Categories
অনুগল্প গল্প বিবিধ

যে সিঁড়ি আকাশ ছুঁয়েছিল।

মহানগরের এক প্রান্তে ছিল পুরোনো একটি বহুতল আবাসন। ভবনটির ছাদ থেকে দূরের আকাশ দেখা যেত, কিন্তু সিঁড়িঘর ছিল অন্ধকার, সংকীর্ণ এবং অবহেলায় ভরা। বহু বছর ধরে কেউ সিঁড়ির দেওয়ালে রং করেনি। কোথাও প্লাস্টার খসে পড়েছিল, কোথাও আবার ভাঙা রেলিং বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

সেই বাড়ির তৃতীয় তলায় থাকত পনেরো বছরের অদিতি। তার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান, মা একটি ছোট পোশাকের দোকানে কাজ করতেন। সংসারে অভাব থাকলেও অদিতির মনে ছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল—সে ভবন দেখতে ভালোবাসত। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় উঁচু বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবত, কীভাবে এত মানুষের থাকার জায়গা তৈরি হয়, কীভাবে একটি ভবন ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও দাঁড়িয়ে থাকে।

স্কুলের অঙ্কের খাতার শেষ পাতায় সে প্রায়ই বাড়ির নকশা আঁকত। কখনও ছোট বাড়ি, কখনও বিদ্যালয়, কখনও এমন একটি হাসপাতাল, যেখানে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরাও সহজে চলাচল করতে পারবেন।

একদিন সন্ধ্যায় স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, পাশের তলার বৃদ্ধ বাসিন্দা নির্মলবাবু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন। তাঁর হাতে বাজারের ব্যাগ, আর অন্য হাতে দেওয়াল ধরে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা।

অদিতি দৌড়ে গিয়ে তাঁকে ধরে ফেলল।

নির্মলবাবু বললেন, “এই সিঁড়িটা এখন আর আমার পক্ষে নিরাপদ নয়। কিন্তু লিফটও তো নেই।”

অদিতি চারপাশে তাকাল। সিঁড়ির এক পাশে জিনিসপত্র রাখা, কয়েকটি ধাপের কিনারা ভাঙা, আর আলো জ্বালানোর সুইচটি এত উঁচুতে যে ছোট শিশুদের নাগালের বাইরে।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে বাবাকে বিষয়টি জানাল।

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বাড়ির সমিতিতে অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু মেরামতের খরচ নিয়ে সবাই একমত হতে পারে না।”

অদিতি প্রশ্ন করল, “সবাই যদি একটু একটু করে সাহায্য করে, তাহলে কি কাজটা করা সম্ভব নয়?”

বাবা বললেন, “সম্ভব হতে পারে। কিন্তু তার আগে সবাইকে বোঝাতে হবে কোন কাজগুলো সবচেয়ে জরুরি।”

এই কথাটাই অদিতির মাথায় নতুন ভাবনা এনে দিল।

পরদিন সে নিজের খাতায় আবাসনের সিঁড়িঘরের একটি নকশা আঁকল। কোথায় আলো কম, কোথায় রেলিং ক্ষতিগ্রস্ত, কোথায় চলাচলের পথে বাধা রয়েছে—সব চিহ্নিত করল। তবে সে কোনও বিপজ্জনক জায়গা নিজে পরীক্ষা করতে গেল না। বাবার সাহায্যে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সমস্যাগুলো নথিভুক্ত করল।

এরপর কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলল। কেউ জানালেন, রাতে সিঁড়িতে আলো না থাকায় অসুবিধা হয়। কেউ বললেন, ছোট শিশুরা রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে ঝুঁকে পড়ে। আবার কেউ অভিযোগ করলেন, সিঁড়ির পাশে রাখা পুরোনো আসবাবপত্রের জন্য জরুরি অবস্থায় দ্রুত বেরিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।

অদিতি সব কথা লিখে নিল।

আবাসনের সমিতির সভায় সে বাবার সঙ্গে হাজির হলো। প্রথমে বড়রা তার উপস্থিতিকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। কিন্তু যখন সে নিজের আঁকা নকশা সামনে রেখে সমস্যাগুলো একে একে দেখাল, তখন সভার পরিবেশ বদলে গেল।

একজন বাসিন্দা বললেন, “এত দিন আমরা শুধু নিজেদের অসুবিধার কথা বলেছি। কেউ পুরো সিঁড়িটাকে একসঙ্গে দেখেনি।”

সমিতি সিদ্ধান্ত নিল, প্রথমে একজন যোগ্য পেশাদারকে দিয়ে ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা করানো হবে। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত রেলিং মেরামত, পর্যাপ্ত আলো, চলাচলের পথ পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক চিহ্ন বসানোর ব্যবস্থা করা হবে। অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টিও আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

কাজ শুরু হলে নতুন সমস্যা দেখা দিল। কয়েকজন বাসিন্দা নিজেদের জিনিস সরাতে চাইছিলেন না। তাঁদের যুক্তি ছিল, সিঁড়ির পাশে সামান্য জিনিস রাখলে এমন কী ক্ষতি হবে?

অদিতি কাউকে অপমান করল না। সে শুধু বোঝাল, জরুরি পরিস্থিতিতে কয়েক সেকেন্ডও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চলাচলের পথ খোলা রাখা সবার নিরাপত্তার জন্য দরকার।

ধীরে ধীরে সবাই সহযোগিতা করতে শুরু করলেন।

মেরামতের কাজ শেষ হতে কয়েক সপ্তাহ লাগল। সিঁড়িঘরে পর্যাপ্ত আলো বসানো হলো, ভাঙা অংশগুলি ঠিক করা হলো এবং জরুরি অবস্থায় বেরোনোর নির্দেশনা স্পষ্ট করে দেওয়া হলো। ভবনের প্রবেশপথ ও সিঁড়ি ব্যবহার করতে যাঁদের বিশেষ অসুবিধা হয়, তাঁদের প্রয়োজন নিয়েও সমিতি নতুন করে আলোচনা শুরু করল।

এক সন্ধ্যায় নির্মলবাবু ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন। এবার তাঁর হাতের পাশে শক্ত রেলিং, ধাপগুলিতে পর্যাপ্ত আলো। তৃতীয় তলায় পৌঁছে তিনি অদিতিকে দেখে বললেন, “তোমার আঁকা নকশাটা শুধু সিঁড়ি বদলায়নি, আমাদের ভাবনাটাও বদলে দিয়েছে।”

অদিতি লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল।

কিছুদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান ও সমাজবিষয়ক প্রকল্প প্রদর্শনী হলো। অদিতি সেখানে আবাসনের আগের ও পরের নকশা দেখাল। তার প্রকল্পের নাম দিল—‘সবার জন্য নিরাপদ পথ’।

শিক্ষকেরা তার কাজের প্রশংসা করলেন। তবে অদিতি বলল, “এটা আমার একার কাজ নয়। বাবা, প্রতিবেশীরা, সমিতি আর যাঁরা নিরাপত্তা পরীক্ষা করেছেন—সবাই মিলে করেছেন। আমি শুধু সমস্যাগুলো একসঙ্গে দেখানোর চেষ্টা করেছি।”

বছর কয়েক পর অদিতি স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার সুযোগ পেল। কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে সে পুরোনো আবাসনের ছাদে দাঁড়াল। সামনে বিস্তৃত শহর, দূরে আকাশছোঁয়া ভবন।

একসময় সে ভাবত, আকাশ ছোঁয়া মানে শুধু উঁচু বাড়ি তৈরি করা। এখন সে জানত, একটি ভবনের সাফল্য তার উচ্চতায় নয়, সেখানে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারার মধ্যে।

আকাশের দিকে তাকিয়ে অদিতি মনে মনে বলল, “আমি এমন বাড়ি তৈরি করতে চাই, যেখানে কেউ শুধু সিঁড়ি ভাঙতে না পারার কারণে নিজের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে না।”

তার সামনে পথটা দীর্ঘ ছিল। কিন্তু প্রথম সিঁড়িটি সে ইতিমধ্যেই পেরিয়ে এসেছে।

শিক্ষা: বড় পরিবর্তন সব সময় বড় প্রকল্প দিয়ে শুরু হয় না। কখনও নিজের চারপাশের একটি সমস্যা মন দিয়ে লক্ষ করা, প্রমাণসহ তা তুলে ধরা এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই ভবিষ্যতের বড় কাজের প্রথম ধাপ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *