ছোট্ট শহরটির নাম শালবন। শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। সেখানে কাজ করতেন অমলেন্দু সেন। প্রতিদিন সকালে তিনি বৃষ্টিমাপের পাত্র পরীক্ষা করতেন, বাতাসের গতিবেগ লিখে রাখতেন, মেঘের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতেন। তাঁর কাজ ছিল নিঃশব্দ, একঘেয়ে এবং অধিকাংশ মানুষের চোখে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
শহরের লোকেরা তাঁকে চিনত বৃষ্টির হিসাব রাখা মানুষ হিসেবে।
কেউ মাঠে বীজ বোনার আগে তাঁর কাছে আসত, কেউ পুকুরে জল বাড়বে কি না জানতে চাইত। অমলেন্দু কখনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করতেন না। তিনি বলতেন, “প্রকৃতি সব সময় আমাদের হিসাব মেনে চলে না। তবে পুরোনো তথ্য থেকে আমরা বিপদের আভাস পেতে পারি।”
এক বছর গ্রীষ্মের শেষে শালবনে অস্বাভাবিক গরম পড়ল। পুকুর শুকিয়ে গেল, কুয়োর জল নেমে গেল অনেকটা নিচে। কৃষকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। আকাশে মেঘ জমলেও বৃষ্টি হল না। শহরের মানুষ ভাবল, এ বছর বুঝি খরা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
অমলেন্দু তাঁর পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে বসে গত পঁচিশ বছরের বৃষ্টিপাতের নথি ঘাঁটছিলেন। তিনি লক্ষ করলেন, কয়েকটি নির্দিষ্ট বছরের সঙ্গে চলতি বছরের আবহাওয়ার অদ্ভুত মিল রয়েছে। সেই বছরগুলিতে প্রথমে দীর্ঘ অনাবৃষ্টি হয়েছিল, তারপর অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
তিনি বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানালেন। প্রস্তাব দিলেন, নীচু এলাকার নিকাশি নালা পরিষ্কার করতে হবে, জল জমার জায়গাগুলি চিহ্নিত করতে হবে এবং নদীর পাশের বসতিগুলিকে সতর্ক রাখতে হবে।
কিন্তু তাঁর কথা সবাই গুরুত্ব দিল না।
একজন ব্যবসায়ী হেসে বললেন, “এত বছর ধরে বৃষ্টি মাপছেন, অথচ বৃষ্টিই তো আনতে পারেন না!”
কথাটা শুনে অমলেন্দুর খারাপ লাগল। তবু তিনি নিজের কাজ বন্ধ করলেন না। কয়েকজন স্কুলশিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষকে সতর্ক করতে শুরু করলেন। তাঁরা নিকাশি নালার মুখ থেকে আবর্জনা সরালেন, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষদের তালিকা তৈরি করলেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় আশ্রয় নেওয়া যাবে, তা ঠিক করলেন।
কয়েক দিন পর রাতের আকাশ হঠাৎ কালো হয়ে এল। শুরু হল প্রবল বৃষ্টি। প্রথমে মানুষ আনন্দিত হয়েছিল। শুকিয়ে যাওয়া জমিতে জল ফিরছে, পুকুর ভরছে—সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কিন্তু ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে গেল। পাহাড়ি ঢল নেমে নদীর জল দ্রুত ফুলে উঠল। শহরের কয়েকটি নীচু পাড়ায় জল ঢুকতে শুরু করল।
তখনই কাজে লাগল অমলেন্দুর আগাম প্রস্তুতি। প্রশাসনের কর্মীরা আগে থেকে চিহ্নিত বিপজ্জনক এলাকাগুলিতে পৌঁছে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা বৃদ্ধ ও শিশুদের সাহায্য করলেন। নিকাশি নালা পরিষ্কার থাকায় কয়েকটি বড় রাস্তা দ্রুত জলমুক্তও হয়ে গেল।
পরদিন বৃষ্টি থামলে দেখা গেল, আশপাশের কিছু গ্রামে ক্ষয়ক্ষতি হলেও শালবনের শহরাঞ্চলে বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
শহরের সেই ব্যবসায়ীও অমলেন্দুর কাছে এলেন। মাথা নিচু করে বললেন, “আপনার কথা যদি আরও আগে গুরুত্ব দিয়ে শুনতাম, তাহলে হয়তো আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতাম।”
অমলেন্দু শান্ত গলায় বললেন, “ভুল বুঝতে পারাও শেখার অংশ। কিন্তু একই ভুল বারবার না করাটাই আসল কথা।”
সেই ঘটনার পর শহরের স্কুলগুলিতে আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি শুরু হল। শিশুরা শিখল, বৃষ্টির জল কীভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, অতিবৃষ্টির সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হয় এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তাকে কেন গুরুত্ব দিতে হয়।
অমলেন্দু অবসর নেওয়ার দিন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের এক তরুণ কর্মী তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার এত বছরের কাজের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কী?”
তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। দূরের মাঠে বৃষ্টির জল জমেছে, কয়েকটি শিশু কাগজের নৌকা ভাসাচ্ছে।
তিনি বললেন, “আমার লেখা খাতাগুলো নয়। আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হল, কোনও বিপদের আগেই যদি মানুষ প্রস্তুত হতে শেখে, আর সেই প্রস্তুতির ফলে যদি একটি প্রাণও বেঁচে যায়।”
সেদিন পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের পুরোনো রেজিস্টারে শেষবারের মতো একটি তথ্য লিখেছিলেন অমলেন্দু—বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা কোনও রেজিস্টারের পাতায় আটকে রইল না। তা ছড়িয়ে পড়ল গোটা শহরের মানুষের অভ্যাসে।
শিক্ষা: ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমানের তথ্য কাজে লাগিয়ে বিপদের ক্ষতি অনেকটাই কমানো যায়। সতর্কতা তখনই সার্থক হয়, যখন তা ব্যক্তিগত জ্ঞান থেকে সামষ্টিক দায়িত্বে পরিণত হয়।