শীতের সকাল।
কুয়াশায় ঢেকে আছে গোটা রামপুর গ্রাম। রাস্তার দুপাশের খেত সাদা চাদরের মতো দেখাচ্ছে। দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টা, কোথাও মোরগের ডাক।
গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় ছোট্ট একটা পোস্ট অফিস।
পোস্ট অফিস বলতে একটা ঘর, সামনে টিনের ছাউনি, আর দরজার পাশে লাল রঙের একটা ডাকবাক্স।
সেখানেই কাজ করেন বিমলবাবু।
বয়স পঞ্চান্ন। প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি চিঠি বিলি করেন। গ্রামের মানুষ তাঁকে শুধু ডাকপিয়ন বলে না, অনেকেই নিজেদের পরিবারের লোকের মতো মনে করে।
কারও ছেলে শহরে কাজ করে, কারও মেয়ে বিয়ের পর দূরে থাকে, কারও ভাই সেনাবাহিনীতে—সব খবরই প্রথমে আসে বিমলবাবুর হাত ধরে।
কিন্তু গত এক বছর ধরে একটা বিষয় তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল।
গ্রামে চিঠি আসা কমে গেছে।
সবাই মোবাইল ব্যবহার করে।
তবু একটা বৃদ্ধা প্রতিদিন পোস্ট অফিসের সামনে এসে বসেন।
তাঁর নাম সরলা।
প্রতিদিন সকাল দশটার দিকে তিনি এসে ডাকবাক্সটার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বিমলবাবু একদিন জিজ্ঞেস করলেন,
—“মাসিমা, কার চিঠির অপেক্ষা করছেন?”
সরলা ধীরে বললেন,
—“ছেলের।”
—“আপনার ছেলে কোথায়?”
—“দিল্লিতে কাজ করে।”
—“ফোন করেন না?”
সরলা মাথা নাড়লেন।
—“ফোন আছে। কিন্তু কথা বলতে পারে না।”
বিমলবাবু অবাক।
—“কেন?”
—“ও শুনতে পায় না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সরলা বললেন,
—“ও ছোটবেলা থেকেই খুব কম শুনত। বড় হয়ে পুরোপুরি শুনতে পায় না।”
বিমলবাবু বললেন,
—“তাহলে চিঠি লেখেন না কেন?”
সরলা হেসে ফেললেন।
—“আমি লিখতে জানি না।”
পরদিনও সরলা এলেন।
তারপরের দিনও।
প্রায় প্রতিদিন।
একদিন বিমলবাবু বললেন,
—“আপনি চাইলে আমি আপনার হয়ে চিঠি লিখে দিতে পারি।”
সরলা চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“কী লিখব?”
বিমলবাবু বললেন,
—“যা বলতে চান।”
সরলা অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
—“লিখবেন—‘বাবা, তুই খাস তো?’”
বিমলবাবু লিখলেন।
সরলা বললেন,
—“লিখবেন—‘শীতে কম্বল নিয়েছিস?’”
বিমলবাবু লিখলেন।
—“লিখবেন—‘তোর ছোটবেলার লাল সোয়েটারটা এখনও আমার কাছে আছে।’”
বিমলবাবু লিখলেন।
তারপর সরলা হঠাৎ থেমে গেলেন।
বিমলবাবু জিজ্ঞেস করলেন,
—“আর কিছু?”
সরলা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
—“লিখবেন—‘আমি ভালো আছি। তুই চিন্তা করিস না।’”
বিমলবাবু চিঠিটা শেষ করলেন।
ঠিকানা লিখে দিলেন।
সরলা চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“এই চিঠি সত্যিই পৌঁছবে তো?”
বিমলবাবু বললেন,
—“চিঠি পৌঁছবেই।”
দুই সপ্তাহ পর একটা উত্তর এল।
সরলার নামে।
বিমলবাবু চিঠি নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলেন।
সরলা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
—“কার চিঠি?”
—“আপনার ছেলের।”
সরলার হাত কাঁপতে লাগল।
বিমলবাবু চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলেন।
ছেলে লিখেছে—
“মা, তুমি ভালো আছ শুনে আমার মনটা শান্ত হয়েছে। আমি কম্বল নিয়েছি। তোমার লাল সোয়েটারটার কথা মনে আছে। আমি ফিরতে পারিনি বলে আমাকে ক্ষমা করো।”
সরলা চুপ করে শুনলেন।
চিঠি শেষ হলে বললেন,
—“আর কী লিখেছে?”
বিমলবাবু নিচের অংশ পড়লেন।
“মা, তুমি বলেছিলে তুমি ভালো আছ। কিন্তু আমি জানি তুমি একা। এবার পুজোর পর আমি বাড়ি আসব।”
সরলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
তিনি বললেন,
—“ও আসবে?”
—“চিঠিতে তাই লিখেছে।”
সরলা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন।
কয়েক মাস পর ছেলে এল।
নাম অমল।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছু বলতে পারছিল না।
সরলা শুধু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
—“এতদিন কোথায় ছিলি?”
অমল মায়ের হাত ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
সেই দিন সন্ধ্যায় সে পোস্ট অফিসে এল।
বিমলবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“আপনি আমার মাকে চিঠি লিখে দিয়েছিলেন?”
বিমলবাবু হাসলেন।
—“হ্যাঁ।”
অমল পকেট থেকে একটা খাম বের করল।
—“এটা আপনার জন্য।”
বিমলবাবু খুলে দেখলেন—একটা ছোট্ট চিঠি।
অমল লিখেছে—
“বিমলকাকু,
আমি ছোটবেলা থেকে ঠিকমতো শুনতে পাই না। ফোনে মায়ের কথা শুনতে পারি না। তাই ধীরে ধীরে মায়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আপনি যদি মায়ের হয়ে সেই প্রথম চিঠিটা না লিখতেন, হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না মা এখনও প্রতিদিন আমার জন্য অপেক্ষা করে।
আপনি শুধু একটা চিঠি লেখেননি।
আপনি আমার আর আমার মায়ের মাঝের দূরত্বটা কমিয়ে দিয়েছেন।
ধন্যবাদ।”
চিঠিটা পড়ে বিমলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“আমি শুধু তোমার মায়ের কথাগুলো কাগজে লিখেছি। আসল চিঠিটা তো তোমার মা-ই লিখেছিল।”
অমল মাথা নাড়ল।
—“কিন্তু তিনি তো লিখতে জানতেন না।”
বিমলবাবু হেসে বললেন,
—“লেখাপড়া না জানলেও মানুষ মনের কথা বলতে জানে।”
এরপর থেকে রামপুর পোস্ট অফিসে একটা নতুন কাজ শুরু হল।
গ্রামের যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা পড়তে বা লিখতে পারেন না, বিমলবাবু তাঁদের চিঠি লিখে দেন।
কেউ ছেলেকে লিখে—
“বাবা, অনেকদিন আসিসনি।”
কেউ মেয়েকে লিখে—
“তোর পাঠানো শাড়িটা পেয়েছি।”
কেউ বিদেশে থাকা নাতিকে লিখে—
“তুই কবে বাড়ি আসবি?”
বিমলবাবু সব চিঠি লিখে দেন।
একদিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক তাঁকে বললেন,
—“আপনি চাইলে এই কাজটা বন্ধ করে দিতে পারেন। এখন তো সবাই ফোন করে।”
বিমলবাবু বললেন,
—“ফোন খবর দেয়। চিঠি অপেক্ষা শেখায়।”
শিক্ষক চুপ করে গেলেন।
কয়েক বছর পর বিমলবাবুর অবসর নেওয়ার সময় এল।
সেদিন পোস্ট অফিসের সামনে গ্রামের অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল।
সরলাও এসেছিলেন।
অমলও এসেছিল।
সরলা হাতে একটা ছোট্ট প্যাকেট নিয়ে বিমলবাবুর সামনে দাঁড়ালেন।
—“এটা আপনার জন্য।”
বিমলবাবু খুলে দেখলেন একটা পুরোনো ফাউন্টেন পেন।
সরলা বললেন,
—“এই কলম দিয়ে কত মানুষের কথা লিখেছেন। এখন এটা আপনার কাছে থাক।”
বিমলবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বললেন,
—“এটা আমি রাখব।”
সরলা বললেন,
—“আর একটা কথা।”
—“কী?”
—“আপনি আমাকে চিঠি লিখতে শিখিয়েছেন।”
বিমলবাবু অবাক।
সরলা নিজের ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করলেন।
কাঁপা হাতে লেখা—
“বিমলবাবু, ভালো থাকবেন।”
অক্ষরগুলো সুন্দর নয়।
কোথাও বাঁকা, কোথাও কালি ছড়িয়ে গেছে।
তবু সেই কয়েকটি শব্দ দেখে বিমলবাবু দীর্ঘক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না।
কারণ জীবনে প্রথমবার সরলা নিজের হাতে একটা চিঠি লিখেছেন।
আর সেই চিঠিতে ছিল কোনো ছেলের জন্য অপেক্ষা নয়।
ছিল একজন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
বিমলবাবু কাগজটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখলেন।
দূরে তখন পোস্ট অফিসের লাল ডাকবাক্সটা বিকেলের রোদে ঝলমল করছে।
চিঠি হয়তো আগের মতো আর আসে না।
কিন্তু মানুষের মনের কথা—
সেটা কখনও পুরোনো হয় না।
কারণ কিছু কথা ফোনে বলা যায় না।
কিছু অপেক্ষা মেসেজে বোঝানো যায় না।
আর কিছু ভালোবাসা—
শুধু একটা কাগজে কয়েকটি কাঁপা অক্ষর হয়ে সারাজীবন বেঁচে থাকে।