Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে মেয়েটি ভাঙা জিনিসের ভবিষ্যৎ দেখত।

শহরের এক কোণে ছিল পুরনো জিনিসপত্র মেরামতের একটি দোকান। সেখানে ভাঙা চেয়ার, নষ্ট টেবিল, ছেঁড়া ব্যাগ কিংবা অকেজো যন্ত্রপাতি নিয়ে মানুষ আসত। দোকানের মালিক জগদীশবাবু বহু বছর ধরে এসব জিনিস সারিয়ে তুলতেন। তাঁর মতে, কোনও জিনিস একবার নষ্ট হয়ে গেলে তাকে ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে সহজ কাজ। কিন্তু তার ভেতরে সামান্য সম্ভাবনা থাকলে তাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলা যায়।

জগদীশবাবুর দোকানের ঠিক পাশেই থাকত চৌদ্দ বছরের মেয়ে ঐশী। তার বাবা একটি ছোট কারখানায় কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, তাই নতুন খেলনা কিংবা দামি জিনিস কেনার সুযোগ তার খুব কমই হতো। কিন্তু ঐশীর চোখে পুরনো জিনিসেরও আলাদা আকর্ষণ ছিল।

রাস্তার ধারে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা কলম, বাতিল কার্ডবোর্ড কিংবা নষ্ট সুইচ—সবকিছুর মধ্যেই সে নতুন কিছু বানানোর সম্ভাবনা খুঁজত।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে দেখল, একটি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকানের সামনে পুরনো কম্পিউটারের কয়েকটি যন্ত্রাংশ ফেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যরা সেগুলোকে আবর্জনা বলে পাশ কাটিয়ে গেলেও ঐশী থেমে দাঁড়াল।

সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, এগুলো কি আমি নিয়ে যেতে পারি?”

দোকানদার অবাক হয়ে বললেন, “ওগুলো দিয়ে কী করবি? সবই তো নষ্ট!”

ঐশী হেসে বলল, “দেখে নিই না। হয়তো সবটা নয়।”

অনেক অনুরোধের পরে সে কয়েকটি নিরাপদ, বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন যন্ত্রাংশ নিয়ে বাড়ি ফিরল। সেদিন রাতেই পুরনো বই আর ইন্টারনেটে পাওয়া শিক্ষামূলক তথ্য দেখে সে যন্ত্রাংশগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল।

প্রথম কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হলো। কখনও তার জোড়া লাগল না, কখনও যন্ত্রটি চালু হলো না। তবু ঐশী হাল ছাড়ল না। সে প্রতিবারের ভুল খাতায় লিখে রাখত, যাতে একই ভুল আবার না হয়।

কয়েক সপ্তাহ পরে সে একটি ছোট্ট শিক্ষামূলক মডেল তৈরি করল। বোতলের ঢাকনা, কার্ডবোর্ড এবং কিছু পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশ দিয়ে বানানো সেই মডেলটি দেখাত কীভাবে বাড়ির বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করলে পুনর্ব্যবহার সহজ হয়। মডেলটির পাশে সে তিনটি পাত্র বসিয়েছিল—জৈব বর্জ্য, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য এবং বিপজ্জনক বর্জ্যের জন্য।

স্কুলের বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে সে মডেলটি নিয়ে গেল।

প্রদর্শনীর বিচারকরা মডেলটি দেখে সন্তুষ্ট হলেন। তবে একজন শিক্ষক প্রশ্ন করলেন, “তুমি তো মূলত পুরনো জিনিস ব্যবহার করেছ। এতে নতুনত্ব কোথায়?”

ঐশী একটু ভেবে উত্তর দিল, “নতুন জিনিস বানানোই সব সময় নতুনত্ব নয়, স্যার। যে জিনিসকে সবাই শেষ বলে মনে করছে, তার ব্যবহার খুঁজে বের করাও নতুন চিন্তা। তবে সব বর্জ্য আবার ব্যবহার করা যায় না। কিছু জিনিস বিশেষ ব্যবস্থায় নিরাপদে ফেলে দিতে হয়।”

তার উত্তর শুনে শিক্ষক মাথা নাড়লেন।

ঐশী প্রথম পুরস্কার পেল না। কিন্তু তার মডেলটি দেখে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক তাকে একটি ছোট্ট কর্মশালা আয়োজনের পরামর্শ দিলেন। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা পুরনো কাগজ, কার্ডবোর্ড এবং নিরাপদে ব্যবহারযোগ্য বাতিল সামগ্রী দিয়ে নতুন শিক্ষাসামগ্রী বানাতে পারবে।

ঐশী খুব উৎসাহ নিয়ে কাজ শুরু করল। প্রথম দিন মাত্র ছয়জন এসেছিল। কেউ বানাল পেনদানি, কেউ তৈরি করল গাণিতিক সংখ্যার কার্ড, কেউ আবার পুরনো বাক্স দিয়ে বই রাখার তাক বানাল।

ধীরে ধীরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়তে লাগল। অভিভাবকেরাও বাড়ির অব্যবহৃত সামগ্রী আলাদা করে দিতে শুরু করলেন। তবে ঐশী একটি নিয়ম চালু করেছিল—কোনও ধারালো, রাসায়নিক পদার্থযুক্ত বা বৈদ্যুতিকভাবে বিপজ্জনক জিনিস শিশুদের হাতে দেওয়া যাবে না। সেগুলো বড়দের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় সরিয়ে ফেলতে হবে।

একদিন জগদীশবাবু কর্মশালাটি দেখতে এলেন। চারদিকে তৈরি হওয়া জিনিসপত্র দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন।

“তুই তো আমার দোকানের কাজটাই অন্যভাবে শিখে ফেলেছিস,” তিনি বললেন।

ঐশী হেসে উত্তর দিল, “আপনি জিনিস মেরামত করেন, আর আমি চেষ্টা করি মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখাতে।”

কথাটা শুনে জগদীশবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের দোকানের এক কোণে একটি তাক খালি করে দিলেন। সেখানে আর বিক্রির জিনিস রাখা হবে না। রাখা হবে এমন কিছু সামগ্রী, যেগুলো মেরামত করে আবার কাজে লাগানো সম্ভব।

কয়েক মাসের মধ্যে দোকানটির নাম বদলে গেল। নতুন সাইনবোর্ডে লেখা হলো—‘দ্বিতীয় জীবন: মেরামত ও পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র’।

ঐশী জানত, সে একা পৃথিবীর সব আবর্জনা কমাতে পারবে না। কিন্তু তার ছোট্ট উদ্যোগ অনেক মানুষকে বুঝিয়েছিল, অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলে দেওয়ার আগে একবার ভাবা যায়—এটির অন্য কোনও ব্যবহার সম্ভব কি না।

বছর কয়েক পরে ঐশী পরিবেশপ্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করতে গেল। বিদায়ের দিন জগদীশবাবু তাকে একটি পুরনো স্ক্রু-ড্রাইভার উপহার দিলেন।

“এটা আমার প্রথম দিকের কাজের সঙ্গী ছিল,” তিনি বললেন। “মনে রাখিস, যন্ত্র মেরামত করার আগে তার সমস্যাটা বুঝতে হয়। পৃথিবীর ক্ষেত্রেও তাই।”

ঐশী যন্ত্রটি হাতে নিয়ে হাসল। তার মনে হলো, ভাঙা জিনিসের ভবিষ্যৎ দেখার শিক্ষা সে শুধু আবর্জনার স্তূপ থেকে পায়নি; পেয়েছে এমন একজন মানুষের কাছ থেকে, যিনি কোনও কিছুকেই অকারণে শেষ বলে মেনে নিতেন না।

শিক্ষা: অপচয় কমাতে সৃজনশীল চিন্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি বিপজ্জনক বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করাও জরুরি। ছোট উদ্যোগ থেকেই বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *