরা।

রেকর্ডার।

ল্যাপটপ।

সব।

বাস সন্ধে সাতটায়।

সে স্ট্যান্ডে পৌঁছতেই দেখল রাস্তার ওপর লোকজন দাঁড়িয়ে আছে।

বাস নেই।

চালক নেই।

কন্ডাক্টর নেই।

একজন বৃদ্ধ বলল,

“আজ বাস যাবে না।”

“কেন?”

“রাস্তা বন্ধ।”

“কী হয়েছে?”

“সেতু ভেঙেছে।”

অনন্যা অবাক।

“কখন?”

“আজ দুপুরে।”

“কিন্তু আমি তো কোনও শব্দ শুনিনি!”

লোকটি বলল,

“এখানে অনেক কিছুই শব্দ না করে ঘটে।”

অনন্যা আর কথা বাড়াল না।

সে ফিরে এল।

হরিপদবাবু তাকে দেখে শুধু বললেন,

“বলেছিলাম না?”

অনন্যা রাগে বলল,

“আপনারা সবাই আমাকে এখানে আটকে রাখতে চাইছেন?”

“না।”

“তাহলে?”

“তুই নিজেই আটকে গেছিস।”


রাত আটটা।

অনন্যা ল্যাপটপ খুলে আগের রাতের রেকর্ডিং শুনতে শুরু করল।

প্রথমে পাখার শব্দ।

তারপর বাইরে বাতাস।

তারপর দরজায় তিনবার ধাক্কা।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মেয়েটির গলা—

“দিদি…”

তারপর নিজের কণ্ঠ—

“ওটা মৌ নয়।”

অনন্যা রেকর্ডিং থামিয়ে দিল।

তারপর আবার চালাল।

এইবার সে অন্য একটা শব্দ শুনতে পেল।

খুব ক্ষীণ।

পেছনে।

কেউ যেন ফিসফিস করছে।

সে অডিওটা বাড়িয়ে দিল।

শব্দটা পরিষ্কার হল।

একটা মেয়ের গলা—

“দিদি, তুই আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিলি।”

অনন্যা স্থির হয়ে গেল।

সে আবার শুনল।

“তুই আমাকে এখানে রেখে গিয়েছিলি।”

তারপর—

“তুই পালিয়ে গিয়েছিলি।”

অনন্যা মাথা নাড়ল।

“না।”

আরও একটা বাক্য—

“তুই আমাকে মেরে ফেলেছিলি।”

অনন্যা ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল।

তারপর নিজের মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরল।

“না…”

তার চোখের সামনে হঠাৎ একটা ছবি ভেসে উঠল।

বৃষ্টি।

অন্ধকার।

একটা পুকুর।

মৌ কাঁদছে।

“দিদি, আমাকে ছেড়ে যাস না।”

আর অনন্যা বলছে—

“চুপ কর!”

মৌ পেছনে সরে যাচ্ছে।

তারপর—

একটা ধাক্কা।

জলে পড়ে যাওয়ার শব্দ।

ছপাৎ!

অনন্যা চিৎকার করে উঠল।

“না!”

হরিপদবাবু ছুটে এলেন।

“কী হয়েছে?”

অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“আমি… আমি মৌকে…”

“কী?”

“আমি ওকে পুকুরে ফেলেছিলাম?”

হরিপদবাবু কিছু বললেন না।

অনন্যা তার মুখের দিকে তাকাল।

“বলুন!”

লোকটির চোখে জল চলে এল।

“তুই ফেলিসনি।”

“তাহলে?”

“তুই ওকে বাঁচাতে জলে নেমেছিলি।”

অনন্যা স্তব্ধ।

“কিন্তু…”

“তুই ডুবে গিয়েছিলি।”

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমি বেঁচে গেলাম কীভাবে?”

হরিপদবাবু উত্তর দিলেন না।


রাত ১১টা।

অনন্যা ঘুমোতে পারল না।

হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে কোনও নম্বর নেই।

শুধু লেখা—

UNKNOWN

সে কল ধরল।

“হ্যালো?”

কোনও উত্তর নেই।

তারপর খুব দূর থেকে একটা শিশুর গলা—

“দিদি?”

অনন্যার চোখ ভিজে গেল।

“মৌ?”

“হ্যাঁ।”

“তুই কোথায়?”

“পুকুরের কাছে।”

“আমি আসছি।”

“না।”

“কেন?”

“কারণ এবার তুই গেলে…”

গলাটা কেঁপে গেল।

“তুই ফিরতে পারবি না।”

অনন্যা বলল,

“তুই কি বেঁচে আছিস?”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর উত্তর—

“আমি তোকে অপেক্ষা করছি।”

“কোথায়?”

“যেখানে তুই আমাকে শেষবার রেখে গিয়েছিলি।”

“পুকুরের কাছে?”

“না।”

“তাহলে?”

মৌ বলল,

“তোর স্মৃতির মধ্যে।”

লাইন কেটে গেল।

অনন্যা ফোনটা নামিয়ে রাখল।

ঠিক তখনই ঘরের আয়নায় কিছু একটা নড়ল।

সে ধীরে ধীরে আয়নার দিকে তাকাল।

আয়নায় সে নিজে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু তার প্রতিবিম্ব—

হাসছে।

অনন্যা হাসছে না।

প্রতিবিম্বটি হাত তুলল।

তারপর আয়নার ভেতর থেকে ঠোঁট নাড়ল—

“তুই ভুলে গেছিস।”

অনন্যা পিছিয়ে গেল।

প্রতিবিম্ব আবার বলল—

“সেদিন পুকুরে দু’জন পড়েছিল।”

অনন্যার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

“দু’জন?”

প্রতিবিম্ব মাথা নাড়ল।

তারপর আয়নার কাচে আঙুল দিয়ে লিখল—

একজন মৌ।

তার নিচে—

আর একজন অনন্যা।

অনন্যা চোখ বন্ধ করল।

আবার খুলল।

আয়নায় এবার আর তার প্রতিবিম্ব নেই।

শুধু একটা ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লাল ফিতা বাঁধা।

ভেজা জামা।

ভেজা চুল।

মৌ।

মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল—

“দিদি…”

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল,

“মৌ…”

মৌ হাত বাড়িয়ে দিল।

“আমাকে বাড়ি নিয়ে চল।”

অনন্যা এক পা এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে নির্মলবাবুর গলা—

“থাম!”

অনন্যা ঘুরে তাকাল।

বৃদ্ধ শিক্ষক দরজায় দাঁড়িয়ে।

তার হাতে একটা পুরনো ঘড়ি।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে—

২:১৭-তে।

নির্মলবাবু চিৎকার করে বললেন,

“ওটা তোর বোন নয়!”

অনন্যা আবার আয়নার দিকে তাকাল।

মৌ নেই।

আয়নায় দাঁড়িয়ে আছে—

অনন্যা নিজেই।

কিন্তু তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো।

নির্মলবাবু বললেন,

“এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে।”

তিনি ঘড়িটা অনন্যার হাতে দিয়ে বললেন,

“পনেরো বছর আগে রাত ২:১৭-তে এই গ্রামের ঘড়িগুলো থেমে গিয়েছিল।”

অনন্যা ঘড়িটার দিকে তাকাল।

“কেন?”

নির্মলবাবু বললেন,

“কারণ সেই মুহূর্তে তুই মারা গিয়েছিলি।”

অনন্যা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

“কী?”

“তুই মারা গিয়েছিলি।”

“তাহলে আমি কে?”

নির্মলবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই—

ঘরের বাইরে থেকে শিশুর হাসি শোনা গেল।

তারপর পুকুরের দিক থেকে একসঙ্গে বহু মানুষের কণ্ঠ—

“অনন্যা…”

“অনন্যা…”

“অনন্যা…”

নির্মলবাবু দরজা বন্ধ করে দিলেন।

তারপর ফিসফিস করে বললেন—

“তুই যে অনন্যা হয়ে এতদিন বেঁচে আছিস…”

তিনি থামলেন।

“সেটাই চাঁদপুরার সবচেয়ে বড় রহস্য।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *