Categories
গল্প বিবিধ

যে ছোট্ট ঘড়িটি থামিয়ে দিয়েছিল একটি পরিবারের দূরত্ব।।

পূর্ব মেদিনীপুরের এক ছোট্ট গ্রামে ছিল মুখোপাধ্যায় পরিবারের পুরোনো বাড়ি। বাড়িটি খুব বড় ছিল না, কিন্তু তার প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে ছিল বহু বছরের স্মৃতি। উঠোনের একপাশে তুলসীমঞ্চ, পিছনে আমগাছ, আর সামনের ঘরে দেওয়ালে ঝোলানো একটি কাঠের পুরোনো ঘড়ি।

ঘড়িটি দেখতে সাধারণ হলেও পরিবারের কাছে তার বিশেষ মূল্য ছিল। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে অমলবাবুর বাবা ঘড়িটি কিনেছিলেন। তখন তিনি ছিলেন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রতিদিন সকালে ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শুনেই পরিবারের সকলে ঘুম থেকে উঠত। বাবা স্কুলে যেতেন, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন, আর ছোট্ট অমল বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্কুলের পথে বেরিয়ে যেত।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। অমলবাবু বড় হয়েছেন, চাকরি করেছেন, বিয়ে করেছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন। তাঁর স্ত্রী মাধবী দেবী সংসারের সমস্ত দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁদের ছেলে অর্ণব কলকাতায় চাকরি করে, মেয়ে অনন্যা থাকে বেঙ্গালুরুতে।

একসময় যে বাড়িতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের কথাবার্তা শোনা যেত, সেখানে এখন বেশিরভাগ সময় নীরবতা।

অমলবাবু ও মাধবী দেবী দুজনেই বৃদ্ধ হয়েছেন। ছেলেমেয়েরা কাজের ব্যস্ততায় নিয়মিত বাড়ি আসতে পারে না। ফোনে কথা হয়, উৎসবের সময় দেখা হয়, কিন্তু একসঙ্গে বসে দীর্ঘক্ষণ গল্প করার সুযোগ ক্রমশ কমে এসেছে।

এই দূরত্ব নিয়ে অমলবাবুর মনে অনেক অভিমান জমেছিল।

তিনি মনে করতেন, সন্তানদের কাছে এখন কাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে অর্ণব ভাবত, বাবা কখনও তার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন না। অফিসের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের পড়াশোনা—সব সামলে প্রতিবার বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয় না।

ফোনে কথা বলার সময় তাই প্রায়ই ছোটখাটো কথা নিয়ে মনোমালিন্য হতো।

“বাবা, এই মাসে ছুটি পাচ্ছি না,” অর্ণব একদিন বলেছিল।

অমলবাবু গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়েছিলেন, “তোমাদের তো এখন আর বাড়ির কথা মনে পড়ে না।”

অর্ণবও বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তুমি কি একবারও ভাবো না, আমারও কত দায়িত্ব আছে?”

তারপর কয়েক দিন আর ফোন হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য, অর্ণবের বারো বছরের মেয়ে তিতলি, একদিন দাদু-দিদার বাড়িতে বেড়াতে এল। তার স্কুলে ছুটি পড়েছে। মা-বাবা কাজের জন্য কলকাতায় থাকায় কয়েক দিন সে দাদু-দিদার সঙ্গে থাকবে।

তিতলি বাড়িতে ঢুকেই দেওয়ালের পুরোনো ঘড়িটি লক্ষ করল।

ঘড়ির কাঁটা দাঁড়িয়ে আছে বিকেল চারটে সতেরো মিনিটে।

“দাদু, ঘড়িটা চলছে না কেন?”

অমলবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, “অনেক দিন হলো বন্ধ হয়ে আছে। ঠিক করানো হয়নি।”

“কেন? ঘড়িটা তো খুব সুন্দর!”

“পুরোনো জিনিস। এখন আর কে এসব ব্যবহার করে বলো?”

তিতলি ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, ঘড়িটা যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে পাচ্ছে না।

সেদিন সন্ধ্যায় দিদার কাছে সে ঘড়িটির ইতিহাস জানতে চাইল। মাধবী দেবী গল্প করতে ভালোবাসতেন। তিনি বললেন, এই ঘড়ির সঙ্গে তাদের পরিবারের কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

“তোর বাবা ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে প্রথমেই ঘড়ির দিকে তাকাত। ওর দাদু কখন ফিরবেন, সেটা ওই ঘড়ির সময় দেখে আন্দাজ করত। আর তোর কাকিমা যখন প্রথম এই বাড়িতে এসেছিল, তখন ঘড়িটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তোর দাদু নিজে হাতে ঠিক করেছিলেন।”

তিতলি অবাক হয়ে বলল, “দাদু ঘড়ি ঠিক করতে পারেন?”

“অনেক কিছুই পারতেন। শুধু ঘড়ি নয়, বাড়ির ছোটখাটো জিনিসপত্র সব নিজেই সারাতেন।”

পরদিন তিতলি দাদুকে অনুরোধ করল, ঘড়িটি একবার ঠিক করার চেষ্টা করতে।

প্রথমে অমলবাবু রাজি হলেন না। কিন্তু নাতনির উৎসাহ দেখে শেষ পর্যন্ত পুরোনো কাঠের বাক্স থেকে কয়েকটি সরঞ্জাম বের করলেন।

ঘড়িটি দেওয়াল থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখা হলো। তার পেছনের অংশ খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে ধুলো জমেছে। একটি ছোট্ট স্প্রিংও ঠিকমতো কাজ করছে না।

অমলবাবু যত্ন করে ঘড়িটি পরিষ্কার করতে লাগলেন। তিতলি পাশে বসে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল।

“এই চাকা ঘুরলে কী হয়?”

“এটা কীভাবে সময় বোঝায়?”

“ঘড়ির কাঁটা কি একসঙ্গে তৈরি হয়েছিল?”

অমলবাবু ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। বহু বছর পর তিনি কোনো কাজ এত আনন্দ নিয়ে করছিলেন।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। ঘড়িটি পুরোপুরি ঠিক করা গেল না, কিন্তু তার ভেতরের সমস্যা অনেকটাই বোঝা গেল। একটি ছোট্ট যন্ত্রাংশ বদলাতে হবে। অমলবাবু তিতলিকে বললেন, বাজার থেকে সেটি আনতে পারলে আবার চেষ্টা করবেন।

তিতলি সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তাহলে আমরা দুজনে বাজারে যাব!”

বাজার থেকে ফেরার সময় তারা এক দোকানে থামল। অমলবাবু তিতলিকে জিলিপি কিনে দিলেন। তারপর রাস্তার ধারের বেঞ্চে বসে অনেকক্ষণ গল্প করলেন।

তিতলি তার স্কুলের কথা বলল, বন্ধুদের কথা বলল, আর বলল যে বাবার সঙ্গে এখন খুব কম সময় কাটাতে পারে।

অমলবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “তোর বাবাও ছোটবেলায় আমার সঙ্গে এমন গল্প করত। তখন সময় কোথা দিয়ে চলে যেত বুঝতেই পারতাম না।”

তিতলি প্রশ্ন করল, “তাহলে এখন বাবার সঙ্গে তোমার এত কম কথা হয় কেন?”

প্রশ্নটা শুনে অমলবাবু উত্তর দিতে পারলেন না।

তিনি বুঝতে পারলেন, যে অভাবের জন্য তিনি সন্তানদের দোষ দিচ্ছেন, সেই অভাবের পেছনে তাঁর নিজের অভিমানও রয়েছে। তিনি কখনও সরাসরি বলেননি যে ছেলের সঙ্গে সময় কাটাতে তাঁর ইচ্ছে করে। বরং প্রতিবার ফোনে অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে অর্ণবও বাবার অভিমান বুঝতে চেষ্টা করেনি। সে শুধু নিজের ব্যস্ততার কথা বোঝাতে গিয়েছে।

সেই রাতে তিতলি বাবাকে ফোন করল।

“বাবা, জানো, দাদুর পুরোনো ঘড়িটা আমরা ঠিক করছি!”

