Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে গ্রাম নিজের বিদ্যুৎ নিজেই তৈরি করেছিল।

পাহাড়ের পাদদেশে ছোট্ট একটি গ্রাম ছিল—নাম তার চন্দ্রপুর। গ্রামটি শহর থেকে অনেক দূরে। চারপাশে ধানখেত, বাঁশবন আর সরু মাটির রাস্তা। সরকারি বিদ্যুতের লাইন গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছিল ঠিকই, কিন্তু ঝড়বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যেত। কখনও কয়েক ঘণ্টা, কখনও টানা দু-তিন দিন।

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা। সন্ধ্যার পর কেরোসিনের আলোয় পড়তে গিয়ে অনেকের চোখ জ্বালা করত। ছোট দোকানদারদের ব্যবসা বন্ধ রাখতে হত। রাতে অসুস্থ কেউ পড়লে গ্রামের মানুষকে অন্ধকারের মধ্যেই পথ খুঁজতে হত।

এই গ্রামেই থাকত কুড়ি বছরের যুবক নীলয়। সে আইটিআই থেকে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কাজ শিখে গ্রামে ফিরে এসেছিল। শহরে চাকরির চেষ্টা করার সুযোগ ছিল, কিন্তু গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ দেখে সে ভাবত, নিজের শেখা বিদ্যাটা যদি এখানেই কাজে লাগানো যায়!

একদিন সন্ধ্যায় গ্রামের চায়ের দোকানে বসে সে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। দোকানদার হরিপদ মোমবাতি জ্বালাতে জ্বালাতে বললেন, “এই তো আমাদের প্রতিদিনের জীবন। বিদ্যুৎ কখন আসবে, কেউ জানে না।”

নীলয় বলল, “আমরা যদি বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারি?”

সবাই হেসে উঠল।

“এই গ্রামে আবার বিদ্যুৎ তৈরি হবে কী করে?” একজন বললেন।

নীলয় উত্তর দিল, “বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর কথা বলছি না। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনের কিছুটা যদি নিজেরাই মেটাতে পারি?”

সে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ, খালি জমি এবং পুকুরপাড় ঘুরে দেখল। গ্রামের স্কুলের ছাদে সারাদিন ভালো রোদ পড়ে। কাছেই ছিল একটি ছোট জলপ্রবাহ, যা বর্ষার পরে অনেকটা শুকিয়ে গেলেও কিছু জল ধরে রাখত। নীলয় বুঝল, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে অন্তত স্কুলের আলো, কয়েকটি জরুরি বাতি এবং মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

কিন্তু সমস্যা ছিল অর্থের। গ্রামের মানুষের পক্ষে একসঙ্গে অনেক টাকা জোগাড় করা সম্ভব নয়।

নীলয় প্রথমে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলল। তিনি প্রস্তাবটি শুনে আগ্রহী হলেন। এরপর গ্রামের পঞ্চায়েত, কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হল। কেউ অল্প টাকা দিলেন, কেউ শ্রম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন, আবার কেউ শহরে পরিচিত মানুষের কাছে সাহায্য চাইলেন।

কয়েক মাসের চেষ্টায় স্কুলের ছাদে ছোট একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো হল। সঙ্গে রাখা হল ব্যাটারি, যাতে দিনের আলোয় সঞ্চিত বিদ্যুৎ সন্ধ্যাতেও ব্যবহার করা যায়। অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদদের সাহায্যে পুরো ব্যবস্থাটি পরীক্ষা করা হল। নীলয় গ্রামের কয়েকজন যুবককে এর রক্ষণাবেক্ষণের প্রাথমিক কাজও শেখাল।

প্রথম দিন সন্ধ্যায় স্কুলের ঘরে আলো জ্বলে উঠতেই শিশুরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল। এত দিন যে ঘরে সন্ধ্যার পরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত, সেখানে এবার নিয়মিত ক্লাস ও পড়ার ব্যবস্থা শুরু হল।

কিন্তু নীলয় জানত, শুধু আলো জ্বালানোই যথেষ্ট নয়। যন্ত্রের যত্ন নিতে হবে, ব্যাটারি ঠিক রাখতে হবে, বিদ্যুতের অপচয় কমাতে হবে। তাই সে একটি ছোট কমিটি তৈরি করল। কমিটির সদস্যরা প্রতি মাসে সামান্য চাঁদা জমা দিতে লাগলেন, যাতে ভবিষ্যতে মেরামতের খরচ জোগানো যায়।

এরপর গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও একটি ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হল। রাতে জরুরি আলো জ্বালানো এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চালানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হল। কোথায় কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, তা হিসাব করে পরিকল্পনা তৈরি করা হল।

এক বছর পরে চন্দ্রপুর পুরোপুরি বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হয়ে যায়নি। সরকারি বিদ্যুতের প্রয়োজন তখনও ছিল। তবে বিদ্যুৎ চলে গেলেই যে সব কাজ থেমে যাবে, সেই অসহায়তা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

একদিন জেলা থেকে কয়েকজন আধিকারিক গ্রামটি দেখতে এলেন। তাঁরা নীলয়কে জিজ্ঞাসা করলেন, “এত ছোট উদ্যোগ থেকে আপনি কী শিখলেন?”

নীলয় স্কুলের ছাদে জ্বলতে থাকা সৌরপ্যানেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা শিখেছি, সমস্যার সমাধানের জন্য সব সময় বাইরে থেকে কেউ এসে সবকিছু করে দেবে, তার অপেক্ষা করতে হয় না। নিজেরা উদ্যোগ নিতে পারি। তবে পরিকল্পনা, সঠিক প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষিত মানুষের সাহায্য ছাড়া কোনও ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন টেকে না।”

সেদিন স্কুলের এক ছাত্র নীলয়ের হাত ধরে বলেছিল, “দাদা, বড় হয়ে আমিও এমন কিছু বানাতে চাই, যাতে আমাদের গ্রামের মানুষের সুবিধা হয়।”

নীলয় হেসে বলেছিল, “তাহলে আজ থেকেই শেখা শুরু করো। পরিবর্তন একদিনে আসে না। একজনের ছোট উদ্যোগ থেকেই অনেকের পথ তৈরি হয়।”

চন্দ্রপুরের সন্ধ্যাগুলো ধীরে ধীরে বদলে গেল। আলো শুধু স্কুলের ঘরে জ্বলল না, মানুষের মনেও জ্বলে উঠল আত্মবিশ্বাসের নতুন প্রদীপ।

শিক্ষা: স্থানীয় সমস্যার সমাধানে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়ার আগে স্বনির্ভরতার পথে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *