অন্ধকারের ভিতর থেকে যে মানুষটি এগিয়ে আসছিল, তার মুখ দেখে অর্কের মনে হল, সে যেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একই চোখ। একই নাক। একই কপাল। এমনকি বাঁ ভ্রুর ওপর ছোট্ট কাটা দাগটাও একই জায়গায়।
শুধু একটা পার্থক্য ছিল।
অর্কের মুখে আতঙ্ক, আর লোকটির মুখে অদ্ভুত এক নিশ্চিন্ত হাসি।
তার হাতে ধরা ছুরির ফলায় আলো পড়তেই মধুরিমা চিৎকার করে উঠল।
“মাধবী!”
লোকটি থেমে গেল।
“এত বছর পরে দিদি নিজের বোনকে চিনতে পারল?”
মধুরিমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। “তুমি বেঁচে আছ?”
“বেঁচে আছি? কথাটা এত সহজ নয়, দিদি।”
লোকটি ছুরিটা নামিয়ে রাখল। তারপর দেওয়ালের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, “এই ছবিগুলো দেখছ? প্রত্যেকটা আমার জীবনের একটা করে নাম। জন্মের সময় আমি মাধবী সেন ছিলাম। পরে আমাকে অর্ক বসু বানানো হল। আর এখন আমি এমন একজন মানুষ, যার কোনও আসল পরিচয় নেই।”
অর্ক পিছিয়ে গেল।
“কিন্তু আমি কে?”
লোকটি তার দিকে তাকাল।
“তুমি সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছ, অথচ উত্তরটা শুনলে হয়তো আর নিজের মুখ দেখতে পারবে না।”
“বল!”
মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার নাম অর্ক বসু নয়। তোমার নাম অরিন্দম সেন। তুমি আমার দিদির ছেলে।”
মধুরিমা যেন বজ্রাহত হল।
“না! আমার তো কোনও সন্তান ছিল না!”
“তুমি ভুলে গেছ, দিদি। তোমার সন্তান জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল বলে তোমাকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই শিশুটিকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিচয় বদলানোর চক্রের জন্য সদ্যোজাত শিশুদের নথি পাল্টানো হত। তোমার সন্তানকে অমলেন্দু বসু নিজের পরিবারের পরিচয়ে বড় করেছিলেন।”
অর্কের মাথার ভিতরে সবকিছু ঘুরতে লাগল।
“তাহলে তুমি আমার মামি?”
মধুরিমা কাঁপা গলায় বলল, “আমি তোমার মা।”
এই একটি বাক্য যেন ঘরের সমস্ত শব্দ থামিয়ে দিল।
অর্ক মেঝেতে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় অসুস্থ হলে এক মহিলা তার মাথায় জলপট্টি দিতেন। তিনি তাকে ঘুম পাড়িয়ে গান শোনাতেন। অর্ক এত দিন ভেবেছিল, তিনি তার পরিচারিকা। পরে অমলেন্দু বলেছিলেন, সেই মহিলা নাকি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
অর্কের চোখ ভিজে উঠল।
“তুমি আমাকে চিনতে পারোনি কেন?”
মধুরিমা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“তোমাকে যখন আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তোমার বয়স মাত্র কয়েক দিন। পরে তোমাকে খুঁজতে গিয়ে আমাকে বলা হয়েছিল, তুমি মারা গিয়েছ। আমি বিশ্বাস করিনি। বছরের পর বছর খুঁজেছি। কিন্তু অমলেন্দু তোমার সমস্ত নথি বদলে দিয়েছিলেন।”
মাধবী এবার কথা বলল।
“অমলেন্দু শুধু তোমার পরিচয় বদলাননি। আমার পরিচয়ও বদলেছিলেন। বারো বছর আগে যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল বলে সবাই জানে, সে আমি নই। সে ছিল এই চক্রের আরেকটি শিশু, যার নথিতে আমার নাম বসানো হয়েছিল।”
“তাহলে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর কী ঘটেছিল?” অর্ক প্রশ্ন করল।
মাধবীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“সেদিন আমি পালাতে চেয়েছিলাম। আমার কাছে পরিচয় বদলের সমস্ত প্রমাণ ছিল। অমলেন্দু আমাকে আটকাতে গিয়ে ভুল করে অন্য একটি মেয়েকে হত্যা করেন। তারপর তার দেহকে আমার বলে চালিয়ে দেন। আমাকে গোপন ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। পরে আমি পালিয়ে যাই। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে বুঝলাম, পৃথিবীর কাছে আমি মৃত।”
“তুমি পুলিশে যাওনি কেন?”
“গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার পরিচয়পত্রে আমি মৃত। জন্মের নথিতে আমি অন্য কেউ। আদালতে প্রমাণ করার মতো কিছুই ছিল না। যে মানুষগুলো সত্যিটা জানত, তারা হয় নিখোঁজ, নয়তো মৃত।”
অর্ক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“আর তুমি এত দিন কোথায় ছিলে?”
“এই বাড়ির কাছেই। অমলেন্দু যে চক্র চালাত, তার প্রমাণ সংগ্রহ করছিলাম। তোমাকে খুঁজছিলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, কখন তুমি নিজের অতীতের কাছে ফিরে আসবে।”
অর্কের মনে পড়ল, বিয়ের আগে মেঘলা নামের সেই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে। মেয়েটি তাকে একটি বই উপহার দিয়েছিল। বইটির নাম ছিল—‘হারিয়ে যাওয়া মানুষের পরিচয়’।
সেই বইয়ের ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজে লেখা ছিল—
‘কখনও নিজের স্মৃতিকে বিশ্বাসঘাতক ভেবো না। কখনও কখনও স্মৃতিকে চুরি করে নেওয়া হয়।’
এখন সে বুঝতে পারল, সেই পরিচয়ও ছিল সাজানো। মধুরিমা তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, নিজের সন্তানকে কাছে পাওয়ার আগে তাকে কতগুলো মিথ্যে পরিচয়ের ভিতর দিয়ে যেতে হবে।
হঠাৎ উপরের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।
তারপর সিঁড়ি দিয়ে ভারী পায়ের শব্দ নামতে শুরু করল।
মাধবী ছুরিটা তুলে নিল।
“ও এসেছে।”
“কে?” অর্ক জিজ্ঞেস করল।
মাধবী উত্তর দিল, “যে মানুষটি এত বছর ধরে আমাদের সবার জীবন লিখেছে।”
সিঁড়ির শেষে অমলেন্দু বসু দেখা দিলেন।
তাঁর হাতে একটি পিস্তল। মুখে কোনও ভয় নেই।
“তোমরা অনেক কিছু জেনে ফেলেছ,” তিনি বললেন। “কিন্তু সব সত্যি জানার দরকার হয় না।”
মধুরিমা অর্কের সামনে দাঁড়াল।
“এবার সব শেষ হবে, অমলেন্দু।”
বৃদ্ধ হেসে উঠলেন।
“শেষ? এই চক্রের শেষ হয় না। একজনের নাম মুছে গেলে অন্যজনের নামে নতুন জীবন শুরু হয়। তোমরা ভাবছ, মাধবী বেঁচে আছে বলে সত্যি ফিরে এসেছে? তোমরা জানো না, মাধবীর পরিচয়ও আসল নয়।”
মাধবী চিৎকার করে উঠল, “চুপ করুন!”
অমলেন্দু পিস্তল তুলে ধরলেন।
“তোমার জন্মের নথিতে যে নাম আছে, সেটা মিথ্যে। তোমার বাবা-মা কারা, তাও তুমি জানো না। তুমি শুধু একটা পরীক্ষার ফল।”
অর্কের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
“পরীক্ষা?”
অমলেন্দু বললেন, “মানুষের স্মৃতি, পরিচয় আর আচরণ বদলে দিলে সে কত দিন নিজের অতীত ছাড়া বাঁচতে পারে, সেটাই ছিল পরীক্ষা। তোমাদের প্রত্যেককে আলাদা পরিচয় দিয়ে বড় করা হয়েছিল। কেউ নিজের জন্মের কথা জানত না, কেউ নিজের পরিবারের কথা জানত না। আমরা দেখতাম, সত্যি গোপন রাখলে মানুষ কীভাবে নতুন জীবন তৈরি করে।”
“আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করেছেন?” অর্ক চিৎকার করল।
“জীবন নয়, পরিচয়। মানুষ যা বিশ্বাস করে, সে-ই হয়ে ওঠে।”
মধুরিমা অমলেন্দুর দিকে এগিয়ে গেল।
“আপনি ভুল করছেন। পরিচয় কাগজে বদলানো যায়। স্মৃতি আড়াল করা যায়। কিন্তু সত্যি চিরকাল মুছে ফেলা যায় না।”
অমলেন্দু পিস্তল তুললেন।
ঠিক তখনই মাধবী মেঝেতে পড়ে থাকা লোহার রডটা তুলে তাঁর হাতে আঘাত করল। পিস্তল ছিটকে দূরে পড়ে গেল। অর্ক দৌড়ে গিয়ে অস্ত্রটা তুলে নিল।
কিন্তু সে অমলেন্দুর দিকে পিস্তল তাক করল না।
“আপনাকে আমি মারব না,” সে বলল। “আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনার তৈরি করা সব মিথ্যের সাক্ষী হয়ে।”
অমলেন্দু প্রথমবারের মতো ভয় পেলেন।
দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।
মধুরিমা মাধবীর দিকে তাকাল।
“তুমি পুলিশকে খবর দিয়েছিলে?”
মাধবী মাথা নাড়ল।
“এইবার সমস্ত নথির কপি তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। তোমাদের আর লুকিয়ে থাকতে হবে না।”
অমলেন্দু গ্রেপ্তার হলেন। তাঁর গোপন অফিস থেকে উদ্ধার হল অসংখ্য জাল জন্মের শংসাপত্র, মৃত মানুষের পরিচয়পত্র, হাসপাতালের নথি এবং বহু নিখোঁজ মানুষের তথ্য। দীর্ঘ তদন্তে প্রমাণিত হল, বহু বছর ধরে একটি সংগঠিত চক্র মানুষের পরিচয় বদলে অপরাধ ঢেকে রেখেছিল।
কিন্তু অর্কের নিজের পরিচয়ের প্রশ্নটি তখনও রয়ে গেল।
তিন মাস পরে।
কলকাতার একটি ছোট্ট বাড়ির বারান্দায় বসে অর্ক পুরোনো কাগজপত্র দেখছিল। এখন সে জানে, তার জন্মের নাম অরিন্দম সেন। মধুরিমা তার মা। মাধবী তার মাসি—যদিও দু’জনের সম্পর্কের ভিতর এত বছর ধরে বোন, ছায়া এবং হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ায় তার জন্মের নথি সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু সে এখনও নিজের পুরোনো নাম পুরোপুরি ছাড়তে পারেনি। অর্ক নামেই তার শৈশব, তার স্মৃতি, তার আনন্দ ও দুঃখ।
একদিন মধুরিমা তার পাশে এসে বসলেন।
“তুমি কি নতুন নামে বাঁচতে পারবে?”
অর্ক মৃদু হাসল।
“আমি আমার জন্মের নাম জানলাম বলে এত দিনের জীবন মিথ্যে হয়ে যায় না। আমি অর্ক নামেও বেঁচেছি। এখন অরিন্দম নামটাকেও নিজের জীবনের অংশ করব।”
মধুরিমা ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
বহু বছর পরে প্রথমবার তাঁদের মধ্যে কোনও গোপনীয়তা ছিল না।
সেদিন সন্ধ্যায় মাধবীও এল। তার হাতে একটি ছোট্ট বাক্স।
“এটা তোমার জন্য,” সে বলল।
বাক্স খুলে অর্ক দেখল, ভিতরে একটি পুরোনো ছবি। ছবিতে তরুণী মধুরিমা কোলে একটি সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে হাসছেন মাধবী।
ছবির পিছনে লেখা—
‘অরিন্দমের প্রথম জন্মদিন। পরিবার মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, সত্যিটা একসঙ্গে বহন করার সাহসও।’
অর্ক ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
তারপর হঠাৎ তার চোখ পড়ল বাক্সের নীচে রাখা একটি ছোট্ট খামের ওপর।
খামের গায়ে লেখা—
‘অরিন্দমের জন্য। খুলবে ১৭ নভেম্বর, ২০২৬।’
অর্কের বুক ধক করে উঠল।
আজও ১৭ নভেম্বর।
সে খাম খুলল।
ভিতরে মাত্র একটি লাইন—
‘যে মানুষটি তোমার পরিচয় বদলেছিল, সে একা ছিল না।’
নীচে একটি নাম লেখা—
‘মধুরিমা সেন।’
অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
মধুরিমা তার সামনেই বসে আছেন। তাঁর মুখে কোনও বিস্ময় নেই।
“মা,” অর্ক ফিসফিস করে বলল, “এই চিঠিটা তুমি লিখেছ?”
মধুরিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “হ্যাঁ।”
“তুমি জানো, অমলেন্দু একা কাজ করেননি?”
মধুরিমা জানলার বাইরে তাকালেন।
“আমি জানি, অরিন্দম। কারণ অমলেন্দুর সঙ্গে যে মানুষটি পরিচয় বদলের চক্র শুরু করেছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”
“কে সে?”
মধুরিমা এবার ছেলের দিকে তাকালেন।
“তোমার জন্মদাতা বাবা।”
অর্কের মুখ থেকে শব্দ হারিয়ে গেল।
“কিন্তু তুমি তো বলেছিলে—”
“আমি বলেছিলাম, তুমি আমার সন্তান। সেটা সত্যি। কিন্তু তোমার জন্মদাতা কে, তা আমি কোনও দিন বলিনি।”
মধুরিমা উঠে দাঁড়ালেন। আলমারি থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে অর্কের হাতে দিলেন।
ছবিতে এক তরুণ পুরুষ। মুখটা অর্কের মতোই। ছবির পিছনে নাম লেখা—
‘ডাক্তার ঈশান সেন। নিখোঁজ: ১৭ নভেম্বর, ২০০১।’
মধুরিমা বললেন, “তোমার জন্মের পর ঈশান নিখোঁজ হয়ে যায়। আমি ভেবেছিলাম, সে মারা গেছে। কিন্তু কয়েক মাস আগে আমি তার কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছি।”
“সে কোথায়?”
“আমি জানি না। শুধু জানি, সে আবার ফিরে আসতে চলেছে।”
অর্ক ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার এত দিনের রহস্যের সমাধান হয়েছে ভেবেছিল। কিন্তু এখন বুঝল, সে আসলে আরও বড় রহস্যের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক তখনই বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠল।
মধুরিমা দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
“সে এসে গেছে।”
অর্ক দরজা খুলল।
বাইরে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখে অদ্ভুত শান্তি। হাতে একটি পুরোনো কালো ব্যাগ।
লোকটি অর্কের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তুমি অরিন্দম? আমি তোমার বাবা।”
অর্ক কিছু বলার আগেই লোকটি ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো জন্মের শংসাপত্র বের করল।
সেখানে শিশুটির নাম লেখা—
‘অরিন্দম সেন।’
কিন্তু বাবার নামের জায়গায় লেখা ছিল—
‘অমলেন্দু বসু।’
অর্কের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
লোকটি মৃদু হাসল।
“এবার বুঝতে পারছ? তোমার জন্মের সত্যিটা এখনও কেউ জানে না।”
তৃতীয় পর্ব শেষ।
এই উপন্যাসের তিন পর্বের কাহিনি এখানে শেষ হল।