অর্ণব হেসে বলল, “ওই ঘড়িটা এখনও আছে?”

“আছে তো! দাদু বলেছে, তোমার ছোটবেলার অনেক গল্প ওই ঘড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”

কথাটা শুনে অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে সে বাবার সঙ্গে বসে ঘড়ির ঘণ্টা গুনত। বাবা তাকে সময় পড়তে শিখিয়েছিলেন। পরীক্ষার আগের রাতে বাবা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “সময়কে ভয় পাবি না। সময়কে বুঝতে শিখবি।”

অর্ণবের চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পুরোনো বাড়ি, উঠোন, বাবার হাসিমুখ আর মায়ের রান্নাঘর থেকে ডেকে ওঠা কণ্ঠস্বর।

সে বুঝতে পারল, এত ব্যস্ততার মধ্যে সে শুধু বাড়িতে যাওয়ার সময়টুকুই হারায়নি, হারিয়েছে পরিবারের সঙ্গে সহজভাবে কথা বলার অভ্যাসও।

পরদিন সকালে অর্ণব বাবাকে ফোন করল।

“বাবা, ঘড়িটা ঠিক করতে পেরেছ?”

অমলবাবু অবাক হলেন। “এখনও পুরোপুরি নয়। একটা যন্ত্রাংশ বদলাতে হবে।”

“আমি কি এ সপ্তাহান্তে এসে সাহায্য করতে পারি?”

কথাটা শুনে অমলবাবুর গলা নরম হয়ে এল।

“পারিস তো ভালোই হয়। তবে কাজের চাপ থাকলে জোর নেই।”

অর্ণব এবার বাবার কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অভিমানটি বুঝতে পারল।

সে বলল, “কাজের চাপ থাকবে। তবু আসব। সব সময় জরুরি কাজের জন্য অপেক্ষা করতে করতে যদি নিজেদের জন্য সময়ই না রাখি, তাহলে লাভ কী?”

সপ্তাহান্তে অর্ণব বাড়ি এল। সঙ্গে এল তার স্ত্রী এবং ছোট ছেলে ঋদ্ধিও। বাড়িতে যেন আবার উৎসবের পরিবেশ তৈরি হলো।

তিতলি সবাইকে নিয়ে বসার ঘরে এল। টেবিলের ওপর রাখা ঘড়িটি দেখে অর্ণব বলল, “এটা তো আমি ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ঠিক করেছিলাম!”

অমলবাবু হেসে বললেন, “তুই শুধু স্ক্রু হাতে নিয়ে বসেছিলি। কাজটা করেছিলাম আমি।”

“তা ঠিক। কিন্তু তোমার পাশে বসে থাকার আনন্দটা তো আমারই ছিল।”

দুজনেই হেসে উঠলেন।

সেদিন সবাই মিলে ঘড়িটি ঠিক করার কাজে হাত দিল। অর্ণব বাজার থেকে আনা যন্ত্রাংশ লাগাল, অমলবাবু ভেতরের ব্যবস্থা পরীক্ষা করলেন, আর তিতলি ছোট ছোট স্ক্রুগুলো সাজিয়ে দিল।

অনেক চেষ্টার পর হঠাৎ ঘড়ির ভেতর থেকে একটি মৃদু শব্দ শোনা গেল।

টিক… টিক… টিক…

ঘরের সবাই থমকে গেল।

তারপর ধীরে ধীরে ঘড়ির কাঁটা নড়তে শুরু করল।

মাধবী দেবীর চোখে জল এসে গেল। তিনি বললেন, “কত বছর পর আবার এই শব্দ শুনছি!”

কিন্তু সেদিনের আসল পরিবর্তন ঘড়ির কাঁটায় ঘটেনি। ঘটেছিল পরিবারের মানুষের মনে।

রাতের খাবারের পর কেউ তাড়াহুড়ো করে নিজের ঘরে চলে গেল না। সবাই একসঙ্গে বসে পুরোনো দিনের গল্প করল। অর্ণব বাবার কাছে তার কাজের সমস্যার কথা খুলে বলল। অমলবাবুও নিজের অভিমানের কথা জানালেন, তবে অভিযোগের সুরে নয়—নিজের একাকিত্বের কথা বোঝানোর জন্য।

অর্ণব বাবার হাত ধরে বলল, “আমি সব সময় তোমাদের কাছে থাকতে পারব না। কিন্তু তোমাদের থেকে দূরে থাকতে চাই না।”

অমলবাবু উত্তর দিলেন, “আমিও চাই না তুই নিজের জীবন থামিয়ে রাখিস। শুধু মাঝেমধ্যে একটু সময় বের করে আমাদের সঙ্গে কথা বলিস।”

পরিবারের সকলে মিলে একটি ছোট্ট নিয়ম তৈরি করল। প্রতি রবিবার রাতে সবাই ভিডিও কলে একসঙ্গে কথা বলবে। আর সম্ভব হলে মাসে অন্তত একবার বাড়িতে দেখা করার চেষ্টা করবে। কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে কেউ কাউকে দোষ দেবে না; বরং পরের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করবে।

কয়েক মাস পরে তিতলি আবার দাদুর বাড়িতে এল। দেওয়ালের ঘড়িটি তখন নিয়মিত চলছে। তার ঘণ্টাধ্বনি শুনে বাড়ির সবাই সময়ের দিকে তাকায়, কিন্তু কেউ আর শুধু সময়ের হিসাব করে না।

ঘড়িটি তাদের শিখিয়েছে, সময় কেবল মিনিট আর ঘণ্টার যোগফল নয়। সময়ের মধ্যে থাকে অপেক্ষা, ভালোবাসা, ভুল বোঝাবুঝি, ক্ষমা এবং নতুন করে কাছে আসার সুযোগ।

এক সন্ধ্যায় তিতলি দাদুকে জিজ্ঞাসা করল, “দাদু, ঘড়িটা ঠিক হওয়ার পর তোমার সবচেয়ে ভালো কী লেগেছে?”

অমলবাবু একটু ভেবে বললেন, “ঘড়িটা আবার চলছে, সেটা ভালো লেগেছে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালো লেগেছে, এত দিন পর আমরা সবাই মিলে একটা কাজ করেছি। অনেক দিন পর মনে হলো, বাড়িটা আবার সত্যি সত্যি বাড়ি হয়ে উঠেছে।”

তিতলি হেসে বলল, “তাহলে ঘড়িটা শুধু সময় দেখায় না, সবাইকে একসঙ্গে থাকতেও শেখায়!”

অমলবাবু নাতনির মাথায় হাত রেখে বললেন, “ঘড়ি কাউকে এক করতে পারে না রে। মানুষ যদি নিজের মনের দরজাটা খুলে দেয়, তবেই দূরত্ব কমে।”

সেই রাতে পুরোনো ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল নির্দিষ্ট ছন্দে।

আর মুখোপাধ্যায় পরিবারের মানুষগুলো বুঝতে শিখল—জীবনের ব্যস্ততা কখনও শেষ হবে না। কিন্তু ব্যস্ততার মধ্যেও প্রিয়জনদের জন্য একটু সময় রেখে দেওয়া যায়। কারণ সম্পর্ক একদিনে ভেঙে যায় না, আবার একদিনে জোড়াও লাগে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কথা, মন দিয়ে শোনা, অভিমান জানানো এবং ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়েই সম্পর্ক বেঁচে থাকে।

গল্পের শিক্ষা: সময়ের অভাবের চেয়েও বড় সমস্যা হলো একে অপরকে বোঝার ইচ্ছার অভাব। পরিবারের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাঁদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অভিমান জমতে না দেওয়া সম্পর্ককে দৃঢ় করে। সময়কে থামানো যায় না, কিন্তু সময়ের মধ্যেই ভালোবাসার জন্য জায়গা তৈরি করা যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *