বাড়ির পেছনের ছোট্ট ঘরটায় বহু বছর ধরে পড়ে ছিল লাল সাইকেলটা।
চাকা দুটোয় হাওয়া নেই। লোহার গায়ে মরচে। ঘণ্টাটাও নষ্ট।
তবু অয়ন কখনও সেটাকে ফেলে দিতে পারেনি।
কারণ সাইকেলটা তার বাবার।
বাবা মারা যাওয়ার আগে শেষবার বলেছিলেন,
—“এটা রেখে দিস। কোনওদিন কাজে লাগবে।”
অয়ন তখন হেসেছিল।
—“এই পুরনো সাইকেল দিয়ে কী হবে বাবা?”
বাবা শুধু বলেছিলেন,
—“সব জিনিসের কাজ টাকা দিয়ে মাপিস না।”
বাবা চলে যাওয়ার পর কথাটা অয়নের মনে বারবার ফিরে আসত।
কয়েক বছর পর অয়ন শহরে চাকরি পেল। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, নতুন জীবন।
পুরনো সাইকেলটা তবু থেকে গেল।
একদিন বাড়ি পরিষ্কার করার সময় অয়নের স্ত্রী বলল,
—“এটা আর রেখে কী হবে? বিক্রি করে দাও।”
অয়ন কিছুক্ষণ সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“না।”
সেদিন বিকেলে সাইকেলটা পরিষ্কার করতে গিয়ে সে সিটের নিচে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স দেখতে পেল।
বাক্স খুলে বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরনো কাগজ।
প্রথম কাগজে লেখা—
“অমলের পড়াশোনার খরচ—৫০০ টাকা।”
দ্বিতীয়টায়—
“রেণুর ওষুধ—৩০০ টাকা।”
তৃতীয়টায়—
“বিপ্লবের পরীক্ষার ফি—৭৫০ টাকা।”
অয়ন অবাক হয়ে গেল।
এই নামগুলো সে চেনে।
পাড়ার মানুষ।
কেউ এখন দোকান চালায়, কেউ অবসর নিয়েছে, কেউ অন্য শহরে চলে গেছে।
কিন্তু তার বাবা তাঁদের জন্য টাকা দিয়েছিলেন?
অয়ন আরও কাগজ বের করল।
প্রায় পঞ্চাশটি নাম।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয়—কোনও কাগজেই বাবার নিজের নাম নেই।
শেষ কাগজে মাত্র একটি লাইন—
“যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের কাছ থেকে টাকা ফেরত নিতে নেই। একদিন তারা অন্য কাউকে সাহায্য করবে।”
অয়নের চোখ ভিজে উঠল।
পরদিন সে অমলকাকুর বাড়িতে গেল।
সব শুনে অমলকাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“তোর বাবা কাউকে জানতে দিত না।”
—“আপনি টাকা ফেরত দেননি?”
—“দিতে গিয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, ‘আমাকে নয়, অন্য কাউকে দিয়ে দিও।’”
অয়ন চুপ করে রইল।
বাড়ি ফেরার পথে তার চোখে পড়ল—একটি ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সাইকেলের দিকে তাকিয়ে আছে।
ছেলেটির স্কুলের পোশাক পুরনো।
অয়ন জিজ্ঞেস করল,
—“সাইকেল চালাতে পারিস?”
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
—“আমাদের সাইকেল নেই।”
অয়ন কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বাড়িতে ফিরে সেই লাল সাইকেলটা বের করল।
চাকা ঠিক করাল।
ব্রেক বদলাল।
ঘণ্টা লাগাল।
পরদিন ছেলেটাকে ডেকে বলল,
—“এটা তোর।”
ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,
—“কিন্তু কাকু, আমি টাকা দিতে পারব না।”
অয়ন হেসে বলল,
—“টাকা দিতে হবে না।”
—“তাহলে?”
অয়ন সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে বলল,
—“যেদিন তুই বড় হবি, আর কাউকে সাহায্য করার সুযোগ পাবি, তখন তাকে সাহায্য করবি।”
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
অয়ন সাইকেলটা তার হাতে তুলে দিল।
সেদিন রাতে অয়ন বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“বাবা, তোমার সাইকেলটা কাজে লেগেছে।”
ছবির মানুষটি অবশ্য কোনও উত্তর দিলেন না।
তবু অয়নের মনে হল, ঘরের কোথাও যেন সেই পুরনো সাইকেলের ঘণ্টা একবার বেজে উঠল।
টিং…
অয়ন হেসে ফেলল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—
কিছু উত্তর শব্দে আসে না। মানুষের ভালো কাজের মধ্যেই তারা বেঁচে থাকে।
সমাপ্ত।