Categories
গল্প বিবিধ

যে ছেলেটি নীরবতার শব্দ শুনতে পেত।

১. অন্য রকম একটি ছেলে

বীরভূমের এক ছোট্ট গ্রামে থাকত ষোলো বছরের ছেলে নীল। তার বাবা গ্রামের একটি ছোট মুদির দোকান চালাতেন, আর মা বাড়িতে হাতে তৈরি নকশিকাঁথা সেলাই করতেন। নীল পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হলেও তার একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপ করে বসে থাকতে পারত।

কখনও পুকুরের ধারে, কখনও মাঠের আলের ওপর, কখনও বাড়ির পিছনের পুরোনো আমগাছটার নিচে বসে থাকত সে। অন্য ছেলেরা যখন মাঠে ফুটবল খেলত, তখন নীল কখনও তাদের সঙ্গে খেলত, আবার কখনও একা বসে চারপাশের পরিবেশ লক্ষ করত।

গ্রামের লোকেরা তাকে নিয়ে মজা করত।

—ছেলেটা বড্ড চুপচাপ! সারাক্ষণ কী ভাবে কে জানে!

কেউ কেউ বলতেন, নীল নাকি নিজের কল্পনার জগতে বাস করে।

কিন্তু নীলের কাছে চারপাশের পৃথিবী কখনও নীরব ছিল না। সে শুনতে পেত পুকুরের জলে মাছের লাফ দেওয়ার শব্দ, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে ছোট প্রাণীর ছুটে যাওয়া, দূরের মাঠে কৃষকের লাঙল চালানোর ছন্দ, এমনকি বৃষ্টির আগে বাতাসের বদলে যাওয়া সুরও।

একদিন বিকেলে সে পুকুরের ধারে বসেছিল। হঠাৎ খেয়াল করল, গত কয়েক দিন ধরে যে জায়গাটিতে অসংখ্য ব্যাঙ ডাকত, সেখানে আজ অস্বাভাবিক নীরবতা।

সে চারপাশে তাকাল। জল আগের মতোই আছে, গাছপালাও রয়েছে। তবু কিছু একটা যেন বদলে গেছে।

নীল বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞাসা করল, —মা, আমাদের পুকুরের ধারে ব্যাঙের ডাক কি কমে গেছে?

মা রান্না করতে করতে বললেন, —তা তো খেয়াল করিনি। বর্ষা এলে আবার ডাকবে হয়তো।

কিন্তু নীলের মনে প্রশ্নটা থেকে গেল।

সে ঠিক করল, পুকুরের আশপাশে কী পরিবর্তন ঘটছে, তা খুঁজে দেখবে।

২. ছোট্ট খাতার বড় কাজ

নীলের স্কুলে পরিবেশবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন সৌমেনবাবু। তিনি ছাত্রছাত্রীদের শুধু বই পড়তে বলতেন না; আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতেও উৎসাহ দিতেন।

পরদিন স্কুলে নীল তাঁর কাছে পুকুরের ব্যাঙের ডাক কমে যাওয়ার কথা বলল।

সৌমেনবাবু মন দিয়ে শুনলেন।

—তুমি কি নিশ্চিত যে সত্যিই ডাক কমেছে, নাকি সময়ের পরিবর্তনের জন্য তোমার এমন মনে হচ্ছে?

নীল একটু থেমে বলল, —পুরোপুরি নিশ্চিত নই, স্যার। তাই আমি কয়েক দিন ধরে লক্ষ্য করতে চাই।

শিক্ষক খুশি হলেন।

—খুব ভালো। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে পর্যবেক্ষণ দরকার। তবে মনে রেখো, শুধু ডাক কমে যাওয়া থেকে ব্যাঙের সংখ্যা কমেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আবহাওয়া, ঋতু, সময়—অনেক কারণ থাকতে পারে।

তিনি নীলকে একটি ছোট খাতা রাখতে বললেন। সেখানে প্রতিদিনের তারিখ, সময়, আবহাওয়া এবং সে কী লক্ষ করেছে, তা লিখে রাখতে হবে।

নীল খাতাটির নাম দিল—‘আমাদের পুকুরের দিনলিপি’।

প্রতিদিন বিকেলে সে নির্দিষ্ট সময়ে পুকুরের ধারে যেত। একই জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করত। কখনও ব্যাঙের ডাক শুনত, কখনও পোকামাকড়ের শব্দ, কখনও জলের রং কিংবা পাড়ের অবস্থা লক্ষ করত।

প্রথম সপ্তাহে তেমন কিছু বোঝা গেল না। দ্বিতীয় সপ্তাহে সে দেখতে পেল, পুকুরের এক পাশের জলে সবুজ আস্তরণ বেড়েছে। পাড়ের কাছে কয়েকটি প্লাস্টিকের প্যাকেটও পড়ে ছিল।

নীল সেগুলো খাতায় লিখে রাখল।

সে জানত না, এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ব্যাঙের ডাকের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। কিন্তু তার মনে হলো, পুকুরের চারপাশে যা ঘটছে, তা আরও ভালোভাবে দেখা দরকার।

৩. যে পরিবর্তন কেউ খেয়াল করেনি

পুকুরটি গ্রামের বহু মানুষের কাজে লাগত। কেউ সেখানে গবাদি পশুকে জল খাওয়াতেন, কেউ পাড়ে বসে কাপড় ধুতেন, আবার কেউ মাছ ধরতেন।

গত কয়েক মাসে পুকুরের এক পাশে কিছু নির্মাণকাজও চলছিল। বৃষ্টির সময় সেই দিক থেকে মাটি ধুয়ে পুকুরে পড়ত। কয়েকটি বাড়ি থেকে আবর্জনাও এসে জমত পাড়ের কাছে।

নীল বিষয়গুলো খাতায় লিখে রাখলেও সে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।

একদিন সে তার বন্ধু সায়নকে সঙ্গে নিয়ে পুকুরের চারপাশে হাঁটল। তারা দেখল, একদিকে পাড়ের ঘাস উঠে গেছে, অন্যদিকে জমে রয়েছে প্লাস্টিক ও শুকনো আবর্জনা।

সায়ন বলল, —এগুলো পরিষ্কার করে দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে!

নীল বলল, —পরিষ্কার করা দরকার, কিন্তু শুধু এটুকু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে কি না, আমরা জানি না। আগে বড়দের জানাই।

দুজন মিলে সৌমেনবাবুর কাছে গেল। শিক্ষক তাদের পর্যবেক্ষণের খাতা দেখে বললেন, —তোমরা খুব ভালো কাজ করেছ। এবার পুকুরটি যারা দেখাশোনা করেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। পরিবেশের সমস্যা বুঝতে হলে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও জানতে হয়।

তিনি গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তাঁরা জানালেন, আগে বর্ষাকালে পুকুরের চারপাশে অনেক ছোট জলজ প্রাণী দেখা যেত। তবে তাঁদের স্মৃতি থেকে একা কোনো নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

সবাই মিলে ঠিক করলেন, পুকুরের অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত পরিবেশকর্মী বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাহায্য নেওয়া হবে।

নীল বুঝতে পারল, তার ছোট্ট পর্যবেক্ষণ তাকে একা কোনো সমস্যার সমাধান দেয়নি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো সামনে আনতে পেরেছে।

৪. গ্রামের সভায় এক কিশোর

রবিবার বিকেলে গ্রামের ক্লাবঘরে একটি সভা বসেছিল। সেখানে পুকুরের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। সৌমেনবাবু নীলকে তার খাতা নিয়ে যেতে বললেন।

প্রথমে নীল খুব ভয় পেয়ে গেল। এত বড়দের সামনে সে কখনও কথা বলেনি।

বাবা তাকে সাহস দিয়ে বললেন, —যা দেখেছিস, শুধু সেটুকুই বলবি। যা জানিস না, তা জানি না বলবি। সত্যি কথা বলার জন্য ভয় পাস না।

সভায় নীল দাঁড়াল। তার হাত একটু কাঁপছিল। তবু সে খাতাটি খুলে বলল, —আমি কয়েক সপ্তাহ ধরে একই সময়ে পুকুরের ধারে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিছু দিনে ব্যাঙের ডাক কম শুনেছি। পুকুরের এক পাশে সবুজ আস্তরণ বেড়েছে, আর পাড়ের কাছে আবর্জনা জমেছে। তবে এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ঠিক কী সম্পর্ক আছে, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।

সভায় কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।

একজন বললেন, —এত ছোট ছেলে এত কিছু লিখে রেখেছে!

অন্য একজন প্রশ্ন করলেন, —তাহলে কি পুকুরের জল খারাপ হয়ে গেছে?

সৌমেনবাবু উত্তর দিলেন, —শুধু দেখে জলের গুণমান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করাতে হবে।

নীল আবার বলল, —আমরা অন্তত পুকুরের পাড়ে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে পারি। আর পুকুরের অবস্থা নিয়মিত লক্ষ্য করতে পারি।

তার কথায় গ্রামের মানুষ উৎসাহিত হলেন। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, পুকুরের চারপাশ পরিষ্কার করা হবে এবং আবর্জনা ফেলার উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি পুকুরের জলের অবস্থা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে নীলের মনে হলো, চুপ করে লক্ষ করা কখনও কখনও কথা বলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

৫. পরিষ্কারের দিন

পরের রবিবার গ্রামের অনেক মানুষ পুকুরের পাড়ে জড়ো হলেন। যুবকেরা আবর্জনা সংগ্রহ করলেন, বড়রা পাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করলেন, আর স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ পরিষ্কার রাখার বার্তা লেখা ছোট পোস্টার তৈরি করল।

নীল ও সায়ন প্লাস্টিকের প্যাকেট সংগ্রহ করতে করতে দেখল, পুকুরের এক পাশে ভাঙা বোতলও পড়ে রয়েছে। তারা সাবধানে বড়দের সাহায্যে সেগুলো সরাল।

তবে নীল খেয়াল করল, পরিষ্কার করার পরও পুকুরের জলে সবুজ আস্তরণ রয়ে গেছে।

সে সৌমেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, —স্যার, আমরা তো আবর্জনা সরালাম। কিন্তু জলের রং এখনও একই রকম কেন?

শিক্ষক বললেন, —জলের রং বদলানোর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কখনও শৈবালের বৃদ্ধি, কখনও পলির উপস্থিতি, কখনও অন্য পরিবেশগত কারণ কাজ করতে পারে। শুধু রং দেখে কারণ নির্ধারণ করা ঠিক নয়। প্রয়োজনে জল পরীক্ষা করতে হবে।

নীল আবার খাতায় লিখল—‘পাড় পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু জলের অবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য দরকার।’

সে বুঝতে পারছিল, কোনো সমস্যার দৃশ্যমান অংশ সরিয়ে ফেললেই সব সময় মূল সমস্যা মেটে না।

৬. বৃষ্টির রাত

কয়েক দিন পরে প্রবল বৃষ্টি হলো। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বৃষ্টি পড়ল একটানা। সকালে নীল পুকুরের ধারে গিয়ে দেখল, নির্মাণকাজ চলা দিক থেকে মাটি ধুয়ে পুকুরের পাড়ে জমেছে। কিছু আবর্জনাও আবার জলের কাছে এসে পড়েছে।

নীল বুঝল, শুধু এক দিনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যথেষ্ট নয়। যে দিক থেকে মাটি ও আবর্জনা আসছে, সেখানে স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার।

সে ছবি তুলে শিক্ষককে দেখাল। সৌমেনবাবু বিষয়টি গ্রামের সভায় তুললেন। নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে বৃষ্টির জল কোন পথে নামছে, তা পরীক্ষা করা হলো। পাড়ে মাটি আটকানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং আবর্জনা যাতে জলে না আসে, সেই পরিকল্পনা নেওয়া হলো।

এবার গ্রামের মানুষ বুঝলেন, পুকুর রক্ষা করার জন্য নিয়মিত পরিচর্যা এবং পরিকল্পনা দুটোই দরকার।

নীল তার দিনলিপি চালিয়ে গেল। সে কোনোদিন ব্যাঙের ডাক বেশি শুনত, কোনোদিন কম। সে প্রতিটি দিনের আবহাওয়া লিখে রাখত, যাতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনগুলো তুলনা করা যায়।

তার পর্যবেক্ষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হলো—প্রকৃতিকে বোঝার জন্য এক দিনের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।

৭. যে উত্তরটি সহজ ছিল না

কয়েক সপ্তাহ পর সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পরামর্শে পুকুরের জল পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হলো। পরীক্ষার ফলাফল থেকে জলের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেল। তবে ব্যাঙের ডাক কম শোনার একমাত্র কারণ হিসেবে কোনো একটি বিষয়কে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা গেল না।

নীল প্রথমে একটু হতাশ হলো।

সে ভেবেছিল, এত দিন পর্যবেক্ষণ করার পরে নিশ্চয়ই একটি স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যাবে।

সৌমেনবাবু তাকে বুঝিয়ে বললেন, —বিজ্ঞানে সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। অনেক সময় তথ্য থেকে কিছু সম্ভাবনা বোঝা যায়, কিন্তু নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা দরকার হয়।

নীল বলল, —তাহলে আমার এত দিনের খাতাটা কি কাজে লাগল না?

শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, —কেন লাগবে না? তুমি পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করেছ, সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগে মানুষকে যুক্ত করেছ। এখন ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তোমার তথ্য তুলনা করা যাবে। সব উত্তর না পেলেও কাজের মূল্য কমে যায় না।

কথাগুলো শুনে নীলের মন হালকা হলো।

সে বুঝল, অনুসন্ধানের সাফল্য সব সময় চূড়ান্ত উত্তর পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনও সাফল্য হলো সঠিক প্রশ্ন করা এবং আরও ভালোভাবে জানার পথ তৈরি করা।

৮. নীরবতার অর্থ

পরবর্তী কয়েক মাস ধরে গ্রামের মানুষ পুকুরের পরিচর্যা চালিয়ে গেলেন। আবর্জনা ফেলার সমস্যা কমানোর চেষ্টা হলো। বৃষ্টির জল নামার পথেও কিছু পরিবর্তন আনা হলো। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পালা করে পুকুরের চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।

নীল এখনও প্রতিদিন সেখানে যেত না, তবে সপ্তাহে কয়েক দিন নির্দিষ্ট সময়ে পর্যবেক্ষণ করত। সে জানত, ব্যাঙের ডাক ঋতু ও আবহাওয়ার সঙ্গে বদলাতে পারে। তাই শুধু একদিনের শব্দ শুনে সিদ্ধান্ত নিত না।

এক বর্ষার সন্ধ্যায় পুকুরের ধারে বসে থাকতে থাকতে সে আবার ব্যাঙের ডাক শুনল। প্রথমে একটি, তারপর আরেকটি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শব্দগুলো স্পষ্ট হলো।

নীল খুশি হলো, কিন্তু এবার সে অতিরিক্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিল না। সে শুধু তারিখ, সময় এবং আবহাওয়ার কথা লিখে রাখল।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

বাতাসে পাতার শব্দ, দূরের মানুষের কথা, জলের মৃদু ঢেউ—সব মিলিয়ে চারপাশ আবার জীবন্ত মনে হচ্ছিল।

সে বুঝতে পারল, প্রকৃতির শব্দ শোনা মানে শুধু কান খোলা রাখা নয়। চোখ দিয়ে দেখা, মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা এবং নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহসও দরকার।

৯. নতুন প্রজন্মের কানে

বছর ঘুরে স্কুলে পরিবেশ দিবস এল। শিক্ষক নীলকে ছোটদের সামনে তার অভিজ্ঞতা বলতে বললেন।

নীল মঞ্চে উঠে নিজের খাতাটি দেখাল। পাতাগুলোতে তারিখ, আবহাওয়া, পর্যবেক্ষণ এবং ছোট ছোট প্রশ্ন লেখা।

সে বলল, —আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, ব্যাঙের ডাক কমে যাওয়ার একটা নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু পরে বুঝেছি, শুধু একটি লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আমাদের আরও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে, বড়দের সাহায্য নিতে হয়েছে এবং পুকুরের পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

একটি ছোট মেয়ে হাত তুলে জিজ্ঞাসা করল, —দাদা, তাহলে আমরা কীভাবে প্রকৃতিকে সাহায্য করব?

নীল বলল, —প্রথমে চারপাশে কী ঘটছে, সেটা মন দিয়ে দেখো। অযথা আবর্জনা ফেলো না, জলাশয় নোংরা হতে দেখলে বড়দের জানাও, গাছপালা ও প্রাণীদের বিরক্ত কোরো না। আর কোনো সমস্যার কারণ না জেনে নিশ্চিত কথা বলো না।

ছাত্রছাত্রীরা মন দিয়ে শুনল।

অনুষ্ঠানের শেষে শিক্ষক নীলের হাতে তার পর্যবেক্ষণের খাতাটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, —এই খাতাটি তোমার প্রথম গবেষণার স্মৃতি। যত দিন কৌতূহল থাকবে, তত দিন শেখার পথও খোলা থাকবে।

নীল খাতাটি বুকের কাছে ধরে হাসল।

১০. যে নীরবতা প্রশ্ন করতে শেখায়

সেদিন সন্ধ্যায় নীল আবার পুকুরের ধারে গেল। আকাশে মেঘ ছিল, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। সে পুকুরের পাশে বসে রইল।

দূরে কয়েকটি ব্যাঙ ডাকছিল। ঝোপের মধ্যে পোকামাকড়ের শব্দ হচ্ছিল। পুকুরের জলে ছোট ঢেউ উঠছিল।

নীল ভাবল, আগে সে নীরবতাকে শুধু শান্ত পরিবেশ বলে মনে করত। এখন সে জানে, কখনও নীরবতা একটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোনো পরিচিত শব্দ হঠাৎ কমে গেলে, কোনো গাছ শুকিয়ে গেলে, কোনো জলাশয়ের চেহারা বদলে গেলে—সেগুলোকে মন দিয়ে দেখা দরকার।

তবে প্রতিটি পরিবর্তনের অর্থ নিজে থেকে নির্ধারণ করা যায় না। জানতে হয়, পরীক্ষা করতে হয়, অভিজ্ঞ মানুষের সাহায্য নিতে হয়।

বাড়ি ফেরার আগে সে খাতায় লিখল—

‘আজ ব্যাঙের ডাক শুনলাম। পুকুরের পাড় আগের চেয়ে পরিষ্কার। পর্যবেক্ষণ চলবে।’

খাতাটি বন্ধ করে নীল আকাশের দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, পৃথিবী প্রতিদিনই অসংখ্য গল্প বলে যায়। কেউ সেই গল্প শুনতে পায়, কেউ পায় না। কিন্তু যে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, তার কাছে নীরবতার মধ্যেও নতুন জ্ঞানের দরজা খুলে যায়।

আর সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বড় কোনো পদবি লাগে না। লাগে কৌতূহল, ধৈর্য এবং সত্যকে জানার আন্তরিক ইচ্ছা।

শিক্ষা: প্রকৃতিকে রক্ষা করার প্রথম ধাপ হলো মনোযোগ দিয়ে তাকে বোঝার চেষ্টা করা। পর্যবেক্ষণ, সঠিক তথ্য, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ছোট সমস্যাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা সম্ভব।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *