Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে কেউ নিজের নাম বলতে পারে না ((তৃতীয় পর্ব: আয়নার ওপারে যে বেঁচে ছিল))।

শেষ পর্ব

রাত বারোটা বাজতেই রায়বাড়ির সমস্ত দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথমে একটি ভারী শব্দ। তারপর জানালার পাল্লা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ। সবশেষে বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এল একটি দীর্ঘশ্বাস—যেন বহু বছর ধরে বন্দি থাকা কেউ অবশেষে জেগে উঠেছে।

ঈশান মোবাইল ফোনটি কানে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

ওপাশে অনির্বাণের কণ্ঠ কাঁপছে।

“ঈশান, তুই শুনতে পাচ্ছিস? আমি বাড়ির বাইরে। তোর ফোনের লোকেশন এখানেই দেখাচ্ছে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে তুই কোথায়?”

ঈশান উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মুখের মানুষটি হাসল।

“ওকে বল, তুই ভালো আছিস। তারপর ফোনটা রেখে দে।”

ঈশান তার দিকে তাকাল।

“তুমি কে?”

“তুই এখনও বুঝলি না? আমি তোর সেই অংশ, যাকে তুই জন্মের পর থেকেই অস্বীকার করে এসেছিস।”

“আমি তোমাকে চিনি না!”

“চিনিস। তোর ছোটবেলার স্বপ্নে যে ছেলেটা বারবার আসে, যার মুখ দেখা যায় না, যে অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে তোকে ডাকে—সে আমি।”

ঈশানের মাথার ভেতর যেন একসঙ্গে অনেকগুলো দরজা খুলে গেল।

ছোটবেলায় দেখা সেই অদ্ভুত স্বপ্ন। অন্ধকার ঘর। আয়নার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিশু। আর একটি কণ্ঠ, যা প্রতিবার বলত—‘আমাকে ভুলে যাস না।’

সে এতদিন ভেবেছিল, এগুলো নিছক দুঃস্বপ্ন।

কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, সেই স্মৃতিগুলোর সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক রয়েছে।

“তুমি যদি আমারই অংশ হও,” ঈশান বলল, “তাহলে আমার জীবন নিতে চাইছ কেন?”

লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল।

“কারণ তোর জীবনের একটা অংশ আমার প্রাপ্য।”

“কী প্রাপ্য?”

“একটা নাম। একটা পরিচয়। একটা জীবন।”

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“আমি অর্ণব। এই বাড়ির আয়না আমাকে তৈরি করেছে। কিন্তু আমি শুধু কল্পনা নই, ঈশান। আমি এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের স্মৃতি থেকে তৈরি হয়েছি। তোর মায়ের কান্না, তোর বাবার অপরাধবোধ, ঠাকুমার গোপন ভয়—সবকিছু আমার মধ্যে রয়েছে।”

ঈশান মাথা নাড়ল।

“তাহলে তুমি আমার ভাই নও?”

“আমি কী, সেটা তুই ঠিক করবি না। আমি বেঁচে থাকতে চাই। আর তার জন্য তোর সাহায্য দরকার।”

ঠিক তখনই বসার ঘরের ওপরের দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটি ঝনঝন করে কেঁপে উঠল।

তার কাচের মধ্যে দেখা গেল একটি ছোট্ট শিশু। শিশুটি দোলনায় শুয়ে কাঁদছে। পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণী—মধুমিতা। তাঁর কোলে আরেকটি শিশু।

দৃশ্যটি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

ঈশান বুঝতে পারল, সে একটি স্মৃতি দেখছে।


১৯৯৪ সালের ১৪ জুন।

রায়বাড়িতে জন্ম হয়েছিল যমজ দুই শিশুর। কিন্তু জন্মের কিছুক্ষণ পরেই একটি শিশু শ্বাস নিতে বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি।

মধুমিতা ভেঙে পড়েছিলেন। অরিন্দম স্ত্রীর পাশে বসে ছিলেন, আর বাড়ির প্রবীণরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

তখনই ঘটেছিল সেই অদ্ভুত ঘটনা।

বাড়ির উত্তরাধিকারী কক্ষের পুরোনো আয়নায় মৃত শিশুটির প্রতিবিম্ব দেখা যায়। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, আলো-ছায়ার খেলা। কিন্তু শিশুটি কাঁদতে শুরু করতেই আয়নার ভেতর থেকে আরেকটি কান্না ভেসে এল।

তারপর আয়নার ওপর ফুটে উঠল একটি বাক্য—

‘একটি জীবন শেষ হলে, তার স্মৃতি আরেকটি জীবন চাইবে।’

