Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে মানুষটি নীরবতার দাম বুঝতেন।

শহরের ব্যস্ত বাজারের মাঝখানে একটি ছোট্ট বই বাঁধাইয়ের দোকান ছিল। দোকানটির মালিক ছিলেন দেবব্রত বসু। পুরোনো বইয়ের ছেঁড়া পাতা জোড়া লাগানো, ছিঁড়ে যাওয়া মলাট নতুন করে বাঁধাই করা, বিবর্ণ নথি যত্ন করে সংরক্ষণ করা—এসবই ছিল তাঁর কাজ।

দেবব্রত খুব কম কথা বলতেন। দোকানে কেউ এলে তিনি প্রথমে তার কথা শুনতেন, তারপর প্রয়োজনমতো উত্তর দিতেন। বাজারের লোকেরা তাঁকে একটু অদ্ভুত ভাবত। কারণ, অন্য দোকানদারেরা যখন ক্রেতা টানতে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করতেন, দেবব্রত তখন নিজের কাজেই ডুবে থাকতেন।

একদিন দুপুরে দোকানে এল তেরো বছরের ছেলে সৌমিক। তার হাতে একটি পুরোনো ডায়েরি। ডায়েরির মলাট ছেঁড়া, কয়েকটি পাতা আলগা হয়ে গেছে।

সৌমিক বলল, “কাকু, এটা বাঁধাই করে দেবেন? কিন্তু ভিতরের লেখাগুলো যেন নষ্ট না হয়।”

দেবব্রত ডায়েরিটি হাতে নিয়ে খুব সাবধানে পাতা উল্টে দেখলেন। প্রতিটি পাতায় হাতের লেখা, কোথাও ছোট ছোট ছবি, কোথাও কয়েকটি বাক্য। তিনি দাম বলার আগে জানতে চাইলেন, “ডায়েরিটা কার?”

সৌমিকের মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

“আমার দিদার। উনি কয়েক মাস আগে মারা গেছেন। মা বলেছে, পুরোনো কাগজগুলো ফেলে দিতে। কিন্তু আমি এটা রাখতে চাই।”

দেবব্রত আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। শুধু বললেন, “কাজটা একটু সময় নিয়ে করতে হবে।”

সৌমিক চলে যাওয়ার পর তিনি ডায়েরির পাতাগুলো শুকনো ও পরিষ্কার জায়গায় রেখে দিলেন। প্রতিটি পাতার অবস্থা পরীক্ষা করলেন। কোথাও কালি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল, কোথাও কাগজ এত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল যে সামান্য টানেই ছিঁড়ে যেতে পারত।

সেই দিন থেকে প্রতিদিন দোকান বন্ধ করার আগে তিনি ডায়েরিটির জন্য কিছুটা সময় রাখতেন। পুরোনো বাঁধাই খুলে পাতাগুলো আলাদা করলেন, ছেঁড়া অংশে উপযুক্ত সংরক্ষণসামগ্রী ব্যবহার করলেন এবং পাতার ক্রম ঠিক রেখে নতুন মলাট তৈরি করলেন।

কাজ চলাকালীন তিনি একটি বিষয় লক্ষ করলেন। ডায়েরিতে দিদা শুধু নিজের জীবনের কথা লেখেননি। লিখেছেন প্রতিবেশীদের সাহায্য করার অভিজ্ঞতা, পরিবারের ছোট ছোট আনন্দ, নিজের ভুলের কথা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু পরামর্শ।

একটি পাতায় লেখা ছিল, ‘মানুষ সব সময় তোমার কথা বুঝবে না। তবু কাউকে বোঝার চেষ্টা বন্ধ কোরো না।’

অন্য একটি পাতায় ছিল, ‘রাগ হলে উত্তর দেওয়ার আগে একটু চুপ করে থেকো। অনেক সম্পর্ক বেঁচে যায়।’

ডায়েরিটি বাঁধাই শেষ হলে দেবব্রত সৌমিককে খবর দিলেন। ছেলেটি এসে নতুন মলাটের ডায়েরি হাতে নিয়ে আনন্দে চমকে উঠল।

“কাকু, আপনি এত সুন্দর করে করলেন কীভাবে?”

দেবব্রত বললেন, “যা যত্ন করে রাখতে চাও, তার সঙ্গে তাড়াহুড়ো করা যায় না।”

সৌমিক ডায়েরিটি বুকে চেপে ধরল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি আমার দিদার লেখা পড়েছেন?”

দেবব্রত একটু থেমে বললেন, “কাজের প্রয়োজনে পাতাগুলো দেখেছি। কিন্তু তোমার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত লেখার গভীরে যাওয়া ঠিক মনে করিনি।”

সৌমিকের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। এত দিন সে ভেবেছিল, কথা না বললে কেউ তাকে বুঝতে পারবে না। অথচ এই মানুষটি খুব বেশি কথা না বলেও তার প্রিয় স্মৃতির গুরুত্ব বুঝেছিলেন।

কয়েক সপ্তাহ পর সৌমিক আবার দোকানে এল। এবার তার সঙ্গে ছিল স্কুলের আরও তিনজন ছাত্র। তারা স্কুলের পুরোনো গ্রন্থাগারের কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত বই মেরামত করাতে চায়। দেবব্রত তাদের বইয়ের যত্ন নেওয়ার নিয়ম শেখাতে রাজি হলেন।

কাজের ফাঁকে এক ছাত্র জিজ্ঞাসা করল, “দেবব্রতকাকু, আপনি এত চুপচাপ থাকেন কেন?”

দেবব্রত হেসে বললেন, “আমি চুপ থাকি বলে যে কিছু ভাবি না, তা নয়। অনেক সময় নিজের কথা বলার আগে অন্যের কথাটা শোনা দরকার হয়।”

সেদিন ছেলেরা বই মেরামত শেখার পাশাপাশি একে অপরের কথাও মন দিয়ে শুনেছিল। কেউ কারও কথা মাঝপথে থামায়নি, কেউ ভুল করলে হাসেনি।

দোকানটি আগের মতোই ছোট রইল। বাজারের কোলাহলও কমল না। কিন্তু সৌমিকের কাছে সেই দোকান হয়ে উঠল এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষকে নিজের কথা প্রমাণ করার জন্য চিৎকার করতে হয় না।

বহু বছর পরে সৌমিক যখন বড় হল, নিজের কর্মস্থলে নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে একটি নিয়ম চালু করেছিল—কেউ কথা বললে তাকে শেষ করতে দিতে হবে। কারণ সে শিখেছিল, নীরবতা মানেই উদাসীনতা নয়; কখনও কখনও নীরবতার ভিতরেই থাকে গভীর মনোযোগ ও সম্মান।

শিক্ষা: অন্যকে বোঝার প্রথম শর্ত হল মন দিয়ে শোনা। সব সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু কাউকে বাধা না দিয়ে তার কথা শোনা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করা এবং ধৈর্য দেখানো—এই ছোট আচরণগুলোই মানুষের মধ্যে বিশ্বাস গড়ে তোলে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *