নয়নপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি মাটির বাড়ি। বাড়িটির সামনের উঠোনে শিউলি গাছ, পেছনে কয়েকটি কলাগাছ আর এক পাশে টিনের চালের নিচে ছোট্ট একটি ঘর। সেই ঘরেই থাকত তেরো বছরের মেয়ে পিউ, তার মা মাধবী এবং ছোট ভাই রনি।
পিউয়ের বাবা অনেক বছর আগে কাজের সন্ধানে শহরে গিয়েছিলেন। প্রথম দিকে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। তারপর একদিন খবর এল, কারখানায় দুর্ঘটনায় তাঁর হাত গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। কাজ হারিয়ে তিনি গ্রামে ফিরে এলেন। চিকিৎসার পর তিনি বেঁচে উঠলেও আগের মতো ভারী কাজ করতে পারতেন না।
সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল পিউয়ের মায়ের ওপর। মাধবী অন্যের বাড়িতে রান্না করতেন। পিউ স্কুলে পড়ার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করত।
তবে পিউয়ের একটি অদ্ভুত শখ ছিল।
গ্রামের কোনো শিশুর খেলনা ভেঙে গেলে সে সেটি ফেলে না দিয়ে পিউয়ের কাছে নিয়ে আসত। কখনও খেলনার গাড়ির চাকা খুলে যেত, কখনও পুতুলের হাত ভেঙে পড়ত, আবার কখনও কাঠের ঘোড়ার পা আলগা হয়ে যেত। পিউ যত্ন করে সেগুলো মেরামত করার চেষ্টা করত।
তার কাছে পুরোনো একটি টিনের বাক্স ছিল। বাক্সে রাখা থাকত ছোট স্ক্রু, তার, আঠা, বোতলের ঢাকনা, ভাঙা চাকার টুকরো, কাঠের ছোট অংশ এবং নানা রকমের বাতিল জিনিস।
রনি প্রায়ই বোনকে জিজ্ঞাসা করত, “দিদি, এত ভাঙা জিনিস জমিয়ে কী হবে?”
পিউ হাসত। “সব ভাঙা জিনিস ফেলে দিতে হয় না। কখনও একটু যত্ন পেলেই আবার কাজ করতে পারে।”
রনি বলত, “তাহলে আমার ভাঙা খেলনাটাও সারিয়ে দাও।”
পিউ তার ভাইয়ের কাঠের ট্রেনটি তুলে নিত। ট্রেনটির একটি চাকা হারিয়ে গিয়েছিল। পুরোনো বোতলের ঢাকনা কেটে, মাঝখানে ছিদ্র করে এবং ছোট একটি কাঠের টুকরো ব্যবহার করে সে নতুন চাকা বানাল। ট্রেনটি আবার গড়িয়ে চলল।
রনি আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
সেই আনন্দের শব্দ পিউয়ের কাছে কোনো পুরস্কারের চেয়ে কম ছিল না।
১. মেলার পুতুল
একদিন গ্রামের মেলা থেকে ফেরার পথে পিউ দেখল, রাস্তার ধারে বসে একটি ছোট মেয়ে কাঁদছে। তার হাতে একটি কাপড়ের পুতুল। পুতুলটির মুখের সেলাই খুলে গেছে, তুলো বেরিয়ে পড়েছে।
পিউ কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাঁদছ কেন?”
মেয়েটি বলল, “আমার পুতুলটা নষ্ট হয়ে গেছে। বাবা অনেক কষ্ট করে মেলা থেকে কিনে দিয়েছিল। মা বলেছে, নতুন পুতুল কেনার টাকা নেই।”
পিউ পুতুলটি হাতে নিল। কাপড়টি পুরোনো হলেও ভালো ছিল। সে মেয়েটিকে বলল, “তুই কাল এটা নিয়ে আমার বাড়িতে আসিস। দেখি কী করা যায়।”
পরদিন মেয়েটি পুতুলটি নিয়ে এল। পিউ পুরোনো কাপড়ের একটি পরিষ্কার টুকরো দিয়ে পুতুলটির পোশাক ঠিক করল। তারপর তুলো ভরে মুখের সেলাই করে দিল। শেষে সুতো দিয়ে দুটি চোখ এবং ছোট্ট একটি হাসি এঁকে দিল।
পুতুলটি ফিরে পেয়ে মেয়েটি এত খুশি হল যে যাওয়ার আগে পিউকে জড়িয়ে ধরল।
ঘটনাটি গ্রামের অন্য শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। অল্প দিনের মধ্যেই পিউয়ের বাড়িতে ভাঙা খেলনা নিয়ে আসার ভিড় বাড়তে লাগল।
কেউ কাঠের গাড়ি আনত, কেউ প্লাস্টিকের পুতুল, কেউ আবার পুরোনো লাটাই বা খেলনা পাখি। পিউ সবার খেলনা সারানোর চেষ্টা করত।
একদিন তার মা বললেন, “সারাদিন এত কাজ করিস, আবার অন্যের খেলনা সারাতে বসিস কেন? এতে তো কোনো টাকা পাওয়া যায় না।”
পিউ মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “সব কাজ কি টাকার জন্য করতে হয়, মা? ওরা যখন খেলনাটা ফিরে পেয়ে হাসে, আমারও ভালো লাগে।”
মাধবী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি জানতেন, অভাবের সংসারে এমন শখকে বড় করে তোলা কঠিন। তবু মেয়ের চোখের আনন্দ দেখে তাঁর মন ভরে গেল।
২. স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক
পিউয়ের এই কাজের কথা একদিন স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক সমরেশবাবুর কানে গেল। তিনি একদিন ক্লাস শেষে পিউকে ডাকলেন।
“শুনেছি, তুই ভাঙা খেলনা মেরামত করিস?”
পিউ একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “জি স্যার। যতটা পারি।”
“কী দিয়ে সারাস?”
“পুরোনো জিনিস দিয়ে, স্যার। কখনও তার, কখনও কাঠ, কখনও বোতলের ঢাকনা। তবে সব খেলনা পারি না।”
সমরেশবাবু হেসে বললেন, “সবাই সব কাজ পারে না। কিন্তু নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করলে অনেক কিছু শেখা যায়।”
তিনি পিউকে স্কুলের বিজ্ঞানাগার দেখালেন। সেখানে নানা ধরনের সরঞ্জাম, পুরোনো মডেল এবং কিছু বাতিল যন্ত্রাংশ রাখা ছিল। তিনি বোঝালেন, কোন জিনিস কীভাবে কাজ করে, কোন উপাদান কোথায় ব্যবহার করা যায় এবং কীভাবে নিরাপদে কাজ করতে হয়।
তিনি আরও বললেন, “কিন্তু একটা কথা মনে রাখবি। ব্যাটারি, বিদ্যুৎ বা ধারালো যন্ত্র নিয়ে কাজ করার সময় বড়দের সাহায্য নিতে হবে। কোনো খেলনা বিপজ্জনক হলে শুধু সারিয়ে দিলেই চলবে না, সেটি ব্যবহার করা নিরাপদ কি না তাও বুঝতে হবে।”
পিউ মন দিয়ে সব শুনল।
পরের সপ্তাহে সমরেশবাবু স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীর ঘোষণা করলেন। ছাত্রছাত্রীরা পুরোনো জিনিস ব্যবহার করে নতুন কিছু তৈরি করবে। উদ্দেশ্য ছিল, অপচয় কমানো এবং সৃজনশীলতা বাড়ানো।
পিউ ঠিক করল, সে একটি বিশেষ খেলনা তৈরি করবে—এমন একটি খেলনা, যা শুধু আনন্দ দেবে না, ছোটদের কিছু শেখাতেও সাহায্য করবে।
৩. অসম্পূর্ণ গাড়ি
পিউ কয়েক দিন ধরে ভাবতে লাগল। তার কাছে অনেক ভাঙা খেলনার অংশ ছিল, কিন্তু সেগুলো দিয়ে কী তৈরি করবে বুঝতে পারছিল না।
এক বিকেলে বাবার পুরোনো বাক্সে সে কয়েকটি কাঠের টুকরো, গোলাকার ঢাকনা এবং একটি ছোট ধাতব দণ্ড পেল। বাবা একসময় কারখানায় যন্ত্রাংশের কাজ করতেন। তাঁর কাছে পুরোনো কিছু সরঞ্জাম ছিল।
পিউ বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, “বাবা, এগুলো দিয়ে কি একটা গাড়ি বানানো যায়?”
বাবা টুকরোগুলো হাতে নিয়ে দেখলেন। “যায় তো। তবে শুধু দেখতে গাড়ির মতো হলেই হবে না। চাকা ঠিকভাবে ঘুরতে হবে, ভারসাম্য রাখতে হবে।”
পিউ বাবার পাশে বসে কাজ শুরু করল। প্রথম দিন কাঠের গাড়িটি একেবারেই চলল না। দ্বিতীয় দিন চাকা ঘুরলেও গাড়ি একদিকে বেঁকে যাচ্ছিল। তৃতীয় দিন গাড়ির সামনের অংশ খুলে গেল।
পিউ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার দ্বারা হবে না বাবা।”
বাবা শান্ত গলায় বললেন, “তুই কি প্রথম দিনেই হাঁটতে শিখেছিলি?”
পিউ মাথা নাড়ল।
“কোনো কাজ শেখার সময় বারবার ভুল হয়। তুই যদি প্রতিবার ভুলের কারণ খুঁজিস, তাহলে একদিন ঠিকই পারবি।”
বাবা তাকে দেখালেন কীভাবে চাকার মাঝখানের ছিদ্রটি সমান রাখতে হয় এবং কীভাবে দুই পাশের অক্ষ সোজা বসাতে হয়। পিউ আবার চেষ্টা করল।
সন্ধ্যা নামার আগে কাঠের গাড়িটি অবশেষে মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল।
পিউয়ের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
গাড়িটির নাম দিল সে—‘বন্ধু’।
কারণ, তার মতে, একটি খেলনা শিশুর বন্ধু হতে পারে। আর কোনো জিনিস ভেঙে গেলে তাকে ফেলে দেওয়ার আগে আরেকবার সুযোগ দেওয়া উচিত।
৪. প্রদর্শনীর দিন
স্কুলের প্রদর্শনীর দিন সকাল থেকেই ছাত্রছাত্রীরা তাদের তৈরি জিনিস সাজাতে ব্যস্ত। কেউ কাগজ দিয়ে ঘর বানিয়েছে, কেউ পুরোনো বোতল দিয়ে ফুলদানি, কেউ আবার কাঠের টুকরো দিয়ে ছোট সেতু।
পিউ তার কাঠের গাড়িটি নিয়ে এল। গাড়িটির গায়ে সে রঙিন কাগজ লাগিয়েছে। পাশে একটি ছোট বাক্সে রেখেছে আগে মেরামত করা কয়েকটি খেলনা।
প্রদর্শনী দেখতে গ্রামের মানুষও এলেন। প্রধান শিক্ষক প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর কাজ দেখছিলেন।
পিউয়ের গাড়ি দেখে একজন বললেন, “এ তো খুব সাধারণ গাড়ি!”
পিউ একটু মন খারাপ করল। কিন্তু সমরেশবাবু তাকে বললেন, “তোর কাজের বিশেষত্ব শুধু গাড়িতে নয়। কীভাবে তৈরি করেছিস, কী শিখেছিস, সেটাও বুঝিয়ে বল।”
পিউ সাহস করে সামনে দাঁড়াল।
সে বলল, “এই গাড়ির বেশির ভাগ অংশই পুরোনো জিনিস থেকে তৈরি। আমি প্রথমে ভুলভাবে চাকা বসিয়েছিলাম, তাই গাড়ি সোজা চলছিল না। পরে বুঝেছি, দুই পাশের অক্ষ ঠিকভাবে বসানো জরুরি। আমি চাই, শিশুরা শিখুক—কোনো জিনিস নষ্ট হলে আগে দেখতে হবে সেটি মেরামত করা যায় কি না।”
একটি ছোট ছেলে গাড়িটি চালিয়ে দেখল। গাড়ি সোজা গড়িয়ে যেতেই সে হাততালি দিল।
তারপর পিউ তার বাক্স থেকে একটি ভাঙা পুতুল বের করল। সে দেখাল, কীভাবে কাপড়, সুতো ও তুলো ব্যবহার করে পুতুলটি আবার ঠিক করা হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক মন দিয়ে সব দেখলেন। শেষে বললেন, “পিউ আমাদের শিখিয়েছে, সৃজনশীলতা মানে শুধু নতুন জিনিস তৈরি করা নয়। পুরোনো জিনিসের মধ্যে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়াও সৃজনশীলতা।”
পিউ প্রথম পুরস্কার পেল না। তার গাড়িটি ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু প্রদর্শনী শেষে কয়েকজন শিক্ষক তাকে ডেকে বললেন, স্কুলে একটি ‘মেরামত কোণ’ তৈরি করা যায় কি না, যেখানে শিশুরা পুরোনো খেলনা ও নিরাপদ ব্যবহারযোগ্য জিনিস মেরামত করতে শিখবে।
পিউয়ের কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের খবর।
৫. ছোট্ট মেরামতঘর
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্কুলের এক কোণে ছোট একটি টেবিল রাখা হল। তার ওপর সাজানো হল নিরাপদ সরঞ্জাম, সুতো, কাগজ, কাঠের ছোট টুকরো, আঠা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ।
সমরেশবাবু ও আরও কয়েকজন শিক্ষক পালা করে ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করতে লাগলেন। পিউও সেখানে কাজ করত। তবে সে একা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করত না। ব্যাটারি, ধাতব অংশ বা ধারালো সরঞ্জামের কাজ শিক্ষক কিংবা প্রশিক্ষিত বড়দের সাহায্যেই করা হত।
শিশুরা শিখতে লাগল কীভাবে ছোটখাটো খেলনা ঠিক করতে হয়, কীভাবে জিনিসের অপচয় কমানো যায় এবং কোন জিনিস মেরামত করা সম্ভব নয় হলে তা কীভাবে নিরাপদে আলাদা করে রাখতে হয়।
একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ কাঠমিস্ত্রি স্কুলে এলেন। তিনি পিউকে কাঠের কাজের কয়েকটি সহজ কৌশল শেখালেন। অন্যদিকে এক দর্জি কাকিমা শেখালেন কীভাবে কাপড়ের পুতুলের সেলাই মজবুত করতে হয়।
এভাবে পিউয়ের ছোট্ট শখ ধীরে ধীরে গ্রামের অনেক মানুষের মিলিত কাজে পরিণত হল।
একদিন রনি দৌড়ে এসে বলল, “দিদি, আজ আমার বন্ধু তার ভাঙা গাড়ি নিয়ে এসেছে। সে বলেছে, তুই সারিয়ে দিলে ও আর কখনও খেলনা ভাঙবে না!”
পিউ হেসে বলল, “খেলনা আবার ভাঙতেই পারে। কিন্তু ভেঙে গেলে কী করা যায়, সেটাই শেখা দরকার।”
রনি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তাহলে আমিও শিখব।”
পিউ ভাইকে পাশে বসাল। দুজনে মিলে একটি পুরোনো কাঠের গাড়ির চাকা ঠিক করতে লাগল।
বাইরে তখন বিকেলের রোদ। উঠোনে শিউলি গাছের ছায়া পড়েছে। দূরে মায়ের হাঁড়িতে ভাতের গন্ধ উঠছে।
পিউয়ের বাবা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মেয়ের কাজ দেখছিলেন। তাঁর চোখে গর্বের আলো।
তিনি জানতেন, তাঁর মেয়ে হয়তো এখনই বড় কোনো কারখানা তৈরি করতে পারবে না। হয়তো তার হাতে দামি যন্ত্রপাতিও নেই। কিন্তু তার মধ্যে আছে ধৈর্য, কৌতূহল আর অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছা।
এই গুণগুলোই একদিন তাকে আরও দূরে নিয়ে যাবে।
৬. ভাঙা জিনিসের নতুন জীবন
এক বছর পরে নয়নপুর স্কুলে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হল। তার নাম দেওয়া হল ‘নতুন জীবন উৎসব’। সেখানে শিশুরা নিজেদের মেরামত করা খেলনা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস প্রদর্শন করল।
পিউয়ের মেরামতঘরে এখন অনেক শিশু নিয়মিত আসে। কেউ নিজের খেলনা সারায়, কেউ নতুন কিছু বানায়, আবার কেউ বাড়ির বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের অপচয় কমানো যায়।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রধান শিক্ষক পিউকে কয়েকটি কথা বলতে বললেন।
পিউ মঞ্চে উঠে দাঁড়াল। সামনে বসে আছে তার সহপাঠী, শিক্ষক, বাবা-মা এবং গ্রামের বহু মানুষ।
সে বলল, “আমি ছোটবেলা থেকে ভাঙা খেলনা সারাতে ভালোবাসি। আগে ভাবতাম, খেলনা ঠিক করাই আমার কাজ। এখন বুঝেছি, এই কাজ আমাকে আরও বড় একটা শিক্ষা দিয়েছে। কোনো জিনিস নষ্ট হলে আমরা অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিই। কিন্তু একটু সময় দিয়ে দেখলে হয়তো সেটি আবার কাজে লাগতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও আমাদের এমন হওয়া উচিত। কেউ ভুল করলে তাকে শুধু দোষ না দিয়ে শেখার সুযোগ দেওয়া দরকার।”
মুহূর্তের জন্য সভাঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর হাততালিতে ঘর ভরে উঠল।
পিউ মঞ্চ থেকে নেমে দেখল, সেই ছোট্ট মেয়েটি এসেছে, যার কাপড়ের পুতুল সে প্রথম সারিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটি এখন নিজের হাতে একটি পুতুল তৈরি করেছে।
সে পিউকে বলল, “দিদি, এবার আমি নিজেই বানিয়েছি!”
পিউ পুতুলটি হাতে নিয়ে দেখল। সেলাই নিখুঁত নয়, মুখটাও একটু বাঁকা। কিন্তু পুতুলটির মধ্যে শিশুটির নিজের চেষ্টা আর আনন্দ জড়িয়ে আছে।
পিউ বলল, “খুব সুন্দর হয়েছে। এবার তুই অন্য কাউকে শেখাবি।”
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
সেদিন বাড়ি ফেরার সময় পিউ তার পুরোনো টিনের বাক্সটি খুলে দেখল। একসময় বাক্সটি ছিল শুধু ভাঙা জিনিসের সংগ্রহ। এখন সেটিই তার শেখার প্রথম সঙ্গী।
সে বাক্সটি বন্ধ করে জানালার পাশে রাখল।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে কোথাও একটি শিশু নতুন খেলনা নিয়ে হাসছে। আর পিউ ভাবছে, পৃথিবীতে কত কিছুই অল্প যত্নের অভাবে হারিয়ে যায়। কখনও একটি চাকা, কখনও একটি পুতুল, কখনও মানুষের আত্মবিশ্বাস।
সবকিছু হয়তো আগের মতো করা যায় না। তবু চেষ্টা করলে অনেক কিছুর নতুন শুরু সম্ভব।
পিউয়ের ছোট্ট মেরামতঘর তাই শুধু খেলনা সারানোর জায়গা রইল না। সেটি হয়ে উঠল ধৈর্য শেখার, অপচয় কমানোর এবং একে অন্যকে সাহায্য করার একটি ছোট্ট বিদ্যালয়।
আর সেই বিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষাটি ছিল খুব সহজ—
ভেঙে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনও কখনও সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন করে গড়ে ওঠার গল্প।