পরিবারের কেউ জানত না এর অর্থ কী।

কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে মধুমিতা লক্ষ্য করলেন, বাড়ির মৃত শিশুটির নাম উচ্চারণ করলেই আয়নায় তার প্রতিবিম্ব নড়ে ওঠে। শিশুটির ছবি সামনে রাখলে ঘরের বাতি নিভে যায়। আর এক রাতে তিনি স্পষ্ট শুনেছিলেন, দোলনার পাশে কেউ ফিসফিস করে বলছে—

“মা, আমাকে ভুলে যেয়ো না।”

ভয়ে অরিন্দম আয়নাটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন।

পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, মৃত শিশুটির কথা আর কখনও বলা হবে না। তার জন্য কোনও নাম থাকবে না, কোনও ছবি থাকবে না। জীবিত শিশুটিকে নিয়ে তারা অন্য শহরে চলে যাবে।

কিন্তু নাম মুছে দিলেই স্মৃতি মুছে যায় না।

বছরের পর বছর সেই স্মৃতি বাড়ির ভেতরে জমতে থাকে। মধুমিতার কান্না, অরিন্দমের অপরাধবোধ, ঠাকুমার ভয়—সবকিছু আয়নাটিকে শক্তিশালী করে তোলে।

একদিন আয়নার ভেতর থেকে একটি শিশুর প্রতিবিম্ব বেরিয়ে আসে।

তার নাম কেউ দেয়নি।

তবু সে নিজেকে অর্ণব বলে ডাকতে শুরু করে।


আয়নার দৃশ্য মিলিয়ে গেল।

ঈশান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“তাহলে অর্ণবের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু সে বেঁচে ছিল না?”

পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“হ্যাঁ, বাবা। তোমার যমজ ভাই জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল। কিন্তু তার স্মৃতি এই বাড়িতে আটকে ছিল। আমরা ভেবেছিলাম, তাকে ভুলে থাকলে সব শেষ হয়ে যাবে। অথচ আমাদের ভয় আর অপরাধবোধই তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।”

মধুমিতা সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। তাঁর চোখে জল।

“তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ি আমাকে ছাড়েনি। আমি যতবার পালাতে চেয়েছি, ততবারই নিজের স্মৃতির মধ্যে ফিরে এসেছি।”

ঈশান মায়ের দিকে তাকাল।

“তুমি এত বছর ধরে এখানে আটকে ছিলে?”

“আমি পুরোপুরি আটকে ছিলাম না। মাঝে মাঝে বাইরে যেতে পেরেছি। কিন্তু প্রতিবারই বাড়ি আমাকে ফিরিয়ে এনেছে। কারণ অর্ণবের অস্তিত্বের সঙ্গে আমার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।”

ঈশান কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে এতদিন তুমি আমাকে কেন খুঁজে পাওনি?”

মধুমিতা উত্তর দিলেন, “কারণ তোর বাবা তোর স্মৃতি থেকে এই বাড়ির সবকিছু মুছে দিতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তুই যদি অর্ণবের কথা ভুলে যাস, তাহলে তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবি। তিনি তোর নাম, পরিচয়, এমনকি আমাদের পরিবারের অতীতও বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, ভুলে যাওয়া কখনও মুক্তি দেয় না।”

ঈশান ধীরে ধীরে বসে পড়ল।

তার সমস্ত জীবনের ভিত্তি যেন ভেঙে পড়েছে।

যে পরিবারকে সে চিনত, সেই পরিবারের ইতিহাস অন্যরকম। যে ভাইকে সে কল্পনা বলে মনে করত, সে একটি মৃত শিশুর স্মৃতি থেকে জন্ম নেওয়া অদ্ভুত অস্তিত্ব। আর যে বাড়িকে সে কেবল পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি ভেবেছিল, সেটি বহু বছরের অপরাধবোধের বন্দিশালা।

কিন্তু তার নিজের জীবনের কী হবে?

“অর্ণব আমাকে বলছে, আমার জীবন তার প্রাপ্য। এটা কি সত্যি?”

মধুমিতা দ্রুত মাথা নাড়লেন।

“না। কোনও মানুষের জীবন অন্য কারও প্রাপ্য হতে পারে না। তোর ভাইয়ের জন্য আমার কষ্ট হয়। কিন্তু তোর জীবন কেড়ে নিয়ে তাকে বাঁচানো যাবে না।”

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ণব এবার চিৎকার করে উঠল।

“তাহলে আমি কী করব? চিরকাল এই বাড়িতে ছায়া হয়ে থাকব? তোমরা আমাকে জন্ম দিয়েছিলে, তারপর আমার নাম মুছে দিলে! আমি কি বাঁচতে চাইতে পারি না?”

তার কণ্ঠে এমন যন্ত্রণা ছিল যে ঈশান কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

অর্ণবের চোখে জল।

“আমি কখনও তোমার শত্রু হতে চাইনি, ভাই। আমি শুধু চাই, কেউ একবার আমাকে সত্যি বলে স্বীকার করুক। কেউ একবার বলুক, আমি ছিলাম।”

ঈশান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল।

“তুমি ছিলে, অর্ণব। তুমি আমার পরিবারের ইতিহাসের অংশ। তোমার মৃত্যু সত্যি, তোমার স্মৃতিও সত্যি। কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমাকে মরতে হবে না।”

অর্ণব মাথা নাড়ল।

“এই বাড়ি আমাকে অন্য কোনও পথ দেয়নি।”

“তাহলে আমরা নতুন পথ তৈরি করব।”


অর্ণব কিছুক্ষণ ঈশানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাত তুলে উত্তরাধিকারী কক্ষের দিকে দেখাল।

“যদি সত্যিই আমাকে মুক্ত করতে চাস, তাহলে আয়নার সামনে যেতে হবে। কিন্তু মনে রাখিস, আয়না কখনও কাউকে বিনা মূল্যে ছাড়ে না।”

ঈশান মায়ের দিকে তাকাল।

মধুমিতা মাথা নাড়লেন। “আমি তোমার সঙ্গে যাব।”

তিনজন উত্তরাধিকারী কক্ষে প্রবেশ করল।

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল পুরোনো আয়না। তার চারপাশে কালো কাঠের খোদাই। কাচের ওপর অসংখ্য সূক্ষ্ম ফাটল। আয়নার সামনে একটি ছোট টেবিল, তার ওপর রাখা একটি রুপোর ঘণ্টা।

দেয়ালে লেখা—

‘যে নিজের সত্যি স্বীকার করবে, সে মুক্ত হবে। যে অন্যের জীবন চাইবে, সে নিজের স্মৃতিতেই বন্দি থাকবে।’

ঈশান আয়নার সামনে দাঁড়াল।

প্রতিবিম্বে সে নিজের মুখ দেখতে পেল। কিন্তু তার পাশে আরও দুটি মুখ।

একটি অর্ণবের।

অন্যটি তার বাবার।

আয়নার ভেতর থেকে অরিন্দমের কণ্ঠ ভেসে এল।

“ঈশান, আমাকে ক্ষমা করিস।”

ঈশান চোখ বন্ধ করল।

তার বাবা তাকে মিথ্যে বলেছিলেন। পরিবারের ইতিহাস লুকিয়েছিলেন। কিন্তু হয়তো সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ভয়—নিজের সন্তানকে এমন এক অদ্ভুত শক্তির হাত থেকে বাঁচানোর ভয়, যার ব্যাখ্যা তিনি নিজেও জানতেন না।

ঈশান বলল, “আমি তোমার সব সিদ্ধান্তকে ঠিক বলছি না, বাবা। কিন্তু আমি তোমার ভয়টাকে বুঝতে পারছি। তুমি ভুল করেছিলে। আমিও সেই ভুলের মধ্যে বড় হয়েছি। এবার আমাদের সত্যিটা মেনে নিতে হবে।”

আয়নাটি কেঁপে উঠল।

মধুমিতা এগিয়ে এসে বললেন, “আমি আমার মৃত সন্তানকে ভুলে থাকতে চেয়েছিলাম। তার নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, ভুলে গেলেই যন্ত্রণা শেষ হবে। কিন্তু আমার নীরবতা তাকে আরও একা করে দিয়েছে।”

তিনি অর্ণবের দিকে তাকালেন।

“আমি দুঃখিত, বাবা। আমি তোমাকে ভুলে যেতে চাইনি। আমি শুধু জানতাম না, কীভাবে তোমার মৃত্যুকে মেনে নেব।”

অর্ণবের মুখে প্রথমবারের মতো শান্তির ছায়া ফুটে উঠল।

“মা…”

মধুমিতা হাত বাড়ালেন।

“তুই আমার সন্তান। তুই পৃথিবীতে বেশি দিন বাঁচিসনি, কিন্তু তুই আমার সন্তানই থাকবি।”

অর্ণব মায়ের হাত ধরতে এগিয়ে গেল।

কিন্তু তাদের হাত ছোঁয়ার আগেই আয়নার ভেতর থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এল। ধোঁয়াটি ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো একে একে মেঝেতে পড়ল। ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল।

আয়নার গভীর থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল—

“স্মৃতি ফিরিয়ে দিতে হলে, একটি পরিচয় ত্যাগ করতে হবে।”

ঈশান বুঝতে পারল, বাড়িটি শেষবারের মতো তাদের পরীক্ষা করছে।

সে অর্ণনের দিকে তাকাল।

“তোমাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হবে না। তোমার অস্তিত্ব সত্যি ছিল। তোমার মৃত্যু সত্যি ছিল। তোমার জন্য আমাদের ভালোবাসাও সত্যি। কিন্তু তুমি অন্যের জীবন নিয়ে বাঁচতে পারবে না।”

অর্ণব চোখ নামিয়ে নিল।

“তাহলে আমি কোথায় যাব?”

ঈশান উত্তর দিল, “যেখানে মৃতদের স্মৃতি থাকে, কিন্তু জীবিতদের জীবন কেড়ে নেওয়ার দরকার হয় না।”

“সেই জায়গা কোথায়?”

ঈশান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমাদের মনে।”


অর্ণব ধীরে ধীরে আয়নার সামনে দাঁড়াল।

সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি অর্ণব রায়। আমি এই পরিবারের মৃত সন্তান। আমি জীবিতদের কাছ থেকে কোনও জীবন চাই না। আমি শুধু চাই, আমাকে ভুলে যাওয়া না হোক।”

আয়নার কাচে একটি উজ্জ্বল রেখা ফুটে উঠল।

তারপর আরেকটি।

ফাটলগুলো ধীরে ধীরে মিলিত হয়ে একটি গোলাকার আলোর পথ তৈরি করল। ঘরের ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।

অর্ণবের শরীরের কালো ধোঁয়া মিলিয়ে যেতে লাগল।

সে ঈশানের দিকে তাকাল।

“ভাই, তুই কি আমাকে মনে রাখবি?”

ঈশান তার হাত বাড়িয়ে দিল।

“হ্যাঁ। কিন্তু তোর জন্য আমি নিজের জীবন ছেড়ে দেব না। আর তুইও আমার জীবন কেড়ে নিবি না। আমরা দু’জনেই আমাদের সত্যি নিয়ে থাকব।”

অর্ণব মৃদু হাসল।

“এটাই হয়তো আমি এতদিন শুনতে চেয়েছিলাম।”

সে মায়ের দিকে তাকাল।

মধুমিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমি তোকে ভালোবাসি, অর্ণব।”

অর্ণব চোখ বন্ধ করল।

এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে একটি ছোট্ট শিশুর শান্ত হাসি ফুটে উঠল।

তারপর সে আলোর মধ্যে মিলিয়ে গেল।

আয়নার কাচে একটি শেষ ছবি দেখা গেল—একটি দোলনায় শুয়ে থাকা নবজাতক। তার পাশে বসে তরুণী মধুমিতা। তিনি শিশুটির কপালে চুমু খাচ্ছেন।

ছবিটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

আয়নার ওপরের লেখা বদলে গেল—

‘স্মৃতি স্বীকার করা হলো। ঋণ শেষ।’

তারপর আয়নাটি প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল।


ভোরের আলো ফুটেছে।

ঈশান যখন চোখ খুলল, তখন সে রায়বাড়ির বাইরে ঘাসের ওপর শুয়ে। পাশে অনির্বাণ বসে আছে। তার ক্যামেরা মাটিতে পড়ে।

অনির্বাণ ঈশানকে দেখে চমকে উঠল।

“তুই ঠিক আছিস?”

ঈশান উঠে বসল।

“তুমি কীভাবে বাইরে এলে?”

অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি তো কখনও বাড়ির ভেতরে ঢুকিনি। তুই আমাকে ফোন করেছিলি, তারপর হঠাৎ লাইন কেটে যায়। আমি গ্রামের লোকজনকে ডেকে আনতে যাচ্ছিলাম, তখন দেখি বাড়ির উত্তর দিকের দরজা খুলে গেছে। তুই আর একজন মহিলা বাইরে বেরিয়ে এলি।”

ঈশান চারপাশে তাকাল।

মধুমিতা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে অদ্ভুত শান্তি।

“মা…”

তিনি এগিয়ে এসে ঈশানকে জড়িয়ে ধরলেন।

“চল, বাড়ি যাই।”

ঈশান শেষবারের মতো রায়বাড়ির দিকে তাকাল।

বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার দোতলার জানালায় আর কোনও আলো নেই। বসার ঘরের জানালায় আর কোনও ছায়া দেখা যাচ্ছে না।

অনির্বাণ ক্যামেরা তুলে বাড়িটির একটি ছবি তুলল।

ছবি তোলার পর সে পর্দার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।

“ঈশান, এটা দেখ!”

ছবিতে দেখা যাচ্ছে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঈশান, অনির্বাণ এবং মধুমিতা। তাদের ঠিক পিছনে একটি ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে।

ছেলেটির মুখে শান্ত হাসি।

তার গলায় কোনও ক্ষত নেই।

ছবির নিচে ক্যামেরার তারিখ—১৫ জুন ২০২৬।

অনির্বাণ মাথা তুলে বাড়ির দিকে তাকাল।

“এটা কি অর্ণব?”

ঈশান ছবিটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“হয়তো। কিংবা হয়তো আমাদের স্মৃতি আমাদের এমন কিছু দেখায়, যা আমরা এতদিন দেখতে চাইনি।”

সে ছবিটি নিজের ফোনে সংরক্ষণ করল।

তারপর মায়ের হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।


ছয় মাস পর।

ঈশান তার নতুন প্রতিবেদনের শেষ লাইন লিখছিল। প্রতিবেদনটির শিরোনাম—

‘রায়বাড়ির রহস্য: একটি পরিবারের নীরবতা, এক মৃত শিশুর স্মৃতি।’

সে কোনও অতিপ্রাকৃত ঘটনার নিশ্চিত দাবি করেনি। বরং লিখেছিল, কীভাবে একটি পরিবার শোক, ভয় এবং অপরাধবোধের মধ্যে সত্যকে আড়াল করে রেখেছিল। কীভাবে দীর্ঘদিনের নীরবতা তাদের সম্পর্ক ভেঙে দিয়েছিল। আর কীভাবে সত্য স্বীকার করার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে পেরেছিল।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের দিন সকালে ঈশান ডাকবাক্সে একটি ছোট খাম পেল।

খামের ওপর লেখা—

‘ঈশান সেনের জন্য।’

তার হাত থেমে গেল।

খাম খুলে দেখল, ভেতরে একটি ছোট্ট সাদা কাগজ। তাতে শিশুর হাতের লেখার মতো অক্ষরে লেখা—

‘ভাই, আমাকে মনে রাখার জন্য ধন্যবাদ।’

নিচে কোনও নাম নেই।

কাগজটির সঙ্গে একটি ছোট্ট রুপোর লকেট। লকেট খুলতেই দেখা গেল, দুটি শিশুর ছবি। একটির পাশে লেখা ‘ঈশান’, অন্যটির পাশে ‘অর্ণব’।

ঈশান লকেটটি বুকে চেপে ধরল।

জানালার বাইরে সকালের রোদ। রাস্তার ওপর মানুষের ভিড়। দূরে স্কুলের ঘণ্টা বাজছে।

জীবন চলেছে।

সে লকেটটি নিজের টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিল। তারপর কম্পিউটারে ফিরে প্রতিবেদনের শেষ বাক্যটি লিখল—

“যে মানুষকে আমরা হারিয়েছি, তাকে স্মরণ করার জন্য নিজের জীবন হারাতে হয় না। কখনও কখনও ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—মৃত্যুকে মেনে নিয়েও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা।”

ঈশান লেখা শেষ করে কম্পিউটার বন্ধ করল।

ঠিক তখনই তার ঘরের আয়নায় ক্ষীণ আলো ফুটে উঠল।

প্রতিবিম্বে সে নিজেকে দেখল। তার পেছনে কেউ নেই।

কিন্তু আয়নার এক কোণে এক মুহূর্তের জন্য একটি ছোট্ট হাত দেখা গেল। হাতটি যেন বিদায় জানাচ্ছে।

ঈশান মৃদু হাসল।

“ভালো থাকিস, ভাই।”

আলোটি মিলিয়ে গেল।

সেই দিন থেকে ঈশান আর কখনও রায়বাড়িতে ফিরে যায়নি। বাড়িটি পরে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। গ্রামের লোকজন বলেছিল, বহু বছর পর সেখানে আবার পাখিরা বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।

আর যে বাড়িতে কেউ নিজের নাম বলতে পারত না, সেখানে শেষবারের মতো একটি নাম উচ্চারিত হয়েছিল।

অর্ণব।

একটি নাম, যা আর কোনও জীবনকে বন্দি করেনি।

একটি স্মৃতি, যা অবশেষে নিজের জায়গা খুঁজে পেয়েছিল।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *